রাজশাহী অঞ্চলের আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারী ভোটারদের মন জয় করা প্রার্থীদের জন্য এক নতুন চ্যালেঞ্জ এবং সুযোগ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। জেলার মোট ভোটারের অর্ধেকেরও বেশি নারী হওয়ায়, তাদের সমর্থন এখন জয়-পরাজয়ের সমীকরণে প্রধান ভূমিকা পালন করছে। এই পরিস্থিতিতে, নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রায় সকল রাজনৈতিক দল, বিশেষ করে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী, নানা প্রতিশ্রুতি ও অঙ্গীকারের মাধ্যমে নারী ভোটারদের আকৃষ্ট করতে তৎপর। ফলে, রাজনীতির ময়দানে নারী ভোটাররাই এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছেন।
নির্বাচন কমিশন সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, রাজশাহী জেলায় মোট ভোটারের সংখ্যা ২২ লাখ ৬৩ হাজার ৯৬৪ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১১ লাখ ২৩ হাজার ৯০৪ জন, যেখানে নারী ভোটার সংখ্যা ১১ লাখ ৪০ হাজার ৩৫ জন। এছাড়াও, তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন ২৫ জন।
ভৌগোলিক বৈচিত্র্যের এই অঞ্চলটি বরেন্দ্রভূমি, চরাঞ্চল এবং জলাশয়পূর্ণ জনপদ নিয়ে গঠিত। এখানকার প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ কৃষিনির্ভর। পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও কৃষিক্ষেত্রে সমানভাবে শ্রম দিয়ে থাকেন। বিশেষ করে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর নারীরা তাদের অক্লান্ত পরিশ্রমের জন্য পরিচিত, তবে তারা প্রায়শই যাতায়াত পথে হয়রানি, মজুরিবৈষম্য এবং নিরাপত্তাহীনতার অভিযোগ করেন। আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে, এই সমস্যাগুলো থেকে মুক্তি পাওয়ার আশ্বাসই খুঁজছেন তারা।
পবা উপজেলার দর্শনপাড়া গ্রামের নারী ভোটার জুলেখা বেগম আধুনিক কৃষিকাজে কারিগরি প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে বলেন, “প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে, আমরা যদি প্রশিক্ষণ পাই তবে আমাদের কাজের দক্ষতা বাড়বে এবং আয়ও বৃদ্ধি পাবে।”
বরেন্দ্র অঞ্চলের পানির সংকট নিরসন, সকলের জন্য সহজলভ্য শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণ এবং নারীবান্ধব কর্মপরিবেশ তৈরি করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর নারীরাও।
কেবল গ্রামেই নয়, শহরের নারী উদ্যোক্তারাও নারীবান্ধব নীতি ও প্রয়োজনীয় সহায়তার দাবি জানিয়েছেন। উদ্যোক্তা শিউলি রানী বলেন, “নতুন নারী উদ্যোক্তাদের জন্য নিরাপত্তা ও সহযোগিতার পরিবেশ অত্যন্ত জরুরি। সরকারি সহায়তা পেলে আমরা আরও এগিয়ে যেতে পারব।”
নারী ব্যবসায়ী গুলনাহার বেগম মনে করেন, কেবল সাধারণ নারী নয়, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর নারীরাও শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত। সরকারি সুযোগ-সুবিধা তাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া প্রয়োজন। টেকসই উন্নয়নের জন্য সমাজের সকল স্তরের মানুষের সমান অধিকার নিশ্চিত করা অপরিহার্য।
নারী উদ্যোক্তা লুৎফুন্নেছা নির্বাচিত সরকারের কাছে আন্তরিকভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, “অনেক নারী ব্যবসা করতে আগ্রহী হলেও পুঁজির অভাবে পিছিয়ে পড়েন। শুধু নারীদের জন্য বিশেষ ব্যাংকিং সুবিধা প্রয়োজন। পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রে নারীদের কাজের যথাযথ মূল্যায়নও জরুরি।”
মোহনপুর উপজেলার মৌগাছি গ্রামের সুলতানা বেগমসহ কয়েকজন নারী ভোটার জানান, জামায়াতে ইসলামীর নারী কর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে তাদের সমস্যা শুনছেন এবং সন্তানদের পড়াশোনা ও নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা করছেন। তবে, বিএনপির পক্ষ থেকে তাদের কাছে তেমন প্রচার দেখা যায়নি, ফলে জামায়াতের প্রচারণা তাদের কাছে বেশি চোখে পড়ছে।
আরেক নারী ভোটার রাজিয়া সুলতানা বলেন, “মহল্লায় জামায়াতের মেয়েরা নিয়মিত মিটিং করছে এবং ‘হ্যাঁ’ (ভোট) কেন জরুরি তা বোঝাচ্ছে। আগে বিএনপির প্রচার বেশি দেখতাম, এবার তেমন নেই।”
জামায়াতের নারী নেত্রী হোসনেয়ারা হাসু দাবি করেন, তারা নারীদের ঘরে ঘরে গিয়ে তাদের অধিকার ও নিরাপত্তার কথা বলছেন এবং রাজশাহীর নারী ভোটারদের কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া পাচ্ছেন।
অন্যদিকে, বিএনপির নারী নেত্রী বুলবুলি বেগম জানান, তারাও নারী ভোটারদের কাছে নিয়মিত প্রচার চালাচ্ছেন এবং নারী ভোটাররা ধানের শীষের প্রতি ইতিবাচক সাড়া দিচ্ছেন।
স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষক আনোয়ার হোসেনের মতে, রাজশাহীতে নারী ভোটারদের লক্ষ্য করে জামায়াত একটি পৃথক সাংগঠনিক কাঠামো গড়ে তুলেছে। তারা ঘরোয়া পরিবেশে সভা এবং ধর্মীয় ও সামাজিক বিষয়গুলোকে সামনে রেখে প্রচারণা চালাচ্ছে। এর বিপরীতে, বিএনপির নারীভিত্তিক প্রচারণা তুলনামূলকভাবে দুর্বল।
রাজনৈতিক অঙ্গনেও নারীদের গুরুত্ব নিয়ে জোরালো বক্তব্য আসছে। বিএনপি মনোনীত প্রার্থীরা সভা-সমাবেশে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন যে, সরকারে গেলে নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে পরিকল্পিত উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। কর্মক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে দক্ষতা উন্নয়ন, আর্থিক সহায়তা এবং মার্কেটিং ও ব্র্যান্ডিং সাপোর্ট দেওয়ারও আশ্বাস দিচ্ছেন তারা।
পাশাপাশি, জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থীরা বলছেন, তারা এমন একটি দেশ চান যেখানে নারীরা ঘরে, কর্মস্থলে এবং রাস্তায় নিরাপদ থাকবেন। তাদের ভাষ্যমতে, নারীদের ওপর কোনো পোশাক বা আচরণ চাপিয়ে দেওয়া হবে না, বরং সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে তারা উন্নয়নে ভূমিকা রাখবেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকার পরিবর্তন হলেও নারীদের ভাগ্যের খুব একটা পরিবর্তন হয় না। তাদের মতে, নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতি নয়, বরং নির্বাচনের পর তার বাস্তবায়নই নারীদের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা। নিরাপত্তা, ন্যায্য মজুরি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার নিশ্চয়তা ছাড়া নারীর উন্নয়ন সম্ভব নয়।
এই নির্বাচনে নারী ভোটাররা কেবল সংখ্যায় নয়, শক্তিতেও পরিণত হয়েছেন। গ্রাম থেকে শহর, কৃষিশ্রমিক থেকে উদ্যোক্তা—সকল শ্রেণির নারীই এমন প্রতিনিধি চান, যিনি বৈষম্যহীনভাবে নারীর উন্নয়নে কাজ করবেন এবং ভোটের পরেও তাদের পাশে থাকবেন। তাই, রাজশাহীর এবারের নির্বাচনের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—নারী ভোটার কাকে ভরসা করেন।
রিপোর্টারের নাম 




















