ঢাকা ১০:৪৩ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১২ মার্চ ২০২৬

‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের’ অভিযোগ ও রাজনীতির নতুন সমীকরণ

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৮:৪২:৫৩ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১২ মার্চ ২০২৬
  • ২ বার পড়া হয়েছে

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচারণা শুরু হওয়ার সময় থেকেই ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’ বা নির্বাচনি কারচুপির আশঙ্কা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে কানাঘুষা চলছিল। নির্বাচনের পর সেই আশঙ্কা এখন প্রকাশ্য অভিযোগে রূপ নিয়েছে, বিশেষ করে প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী এবং তাদের জোটভুক্ত শরিকদের পক্ষ থেকে। জামায়াত ও তাদের মিত্রদের অভিযোগের তিরে রয়েছেন বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান এবং সাবেক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান।

জামায়াতের নায়েবে আমির সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরের দাবি অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকারের এই দুই প্রভাবশালী ব্যক্তি পরিকল্পিতভাবে কলকাঠি নেড়েছেন যাতে জামায়াত সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে মূলধারার রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হতে না পারে। তারা বিশেষ করে রিজওয়ানা হাসানের একটি টেলিভিশন সাক্ষাৎকারকে ‘রাজসাক্ষীর জবানবন্দি’ হিসেবে অভিহিত করছেন, যেখানে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে নারীদের অধিকার নিশ্চিত করতে না পারা শক্তিগুলোকে তারা মূলধারায় আসতে দেননি। এই অভিযোগের সূত্র ধরে জামায়াত ও তাদের শরিক দলগুলো এখন দায়ীদের জিজ্ঞাসাবাদের আওতায় আনার দাবি তুলছে।

অন্যদিকে, এই গুরুতর অভিযোগের মুখেও বিএনপি সরকার ও দলের পক্ষ থেকে এক ধরণের কৌশলী নীরবতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সরকারের উচ্চপর্যায়ের নেতাদের মতে, এই অভিযোগগুলো নিছক ‘রাজনৈতিক বিরোধিতার জন্য বিরোধিতা’ ছাড়া আর কিছু নয়। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এই অভিযোগকে অত্যন্ত কঠোর ভাষায় নাকচ করে দিয়ে একে ‘পাগলের প্রলাপ’ বলে অভিহিত করেছেন।

তাঁর মতে, একটি সর্বজনস্বীকৃত নির্বাচনকে যারা বিতর্কিত করতে চায়, জনগণ তাদের কখনোই গ্রহণ করবে না। বিএনপির নীতিনির্ধারকরা মনে করছেন, জামায়াত নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান শক্ত করতেই এমন ভিত্তিহীন অভিযোগ তুলছে। বিশেষ করে আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে সংসদীয় গণতন্ত্রে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে নিজেদের ‘খাঁটি’ ও ‘আপসহীন’ ভাবমূর্তি গড়ে তোলাই এখন জামায়াতের মূল লক্ষ্য। সরকারপন্থী নেতারা মনে করছেন, নির্বাচনে ২০৯ আসনে জয়লাভ করা বিএনপির বিজয়কে ম্লান করতেই ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’ ইস্যুটি বারবার সামনে আনা হচ্ছে।

এই পাল্টাপাল্টি অবস্থানের পেছনে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন এবং সংবিধান সংস্কারের বিষয়টিও একটি বড় প্রভাবক হিসেবে কাজ করছে। জামায়াত ও তাদের ১১ দলীয় জোটের নেতারা মনে করছেন, সরকার জুলাই গণভোটের রায় বাস্তবায়নে গড়িমসি করছে। তারা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, সংসদে রাজনৈতিক ইস্যুগুলো সমাধানের যদি ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি না হয়, তবে তারা রাজপথে নামতে দ্বিধা করবেন না।

ইতোমধ্যে ২৪ এপ্রিলে গণসমাবেশের ঘোষণাও দিয়ে রেখেছে জোটের অন্যতম শরিক বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস। সব মিলিয়ে নির্বাচন পরবর্তী এই বিতর্ক রাজপথের আন্দোলনে রূপ নেওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। জামায়াত যেখানে এই ইস্যুটিকে রাজনৈতিকভাবে বাঁচিয়ে রাখতে চাইছে, বিএনপি সরকার সেখানে নিয়মিত আইনি প্রক্রিয়ার দোহাই দিয়ে বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার পথে হাঁটছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই দ্বন্দ্ব আগামী দিনগুলোতে সংসদীয় কার্যক্রম এবং রাজপথের রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ সৃষ্টি করতে পারে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

রাজধানীতে মশার তীব্র উপদ্রব: জনজীবন অতিষ্ঠ, বাড়ছে মশাবাহিত রোগের ঝুঁকি

‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের’ অভিযোগ ও রাজনীতির নতুন সমীকরণ

আপডেট সময় : ০৮:৪২:৫৩ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১২ মার্চ ২০২৬

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচারণা শুরু হওয়ার সময় থেকেই ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’ বা নির্বাচনি কারচুপির আশঙ্কা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে কানাঘুষা চলছিল। নির্বাচনের পর সেই আশঙ্কা এখন প্রকাশ্য অভিযোগে রূপ নিয়েছে, বিশেষ করে প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী এবং তাদের জোটভুক্ত শরিকদের পক্ষ থেকে। জামায়াত ও তাদের মিত্রদের অভিযোগের তিরে রয়েছেন বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান এবং সাবেক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান।

জামায়াতের নায়েবে আমির সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরের দাবি অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকারের এই দুই প্রভাবশালী ব্যক্তি পরিকল্পিতভাবে কলকাঠি নেড়েছেন যাতে জামায়াত সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে মূলধারার রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হতে না পারে। তারা বিশেষ করে রিজওয়ানা হাসানের একটি টেলিভিশন সাক্ষাৎকারকে ‘রাজসাক্ষীর জবানবন্দি’ হিসেবে অভিহিত করছেন, যেখানে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে নারীদের অধিকার নিশ্চিত করতে না পারা শক্তিগুলোকে তারা মূলধারায় আসতে দেননি। এই অভিযোগের সূত্র ধরে জামায়াত ও তাদের শরিক দলগুলো এখন দায়ীদের জিজ্ঞাসাবাদের আওতায় আনার দাবি তুলছে।

অন্যদিকে, এই গুরুতর অভিযোগের মুখেও বিএনপি সরকার ও দলের পক্ষ থেকে এক ধরণের কৌশলী নীরবতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সরকারের উচ্চপর্যায়ের নেতাদের মতে, এই অভিযোগগুলো নিছক ‘রাজনৈতিক বিরোধিতার জন্য বিরোধিতা’ ছাড়া আর কিছু নয়। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এই অভিযোগকে অত্যন্ত কঠোর ভাষায় নাকচ করে দিয়ে একে ‘পাগলের প্রলাপ’ বলে অভিহিত করেছেন।

তাঁর মতে, একটি সর্বজনস্বীকৃত নির্বাচনকে যারা বিতর্কিত করতে চায়, জনগণ তাদের কখনোই গ্রহণ করবে না। বিএনপির নীতিনির্ধারকরা মনে করছেন, জামায়াত নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান শক্ত করতেই এমন ভিত্তিহীন অভিযোগ তুলছে। বিশেষ করে আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে সংসদীয় গণতন্ত্রে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে নিজেদের ‘খাঁটি’ ও ‘আপসহীন’ ভাবমূর্তি গড়ে তোলাই এখন জামায়াতের মূল লক্ষ্য। সরকারপন্থী নেতারা মনে করছেন, নির্বাচনে ২০৯ আসনে জয়লাভ করা বিএনপির বিজয়কে ম্লান করতেই ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’ ইস্যুটি বারবার সামনে আনা হচ্ছে।

এই পাল্টাপাল্টি অবস্থানের পেছনে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন এবং সংবিধান সংস্কারের বিষয়টিও একটি বড় প্রভাবক হিসেবে কাজ করছে। জামায়াত ও তাদের ১১ দলীয় জোটের নেতারা মনে করছেন, সরকার জুলাই গণভোটের রায় বাস্তবায়নে গড়িমসি করছে। তারা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, সংসদে রাজনৈতিক ইস্যুগুলো সমাধানের যদি ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি না হয়, তবে তারা রাজপথে নামতে দ্বিধা করবেন না।

ইতোমধ্যে ২৪ এপ্রিলে গণসমাবেশের ঘোষণাও দিয়ে রেখেছে জোটের অন্যতম শরিক বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস। সব মিলিয়ে নির্বাচন পরবর্তী এই বিতর্ক রাজপথের আন্দোলনে রূপ নেওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। জামায়াত যেখানে এই ইস্যুটিকে রাজনৈতিকভাবে বাঁচিয়ে রাখতে চাইছে, বিএনপি সরকার সেখানে নিয়মিত আইনি প্রক্রিয়ার দোহাই দিয়ে বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার পথে হাঁটছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই দ্বন্দ্ব আগামী দিনগুলোতে সংসদীয় কার্যক্রম এবং রাজপথের রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ সৃষ্টি করতে পারে।