আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের ক্ষণগণনা যতই ঘনিয়ে আসছে, দেশজুড়ে রাজনৈতিক সহিংসতার মাত্রা ততই ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। নির্বাচনী প্রচারণার শুরু থেকেই বিভিন্ন স্থানে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ, হামলা ও খুনাখুনির ঘটনায় সাধারণ ভোটারদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। মানবাধিকার সংগঠন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্যমতে, গত এক বছরে শুধু রাজনৈতিক ও নির্বাচনী বিরোধের জের ধরে দেড় শতাধিক মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন।
সহিংসতার পরিসংখ্যান: একটি ভয়াবহ চিত্র
মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) এবং আসক (ASK)-এর তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত ১৩ মাসে সারা দেশে রাজনৈতিক সহিংসতায় ১৪৬ জন নিহত হয়েছেন। কেবল চলতি বছরের জানুয়ারি মাসেই (১ থেকে ২৯ তারিখ পর্যন্ত) ৬৫টি পাল্টাপাল্টি সংঘর্ষের ঘটনায় ১০ জন নিহত ও ৫৫৫ জন আহত হয়েছেন।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য বলছে, ১২ ডিসেম্বর তফসিল ঘোষণার পর থেকে ২৬ জানুয়ারি পর্যন্ত ৪৫ দিনে সারা দেশে ১৪৪টি নির্বাচনী সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে প্রার্থীর ওপর হামলা, নির্বাচনী কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগ এবং ককটেল বিস্ফোরণের মতো ঘটনাও রয়েছে।
শেরপুর ও হাতিয়ায় সাম্প্রতিক রক্তক্ষয়ী সংঘাত
- শেরপুর-৩ আসন: গত ২৮ জানুয়ারি ঝিনাইগাতীতে প্রার্থীদের ইশতেহার পাঠ অনুষ্ঠানে আসন বণ্টন ও চেয়ারে বসাকে কেন্দ্র করে বিএনপি ও জামায়াত কর্মীদের মধ্যে ভয়াবহ সংঘর্ষ হয়। এতে গুরুতর আহত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান শ্রীবরদী উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি মাওলানা রেজাউল করিম। এ ঘটনায় শতাধিক নেতাকর্মী আহত হন।
- হাতিয়া (নোয়াখালী-৬): গতকাল শুক্রবার বিকেলে নলচিরা ঘাটে ফেরি উদ্বোধনকে কেন্দ্র করে বিএনপি ও এনসিপি সমর্থকদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও সংঘর্ষে অন্তত ১০ জন আহত হয়েছেন।
ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্রের মৃত্যু ও হুমকি
গত ১২ ডিসেম্বর রাজধানীর বিজয়নগরে দুর্বৃত্তদের গুলিতে আহত ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদি ১৮ ডিসেম্বর সিঙ্গাপুরের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। এই হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে ইনকিলাব মঞ্চ সরকার পতনের আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়েছে। এছাড়া কক্সবাজারে বিএনপি প্রার্থী শাহজাহান চৌধুরীর বাসায় ডাকযোগে কাফনের কাপড় পাঠিয়ে হত্যার হুমকি দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর প্রস্তুতি ও চ্যালেঞ্জ
নির্বাচনী নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবার সশস্ত্র বাহিনীসহ বিভিন্ন বাহিনীর প্রায় ৯ লাখ সদস্য মাঠে থাকবেন। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী জানিয়েছেন, নির্বাচনের চার দিন আগে থেকে নিবিড় টহল শুরু হবে। তবে লুণ্ঠিত অস্ত্রের একটি বড় অংশ (প্রায় ১,৩০০টির বেশি আগ্নেয়াস্ত্র) এখনো উদ্ধার না হওয়া এবং ‘মব সংস্কৃতি’র উত্থান আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সহিংসতার নেপথ্যে প্রধান কারণসমূহ:
- রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তার ও পেশিশক্তির ব্যবহার।
- বড় দলগুলোর মধ্যে বিদ্রোহী প্রার্থীদের প্রভাব।
- কমিটি গঠন ও পোস্টার ছেঁড়াকে কেন্দ্র করে স্থানীয় বিরোধ।
- পতিত শক্তির ইন্ধন ও প্রতিবেশী দেশ থেকে ছড়ানো অপপ্রচার।
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের দিন ভোটারদের নির্ভয়ে কেন্দ্রে আনা এবং গণতান্ত্রিক পরিবেশ বজায় রাখতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও বেশি নিরপেক্ষ ও কঠোর ভূমিকা পালন করতে হবে।
রিপোর্টারের নাম 

























