নির্বাচনী ডামডোল শেষে যখন নতুন সরকার গঠনের প্রক্রিয়া চলছে, ঠিক তখনই দুয়ারে কড়া নাড়ছে পবিত্র রমজান মাস। সাধারণ মানুষের মনে আনন্দের পরিবর্তে এখন নিত্যপণ্যের আকাশছোঁয়া দাম নিয়ে গভীর উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। নতুন সরকারের জন্য এটি কেবল একটি প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়, বরং জনমনে আস্থা অর্জনের প্রথম ও প্রধান অগ্নিপরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে নিত্যপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণ।
অতীতে দেখা গেছে, রাজনৈতিক পালাবদল বা অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী বাজারকে অস্থিতিশীল করে তোলে। এবারও সেই একই শঙ্কা জনমনে প্রবলভাবে বিরাজমান। রমজান আসার আগেই চাল, ডাল, তেল, চিনি, সবজি, কাঁচামরিচ ও লেবুর মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম হু হু করে বাড়তে শুরু করে। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য ইফতার ও সাহরির সংস্থান করা তখন একপ্রকার দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়। নতুন সরকারের শপথগ্রহণ এবং প্রশাসনিক গুছিয়ে ওঠার মাঝখানের এই সময়টুকুকে ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট তৈরির মোক্ষম সুযোগ হিসেবে বেছে নিতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি চট্টগ্রাম বন্দরে ২১ লাখ টনের বেশি খাদ্যপণ্য আটকে থাকার খবর বর্তমানে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। সময়মতো এই বিশাল পরিমাণ পণ্য খালাস করা সম্ভব না হলে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হওয়া অনিবার্য। পর্যাপ্ত লাইটার জাহাজের অভাব এবং অনেক ব্যবসায়ীর নিজস্ব গুদাম না থাকায় পণ্য খালাসে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হচ্ছে বলে জানা গেছে। রমজানের আগে এই অচলাবস্থা দ্রুত নিরসন করা না গেলে বাজারে পণ্যের সরবরাহ কমে যাবে এবং সুযোগসন্ধানী ব্যবসায়ীরা এর পূর্ণ ফায়দা লুটবে।
বাজার অস্থিতিশীল হওয়ার মূল কারণ প্রায়শই পণ্যের অভাব নয়, বরং ‘দুষ্টচক্র’ বা সিন্ডিকেটের কারসাজি। অসাধু ব্যবসায়ীরা পণ্য গুদামজাত করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে এবং স্থানীয় প্রশাসন ও বাজার মনিটরিং সেলের শিথিলতার সুযোগ নিয়ে সাধারণ মানুষের পকেট কাটে। এই সিন্ডিকেট চক্রের হোতাদের চিহ্নিত করে এখনই তাদের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযান চালানো এবং পুলিশ ও প্রশাসনকে কঠোর হাতে এই চাঁদাবাজি দমন করা অপরিহার্য।
রমজান মাস পবিত্রতা ও ত্যাগের মাস হলেও, দুঃখজনকভাবে বাংলাদেশের একশ্রেণির ব্যবসায়ী এই মাসকে অধিক মুনাফা লাভের হাতিয়ার হিসেবে দেখে। অথচ বিশ্বের অন্যান্য মুসলিম দেশগুলোতে রমজান উপলক্ষে পণ্যের দাম কমানো হয়। ব্যবসায়ীদের উপলব্ধি করা উচিত যে, মাপে কম দেওয়া বা ভেজাল পণ্য বিক্রি করা ইসলামের দৃষ্টিতে গুরুতর অপরাধ। অবৈধভাবে উপার্জিত অর্থে ইফতার বা সাহরি করে কোনো আত্মিক তৃপ্তি বা পুণ্য লাভ সম্ভব নয়। মানবিকতার দৃষ্টিকোণ থেকে এবং সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বিবেচনা করে ন্যায্য মুনাফায় পণ্য বিক্রি করাই তাদের কর্তব্য।
আসন্ন রমজানকে সামনে রেখে সরকারকে এখনই কোমর বেঁধে নামতে হবে। যদি বন্দরে পণ্য খালাসে জটিলতা থাকে, সিন্ডিকেট সক্রিয় থাকে এবং প্রশাসন নিষ্ক্রিয় থাকে, তবে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগের শেষ থাকবে না। ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ের মুখে হাসি ফোটাতে সিন্ডিকেটের কালো হাত ভেঙে দিয়ে বাজার পরিস্থিতি সহনীয় পর্যায়ে রাখা নতুন সরকারের জন্য প্রথম ও সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। শুধু রমজানেই নয়, সারা বছরই যেন নিত্যপণ্যের দাম মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে থাকে—এটাই সাধারণ নাগরিকদের প্রত্যাশা। ছিন্নমূল ও শ্রমজীবী মানুষও যেন ডাল-ভাত খেয়ে শান্তিতে রোজা পালন করতে পারে, সেই পরিবেশ নিশ্চিত করাই হোক নতুন সরকারের প্রধান লক্ষ্য।
রিপোর্টারের নাম 




















