ঢাকা ০১:০০ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৪ মার্চ ২০২৬

দুর্নীতিমুক্ত, কল্যাণমূলক ও কর্মসংস্থানমুখী দেশ গড়ার প্রত্যয়ে বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহার: তারেক রহমানের নেতৃত্বে রাষ্ট্র মেরামতের অঙ্গীকার

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৮:৪৫:০৭ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ৫ বার পড়া হয়েছে

জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দুর্নীতিমুক্ত, কল্যাণমূলক ও কর্মসংস্থানমুখী বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে নিজেদের নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। গতকাল শুক্রবার রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান এই ইশতেহার তুলে ধরেন। ‘লুটপাট নয়, উৎপাদন’— এই মূলমন্ত্রকে সামনে রেখে তিনি চার কোটি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং প্রতিহিংসার বদলে বিচার ও মানবিকতার রাজনীতি দিয়ে ‘রাষ্ট্র মেরামত’-এর এক সুনির্দিষ্ট রূপরেখা তুলে ধরেন। ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগানে এবং ‘করব কাজ, গড়ব দেশ’ প্রত্যয়ে ঘোষিত এই ইশতেহারে মোট ৫১টি দফাকে পাঁচটি ভাগে বিন্যস্ত করা হয়েছে, যার মধ্যে ৯টি প্রধান প্রতিশ্রুতিকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করা হয়েছে।

অনুষ্ঠানের শুরুতে পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত ও দোয়া পরিচালনা করা হয়, এরপর জাতীয় সংগীত পরিবেশন করা হয়। স্বাগত বক্তব্য দেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। ইশতেহার ঘোষণাকালে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেন, জনগণের রায়ে দায়িত্ব পেলে তার দল এমন একটি বাংলাদেশ গড়বে, যেখানে ভোটের মর্যাদা থাকবে; সন্ত্রাস, দুর্নীতি ও বৈষম্যের অবসান হবে; আইনের ঊর্ধ্বে কেউ থাকবে না এবং প্রত্যেক নাগরিক গর্ব করে বলতে পারবে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ব্যক্তিগতভাবে একজন মানুষ ও রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে তিনি মনে করেন, যারা সরকার গঠন করবেন, তারা যদি দুর্নীতি, আইনের শাসন ও জবাবদিহির ব্যাপারে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ না করেন, তাহলে কোনো পরিকল্পনাই সফল হবে না। দলের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার থাকবে এই তিনটি বিষয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করা।

তারেক রহমান উল্লেখ করেন, ২০০১ সালের অক্টোবর মাসে আওয়ামী লীগের রেখে যাওয়া দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশের পরিচালনার দায়িত্ব নিয়ে বিএনপি দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালায়। সেই সময়ে বিএনপি সরকারের কঠোর পদক্ষেপের ফলে বাংলাদেশ সারা বিশ্বে দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার কলঙ্ক থেকে মুক্তি পেয়েছিল এবং ২০০৬ সালের অক্টোবর মাসে যখন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হয়, তার অনেক আগেই বাংলাদেশ ‘ইমার্জিং টাইগার’ হিসেবে স্বীকৃতি পায়। তিনি বলেন, এই ইশতেহার কেবল নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি নয়, এটি একটি নতুন সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় চুক্তির ঘোষণা। বিএনপি প্রতিশোধ নয়, ন্যায় ও মানবিকতার রাজনীতিতে বিশ্বাস করে। ক্ষমতা নয়, জনগণের অধিকারই তাদের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু। বিএনপি রাষ্ট্রক্ষমতায় এলে ‘লুটপাট নয়, উৎপাদন; ভয় নয়, অধিকার; বৈষম্য নয়, ন্যায্যতা’— এই নীতিতেই রাষ্ট্র পরিচালিত হবে।

বিএনপি জানিয়েছে, এবারের ইশতেহারের তিনটি মৌলিক ভিত্তি হলো শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা রাষ্ট্র দর্শন, দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার ভিশন-২০৩০ এবং চেয়ারম্যান তারেক রহমান ঘোষিত রাষ্ট্র মেরামতের ৩১ দফা। দলটির রাজনীতি স্লোগাননির্ভর নয়, বরং সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনাভিত্তিক। ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ দর্শনের ভিত্তিতে দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ব্যাপক সামাজিক পরিকল্পনা মানুষের কর্মসংস্থান, সুশাসন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, ক্রীড়া, সুষম উন্নয়ন, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, আইনের শাসন এবং সামাজিক ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করে দেশকে বাস্তব উন্নয়নের পথে এগিয়ে নিয়ে যাবে। এই প্রেক্ষাপটে তারেক রহমান ঘোষিত ‘উই হ্যাভ অ্যা প্ল্যান’-এর আলোকে বিএনপি একটি মানবিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র বিনির্মাণ করবে।

বিএনপির ৯ প্রতিশ্রুতি
ঘোষিত ইশতেহারে প্রধান ৯টি বিষয়ের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
প্রান্তিক ও নিম্ন আয়ের পরিবারকে সুরক্ষা দিতে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালু করে প্রতি মাসে আড়াই হাজার টাকা অথবা সমমূল্যের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা।
কৃষকের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে ‘কৃষক কার্ড’-এর মাধ্যমে ভর্তুকি, সহজ ঋণ, কৃষিবীমা এবং রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় বাজারজাতকরণ জোরদার করা।
দুর্নীতিমুক্ত ও মানবিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে দেশব্যাপী এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ এবং জেলা ও মহানগর পর্যায়ে মানসম্মত চিকিৎসা; মা ও শিশুর পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যসেবা এবং রোগপ্রতিরোধমূলক কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা।
আনন্দময় ও কর্মমুখী শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বাস্তব দক্ষতা ও মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষানীতি প্রণয়ন, প্রাথমিক শিক্ষায় সর্বাধিক গুরুত্ব, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তি সহায়তা এবং ‘মিড-ডে মিল’ চালু করা।
তরুণদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কারিগরি ও ভাষা দক্ষতা উন্নয়ন, স্টার্টআপ ও উদ্যোক্তা সহায়তা, বৈশ্বিক ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে যুক্তকরণ এবং মেধাভিত্তিক সরকারি নিয়োগ নিশ্চিত করা।
ক্রীড়াকে পেশা এবং জীবিকার মাধ্যম হিসেবে গড়ে তুলতে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ক্রীড়া অবকাঠামো এবং প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা সম্প্রসারণ করা।
পরিবেশ রক্ষা ও জলবায়ু সহনশীলতা জোরদারে দেশপ্রেমী জনগণের স্বেচ্ছাশ্রম এবং সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে ২০ হাজার কিলোমিটার নদী, খাল খনন ও পুনঃখনন, পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ এবং আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা চালু করা।
ধর্মীয় ও সামাজিক সম্প্রীতি সুদৃঢ় করতে সব ধর্মের উপাসনালয়ের ধর্মীয় নেতাদের জন্য সম্মানি ও প্রশিক্ষণভিত্তিক কল্যাণ ব্যবস্থা চালু করা।
ডিজিটাল অর্থনীতি ও বৈশ্বিক সংযোগ বাড়াতে আন্তর্জাতিক পেমেন্ট সিস্টেম (পেপাল) চালু, ই-কমার্সের আঞ্চলিক হাব স্থাপন এবং ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ পণ্যের রপ্তানি সম্প্রসারণ করা।

পাঁচ ভাগে ৫১ দফা প্রতিশ্রুতি
বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারে পাঁচটি ভাগে মোট ৫১ দফা প্রতিশ্রুতি তুলে ধরা হয়েছে।
প্রথম ভাগে রাষ্ট্রব্যবস্থা সংস্কার: গণতন্ত্র ও জাতি গঠন, মুক্তিযুদ্ধ ও গণঅভ্যুত্থান, সাংবিধানিক সংস্কার, সুশাসন ও স্থানীয় সরকার বিষয়ে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। জনগণের ভোটে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেলে বিএনপি জবাবদিহিমূলক, দায়বদ্ধ এবং ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র ও সরকার প্রতিষ্ঠা করবে। সংবিধান ও নির্বাচনব্যবস্থার প্রয়োজনীয় সংস্কারের মাধ্যমে একটি টেকসই গণতান্ত্রিক কাঠামো গড়ে তোলার অঙ্গীকার করা হয়েছে। ভোটকে রাষ্ট্রক্ষমতার একমাত্র বৈধ উৎস হিসেবে পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং মহানবী (সা.)-এর ন্যায়পরায়ণতা ও আদর্শকে সমুন্নত রেখে রাষ্ট্র পরিচালনায় ন্যায়পরায়ণতাকে মূলমন্ত্র করা হবে।
মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের তালিকা প্রণয়ন, রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ও স্বীকৃতি নিশ্চিত করার পাশাপাশি শিক্ষা কারিকুলামে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস তুলে ধরার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান’ এবং ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে সব শহীদের তালিকা প্রস্তুত করে তাদের পরিবারকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও অর্থনৈতিক সহায়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও রয়েছে।
সংবিধান সংস্কারের বিষয়ে বলা হয়েছে, সংবিধানের এককেন্দ্রিক চরিত্র অক্ষুণ্ণ রেখে বিদ্যমান সংসদীয় ব্যবস্থার পাশাপাশি বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে সংসদে ১০০ সদস্যবিশিষ্ট উচ্চকক্ষ প্রবর্তন করা হবে। এছাড়া, জুলাই অভ্যুত্থানকালে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস ও নিপীড়নের সঙ্গে জড়িত এবং ভোট জালিয়াতি ও দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের চিহ্নিতকরণ ও তাদের বিরুদ্ধে উপযুক্ত পদক্ষেপ নিতে স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠন করা হবে। ন্যায়পাল নিয়োগের প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছে।
সুশাসনের বিষয়ে বিএনপি দুর্নীতির সঙ্গে কোনো আপস না করার অঙ্গীকার করেছে। দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরতে পদ্ধতিগত ও আইনের সংস্কারের পাশাপাশি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হবে। ‘বিশেষ ক্ষমতা আইন, ১৯৭৪’ বাতিল করা হবে। জনপ্রশাসন সংস্কারে মেধা, সততা, সৃজনশীলতা, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতাই নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে একমাত্র মাপকাঠি হিসেবে বিবেচিত হবে। বিচার বিভাগের কার্যকর স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ, মামলার জট কমানো এবং ‘জুডিশিয়াল কমিশন’ গঠন করা হবে। সেবাবান্ধব পুলিশ গঠনের লক্ষ্যে আইন ও বিধি অনুযায়ী পুলিশের ওপর বিচার বিভাগীয় তদারকি নিশ্চিত করা হবে। স্থানীয় সরকার প্রশাসনকে ক্ষমতায়িত করে জনমুখী, কার্যকর ও টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা এবং জাতীয় উন্নয়ন বাজেটের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ স্থানীয় সরকারের অনুকূলে বরাদ্দ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

দ্বিতীয় ভাগে বৈষম্যহীন আর্থসামাজিক উন্নয়ন ও টেকসই রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা অর্জন: বাংলাদেশের চার কোটি ১৭ লাখ চরম দারিদ্র্যের কবলে নিপতিত মানুষের জন্য মানবিক, ন্যায়সংগত ও মর্যাদাভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা কাঠামো গড়ে তোলার অঙ্গীকার করা হয়েছে। ‘ফ্যামিলি কার্ড’ এবং ‘কৃষক কার্ড’ প্রদানের পাশাপাশি সমাজের অবহেলিত গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়কে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় আনা হবে। নারীর ক্ষমতায়নে স্নাতকোত্তর পর্যন্ত বিনা বেতনে লেখাপড়ার সুযোগ সৃষ্টি এবং কর্মস্থলে শিশু পরিচর্যা কেন্দ্র ও ‘ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার’ স্থাপন করা হবে। কৃষি খাতের মৌলিক রূপান্তরে শহীদ জিয়াউর রহমান প্রবর্তিত ‘স্বেচ্ছাশ্রমে খাল খনন কর্মসূচি’ পুনঃবাস্তবায়নের মাধ্যমে ২০ হাজার কিলোমিটার নদী ও খাল খনন, পুনঃখনন ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প গ্রহণ করা হবে। ‘করব কাজ, গড়ব দেশ’ নীতির ভিত্তিতে ধারাবাহিকভাবে এক কোটি কর্মসংস্থান তৈরির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পাশাপাশি তরুণ ও যুবকদের কারিগরি শিক্ষা, ডিজিটাল দক্ষতা ও উদ্যোক্তা উদ্ভাবনে সহায়তা করা হবে। শিক্ষা খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দ, বাধ্যতামূলক তৃতীয় ভাষা শিক্ষা এবং ‘শিক্ষা সংস্কার কমিশন’ গঠনের প্রতিশ্রুতি রয়েছে। স্বাস্থ্যসেবায় জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দ এবং ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের কথা বলা হয়েছে। জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষায় আধুনিক, পেশাদার ও শক্তিশালী সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তুলতে স্বনির্ভর ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ প্রতিরক্ষা শিল্প গড়ে তোলা এবং সন্ত্রাসবাদ, জঙ্গিবাদ ও উগ্রবাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার অঙ্গীকার করা হয়েছে। পররাষ্ট্রনীতিতে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ দর্শনকে প্রাধান্য দিয়ে সমতা, ন্যায্যতা ও পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে একটি আত্মমর্যাদাশীল বৈশ্বিক অবস্থান গ্রহণের কথা বলা হয়েছে।

তৃতীয় ভাগে ভঙ্গুর অর্থনীতির পুনর্গঠন ও পুনরুদ্ধার: অর্থনীতিকে ২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করা এবং বৈদেশিক প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ (এফডিআই) জিডিপির ২.৫ শতাংশে উন্নীত করার চেষ্টা চালানোর কথা বলা হয়েছে। পুঁজিবাজারের সংস্কারকল্পে ‘পুঁজিবাজার সংস্কার কমিশন’ গঠন এবং গত ১৫ বছরে সংঘটিত অনিয়ম তদন্তে বিশেষ কমিশন গঠনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ২০৩০ সালের মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ৩৫ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত করা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি ২০ শতাংশে উন্নীত করতে প্রচেষ্টা জোরদার করা হবে। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি খাতকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) হাব এবং হার্ডওয়্যার উৎপাদন কেন্দ্রে পরিণত করার মাধ্যমে জিডিপিতে আইসিটি খাতের অবদান ৫ থেকে ১০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। দেশের অপার সম্ভাবনাময় সমুদ্রসম্পদের বিজ্ঞানভিত্তিক টেকসই ব্যবহার নিশ্চিত করতে ‘জাতীয় সুনীল অর্থনীতি কর্তৃপক্ষ’ এবং শিক্ষা ও শিল্প খাতে ‘মেরিটাইম ইনোভেশন ফান্ড’ প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে। ২০৩৫ সালের মধ্যে কর-জিডিপির অনুপাত ১৫ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনাও রয়েছে।

চতুর্থ ভাগে দেশের সব অঞ্চলের সবার জন্য সমতা-ভিত্তিক সুষম উন্নয়ন: দেশের যে অঞ্চল যেই অর্থনৈতিক ও শিল্প উন্নয়নের জন্য উপযুক্ত, বিএনপি সে অঞ্চলে সেই উপযুক্ত অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও শিল্পায়নে অগ্রাধিকার দেবে। এরই অংশ হিসেবে চট্টগ্রামকে দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী এবং কর্মসংস্থানের হাব হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।

পঞ্চম ভাগে ধর্ম, সমাজ, ক্রীড়া, সংস্কৃতি ও সংহতি: ‘নৃ-গোষ্ঠী উন্নয়ন অধিদপ্তর’ প্রতিষ্ঠা, ইসলামী গবেষণা সম্প্রসারণ এবং মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রম সারা দেশে বিস্তৃত করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। খেলাধুলাকে পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা, জাতীয় শিক্ষাক্রমে চতুর্থ শ্রেণি থেকে খেলাধুলাকে বাধ্যতামূলক করা এবং আধুনিক ক্রীড়া বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের কথা বলা হয়েছে। গণমাধ্যমকর্মীদের কাজের সুরক্ষা ও পেশাগত স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে ‘জাতীয় সাংবাদিক অবসর কল্যাণ বোর্ড’ গঠনের অঙ্গীকারও রয়েছে।

ইশতেহার প্রকাশ অনুষ্ঠানে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ও নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম খানের পরিচালনায় আরও উপস্থিত ছিলেন স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ইসমাইল জবিউল্লাহ, ড. মাহদী আমিন, মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. মওদুদ হোসেন আলমগীর পাভেল, সদস্য আতিকুর রহমান রুমন, শায়রুল কবির খান প্রমুখ। এছাড়াও শিক্ষাবিদ অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ, অধ্যাপক আ ন ম ইউসুফ হায়দার, অধ্যাপক কামরুল আহসান, অধ্যাপক এবিএম ওবায়দুল ইসলাম, অধ্যাপক নজরুল ইসলামসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-গবেষকরাও অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

স্মর্তব্য, বিএনপি দশম ও দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন বয়কট করেছিল। এর আগে পঞ্চম, ষষ্ঠ, সপ্তম, অষ্টম ও নবম সংসদ নির্বাচনে দলের তৎকালীন চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ইশতেহার ঘোষণা করেছিলেন। ২০১৮ সালের একাদশ সংসদ নির্বাচনে ইশতেহার ঘোষণা করেছিলেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এবারই প্রথম দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ইশতেহার ঘোষণা করলেন।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

দুর্নীতিমুক্ত, কল্যাণমূলক ও কর্মসংস্থানমুখী দেশ গড়ার প্রত্যয়ে বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহার: তারেক রহমানের নেতৃত্বে রাষ্ট্র মেরামতের অঙ্গীকার

আপডেট সময় : ০৮:৪৫:০৭ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দুর্নীতিমুক্ত, কল্যাণমূলক ও কর্মসংস্থানমুখী বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে নিজেদের নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। গতকাল শুক্রবার রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান এই ইশতেহার তুলে ধরেন। ‘লুটপাট নয়, উৎপাদন’— এই মূলমন্ত্রকে সামনে রেখে তিনি চার কোটি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং প্রতিহিংসার বদলে বিচার ও মানবিকতার রাজনীতি দিয়ে ‘রাষ্ট্র মেরামত’-এর এক সুনির্দিষ্ট রূপরেখা তুলে ধরেন। ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগানে এবং ‘করব কাজ, গড়ব দেশ’ প্রত্যয়ে ঘোষিত এই ইশতেহারে মোট ৫১টি দফাকে পাঁচটি ভাগে বিন্যস্ত করা হয়েছে, যার মধ্যে ৯টি প্রধান প্রতিশ্রুতিকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করা হয়েছে।

অনুষ্ঠানের শুরুতে পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত ও দোয়া পরিচালনা করা হয়, এরপর জাতীয় সংগীত পরিবেশন করা হয়। স্বাগত বক্তব্য দেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। ইশতেহার ঘোষণাকালে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেন, জনগণের রায়ে দায়িত্ব পেলে তার দল এমন একটি বাংলাদেশ গড়বে, যেখানে ভোটের মর্যাদা থাকবে; সন্ত্রাস, দুর্নীতি ও বৈষম্যের অবসান হবে; আইনের ঊর্ধ্বে কেউ থাকবে না এবং প্রত্যেক নাগরিক গর্ব করে বলতে পারবে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ব্যক্তিগতভাবে একজন মানুষ ও রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে তিনি মনে করেন, যারা সরকার গঠন করবেন, তারা যদি দুর্নীতি, আইনের শাসন ও জবাবদিহির ব্যাপারে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ না করেন, তাহলে কোনো পরিকল্পনাই সফল হবে না। দলের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার থাকবে এই তিনটি বিষয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করা।

তারেক রহমান উল্লেখ করেন, ২০০১ সালের অক্টোবর মাসে আওয়ামী লীগের রেখে যাওয়া দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশের পরিচালনার দায়িত্ব নিয়ে বিএনপি দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালায়। সেই সময়ে বিএনপি সরকারের কঠোর পদক্ষেপের ফলে বাংলাদেশ সারা বিশ্বে দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার কলঙ্ক থেকে মুক্তি পেয়েছিল এবং ২০০৬ সালের অক্টোবর মাসে যখন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হয়, তার অনেক আগেই বাংলাদেশ ‘ইমার্জিং টাইগার’ হিসেবে স্বীকৃতি পায়। তিনি বলেন, এই ইশতেহার কেবল নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি নয়, এটি একটি নতুন সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় চুক্তির ঘোষণা। বিএনপি প্রতিশোধ নয়, ন্যায় ও মানবিকতার রাজনীতিতে বিশ্বাস করে। ক্ষমতা নয়, জনগণের অধিকারই তাদের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু। বিএনপি রাষ্ট্রক্ষমতায় এলে ‘লুটপাট নয়, উৎপাদন; ভয় নয়, অধিকার; বৈষম্য নয়, ন্যায্যতা’— এই নীতিতেই রাষ্ট্র পরিচালিত হবে।

বিএনপি জানিয়েছে, এবারের ইশতেহারের তিনটি মৌলিক ভিত্তি হলো শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা রাষ্ট্র দর্শন, দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার ভিশন-২০৩০ এবং চেয়ারম্যান তারেক রহমান ঘোষিত রাষ্ট্র মেরামতের ৩১ দফা। দলটির রাজনীতি স্লোগাননির্ভর নয়, বরং সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনাভিত্তিক। ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ দর্শনের ভিত্তিতে দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ব্যাপক সামাজিক পরিকল্পনা মানুষের কর্মসংস্থান, সুশাসন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, ক্রীড়া, সুষম উন্নয়ন, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, আইনের শাসন এবং সামাজিক ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করে দেশকে বাস্তব উন্নয়নের পথে এগিয়ে নিয়ে যাবে। এই প্রেক্ষাপটে তারেক রহমান ঘোষিত ‘উই হ্যাভ অ্যা প্ল্যান’-এর আলোকে বিএনপি একটি মানবিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র বিনির্মাণ করবে।

বিএনপির ৯ প্রতিশ্রুতি
ঘোষিত ইশতেহারে প্রধান ৯টি বিষয়ের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
প্রান্তিক ও নিম্ন আয়ের পরিবারকে সুরক্ষা দিতে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালু করে প্রতি মাসে আড়াই হাজার টাকা অথবা সমমূল্যের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা।
কৃষকের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে ‘কৃষক কার্ড’-এর মাধ্যমে ভর্তুকি, সহজ ঋণ, কৃষিবীমা এবং রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় বাজারজাতকরণ জোরদার করা।
দুর্নীতিমুক্ত ও মানবিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে দেশব্যাপী এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ এবং জেলা ও মহানগর পর্যায়ে মানসম্মত চিকিৎসা; মা ও শিশুর পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যসেবা এবং রোগপ্রতিরোধমূলক কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা।
আনন্দময় ও কর্মমুখী শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বাস্তব দক্ষতা ও মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষানীতি প্রণয়ন, প্রাথমিক শিক্ষায় সর্বাধিক গুরুত্ব, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তি সহায়তা এবং ‘মিড-ডে মিল’ চালু করা।
তরুণদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কারিগরি ও ভাষা দক্ষতা উন্নয়ন, স্টার্টআপ ও উদ্যোক্তা সহায়তা, বৈশ্বিক ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে যুক্তকরণ এবং মেধাভিত্তিক সরকারি নিয়োগ নিশ্চিত করা।
ক্রীড়াকে পেশা এবং জীবিকার মাধ্যম হিসেবে গড়ে তুলতে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ক্রীড়া অবকাঠামো এবং প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা সম্প্রসারণ করা।
পরিবেশ রক্ষা ও জলবায়ু সহনশীলতা জোরদারে দেশপ্রেমী জনগণের স্বেচ্ছাশ্রম এবং সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে ২০ হাজার কিলোমিটার নদী, খাল খনন ও পুনঃখনন, পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ এবং আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা চালু করা।
ধর্মীয় ও সামাজিক সম্প্রীতি সুদৃঢ় করতে সব ধর্মের উপাসনালয়ের ধর্মীয় নেতাদের জন্য সম্মানি ও প্রশিক্ষণভিত্তিক কল্যাণ ব্যবস্থা চালু করা।
ডিজিটাল অর্থনীতি ও বৈশ্বিক সংযোগ বাড়াতে আন্তর্জাতিক পেমেন্ট সিস্টেম (পেপাল) চালু, ই-কমার্সের আঞ্চলিক হাব স্থাপন এবং ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ পণ্যের রপ্তানি সম্প্রসারণ করা।

পাঁচ ভাগে ৫১ দফা প্রতিশ্রুতি
বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারে পাঁচটি ভাগে মোট ৫১ দফা প্রতিশ্রুতি তুলে ধরা হয়েছে।
প্রথম ভাগে রাষ্ট্রব্যবস্থা সংস্কার: গণতন্ত্র ও জাতি গঠন, মুক্তিযুদ্ধ ও গণঅভ্যুত্থান, সাংবিধানিক সংস্কার, সুশাসন ও স্থানীয় সরকার বিষয়ে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। জনগণের ভোটে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেলে বিএনপি জবাবদিহিমূলক, দায়বদ্ধ এবং ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র ও সরকার প্রতিষ্ঠা করবে। সংবিধান ও নির্বাচনব্যবস্থার প্রয়োজনীয় সংস্কারের মাধ্যমে একটি টেকসই গণতান্ত্রিক কাঠামো গড়ে তোলার অঙ্গীকার করা হয়েছে। ভোটকে রাষ্ট্রক্ষমতার একমাত্র বৈধ উৎস হিসেবে পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং মহানবী (সা.)-এর ন্যায়পরায়ণতা ও আদর্শকে সমুন্নত রেখে রাষ্ট্র পরিচালনায় ন্যায়পরায়ণতাকে মূলমন্ত্র করা হবে।
মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের তালিকা প্রণয়ন, রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ও স্বীকৃতি নিশ্চিত করার পাশাপাশি শিক্ষা কারিকুলামে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস তুলে ধরার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান’ এবং ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে সব শহীদের তালিকা প্রস্তুত করে তাদের পরিবারকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও অর্থনৈতিক সহায়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও রয়েছে।
সংবিধান সংস্কারের বিষয়ে বলা হয়েছে, সংবিধানের এককেন্দ্রিক চরিত্র অক্ষুণ্ণ রেখে বিদ্যমান সংসদীয় ব্যবস্থার পাশাপাশি বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে সংসদে ১০০ সদস্যবিশিষ্ট উচ্চকক্ষ প্রবর্তন করা হবে। এছাড়া, জুলাই অভ্যুত্থানকালে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস ও নিপীড়নের সঙ্গে জড়িত এবং ভোট জালিয়াতি ও দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের চিহ্নিতকরণ ও তাদের বিরুদ্ধে উপযুক্ত পদক্ষেপ নিতে স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠন করা হবে। ন্যায়পাল নিয়োগের প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছে।
সুশাসনের বিষয়ে বিএনপি দুর্নীতির সঙ্গে কোনো আপস না করার অঙ্গীকার করেছে। দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরতে পদ্ধতিগত ও আইনের সংস্কারের পাশাপাশি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হবে। ‘বিশেষ ক্ষমতা আইন, ১৯৭৪’ বাতিল করা হবে। জনপ্রশাসন সংস্কারে মেধা, সততা, সৃজনশীলতা, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতাই নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে একমাত্র মাপকাঠি হিসেবে বিবেচিত হবে। বিচার বিভাগের কার্যকর স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ, মামলার জট কমানো এবং ‘জুডিশিয়াল কমিশন’ গঠন করা হবে। সেবাবান্ধব পুলিশ গঠনের লক্ষ্যে আইন ও বিধি অনুযায়ী পুলিশের ওপর বিচার বিভাগীয় তদারকি নিশ্চিত করা হবে। স্থানীয় সরকার প্রশাসনকে ক্ষমতায়িত করে জনমুখী, কার্যকর ও টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা এবং জাতীয় উন্নয়ন বাজেটের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ স্থানীয় সরকারের অনুকূলে বরাদ্দ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

দ্বিতীয় ভাগে বৈষম্যহীন আর্থসামাজিক উন্নয়ন ও টেকসই রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা অর্জন: বাংলাদেশের চার কোটি ১৭ লাখ চরম দারিদ্র্যের কবলে নিপতিত মানুষের জন্য মানবিক, ন্যায়সংগত ও মর্যাদাভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা কাঠামো গড়ে তোলার অঙ্গীকার করা হয়েছে। ‘ফ্যামিলি কার্ড’ এবং ‘কৃষক কার্ড’ প্রদানের পাশাপাশি সমাজের অবহেলিত গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়কে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় আনা হবে। নারীর ক্ষমতায়নে স্নাতকোত্তর পর্যন্ত বিনা বেতনে লেখাপড়ার সুযোগ সৃষ্টি এবং কর্মস্থলে শিশু পরিচর্যা কেন্দ্র ও ‘ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার’ স্থাপন করা হবে। কৃষি খাতের মৌলিক রূপান্তরে শহীদ জিয়াউর রহমান প্রবর্তিত ‘স্বেচ্ছাশ্রমে খাল খনন কর্মসূচি’ পুনঃবাস্তবায়নের মাধ্যমে ২০ হাজার কিলোমিটার নদী ও খাল খনন, পুনঃখনন ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প গ্রহণ করা হবে। ‘করব কাজ, গড়ব দেশ’ নীতির ভিত্তিতে ধারাবাহিকভাবে এক কোটি কর্মসংস্থান তৈরির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পাশাপাশি তরুণ ও যুবকদের কারিগরি শিক্ষা, ডিজিটাল দক্ষতা ও উদ্যোক্তা উদ্ভাবনে সহায়তা করা হবে। শিক্ষা খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দ, বাধ্যতামূলক তৃতীয় ভাষা শিক্ষা এবং ‘শিক্ষা সংস্কার কমিশন’ গঠনের প্রতিশ্রুতি রয়েছে। স্বাস্থ্যসেবায় জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দ এবং ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের কথা বলা হয়েছে। জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষায় আধুনিক, পেশাদার ও শক্তিশালী সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তুলতে স্বনির্ভর ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ প্রতিরক্ষা শিল্প গড়ে তোলা এবং সন্ত্রাসবাদ, জঙ্গিবাদ ও উগ্রবাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার অঙ্গীকার করা হয়েছে। পররাষ্ট্রনীতিতে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ দর্শনকে প্রাধান্য দিয়ে সমতা, ন্যায্যতা ও পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে একটি আত্মমর্যাদাশীল বৈশ্বিক অবস্থান গ্রহণের কথা বলা হয়েছে।

তৃতীয় ভাগে ভঙ্গুর অর্থনীতির পুনর্গঠন ও পুনরুদ্ধার: অর্থনীতিকে ২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করা এবং বৈদেশিক প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ (এফডিআই) জিডিপির ২.৫ শতাংশে উন্নীত করার চেষ্টা চালানোর কথা বলা হয়েছে। পুঁজিবাজারের সংস্কারকল্পে ‘পুঁজিবাজার সংস্কার কমিশন’ গঠন এবং গত ১৫ বছরে সংঘটিত অনিয়ম তদন্তে বিশেষ কমিশন গঠনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ২০৩০ সালের মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ৩৫ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত করা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি ২০ শতাংশে উন্নীত করতে প্রচেষ্টা জোরদার করা হবে। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি খাতকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) হাব এবং হার্ডওয়্যার উৎপাদন কেন্দ্রে পরিণত করার মাধ্যমে জিডিপিতে আইসিটি খাতের অবদান ৫ থেকে ১০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। দেশের অপার সম্ভাবনাময় সমুদ্রসম্পদের বিজ্ঞানভিত্তিক টেকসই ব্যবহার নিশ্চিত করতে ‘জাতীয় সুনীল অর্থনীতি কর্তৃপক্ষ’ এবং শিক্ষা ও শিল্প খাতে ‘মেরিটাইম ইনোভেশন ফান্ড’ প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে। ২০৩৫ সালের মধ্যে কর-জিডিপির অনুপাত ১৫ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনাও রয়েছে।

চতুর্থ ভাগে দেশের সব অঞ্চলের সবার জন্য সমতা-ভিত্তিক সুষম উন্নয়ন: দেশের যে অঞ্চল যেই অর্থনৈতিক ও শিল্প উন্নয়নের জন্য উপযুক্ত, বিএনপি সে অঞ্চলে সেই উপযুক্ত অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও শিল্পায়নে অগ্রাধিকার দেবে। এরই অংশ হিসেবে চট্টগ্রামকে দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী এবং কর্মসংস্থানের হাব হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।

পঞ্চম ভাগে ধর্ম, সমাজ, ক্রীড়া, সংস্কৃতি ও সংহতি: ‘নৃ-গোষ্ঠী উন্নয়ন অধিদপ্তর’ প্রতিষ্ঠা, ইসলামী গবেষণা সম্প্রসারণ এবং মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রম সারা দেশে বিস্তৃত করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। খেলাধুলাকে পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা, জাতীয় শিক্ষাক্রমে চতুর্থ শ্রেণি থেকে খেলাধুলাকে বাধ্যতামূলক করা এবং আধুনিক ক্রীড়া বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের কথা বলা হয়েছে। গণমাধ্যমকর্মীদের কাজের সুরক্ষা ও পেশাগত স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে ‘জাতীয় সাংবাদিক অবসর কল্যাণ বোর্ড’ গঠনের অঙ্গীকারও রয়েছে।

ইশতেহার প্রকাশ অনুষ্ঠানে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ও নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম খানের পরিচালনায় আরও উপস্থিত ছিলেন স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ইসমাইল জবিউল্লাহ, ড. মাহদী আমিন, মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. মওদুদ হোসেন আলমগীর পাভেল, সদস্য আতিকুর রহমান রুমন, শায়রুল কবির খান প্রমুখ। এছাড়াও শিক্ষাবিদ অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ, অধ্যাপক আ ন ম ইউসুফ হায়দার, অধ্যাপক কামরুল আহসান, অধ্যাপক এবিএম ওবায়দুল ইসলাম, অধ্যাপক নজরুল ইসলামসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-গবেষকরাও অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

স্মর্তব্য, বিএনপি দশম ও দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন বয়কট করেছিল। এর আগে পঞ্চম, ষষ্ঠ, সপ্তম, অষ্টম ও নবম সংসদ নির্বাচনে দলের তৎকালীন চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ইশতেহার ঘোষণা করেছিলেন। ২০১৮ সালের একাদশ সংসদ নির্বাচনে ইশতেহার ঘোষণা করেছিলেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এবারই প্রথম দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ইশতেহার ঘোষণা করলেন।