ঢাকা: আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ‘তারুণ্য ও মর্যাদার ইশতেহার’ নামে ৩৬ দফা অঙ্গীকার ঘোষণা করেছে। গতকাল শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর গুলশানে এক হোটেলে আয়োজিত অনুষ্ঠানে দলটির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম এই ইশতেহার উপস্থাপন করেন। জুলাই মাসের গণঅভ্যুত্থান ও এর চেতনাকে ধারণ করে দলটি গণতন্ত্র, মানবাধিকার, অর্থনীতি ও রাষ্ট্র সংস্কারের এক সমন্বিত রূপরেখা তুলে ধরেছে।
ইশতেহারের মূল বিষয়বস্তু:
এনসিপি’র এই ৩৬ দফার ইশতেহারে মানবতাবিরোধী অপরাধ, বিশেষ করে জুলাই ও শাপলা গণহত্যাসহ বিভিন্ন আলোচিত ঘটনার বিচার নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করা হয়েছে। এর পাশাপাশি একটি স্বাধীন কমিশন এবং ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে রাজনৈতিক ব্যয় শূন্যে নামিয়ে আনা এবং চাঁদাবাজি সম্পূর্ণ বন্ধ করার প্রতিশ্রুতিও ইশতেহারে স্থান পেয়েছে।
দুর্নীতি দমনে রাজনীতিবিদ, সংসদ সদস্য, মন্ত্রী ও সরকারি কর্মকর্তাদের সম্পদের হিসাব প্রকাশ বাধ্যতামূলক করা, প্রশাসন সংস্কার এবং ন্যূনতম মজুরি বাড়িয়ে প্রতি ঘণ্টায় ১০০ টাকা নির্ধারণের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোও এনসিপি’র অঙ্গীকারে অন্তর্ভুক্ত। এছাড়াও, সামাজিক সুরক্ষা জোরদার, শিক্ষার মানোন্নয়ন, স্বাস্থ্য খাতের ব্যাপক সংস্কার, আগামী পাঁচ বছরে এক কোটি সম্মানজনক কর্মসংস্থান সৃষ্টি, প্রবাসী কল্যাণ, নারী ও সংখ্যালঘু ক্ষমতায়ন, পরিবেশ সুরক্ষা এবং কৃষকদের সহায়তার মতো বিষয়গুলোতেও দলটির সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে।
বিশেষ অঙ্গীকার ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা:
দলটি ভোটাধিকারের বয়স ১৬ বছর করার বিষয়েও অঙ্গীকার করেছে। পররাষ্ট্র নীতির ক্ষেত্রে ভারতের সঙ্গে সীমান্ত হত্যা, পানির ন্যায্য হিস্যা, এবং বিভিন্ন চুক্তি সংক্রান্ত ইস্যুগুলোতে দৃঢ় অবস্থান নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছে।
দলীয় নেতৃত্ব ও ভবিষ্যৎ পথচলা:
জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, “জাতীয় মর্যাদা নিয়ে বিশ্বের বুকে দাঁড়ানোই ছিল আমাদের আকাঙ্ক্ষা। আমরা একটি নতুন সংবিধান চেয়েছিলাম, কিন্তু সংস্কারের পর্যায়ে এসে সব লক্ষ্য অর্জন করা যায়নি। জোটবদ্ধ হয়ে আমরা এখন দীর্ঘমেয়াদী লড়াইয়ের মাধ্যমে আমাদের দাবিগুলো বাস্তবায়নের চেষ্টা করব। আমাদের ১১ দলীয় নির্বাচনি ঐক্য মূলত একটি নির্বাচনী জোট, তবে এর মধ্য দিয়েই আমরা সংস্কারের দাবিগুলো বাস্তবায়নের চেষ্টা করব।” তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, নাগরিক সুবিধা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে বিভিন্ন কার্ডের পরিবর্তে শুধু এনআইডি কার্ডকেই ব্যবহার করা হবে, যা জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সব সুবিধা নিশ্চিত করবে।
এনসিপি’র নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া বলেন, “জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর জাতীয় নাগরিক পার্টির প্রতি জনগণের ব্যাপক আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে। কিন্তু স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও আমরা গণতন্ত্র, সাম্য এবং মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হয়েছি। এই ব্যর্থতা স্বীকার করাই রাষ্ট্র সংস্কারের প্রথম ধাপ।” তিনি আরও বলেন, ৩৬ দফা কোনো অলীক প্রতিশ্রুতি নয়, বরং একটি জবাবদিহিতামূলক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও মানবিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার।
৩৬ দফার সারসংক্ষেপ:
ইশতেহারের ৩৬ দফার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: জুলাই ও শাপলা গণহত্যার বিচার, স্বাধীন কমিশন গঠন, রাজনীতিবিদদের সম্পদের হিসাব প্রকাশ, ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি, ভোটাধিকারের বয়স ১৬ বছর, এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সংস্কার, ডিজিটাল স্বাস্থ্য রেকর্ড, নারীর ক্ষমতায়ন, পরিবেশ সুরক্ষা, সীমান্ত হত্যা বন্ধ, এবং প্রতিরক্ষা শক্তিশালীকরণ।
অনুষ্ঠানে এনসিপির ইশতেহার প্রণয়ন কমিটির প্রধান এহতেশাম হক, যুগ্ম আহ্বায়ক নুসরাত তাবাসসুম, ন্যাশনাল হেলথ অ্যালায়েন্সের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক গাউসুল আজম, ইশতিয়াক আকিব প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। এছাড়াও, ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনালের চিফ অব পার্টি ক্যাথেরিন সিছিল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক শেহরীন আমিন ভূঁইয়া, বিএনপি’র উপদেষ্টা মাহদী আমিন, যুবদল সভাপতি আবদুল মোনায়েম মুন্না, জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আবদুল হালিম, কবি ফরহাদ মজহার, দ্য ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনাম এবং বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক ও রাজনৈতিক দলের নেতারাও অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
রিপোর্টারের নাম 

























