## পাবনা-৩ আসনে ধানের শীষের সঙ্গে লড়ছে বিদ্রোহী ঘোড়া, জামায়াতের দাঁড়িপাল্লা নির্ভার
পাবনা, [তারিখ]: আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে চলনবিল বিধৌত পাবনা-৩ (চাটমোহর-ভাঙ্গুড়া-ফরিদপুর) আসনে বইছে নির্বাচনী হাওয়া। কৃষি, মৎস্য, দুগ্ধ, ডিম ও ঘি’র জন্য খ্যাত এই আসনে উৎসবমুখর পরিবেশে চলছে প্রচার-প্রচারণা। চায়ের দোকান থেকে শুরু করে কৃষকের মাঠ, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে অফিস পাড়া পর্যন্ত সর্বত্রই চলছে নির্বাচনী সমীকরণ। সরগরম খানকা, হাট-বাজারও। কে জিতবে, কে হারবে—এই বিশ্লেষণ চলছে পুরোদমে।
স্থানীয় বিএনপিতে অভ্যন্তরীণ কিছু সংকট থাকলেও শেষ মুহূর্তে তৃণমূলের নেতাকর্মীরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে ধানের শীষের প্রার্থীকে জয়ী করতে মরিয়া। প্রচারণায় এক পক্ষ অন্য পক্ষের বিরুদ্ধে বিষোদগার করে ভোট টানার চেষ্টা করলেও, এখানে বিএনপির ধানের শীষের মূল প্রতিপক্ষ হয়েছে দলেরই এক বহিস্কৃত নেতার ‘ঘোড়া’ প্রতীক। অন্যদিকে, জামায়াতের ‘দাঁড়িপাল্লা’ প্রতীক রয়েছে নির্ভার। ফলে, ‘কেহ কারে নাহি ছাড়ে সমানে সমান’—এই পরিস্থিতি বিরাজ করছে এই সংসদীয় আসনে। মাঘের শীতে প্রার্থী ও তাদের কর্মী-সমর্থকদের ঘাম ছুটছে ভোটের পাল্লা ভারি করতে। শেষ হাসি কে হাসবে, তা দেখতে অধীর অপেক্ষায় লাখ লাখ মানুষ। তবে, নির্বাচন ঘিরে পাবনা-৩ এলাকায় এখনো পর্যন্ত কোনো সহিংসতার ঘটনা ঘটেনি। মাঠ পর্যায়ের প্রশাসন কঠোর অবস্থানে থাকায় বিরাজ করছে চিরচেনা ভোট উৎসবের আমেজ।
বিএনপিতে বিভক্তি, বিদ্রোহী প্রার্থীর উত্থান:
পাবনা-৩ আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন কৃষকদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি কৃষিবিদ হাসান জাফির তুহিন (ধানের শীষ)। তিনি দলীয় মনোনয়ন নিয়ে এলাকায় পৌঁছানোর পর তৃণমূল পর্যায়ে অসন্তোষ দেখা দেয়। বিএনপির একটি অংশ সাবেক এমপি কেএম আনোয়ারুল ইসলাম ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান হাসাদুল ইসলাম হীরাকে নিয়ে তুহিনের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে বিরোধিতায় নামে। স্থানীয় প্রার্থীর দাবি তুলে মশাল মিছিলসহ নানা আন্দোলন-সংগ্রাম শুরু হয়।
যখন তুহিনের দলীয় মনোনয়ন চূড়ান্ত হয়, তখন কেন্দ্রীয় বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য ও সাবেক এমপি আলহাজ্ব কেএম আনোয়ারুল ইসলাম বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে ‘ঘোড়া’ প্রতীকে নির্বাচন করার ঘোষণা দেন। তার সঙ্গে নির্বাচনি প্রচারে যোগ দেন উপজেলা বিএনপির সাবেক সদস্য সচিব মো. হাসাদুল ইসলাম হীরা, পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. তৌহিদুল ইসলাম তাইজুলসহ বিএনপির অন্য নেতৃবৃন্দ।
অন্যদিকে, উপজেলা যুবদলের সদস্য সচিব ফারুক হোসেন, পৌর যুবদলের আহ্বায়ক তানভির লিখন জুয়েল, স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্য সচিব আসাদুজ্জামান লেবু দলীয় প্রার্থী তুহিনের পক্ষে ধানের শীষের ভোট প্রার্থনা শুরু করলেও, গত ২ ফেব্রুয়ারি সংবাদ সম্মেলন করে তারা স্থানীয় প্রার্থী কেএম আনোয়ারুল ইসলামের পক্ষে নির্বাচন করার ঘোষণা দেন। ওই সংবাদ সম্মেলন থেকে কেন্দ্রীয় বিএনপির নেতাদের ‘দালাল’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। পরবর্তীতে দল আনোয়ারুল, হীরা, তাইজুল, লিখন, ফারুক, লেবু এবং ছাত্রদল নেতা আরিফকে দল থেকে বহিস্কার করে।
তবে, উপজেলা বিএনপি, পৌর বিএনপি এবং এর সকল অঙ্গসংগঠনের সিংহভাগ নেতাকর্মী দলীয় প্রার্থী হাসান জাফির তুহিনের পক্ষে নির্বাচনি মাঠে কাজ করছে।
ভোটারদের ভাবনা ও নির্বাচনী সমীকরণ:
ফরিদপুরের হাদল গ্রামের চা দোকানী আফজাল হোসেন জানান, ‘চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া উপজেলায় কী হবে জানি না, তবে আমাদের এখানে অনেক ভোটে ধানের শীষ জিতবে।’
ভাঙ্গুড়ার বিএলবাড়ী গ্রামের ছকির উদ্দিন বলেন, ‘ভাঙ্গুড়ায় দাঁড়িপাল্লার ভোট বেশি আছে। তবে ধানের শীষের সঙ্গে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে।’
চাটমোহর উপজেলার নবীন গ্রামের নুর মোহাম্মদ বলেন, ‘চাটমোহরে পুরানো মানুষ হিসেবে আনোয়ারের (ঘোড়া) সঙ্গে ধানের শীষের (হাসান জাফির তুহিন) ফাইট (যুদ্ধ) হবে। চাটমোহরে ১০-১৫ হাজার ভোটের বেশি কেউ জিততে পারবে না।’
অনেকে ‘চাটমোহর ইজম’ কাজে লাগিয়ে বিদ্রোহী প্রার্থী কেএম আনোয়ারুল ইসলামের (ঘোড়া) ভোটের পাল্লা ভারি করার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন। এই তিন উপজেলার মধ্যে চাটমোহরেই ভোটার সংখ্যা সবচেয়ে বেশি—২ লাখ ৬০ হাজার ১১৭ জন। সে লক্ষ্যে বিগত দিনের উন্নয়নের কথা বলে তার কর্মীরা দিনরাত ভোট প্রার্থনা করছেন এবং নির্বাচিত হলে পাবনা-৩ এলাকার উন্নয়নের ধারা বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। আনোয়ারুল ইসলামের নিজস্ব কিছু ভোট ব্যাংক থাকলেও, সেখান থেকে অনেক ভোটার দলীয় প্রার্থীর বাইরে যাবেন কিনা, তা নিয়ে আভাস পাওয়া যাচ্ছে।
অন্যদিকে, বিএনপির দলীয় প্রার্থী হাসান জাফির তুহিন (ধানের শীষ) চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া, ফরিদপুরে দলের প্রার্থী হিসেবে বাড়তি সুযোগ কাজে লাগাতে পারছেন। দলীয় নারী-পুরুষ নেতাকর্মীরা কাক ডাকা ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে চলনবিলের প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে নানা উন্নয়ন ও প্রতিশ্রুতির বাণী শুনিয়ে দ্বারে দ্বারে ভোট প্রার্থনা করছেন। প্রচারণার প্রথম দিকে দলে বিভক্তি প্রকট থাকলেও, শেষ মুহূর্তে বিএনপির তৃণমূলের নেতাকর্মীরা সংগঠিত হয়েছেন। তারা তাদের দলের প্রার্থী তুহিনকে বিজয়ী করতে ঐক্যবদ্ধভাবে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। ভোটের ‘দুর্গ’ খুঁজে খুঁজে দুর্গম এলাকায় সভা-সমাবেশ করছেন তারা। নির্বাচিত হলে চলনবিল নিয়ে মহা পরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতিও দিচ্ছেন। দীর্ঘ ১৭ বছর পর এই অঞ্চলে নির্বাচন ঘিরে এমন উৎসবের আমেজ শুরু হয়েছে। ১৯৭১ সালের পর এই আসনে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের বাইরে অন্য কোনো প্রার্থী এমপি হতে পারেননি। অনেক সচেতন ভোটার মনে করছেন, সেই ধারাবাহিকতা এই নির্বাচনেও বজায় থাকবে।
জামায়াতের অবস্থান ও ত্রিমুখী লড়াইয়ের সম্ভাবনা:
এছাড়াও, জামায়াতের প্রার্থী ভাঙ্গুড়া উপজেলার বাসিন্দা মাওলানা আলী আছগার তাদের দলে অভ্যন্তরীণ কোনো সংকট না থাকায় নিরবিচ্ছিন্নভাবে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। তার কর্মী বাহিনী, এমনকি নারী সদস্যরাও দিনরাত ভোট প্রার্থনায় নানা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। জামায়াতের প্রার্থী নির্ভার রয়েছেন। বিগত নির্বাচনগুলোতে জামায়াতের ভোটের সংখ্যা কম থাকলেও, এই নির্বাচনে তাদের ভোট অনেক বেড়েছে বলে দাবি করেন জামায়াতের স্থানীয় একাধিক নেতা। সে ক্ষেত্রে, পাবনা-৩ আসনে ভোটের লড়াই ত্রিমুখীও হতে পারে বলে ওয়াকিবহাল মহল মনে করছে।
নির্বাচনে জয়ের ব্যাপারে পৃথকভাবে কৃষিবিদ হাসান জাফির তুহিন, কেএম আনোয়ারুল ইসলাম এবং মাওলানা আলী আছগার আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।
ভোটের পরিসংখ্যান:
পাবনা-৩ আসনে মোট ৪ লাখ ৮৬ হাজার ৮০৪ জন ভোটার রয়েছেন। এর মধ্যে চাটমোহর উপজেলায় মোট ভোটারের সংখ্যা ২ লাখ ৬০ হাজার ১১৭ জন (পুরুষ ১ লাখ ৩০ হাজার ৬৬৯ জন এবং মহিলা ১ লাখ ২৯ হাজার ৪৪৮ জন)। ভাঙ্গুড়া উপজেলায় মোট ভোটার ১ লাখ ৮ হাজার ৯৬৮ (পুরুষ ৫৪ হাজার ২৮৭ জন ও মহিলা ৫৪ হাজার ৬৭৯ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গ ২ জন)। ফরিদপুর উপজেলায় মোট ভোটার ১ লাখ ৭৭ হাজার ৭১৯ জন (পুরুষ ৫৮ হাজার ৯৮০ জন ও মহিলা ৫৮ হাজার ৭৩৫ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গ ৪ জন)।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, পাবনা-৩ আসনে জয়ের মূল ফ্যাক্টর হবে ফরিদপুরের ভোট। কারণ, চাটমোহর এবং ভাঙ্গুড়ায় শক্তিশালী প্রার্থী থাকলেও ফরিদপুরে তেমন প্রতিদ্বন্দ্বী নেই। এই কারণে ফরিদপুরে যে প্রার্থী বেশি ভোট পাবে, তারই জয়লাভের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। তবে, সাধারণ মানুষের চাওয়া—নির্বাচনে যে দলের প্রার্থীই জয়লাভ করুক না কেন, তারা যেন অবহেলিত এই অঞ্চলের দৃশ্যমান উন্নয়ন করে পরিবর্তন নিয়ে আসেন।
অন্যান্য প্রার্থী:
পাবনা-৩ আসনের অন্য প্রার্থীরা হলেন, গণ অধিকার পরিষদের হাসানুল ইসলাম (ট্রাক), ইসলামী আন্দোলনের আব্দুল খালেক (হাতপাখা), গণ ফোরামের সরদার আশা পারভেজ (উদিয়মান সূর্য্য), জাতীয় পার্টির মীর নাদিম ডাবলু (লাঙ্গল), সুপ্রিম পার্টির মাহবুবুর রহমান (একতারা)।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট:
উল্লেখ্য, চাটমোহর থেকে সর্বশেষ ২০০১ সালে অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কেএম আনোয়ারুল ইসলাম বিএনপি থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। এরপর ভাঙ্গুড়া উপজেলার বাসিন্দা আওয়ামী লীগের প্রার্থী মকবুল হোসেন নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হন। সেই নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী ছিলেন ফরিদপুর উপজেলার বাসিন্দা সাবেক এমপি অবসরপ্রাপ্ত গ্রুপ ক্যাপ্টেন সাইফুল আজম সুজা। এরপর বিতর্কিত তিনটি নির্বাচনে মকবুল হোসেন বিজয়ী হন। সর্বশেষ ২০২৪ সালে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী আব্দুল হামিদ মাস্টার চাটমোহরে প্রায় ১৭ হাজার ভোটে জয়লাভ করলেও, অন্য দুই উপজেলায় ৩৫ হাজার ভোটে হেরে মকবুল হোসেন জয়লাভ করেন।
রিপোর্টারের নাম 

























