রাজধানীর উত্তর বাড্ডায় একটি ফ্ল্যাটে অভিযান চালিয়ে শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী মেহেদী হাসান ওরফে দীপুকে বিপুল অস্ত্র ও গুলিসহ গ্রেপ্তার করেছে যৌথ বাহিনীর একটি বিশেষ দল। শুক্রবার পরিচালিত এই অভিযানে ওই ফ্ল্যাট থেকে ১১টি অত্যাধুনিক বিদেশি অস্ত্র এবং ৩৯৪টি গুলি উদ্ধার করা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তারকৃত দীপুর বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনে মামলা দায়ের করে পাঁচ দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) বাড্ডা অঞ্চল সূত্রে জানা গেছে, উত্তর বাড্ডার পোস্ট অফিস গলির ওই বাড়িটি মেহেদী হাসানেরই। শুক্রবারের অভিযানে তার তিনতলার ফ্ল্যাট থেকে ১১টি অত্যাধুনিক বিদেশি অস্ত্র, ৩৯৪টি গুলি, ৮টি পিস্তলের ম্যাগাজিন, ৩২টি কার্তুজ, একটি .২২ ইউজি মেশিনগান রাইফেল, উজি রাইফেলের দুটি ম্যাগাজিন, তিনটি চাইনিজ কুড়াল, একটি টাইগার হান্টিং কমান্ডো চাকু, দুটি ওয়াকিটকি, একটি ওয়াকিটকি ব্যাটারি, তিনটি পিস্তলের সাইড কভার এবং একটি ল্যাপটপ উদ্ধার করা হয়েছে।
পুলিশের একাধিক সূত্র জানায়, মেহেদী হাসান ওরফে দীপু দীর্ঘদিন ধরে শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে কাজ করে আসছিলেন। রামপুরা, বনশ্রী, বাড্ডা, ভাটারা, বারিধারা ও গুলশান এলাকার অপরাধজগৎ মূলত তার মাধ্যমেই নিয়ন্ত্রিত হতো। পুলিশ আরও বলছে, দীপু ও তার সহযোগীদের কাছে আরও অস্ত্র রয়েছে, যা মূলত সুব্রত বাইন এবং আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী মোল্লা মাসুদের। গত বছর মে মাসে কুষ্টিয়ায় যৌথ বাহিনীর অভিযানে সুব্রত বাইন ও মোল্লা মাসুদ গ্রেপ্তার হওয়ার পর দীপু অপরাধজগতের নিয়ন্ত্রণভার গ্রহণ করেন।
নব্বইয়ের দশকে ঢাকার অপরাধজগতে সুব্রত বাইন এক আলোচিত নাম ছিলেন। চাঁদাবাজি ও দরপত্র নিয়ন্ত্রণে তার আধিপত্য ছিল ব্যাপক, যা অসংখ্য খুন ও জখমের জন্ম দিয়েছিল। মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, গ্রেপ্তারকৃত মেহেদী হাসান সুব্রত বাইনের সহযোগী হিসেবে বাড্ডা, ভাটারা এবং রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অস্ত্র-গোলাবারুদ বিক্রি করে আসছিলেন।
তদন্তসংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, সুব্রত বাইনের সহযোগী হিসেবে মেহেদী হাসান ছাড়াও ওয়াসির মাহমুদ সাঈদ ওরফে বড় সাঈদ, গোলাম মর্তুজা বাবু ওরফে মধু বাবু এবং সোহেল ওরফে কান্নি সোহেল সক্রিয়। গত এক বছরে তারা একাধিক খুনের ঘটনা ঘটিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে গত বছরের ২০ মার্চ গুলশানের পুলিশ প্লাজার সামনে ইন্টারনেট ব্যবসার সঙ্গে জড়িত সুমন নামের এক ব্যক্তিকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ওই হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে ওয়াসির মাহমুদ সাঈদকে গ্রেপ্তার করা হলেও দুই মাস পর তিনি জামিনে মুক্তি পান। এছাড়াও, বাড্ডা ৩৭ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর মো. জাহাঙ্গীর আলম ও তার ভাই আলমগীরের সঙ্গেও মেহেদী হাসানের ঘনিষ্ঠতা রয়েছে বলে পুলিশ সূত্র জানায়।
৫ই আগস্টের পর সুব্রত বাইন প্রকাশ্যে এসে প্রতিবেশী দেশ থেকে বিপুল অস্ত্র সংগ্রহ করে এলাকায় ফের আধিপত্য বিস্তার শুরু করেন। মেরুল বাড্ডার একটি মাছের আড়ত থেকে তিনি ও তার সহযোগীরা দিনে লাখ লাখ টাকা চাঁদা তুলতেন। সুব্রত বাইন গ্রেপ্তারের পর ওই মাছের আড়ত, গাড়ির শো রুম, তৈরি পোশাক কারখানায় চাঁদাবাজি এবং ঝুট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ দীপুর হাতে চলে আসে। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) একটি সূত্র জানায়, মেহেদী হাসান ও তার সহযোগীরা বাড্ডা, ভাটারা ও অন্যান্য এলাকায় ভাড়াটে খুনি হিসেবে কাজ করতেন এবং বিভিন্ন সন্ত্রাসীর কাছে অস্ত্র ভাড়া দিতেন। সুব্রত বাইনের অস্ত্রগুলো মূলত মেহেদী হাসান ও গোলাম মর্তুজা বাবু ওরফে মধু বাবুর কাছেই রয়েছে। মধু বাবুর কাছেও আরও ১৩ থেকে ১৪টি অস্ত্র মজুদ আছে বলে ডিবি সূত্রে জানা গেছে।
গত ১৯ এপ্রিল রাতে রাজধানীর হাতিরঝিল থানাধীন নয়াটোলা মোড়ল গলির ‘দি ঝিল ক্যাফে’র সামনে যুবদল নেতা মো. আরিফ সিকদারকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এই হত্যাকাণ্ডে সুব্রত বাইনের সহযোগীরা জড়িত ছিলেন। এ মামলায় সুব্রত বাইনের মেয়ে খাদিজা ইয়াসমিনকে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদও করেছিল ডিবি পুলিশ। ডিবি সূত্র আরও জানায়, সুব্রত বাইন বর্তমানে কুমিল্লার কারাগারে বন্দি। খাদিজা বাবার সঙ্গে দেখা করে মেহেদী হাসান, মধু বাবুসহ তার অন্যান্য সহযোগীদের কাছে বার্তা পৌঁছে দিতেন।
রিপোর্টারের নাম 























