ঢাকা ০৭:৪৫ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১০ মার্চ ২০২৬

নির্বাচনী ব্যয়সীমা লঙ্ঘন: হলফনামায় স্বীকারোক্তি সত্ত্বেও বৈধতা, ইসির ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৫:১৮:১৫ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৩০ জানুয়ারী ২০২৬
  • ৩ বার পড়া হয়েছে

নির্বাচনী ব্যয়ের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপের লক্ষ্যে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) সংশোধন করলেও এর বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। চট্টগ্রামের চারটি সংসদীয় আসনে প্রার্থীরা নিজেরাই হলফনামায় নির্ধারিত ব্যয়সীমা অতিক্রম করার কথা স্বীকার করলেও, তাদের মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। এই ঘটনা নির্বাচন কমিশনের (ইসি) নিরপেক্ষতা ও আইনের প্রয়োগের সক্ষমতা নিয়ে গভীর সংশয় তৈরি করেছে।

সংশোধিত আরপিও এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি গেজেট অনুযায়ী, একজন সংসদ সদস্য প্রার্থী তার নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকায় প্রতি ভোটারের জন্য সর্বোচ্চ ১০ টাকা ব্যয় করতে পারবেন। এই নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। আরপিও-২০২৫ এর সংশোধিত বিধান অনুযায়ী, ব্যয়সীমা লঙ্ঘনের প্রমাণ মিললে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা ইসির হাতে রয়েছে।

তবে চট্টগ্রামের চারটি আসনের প্রার্থীদের জমা দেওয়া হলফনামা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, তারা নিজেরাই নির্ধারিত সীমার চেয়ে বেশি ব্যয়ের ঘোষণা দিয়েছেন। এতদসত্ত্বেও সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তা এসব মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করেছেন, যা ইসির নিজস্ব আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

রাঙ্গুনিয়ার চট্টগ্রাম-৭ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা তিন লাখ ১৯ হাজার আটজন। সে অনুযায়ী, এই আসনে একজন প্রার্থীর সর্বোচ্চ নির্বাচনী ব্যয়সীমা ছিল ৩১ লাখ ৯০ হাজার ৮০ টাকা। অথচ, প্রার্থী হুম্মাম কাদের চৌধুরী তার হলফনামায় ৩৮ লাখ টাকা ব্যয়ের ঘোষণা দিয়েছেন, যা নির্ধারিত সীমার চেয়ে ছয় লাখ ১০ হাজার টাকা বেশি।

রাউজানের চট্টগ্রাম-৬ আসনে মোট ভোটার তিন লাখ ৩৯ হাজার ৯৮৮ জন। এখানে গিয়াস কাদের চৌধুরীর সর্বোচ্চ ব্যয়সীমা ছিল ৩৩ লাখ ৯৯ হাজার ৮৮০ টাকা। কিন্তু তিনি হলফনামায় ৩৫ লাখ টাকা ব্যয়ের কথা উল্লেখ করেছেন, যা আইনি সীমার চেয়ে এক লাখ টাকারও বেশি।

আনোয়ারা-কর্ণফুলীর চট্টগ্রাম-১৩ আসনে সরওয়ার জামাল নিজামের ক্ষেত্রে ব্যয়সীমা ছিল ৩৯ লাখ ৫২ হাজার ৪০০ টাকা। তিনি তার হলফনামায় মাত্র ৬০ টাকা বেশি ব্যয়ের কথা স্বীকার করেছেন। অঙ্কের দিক থেকে সামান্য হলেও, আইনের দৃষ্টিতে এটি স্পষ্ট লঙ্ঘন।

সাতকানিয়ার চট্টগ্রাম-১৫ আসনে শাহজাহান চৌধুরীর ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ব্যয়সীমা ছিল ৫০ লাখ ৬০ হাজার ৫৯০ টাকা। তিনি হলফনামায় মোট ৫০ লাখ ৬২ হাজার ৫৯০ টাকা ব্যয় দেখিয়েছেন, যা নির্ধারিত সীমার চেয়ে দুই হাজার টাকা বেশি।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্বাচনী ব্যয়সীমা লঙ্ঘন হলে সংশ্লিষ্ট হলফনামা ত্রুটিপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হওয়ার কথা এবং ইসির অনুমোদন ছাড়া তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। কিন্তু উল্লিখিত চারটি ক্ষেত্রে রিটার্নিং কর্মকর্তারা কোনো প্রকার আপত্তি ছাড়াই মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করেছেন, যা নির্বাচনি আইন ও ইসির নিজস্ব নির্দেশনার পরিপন্থী।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. সফিকুল ইসলাম এই প্রসঙ্গে বলেন, “আরপিও সংশোধনের পর এটি ছিল নির্বাচন কমিশনের জন্য একটি বড় পরীক্ষা। কিন্তু এই ঘটনাগুলো প্রমাণ করে ইসি নিজেদেরই তৈরি করা নিয়ম মানতে ব্যর্থ হয়েছে। এটি শুধু প্রশাসনিক দুর্বলতা নয়, বরং নির্বাচন পরিচালনায় শৃঙ্খলার অভাবেরই প্রতিফলন।”

এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ বলেন, “ভোটারপ্রতি নির্ধারিত সীমার বেশি ব্যয় করা সুস্পষ্টভাবে আরপিও লঙ্ঘন। প্রার্থীরা ভুল হিসাব করে থাকতে পারেন—এই যুক্তি গ্রহণযোগ্য নয়। আইন লঙ্ঘন মানেই লঙ্ঘন।” একই সঙ্গে তিনি স্বীকার করেন, ব্যয়ের হিসাব যাচাই করার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তাদেরই ছিল।

তবে এ বিষয়ে বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দিন এবং জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তা মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞার বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তারা কোনো সাড়া দেননি।

বিশ্লেষকদের মতে, প্রার্থীরা যখন নিজেরাই লিখিতভাবে আইন ভাঙার কথা স্বীকার করেন এবং এরপরও কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হয়, তখন তা ভবিষ্যৎ নির্বাচনের জন্য একটি বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত তৈরি করে। এতে নির্বাচনি প্রতিযোগিতার আর্থিক সমতা, স্বচ্ছতা এবং জনগণের আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

প্রধানমন্ত্রীর হাত ধরে আজ চালু হচ্ছে ‘ফ্যামিলি কার্ড’: হতদরিদ্রদের জন্য বিশেষ সুবিধা

নির্বাচনী ব্যয়সীমা লঙ্ঘন: হলফনামায় স্বীকারোক্তি সত্ত্বেও বৈধতা, ইসির ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ

আপডেট সময় : ০৫:১৮:১৫ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৩০ জানুয়ারী ২০২৬

নির্বাচনী ব্যয়ের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপের লক্ষ্যে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) সংশোধন করলেও এর বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। চট্টগ্রামের চারটি সংসদীয় আসনে প্রার্থীরা নিজেরাই হলফনামায় নির্ধারিত ব্যয়সীমা অতিক্রম করার কথা স্বীকার করলেও, তাদের মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। এই ঘটনা নির্বাচন কমিশনের (ইসি) নিরপেক্ষতা ও আইনের প্রয়োগের সক্ষমতা নিয়ে গভীর সংশয় তৈরি করেছে।

সংশোধিত আরপিও এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি গেজেট অনুযায়ী, একজন সংসদ সদস্য প্রার্থী তার নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকায় প্রতি ভোটারের জন্য সর্বোচ্চ ১০ টাকা ব্যয় করতে পারবেন। এই নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। আরপিও-২০২৫ এর সংশোধিত বিধান অনুযায়ী, ব্যয়সীমা লঙ্ঘনের প্রমাণ মিললে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা ইসির হাতে রয়েছে।

তবে চট্টগ্রামের চারটি আসনের প্রার্থীদের জমা দেওয়া হলফনামা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, তারা নিজেরাই নির্ধারিত সীমার চেয়ে বেশি ব্যয়ের ঘোষণা দিয়েছেন। এতদসত্ত্বেও সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তা এসব মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করেছেন, যা ইসির নিজস্ব আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

রাঙ্গুনিয়ার চট্টগ্রাম-৭ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা তিন লাখ ১৯ হাজার আটজন। সে অনুযায়ী, এই আসনে একজন প্রার্থীর সর্বোচ্চ নির্বাচনী ব্যয়সীমা ছিল ৩১ লাখ ৯০ হাজার ৮০ টাকা। অথচ, প্রার্থী হুম্মাম কাদের চৌধুরী তার হলফনামায় ৩৮ লাখ টাকা ব্যয়ের ঘোষণা দিয়েছেন, যা নির্ধারিত সীমার চেয়ে ছয় লাখ ১০ হাজার টাকা বেশি।

রাউজানের চট্টগ্রাম-৬ আসনে মোট ভোটার তিন লাখ ৩৯ হাজার ৯৮৮ জন। এখানে গিয়াস কাদের চৌধুরীর সর্বোচ্চ ব্যয়সীমা ছিল ৩৩ লাখ ৯৯ হাজার ৮৮০ টাকা। কিন্তু তিনি হলফনামায় ৩৫ লাখ টাকা ব্যয়ের কথা উল্লেখ করেছেন, যা আইনি সীমার চেয়ে এক লাখ টাকারও বেশি।

আনোয়ারা-কর্ণফুলীর চট্টগ্রাম-১৩ আসনে সরওয়ার জামাল নিজামের ক্ষেত্রে ব্যয়সীমা ছিল ৩৯ লাখ ৫২ হাজার ৪০০ টাকা। তিনি তার হলফনামায় মাত্র ৬০ টাকা বেশি ব্যয়ের কথা স্বীকার করেছেন। অঙ্কের দিক থেকে সামান্য হলেও, আইনের দৃষ্টিতে এটি স্পষ্ট লঙ্ঘন।

সাতকানিয়ার চট্টগ্রাম-১৫ আসনে শাহজাহান চৌধুরীর ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ব্যয়সীমা ছিল ৫০ লাখ ৬০ হাজার ৫৯০ টাকা। তিনি হলফনামায় মোট ৫০ লাখ ৬২ হাজার ৫৯০ টাকা ব্যয় দেখিয়েছেন, যা নির্ধারিত সীমার চেয়ে দুই হাজার টাকা বেশি।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্বাচনী ব্যয়সীমা লঙ্ঘন হলে সংশ্লিষ্ট হলফনামা ত্রুটিপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হওয়ার কথা এবং ইসির অনুমোদন ছাড়া তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। কিন্তু উল্লিখিত চারটি ক্ষেত্রে রিটার্নিং কর্মকর্তারা কোনো প্রকার আপত্তি ছাড়াই মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করেছেন, যা নির্বাচনি আইন ও ইসির নিজস্ব নির্দেশনার পরিপন্থী।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. সফিকুল ইসলাম এই প্রসঙ্গে বলেন, “আরপিও সংশোধনের পর এটি ছিল নির্বাচন কমিশনের জন্য একটি বড় পরীক্ষা। কিন্তু এই ঘটনাগুলো প্রমাণ করে ইসি নিজেদেরই তৈরি করা নিয়ম মানতে ব্যর্থ হয়েছে। এটি শুধু প্রশাসনিক দুর্বলতা নয়, বরং নির্বাচন পরিচালনায় শৃঙ্খলার অভাবেরই প্রতিফলন।”

এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ বলেন, “ভোটারপ্রতি নির্ধারিত সীমার বেশি ব্যয় করা সুস্পষ্টভাবে আরপিও লঙ্ঘন। প্রার্থীরা ভুল হিসাব করে থাকতে পারেন—এই যুক্তি গ্রহণযোগ্য নয়। আইন লঙ্ঘন মানেই লঙ্ঘন।” একই সঙ্গে তিনি স্বীকার করেন, ব্যয়ের হিসাব যাচাই করার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তাদেরই ছিল।

তবে এ বিষয়ে বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দিন এবং জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তা মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞার বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তারা কোনো সাড়া দেননি।

বিশ্লেষকদের মতে, প্রার্থীরা যখন নিজেরাই লিখিতভাবে আইন ভাঙার কথা স্বীকার করেন এবং এরপরও কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হয়, তখন তা ভবিষ্যৎ নির্বাচনের জন্য একটি বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত তৈরি করে। এতে নির্বাচনি প্রতিযোগিতার আর্থিক সমতা, স্বচ্ছতা এবং জনগণের আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।