শহীদ শরীফ ওসমান হাদি হত্যার বিচার ও জাতিসংঘের অধীনে তদন্তের দাবিতে চলমান আন্দোলন চলাকালে শুক্রবার ইনকিলাব মঞ্চের নেতাকর্মীদের ওপর পুলিশ হামলা চালিয়েছে। এতে সংগঠনের বেশ কয়েকজন সদস্য আহত হন। এই ঘটনার প্রতিবাদে শুক্রবার রাতে ইনকিলাব মঞ্চ তাদের ফেসবুক পেজে একটি ভিডিও বার্তা প্রকাশ করে পুলিশের ভূমিকার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে এবং জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে হত্যাকাণ্ডের তদন্তের জোর দাবি জানিয়েছে।
ভিডিও বার্তায় ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যসচিব আবদুল্লাহ আল জাবের জানান, বৃহস্পতিবার থেকে তারা নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বাসভবনের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করছিলেন। তাদের মূল দাবি ছিল, ড. ইউনূস যেন শহীদ ওসমান হাদির সুষ্ঠু তদন্তের জন্য জাতিসংঘে একটি চিঠি পাঠান। জাবেরের সঙ্গে ডাকসু নেত্রী ফাতিমা তাসনিম জুমা ও রাকসুর জিএস সালাউদ্দিন আম্মারও ভিডিওতে উপস্থিত ছিলেন।
তিনি বলেন, বৃহস্পতিবার বিকেল ৪টা থেকে শুক্রবার পর্যন্ত তারা শান্তিপূর্ণভাবে তাদের দাবি আদায়ের চেষ্টা করছিলেন। এই সময়ে শহীদ ওসমান হাদির স্ত্রী ও সন্তানও তাদের সঙ্গে ছিলেন। তাদের অভিযোগ, সরকারের পক্ষ থেকে কোনো যোগাযোগ করা হয়নি এবং ড. ইউনূসের বাসভবন থেকে কেউ এসে ওসমান হাদির স্ত্রীর প্রতি ন্যূনতম সম্মানও দেখায়নি।
শুক্রবার জুমার নামাজের পর শহীদ ওসমান হাদির স্ত্রী আবারও বাসভবনের দিকে রওনা দিলে ইনকিলাব মঞ্চের কিছু সদস্য তার নিরাপত্তার জন্য ভেতরে প্রবেশ করার চেষ্টা করেন। এ সময় সংগঠনের আরও কিছু সদস্য ভেতরে আটকা পড়েছিলেন, যাদের বাইরে আসতে দেওয়া হচ্ছিল না। জাবেরের ভাষ্যমতে, সংগঠনের সদস্য জুমা, শান্তা ও জুবায়েরকে ভেতরে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য পাঠানো হলে পুলিশ তাদের বাধা দেয়। একপর্যায়ে পুলিশ জুমা ও শান্তার ওপর শারীরিক হামলা চালায়, শান্তাকে গলা টিপে ধরে এবং জুমার গালে খামচি দেয় ও বুট দিয়ে আঘাত করে।
আবদুল্লাহ আল জাবের অভিযোগ করেন, পুলিশের এই আচরণ ফ্যাসিবাদী শাসনামলের পুলিশের আচরণের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। তিনি দাবি করেন, হামলার সময় ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করলেও পেছন থেকে কিছু পুলিশ সদস্য অতর্কিত হামলা চালায় এবং তাদের ভাইদের রক্তাক্ত করে। ইনকিলাব মঞ্চ এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে জড়িতদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনার আহ্বান জানিয়েছে।
তিনি আরও বলেন, হামলাকারী অধিকাংশ পুলিশ সদস্যের নেমপ্লেট ছিল না এবং তারা মাস্ক পরা ছিল। এই ধরনের কৌশল ফ্যাসিবাদী শাসনামলে দেখা গেছে, যা বর্তমান পুলিশ প্রশাসনের ওপর প্রশ্ন তোলে। জাবেরের অভিযোগ, এসএসএফ সদস্যরাও তাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেছে এবং জুবায়েরকে রাস্তায় ফেলে মারধর করেছে, মাথায় আঘাত করেছে। ইনকিলাব মঞ্চের প্রায় সব কর্মীই এই হামলায় আহত হয়েছেন।
ইনকিলাব মঞ্চের নেতা প্রশ্ন তোলেন, কারা শহীদ ওসমান হাদির হত্যার তদন্ত জাতিসংঘের অধীনে দিতে চায় না, তা আজ স্পষ্ট হয়ে গেছে। তিনি মনে করেন, প্রধান উপদেষ্টার উপদেষ্টা পরিষদের একটি অংশ এই খুনের সঙ্গে জড়িত, নয়তো শান্তিপূর্ণ অবস্থানে এমন অমানবিক হামলার প্রশ্নই আসে না। সরকারি প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে আন্দোলনকারীদের জলকামানের ওপর ওঠার যে দাবি করা হয়েছে, তা তিনি অস্বীকার করেন এবং বলেন, তারা বরং জনগণকে শান্ত করার চেষ্টা করছিলেন। জনগণের সামনে জুমা ও শান্তাকে মারধর করা দেখে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয় এবং এর পুরো দায়ভার দায়িত্বরত পুলিশ প্রশাসন ও সরকারকেই বহন করতে হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
জাবের আসন্ন ১২ তারিখের নির্বাচনকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেন, এই হামলা নির্বাচন বানচালের একটি নীলনকশা। তিনি জনগণকে ১২ তারিখে ভোট দিয়ে ইনসাফ ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের পক্ষে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান। তিনি আরও অভিযোগ করেন, সরকার শান্তিপূর্ণ জনগণের ওপর সাউন্ড গ্রেনেড, টিয়ারশেল ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করেছে। শাহবাগেও হামলার ঘটনা ঘটেছে এবং শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন। কিছু পুলিশ সদস্যের আপত্তিকর মন্তব্য থেকে বোঝা যায় যে, বর্তমান পুলিশ প্রশাসনে এখনও আওয়ামী লীগপন্থী গোষ্ঠী রয়ে গেছে এবং এর দায়ভার অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকেই নিতে হবে। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, যেভাবে ইনকিলাব মঞ্চের ওপর হামলা হয়েছে, তাতে ড. ইউনূসও বাসভবনের ভেতরে নিরাপদ নন।
ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যসচিব বলেন, তারা চান না বাংলাদেশে কোনো অস্বাভাবিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হোক। তার মতে, আজকের আক্রমণ মূলত নির্বাচন বানচালের উদ্দেশ্যে করা হয়েছে। তাই, এই নির্বাচন অবশ্যই ১২ তারিখেই হতে হবে এবং যারা নির্বাচন বানচাল করতে চায়, তাদের রুখে দিতে হবে।
আবদুল্লাহ আল জাবেরের প্রধান দাবি হলো, শহীদ ওসমান হাদির হত্যার তদন্ত জাতিসংঘের অধীনেই হতে হবে। তিনি জানান, সরকার ইতিপূর্বে আশ্বস্ত করলেও কোনো সময়সীমা বেঁধে দেয়নি। তাই তারা ৮ তারিখের মধ্যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে জাতিসংঘ বরাবর একটি চিঠি পাঠানোর দাবি জানিয়েছেন। এই চিঠিতে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত থাকার কথা বলা হয়েছে:
১. সরকারকে ইউএনও ও এসএইচআরকে অনুরোধ করতে হবে যেন তারা শহীদ শরীফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডে একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত পরিচালনা করে।
২. এই তদন্তের স্পষ্ট কার্যপরিধি থাকবে, যাতে ঘটনার সত্যতা নির্ধারণ, দায়ী ব্যক্তি ও তাদের সহায়তাকারী নেটওয়ার্ক শনাক্তকরণ এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করে করণীয় সুপারিশ অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
৩. তদন্তে শুধু সরাসরি হামলাকারীদের নয়, বরং আড়ালে থাকা পরিকল্পনাকারী, ষড়যন্ত্রকারী, জড়িত থাকা বা সহযোগিতা, সহায়তা প্রদান, কিংবা আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়া ব্যক্তিদের শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে।
৪. সরকারকে এক্ষেত্রে পূর্ণ সহযোগিতার নিশ্চয়তা দিতে হবে, যাতে প্রাসঙ্গিক প্রমাণ ও স্থানে প্রবেশাধিকার অন্তর্ভুক্ত থাকে।
৫. অভিযুক্ত সন্দেহভাজনরা বিদেশে পালিয়ে থাকতে পারে, এমন প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সরকারকে ওএসসি এইচআরের সহায়তা চাইতে হবে, যাতে কাঠামোগত আন্তঃসীমান্ত সহযোগিতা নিশ্চিত হয়।
জাবের জোর দিয়ে বলেন, শহীদ ওসমান হাদির হত্যার তদন্ত জাতিসংঘের অধীনেই হতে হবে এবং এই তদন্ত কাজে যাতে কোনো বাধা না আসে, তা রাষ্ট্রপক্ষকে নিশ্চিত করতে হবে। এর বাইরে তাদের কাছে কোনো বিকল্প নেই।
তিনি প্রশাসনের কাছে জানতে চান, কারা এই হামলার পেছনে রয়েছে এবং কেন একজন মানুষকে বারবার লাঠি দিয়ে আঘাত করা হয়েছে। তিনি ভিডিওতে দেখেছেন, একজন ব্যক্তিকে ৩২ বারের বেশি আঘাত করা হয়েছে। তার মতে, এই প্রশাসন এখন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কথায় চলছে না, বরং অন্য কেউ তাদের নিয়ন্ত্রণ করছে। সরকার যদি এই নিয়ন্ত্রকদের চিহ্নিত করতে না পারে, তবে জুলাইয়ের প্রেক্ষাপটে জনগণের ওপর এই হামলার দায়ভার তাদের ওপরই বর্তাবে।
সাধারণ জনগণের প্রতি জাবের ৮ তারিখ পর্যন্ত ধৈর্য ধারণের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, সরকার যেহেতু ৮ তারিখে জাতিসংঘের কাছে চিঠি পাঠানোর কথা বলেছে, তাই চিঠি প্রেরণের আগে এর বিষয়বস্তু অবশ্যই তাদের দেখাতে হবে। তিনি হুঁশিয়ারি দেন, ছলচাতুরি করে কোনো চিঠি পাঠানো যাবে না।
ইনকিলাব মঞ্চের নেতা বলেন, শহীদ ওসমান হাদি স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং ইনসাফের লড়াইয়ের জন্য শাহাদাত বরণ করেছেন। এই লড়াই থামাতে না দেওয়ার জন্য তিনি জনগণের প্রতি আহ্বান জানান। তিনি নিজের এবং তার সহকর্মীদের গুরুতর আহত হওয়ার বর্ণনা দেন; যেখানে সালাউদ্দিন আম্মারের মাথা লক্ষ্য করে গ্রেনেড নিক্ষেপ, জুমার গালে আঘাত, শান্তাকে গলা টিপে ধরা, ফাহিমের হাত ভেঙে যাওয়া এবং অন্য এক কর্মীর সংকটাপন্ন অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তির কথা উল্লেখ করেন।
তিনি সরকারকে দ্রুত হামলাকারীদের চিহ্নিত করে বিচারের মুখোমুখি করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, অন্যথায় যেকোনো পরিস্থিতির জন্য সরকারকেই দায়ী থাকতে হবে। জাবের সতর্ক করেন, যদি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা না যায়, তবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব হুমকির মুখে পড়বে। তিনি প্রধান উপদেষ্টাকে আমেরিকায় যাওয়ার আগে দেশের জনগণের কাছে জবাবদিহি করার দাবি জানান।
ছাত্রদের উদ্দেশে তিনি ধৈর্য ধারণ এবং মনোবল না হারানোর কথা বলেন। জাবের বলেন, ‘আজাদির লড়াই’ একদিনের নয়, এবং তাদের আর পেছনে ফেরার সুযোগ নেই, কেবল সামনেই এগিয়ে যেতে হবে। তিনি অভিযোগ করেন, সরকার ইচ্ছাকৃতভাবে পরিস্থিতি তৈরি করেছে এবং এর দায়ভার তাদেরই বহন করতে হবে। তিনি বলেন, আজকের হামলায় তারা সবাই প্রচণ্ড আহত, অনেকের রক্তে পোশাক ভিজে গেছে, হাত ভেঙেছে, মুখে সেলাই লেগেছে। তাদের ধারণা, হামলাকারীদের উদ্দেশ্য ছিল খুন করা। তিনি দৃঢ়ভাবে বলেন, তারা আরও কোনো ভাইকে হারালেও নির্বাচন পেছানো যাবে না এবং নির্বাচনের পর যে রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় আসবে, তারা যেন এই ব্যাপারে সুষ্ঠু পদক্ষেপ নেয়।
রিপোর্টারের নাম 























