বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক খাত বর্তমানে এক কঠিন সময় পার করছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) এই খাতের রফতানিতে বড় ধরনের নিম্নগতি লক্ষ্য করা গেছে। রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এই সময়ে রফতানি আয় হয়েছে ২৫.৮০ বিলিয়ন ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৩.৭৩ শতাংশ কম। বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতি, ভোক্তা ব্যয় হ্রাস এবং ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতাকে এই ধসের প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
অপ্রচলিত বাজারে বড় ধস
বাজার বৈচিত্র্যকরণের লক্ষে বাংলাদেশ গত কয়েক বছর ধরে অপ্রচলিত বা নন-ট্র্যাডিশনাল বাজারের ওপর জোর দিলেও চলতি অর্থবছরে সেখানে বড় ধাক্কা লেগেছে। জুলাই-ফেব্রুয়ারি সময়ে এসব বাজারে রফতানি ৬.৩৪ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৪.২৪ বিলিয়ন ডলারে।
- যেখানে কমেছে: সবচেয়ে বেশি কমেছে রাশিয়ায় (২৯.১৭%), তুরস্কে (২৪.৩৮%) এবং মেক্সিকোতে (১৬.৮২%)। এছাড়াও অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়াতেও রফতানি কমেছে ১২ শতাংশের বেশি।
- যেখানে বেড়েছে: মন্দার মধ্যেও ব্রাজিল (২৩.৩১%), চীন (২১.৫১%) এবং সৌদি আরবে (২১.৪৬%) রফতানি প্রবৃদ্ধি ইতিবাচক রয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত ও লোহিত সাগরের ঝুঁকি
লোহিত সাগর ও সুয়েজ খাল অঞ্চলে চলমান সংঘাত বাংলাদেশের পোশাক রফতানিতে নতুন ‘মরার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইউরোপগামী জাহাজগুলোকে এখন দীর্ঘ পথ ঘুরে আসতে হচ্ছে, যা পরিবহন ব্যয় ও সময় উভয়ই বাড়িয়ে দিয়েছে। অন্যদিকে, আকাশপথেও তৈরি হয়েছে জটিলতা। বাংলাদেশের মোট এয়ার কার্গোর অর্ধেকের বেশি মধ্যপ্রাচ্যের দুবাই বা কাতার হয়ে পরিবাহিত হয়। সংঘাতের কারণে কাতার এয়ারওয়েজ ও এমিরেটসের মতো বড় এয়ারলাইনগুলোর ফ্লাইট ব্যাহত হওয়ায় শত শত টন পোশাকের চালান এখন ঢাকা ও দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন বিমানবন্দরে আটকে আছে।
প্রধান বাজারের চিত্র: ইইউ ও যুক্তরাষ্ট্র
বাংলাদেশের পোশাকের বৃহত্তম বাজার ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) রফতানি কমেছে ৫.৪৯ শতাংশ। বিশেষ করে জার্মানি (১২.২০%) ও ফ্রান্সে (১১.৩০%) রফতানি উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। দ্বিতীয় বৃহত্তম বাজার যুক্তরাষ্ট্রেও রফতানি সামান্য (০.৭৪%) কমেছে। তবে আশার আলো দেখা গেছে যুক্তরাজ্য (১.২২% প্রবৃদ্ধি) ও কানাডার (৩.০৮% প্রবৃদ্ধি) বাজারে।
পণ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ ও আগামীর পথ
পরিসংখ্যান বলছে, নিটওয়্যার ও ওভেন—উভয় খাতেই রফতানি নেতিবাচক। নিটওয়্যার খাতে রফতানি কমেছে ৪.৫৬ শতাংশ এবং ওভেন খাতে ২.৭৯ শতাংশ।
বিজিএমইএ-র সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল জানান, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার কারণে পোশাকের চাহিদা কমেছে। তিনি বলেন, “দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকতে হলে আমাদের উচ্চমূল্যের পোশাক উৎপাদন, নতুন বাজার অনুসন্ধান এবং সরবরাহ ব্যবস্থার দক্ষতা বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই।”
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল ভেঙে পড়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা, যা বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের জন্য আগামী দিনগুলোতে আরও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
রিপোর্টারের নাম 




















