ঢাকা ০৮:৫৩ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৫ মার্চ ২০২৬

স্বৈরাচারমুক্ত স্বদেশ প্রতিষ্ঠায় ‘জুলাই সনদে’ হ্যাঁ-এর আহ্বান: আলী রীয়াজ

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৫:২১:৩১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ৪ বার পড়া হয়েছে

স্বৈরাচারী শাসন ব্যবস্থার পুনরাবৃত্তি রোধ এবং জনগণের অধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আসন্ন গণভোটে ‘জুলাই সনদের’ পক্ষে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়ে একে জয়যুক্ত করার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক আলী রীয়াজ। তিনি বলেছেন, ‘জুলাই সনদ’ হলো দেশের তরুণ, শ্রমিক এবং স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে অংশ নেওয়া প্রত্যেকের প্রতি আমাদের ঋণের প্রতিচ্ছবি, যা রক্তের অক্ষরে লেখা এক শপথের স্বাক্ষর। মঙ্গলবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।

মতবিনিময় সভাটি আয়োজন করে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি), যার মূল উদ্দেশ্য ছিল গণভোটের প্রচার এবং ভোটারদের উদ্বুদ্ধ করা।

অধ্যাপক আলী রীয়াজ জোর দিয়ে বলেন, আর কোনো স্বৈরাচারী শক্তি যেন জাতির ঘাড়ে চেপে বসতে না পারে, জনগণের ভোটাধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কেড়ে নিতে না পারে, কাউকে গুম করতে না পারে, সে জন্য এই সনদের প্রতি সমর্থন অত্যন্ত জরুরি। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, দীর্ঘ ষোলো বছর ধরে যারা ফ্যাসিবাদী দুঃশাসনের নিগড় থেকে স্বদেশকে মুক্ত করার লড়াইয়ে জীবন দিয়েছেন, গুম-খুনের শিকার হয়েছেন, গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, তারা আমাদের জন্য কিছু সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব নির্ধারণ করে গেছেন।

এই দায়িত্বগুলোর মধ্যে প্রধান হলো, ব্যক্তিতান্ত্রিক স্বৈরতন্ত্রের পুনরাগমনের পথ রুদ্ধ করা এবং ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের জন্য একটি সুদূরপ্রসারী পথনকশা তৈরি করা। তিনি উল্লেখ করেন, দেশের এক-তৃতীয়াংশ জনগোষ্ঠী ২৭ থেকে ৩৭ বছর বয়সী। আগামী অন্তত ৪০ বছর আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি কোন পথে যাবে, তা নির্ধারণের দায়িত্ব আমাদের সকলের। আলী রীয়াজ দৃঢ় বিশ্বাস ব্যক্ত করেন যে, অগুনতি শহীদের আত্মাহুতি বৃথা যাবে না এবং এদেশের জনগণ ‘জুলাই সনদের’ পক্ষে অবস্থান নিয়ে বাংলাদেশ সাফল্য ও সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাবে।

সংবিধান সংশোধনে অতীতে এক ব্যক্তির ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ত্রুটি-বিচ্যুতি সংশোধনের জন্য জাতীয় সংসদে একটি কমিটি গঠিত হয়। সেই কমিটিতে আওয়ামী লীগ ছাড়া অন্য কোনো দলের সদস্য ছিল না। ২৫টি বৈঠক এবং ১০৪ জন ব্যক্তির মতামত গ্রহণের পর কমিটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বহাল রাখার সুপারিশ করে, তবে ৯০ দিনের বেশি না থাকা এবং বিদেশের সঙ্গে চুক্তি না করার মতো কিছু শর্তারোপের কথা বলে। কিন্তু একটি মাত্র বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত পরিবর্তিত হয়, যা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর একক সিদ্ধান্তে বাংলাদেশে পঞ্চদশ সংশোধনী তৈরি হয় এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল হয়। সংবিধান সংশোধন যেন আর ছেলেখেলায় পরিণত না হয়, তা বন্ধ করা এখন সময়ের দাবি।

ড. রীয়াজ ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের নির্বাচনগুলোকে ‘তামাশার নির্বাচন’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তিনি ২০১২ সালে প্রধান নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের সময় ‘সার্চ কমিটি’ গঠনের প্রক্রিয়াকে ‘নাটক’ বলে উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, ‘সার্চ কমিটি’র সুপারিশে ‘কাজী রকিব উদ্দিন’ নামের কোনো ব্যক্তির নাম ছিল না, বরং এক ব্যক্তির ইচ্ছাতেই এই নিয়োগ হয়েছিল। প্রহসনের নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্রকে নির্বাসনে পাঠানো হয়েছিল বলে তিনি মন্তব্য করেন।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার জানান, সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত ৪৮টি সুপারিশ চারটি ক্যাটাগরিতে গণভোটে আসছে। তবে কার্যত প্রশ্নটি একটাই, আর তা হলো— আপনি কি জুলাই অভ্যুত্থানের পক্ষে, না বিপক্ষে? তিনি সতর্ক করে বলেন, যদি গণভোট ব্যর্থ হয়, তাহলে ফ্যাসিবাদ আবার ফিরে আসবে এবং সেটি কতটা বীভৎস, নির্মম ও নৃশংস হতে পারে, তা আমরা কল্পনাও করতে পারি না।

মনির হায়দার বলেন, স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র অনুযায়ী আমাদের মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্য ছিল সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারভিত্তিক একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে গত ৫৪ বছরে আমরা সেই রাষ্ট্র পাইনি। বরং এই দীর্ঘ সময়ে ব্যক্তি ও গোষ্ঠীবিশেষ নিজেদের হীন স্বার্থে আমাদের স্বাধীনতাকে অপব্যবহার করেছে। তিনি যোগ করেন, ‘জুলাই অভ্যুত্থান’ আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সেই লক্ষ্য অর্জনের একটি সুযোগ এনে দিয়েছে এবং এখন গণভোটের মাধ্যমে এই সুযোগকে কাজে লাগাতে হবে।

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন আয়োজিত এই মতবিনিময় সভায় সভাপতিত্ব করেন কমিশনের চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. এসএমএ ফায়েজ। সভায় ঢাকার বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবিরের ইফতার আয়োজন: বিশৃঙ্খলা ও খাবার সংকটে ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা

স্বৈরাচারমুক্ত স্বদেশ প্রতিষ্ঠায় ‘জুলাই সনদে’ হ্যাঁ-এর আহ্বান: আলী রীয়াজ

আপডেট সময় : ০৫:২১:৩১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

স্বৈরাচারী শাসন ব্যবস্থার পুনরাবৃত্তি রোধ এবং জনগণের অধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আসন্ন গণভোটে ‘জুলাই সনদের’ পক্ষে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়ে একে জয়যুক্ত করার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক আলী রীয়াজ। তিনি বলেছেন, ‘জুলাই সনদ’ হলো দেশের তরুণ, শ্রমিক এবং স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে অংশ নেওয়া প্রত্যেকের প্রতি আমাদের ঋণের প্রতিচ্ছবি, যা রক্তের অক্ষরে লেখা এক শপথের স্বাক্ষর। মঙ্গলবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।

মতবিনিময় সভাটি আয়োজন করে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি), যার মূল উদ্দেশ্য ছিল গণভোটের প্রচার এবং ভোটারদের উদ্বুদ্ধ করা।

অধ্যাপক আলী রীয়াজ জোর দিয়ে বলেন, আর কোনো স্বৈরাচারী শক্তি যেন জাতির ঘাড়ে চেপে বসতে না পারে, জনগণের ভোটাধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কেড়ে নিতে না পারে, কাউকে গুম করতে না পারে, সে জন্য এই সনদের প্রতি সমর্থন অত্যন্ত জরুরি। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, দীর্ঘ ষোলো বছর ধরে যারা ফ্যাসিবাদী দুঃশাসনের নিগড় থেকে স্বদেশকে মুক্ত করার লড়াইয়ে জীবন দিয়েছেন, গুম-খুনের শিকার হয়েছেন, গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, তারা আমাদের জন্য কিছু সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব নির্ধারণ করে গেছেন।

এই দায়িত্বগুলোর মধ্যে প্রধান হলো, ব্যক্তিতান্ত্রিক স্বৈরতন্ত্রের পুনরাগমনের পথ রুদ্ধ করা এবং ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের জন্য একটি সুদূরপ্রসারী পথনকশা তৈরি করা। তিনি উল্লেখ করেন, দেশের এক-তৃতীয়াংশ জনগোষ্ঠী ২৭ থেকে ৩৭ বছর বয়সী। আগামী অন্তত ৪০ বছর আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি কোন পথে যাবে, তা নির্ধারণের দায়িত্ব আমাদের সকলের। আলী রীয়াজ দৃঢ় বিশ্বাস ব্যক্ত করেন যে, অগুনতি শহীদের আত্মাহুতি বৃথা যাবে না এবং এদেশের জনগণ ‘জুলাই সনদের’ পক্ষে অবস্থান নিয়ে বাংলাদেশ সাফল্য ও সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাবে।

সংবিধান সংশোধনে অতীতে এক ব্যক্তির ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ত্রুটি-বিচ্যুতি সংশোধনের জন্য জাতীয় সংসদে একটি কমিটি গঠিত হয়। সেই কমিটিতে আওয়ামী লীগ ছাড়া অন্য কোনো দলের সদস্য ছিল না। ২৫টি বৈঠক এবং ১০৪ জন ব্যক্তির মতামত গ্রহণের পর কমিটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বহাল রাখার সুপারিশ করে, তবে ৯০ দিনের বেশি না থাকা এবং বিদেশের সঙ্গে চুক্তি না করার মতো কিছু শর্তারোপের কথা বলে। কিন্তু একটি মাত্র বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত পরিবর্তিত হয়, যা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর একক সিদ্ধান্তে বাংলাদেশে পঞ্চদশ সংশোধনী তৈরি হয় এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল হয়। সংবিধান সংশোধন যেন আর ছেলেখেলায় পরিণত না হয়, তা বন্ধ করা এখন সময়ের দাবি।

ড. রীয়াজ ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের নির্বাচনগুলোকে ‘তামাশার নির্বাচন’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তিনি ২০১২ সালে প্রধান নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের সময় ‘সার্চ কমিটি’ গঠনের প্রক্রিয়াকে ‘নাটক’ বলে উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, ‘সার্চ কমিটি’র সুপারিশে ‘কাজী রকিব উদ্দিন’ নামের কোনো ব্যক্তির নাম ছিল না, বরং এক ব্যক্তির ইচ্ছাতেই এই নিয়োগ হয়েছিল। প্রহসনের নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্রকে নির্বাসনে পাঠানো হয়েছিল বলে তিনি মন্তব্য করেন।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার জানান, সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত ৪৮টি সুপারিশ চারটি ক্যাটাগরিতে গণভোটে আসছে। তবে কার্যত প্রশ্নটি একটাই, আর তা হলো— আপনি কি জুলাই অভ্যুত্থানের পক্ষে, না বিপক্ষে? তিনি সতর্ক করে বলেন, যদি গণভোট ব্যর্থ হয়, তাহলে ফ্যাসিবাদ আবার ফিরে আসবে এবং সেটি কতটা বীভৎস, নির্মম ও নৃশংস হতে পারে, তা আমরা কল্পনাও করতে পারি না।

মনির হায়দার বলেন, স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র অনুযায়ী আমাদের মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্য ছিল সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারভিত্তিক একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে গত ৫৪ বছরে আমরা সেই রাষ্ট্র পাইনি। বরং এই দীর্ঘ সময়ে ব্যক্তি ও গোষ্ঠীবিশেষ নিজেদের হীন স্বার্থে আমাদের স্বাধীনতাকে অপব্যবহার করেছে। তিনি যোগ করেন, ‘জুলাই অভ্যুত্থান’ আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সেই লক্ষ্য অর্জনের একটি সুযোগ এনে দিয়েছে এবং এখন গণভোটের মাধ্যমে এই সুযোগকে কাজে লাগাতে হবে।

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন আয়োজিত এই মতবিনিময় সভায় সভাপতিত্ব করেন কমিশনের চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. এসএমএ ফায়েজ। সভায় ঢাকার বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।