ঢাকা ০১:২৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

দেশে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা খুব দ্রুত বাড়ছে ২০৫০ সাল নাগাদ ৩০ শতাংশও ছাড়িয়ে যাবে।

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৮:১৮:০০ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৫
  • ৪৭ বার পড়া হয়েছে

চিকিৎসা সেবা আর মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত হওয়ায় দেশে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা খুব দ্রুত বাড়ছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) একটা ধারণা দিয়েছে যে, ২০২০ সালেও দেশে ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষ ছিল মোট জনসংখ্যার ১৩ শতাংশ, কিন্তু ২০৫০ সাল নাগাদ এই হার ৩০ শতাংশও ছাড়িয়ে যাবে।

পরিস্থিতি এমন দাঁড়ালে, পরিবারের যেসব নারীরা কোনো বেতন ছাড়াই বয়স্কদের দেখাশোনা করেন (অবৈতনিক সদস্য), তাদের একার পক্ষে এই বাড়তি চাপ সামলানো সম্ভব হবে না। একারণে সংস্থাটি (এডিবি) পরামর্শ দিয়েছে, দেশের স্বাস্থ্য, কল্যাণ আর জেন্ডার নীতিকে একসাথ করে একটা আনুষ্ঠানিক এবং সব দিক সামলানোর মতো (বহুমাত্রিক) যত্ন ব্যবস্থা গড়ে তোলা দরকার।

দেশে যে দ্রুত বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, এই নিয়েই গত মঙ্গলবার (২৮ অক্টোবর) একটা বড় সেমিনার হয়েছে। সেখানে কীভাবে বয়স্কদের জন্য একটা ‘দীর্ঘমেয়াদি যত্ন’ (এলটিসি) ব্যবস্থা চালু করা যায়, তার একটা রূপরেখা নিয়ে আলোচনা হয়। ঢাকার লেকশোর গ্র্যান্ড হোটেলে এই অনুষ্ঠান হয়, যেখানে সরকারের নীতিনির্ধারক, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা এবং সুশীল সমাজের লোকজন এসেছিলেন।

এই অনুষ্ঠানে ‘বয়স্ক জনগোষ্ঠীর জন্য দীর্ঘমেয়াদি যত্নবিষয়ক জাতীয় বিশ্লেষণমূলক গবেষণা (সিডিএস)’ নামে একটা রিপোর্ট প্রকাশ করা হয়, যা বাংলাদেশে এই ধরনের প্রথম গবেষণা। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক আর আয়াত এডুকেশন ফাউন্ডেশন মিলে এই গবেষণাটা করেছে। এই গবেষণায়, নারী-পুরুষের সমতা, কম খরচে সেবা দেওয়া (সাশ্রয়িতা) এবং মানুষকে কেন্দ্র করে ভাবা—এই বিষয়গুলোর ওপর ভিত্তি করে একটা ভালো ও টেকসই যত্ন ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য কিছু বাস্তবসম্মত পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

সেমিনারে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মোহাম্মদ আবু ইউছুফ বলেছেন, ‘এই গবেষণাটা আমাদের যারা নীতি ঠিক করি, তাদের জন্য ঠিক সময়ে একটা পথ দেখিয়েছে। আমাদের কিছু নীতিমালা আছে বটে, কিন্তু শুধু টাকা-পয়সা দিয়ে সাহায্য (আয়ের সহায়তা) করাই যথেষ্ট নয়। এখন দরকার হলো প্রশিক্ষিত লোক, যারা সেবা দেবে, টাকার একটা টেকসই ব্যবস্থা (অর্থায়ন) আর সবাই যেন সমানভাবে সেবা পায়—সেটা নিশ্চিত করে একটা গোছানো যত্ন ব্যবস্থা তৈরি করা।’

তিনি আরও বলেন, ‘সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় আর সমাজসেবা অধিদপ্তর বয়স্কদের জন্য ভাতা দেওয়া এবং ডে-কেয়ার সেন্টার বাড়ানোর মতো কাজগুলো করতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। এখন সময় হয়েছে, এই কাজগুলোকে ঐ দীর্ঘমেয়াদি যত্নের যে আর্থিক কাঠামো (অর্থায়ন) করা হবে, তার সাথে জুড়ে দেওয়ার, যেন দেশের প্রত্যেক প্রবীণ নাগরিক সম্মান আর যত্ন পান।’

এডিবির প্রধান সমাজ উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ (যিনি সামাজিক অন্তর্ভুক্তি নিয়ে কাজ করেন) ফ্রান্সেসকো টর্নিয়েরি জানান, এই গবেষণাটা বাংলাদেশে মানুষকে কেন্দ্র করে একটা দীর্ঘমেয়াদি যত্ন ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য একটা বাস্তবসম্মত পথ ঠিক করে দিয়েছে।

আয়াত এডুকেশন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান তাহসিন আমান বলেছেন, ‘আমাদের উন্নতি শুধু সংখ্যা বা অর্থনীতির হিসাবে হলে চলবে না, উন্নতি হতে হবে মানবিকতা আর সহানুভূতির দিক দিয়েও। বয়স্কদের দীর্ঘমেয়াদি যত্নের পেছনে বিনিয়োগ করাটা শুধু একটা নৈতিক দায়িত্বই নয়, এটা একটা অর্থনৈতিক সুযোগও তৈরি করে।’

গবেষণার প্রধান দিকগুলো তুলে ধরেন এডিবি বাংলাদেশের প্রধান সামাজিক উন্নয়ন কর্মকর্তা (জেন্ডার) নাশিবা সেলিম এবং আয়াত ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও জাতীয় প্রবীণ যত্ন পরামর্শক ইমরান চৌধুরী। তারা জোর দিয়ে বলেছেন যে, একটা ‘জাতীয় দীর্ঘমেয়াদি যত্ন নীতি ও কৌশল’ ঠিক করা, যত্ন নেওয়ার জন্য প্রশিক্ষিত লোক তৈরি করা, স্বাস্থ্য আর সামাজিক সেবাগুলোকে একসাথে মেলানো এবং টাকা-পয়সার জন্য নতুন নতুন উপায় (উদ্ভাবনী অর্থায়ন) বের করা খুবই জরুরি।

এই সেমিনারে সমাজকল্যাণ, স্বাস্থ্য, অর্থ, মহিলা ও শিশুবিষয়ক এবং পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় ছাড়াও বিভিন্ন দূতাবাস, জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা, সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (একাডেমিক) এবং বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অংশ নিয়েছিলেন।

এই অনুষ্ঠানের একটা বড় আকর্ষণ ছিল একটা প্যানেল আলোচনা, যার বিষয় ছিল ‘বাংলাদেশে টেকসই দীর্ঘমেয়াদি যত্ন ব্যবস্থার জন্য নতুন ধরনের অর্থায়ন কৌশল’। এটা পরিচালনা করেন আয়াত এডুকেশন ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নুসরাত আমান। তিনি বলেন, “বয়স্কদের এই দীর্ঘমেয়াদি যত্ন ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জটাই হলো টাকা-পয়সার জোগান (অর্থায়ন)। এখনই সময় নতুন কিছু ভাবার আর বাস্তবসম্মত একটা তহবিল পরিকল্পনা করার।”

প্যানেল আলোচনায় যারা ছিলেন, তারা বলেছেন, এজন্য চাঁদাভিত্তিক (অবদানভিত্তিক) সামাজিক বিমা চালু করা যায়, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বে কাজ করা যায় এবং বর্তমানে যে সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা (যেমন ভাতা) আছে, তার সাথেই এই দীর্ঘমেয়াদি যত্নকে জুড়ে দেওয়া যায়।

বাংলাদেশে জাতিসংঘ নারী সংস্থার প্রতিনিধি গীতাঞ্জলি সিংহ বলেন, এই যত্নের ব্যবস্থাটা এমনভাবে করতে হবে, যেন একদিকে নারীদের ওপর বিনা বেতনে সেবা দেওয়ার বোঝাটা কমে, আবার অন্যদিকে তাদের জন্য নতুন কাজের সুযোগও (কর্মসংস্থান) তৈরি হয়।

কেয়ার বাংলাদেশের উপ-দেশ পরিচালক এমেবেট মেনা বলেন, টাকা-পয়সার এই ব্যবস্থাটা যেন টেকসই হয় সেটা তো দেখতেই হবে, পাশাপাশি যারা প্রান্তিক জনগোষ্ঠী বা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার মানুষ, তারাও যেন এই সেবার আওতায় আসে, সেটা নিশ্চিত করতে হবে।

জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) উপ-প্রতিনিধি মাসাকি ওয়াতাবে বলেন, এই দীর্ঘমেয়াদি যত্ন শুধু বুড়ো বয়সের ব্যাপার নয়, এটা আসলে সারা জীবনের জন্য একটা যত্ন ব্যবস্থা গড়ে তোলার বিষয়। লক্ষ্য হলো, জীবনের প্রত্যেকটা ধাপে যেন মানুষ সহজে, কম খরচে আর সম্মানের সাথে সেবা পায়।

এডিবির সহায়তায় করা এই গবেষণাটি দেশের ‘জাতীয় প্রবীণ নীতি’ আর ‘জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি’—এই দুটোর সাথে মিল রেখে একটা ‘জাতীয় দীর্ঘমেয়াদি যত্ন নীতি ও কৌশল’ গ্রহণ করার জন্য সুপারিশ করেছে। বাংলাদেশের জনসংখ্যা যেভাবে দ্রুত বদলে যাচ্ছে (অর্থাৎ বয়স্ক মানুষ বাড়ছে), এই সময়ে যদি ঠিকমতো বিনিয়োগ করা যায়, সব কাজের মধ্যে সমন্বয় রাখা যায় আর দূরের কথা ভাবা যায় (দূরদৃষ্টি), তাহলে বাংলাদেশ এমন একটা যত্ন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারবে, যা বয়স্কদের সুরক্ষা দেবে, নারীদের ক্ষমতা বাড়াবে আর ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সমাজকে তৈরি করবে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

আফগানিস্তানে আপাতত স্বস্তির নিশ্বাস, কাবুলসহ কিছু এলাকায় শান্তি

দেশে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা খুব দ্রুত বাড়ছে ২০৫০ সাল নাগাদ ৩০ শতাংশও ছাড়িয়ে যাবে।

আপডেট সময় : ০৮:১৮:০০ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৫

চিকিৎসা সেবা আর মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত হওয়ায় দেশে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা খুব দ্রুত বাড়ছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) একটা ধারণা দিয়েছে যে, ২০২০ সালেও দেশে ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষ ছিল মোট জনসংখ্যার ১৩ শতাংশ, কিন্তু ২০৫০ সাল নাগাদ এই হার ৩০ শতাংশও ছাড়িয়ে যাবে।

পরিস্থিতি এমন দাঁড়ালে, পরিবারের যেসব নারীরা কোনো বেতন ছাড়াই বয়স্কদের দেখাশোনা করেন (অবৈতনিক সদস্য), তাদের একার পক্ষে এই বাড়তি চাপ সামলানো সম্ভব হবে না। একারণে সংস্থাটি (এডিবি) পরামর্শ দিয়েছে, দেশের স্বাস্থ্য, কল্যাণ আর জেন্ডার নীতিকে একসাথ করে একটা আনুষ্ঠানিক এবং সব দিক সামলানোর মতো (বহুমাত্রিক) যত্ন ব্যবস্থা গড়ে তোলা দরকার।

দেশে যে দ্রুত বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, এই নিয়েই গত মঙ্গলবার (২৮ অক্টোবর) একটা বড় সেমিনার হয়েছে। সেখানে কীভাবে বয়স্কদের জন্য একটা ‘দীর্ঘমেয়াদি যত্ন’ (এলটিসি) ব্যবস্থা চালু করা যায়, তার একটা রূপরেখা নিয়ে আলোচনা হয়। ঢাকার লেকশোর গ্র্যান্ড হোটেলে এই অনুষ্ঠান হয়, যেখানে সরকারের নীতিনির্ধারক, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা এবং সুশীল সমাজের লোকজন এসেছিলেন।

এই অনুষ্ঠানে ‘বয়স্ক জনগোষ্ঠীর জন্য দীর্ঘমেয়াদি যত্নবিষয়ক জাতীয় বিশ্লেষণমূলক গবেষণা (সিডিএস)’ নামে একটা রিপোর্ট প্রকাশ করা হয়, যা বাংলাদেশে এই ধরনের প্রথম গবেষণা। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক আর আয়াত এডুকেশন ফাউন্ডেশন মিলে এই গবেষণাটা করেছে। এই গবেষণায়, নারী-পুরুষের সমতা, কম খরচে সেবা দেওয়া (সাশ্রয়িতা) এবং মানুষকে কেন্দ্র করে ভাবা—এই বিষয়গুলোর ওপর ভিত্তি করে একটা ভালো ও টেকসই যত্ন ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য কিছু বাস্তবসম্মত পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

সেমিনারে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মোহাম্মদ আবু ইউছুফ বলেছেন, ‘এই গবেষণাটা আমাদের যারা নীতি ঠিক করি, তাদের জন্য ঠিক সময়ে একটা পথ দেখিয়েছে। আমাদের কিছু নীতিমালা আছে বটে, কিন্তু শুধু টাকা-পয়সা দিয়ে সাহায্য (আয়ের সহায়তা) করাই যথেষ্ট নয়। এখন দরকার হলো প্রশিক্ষিত লোক, যারা সেবা দেবে, টাকার একটা টেকসই ব্যবস্থা (অর্থায়ন) আর সবাই যেন সমানভাবে সেবা পায়—সেটা নিশ্চিত করে একটা গোছানো যত্ন ব্যবস্থা তৈরি করা।’

তিনি আরও বলেন, ‘সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় আর সমাজসেবা অধিদপ্তর বয়স্কদের জন্য ভাতা দেওয়া এবং ডে-কেয়ার সেন্টার বাড়ানোর মতো কাজগুলো করতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। এখন সময় হয়েছে, এই কাজগুলোকে ঐ দীর্ঘমেয়াদি যত্নের যে আর্থিক কাঠামো (অর্থায়ন) করা হবে, তার সাথে জুড়ে দেওয়ার, যেন দেশের প্রত্যেক প্রবীণ নাগরিক সম্মান আর যত্ন পান।’

এডিবির প্রধান সমাজ উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ (যিনি সামাজিক অন্তর্ভুক্তি নিয়ে কাজ করেন) ফ্রান্সেসকো টর্নিয়েরি জানান, এই গবেষণাটা বাংলাদেশে মানুষকে কেন্দ্র করে একটা দীর্ঘমেয়াদি যত্ন ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য একটা বাস্তবসম্মত পথ ঠিক করে দিয়েছে।

আয়াত এডুকেশন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান তাহসিন আমান বলেছেন, ‘আমাদের উন্নতি শুধু সংখ্যা বা অর্থনীতির হিসাবে হলে চলবে না, উন্নতি হতে হবে মানবিকতা আর সহানুভূতির দিক দিয়েও। বয়স্কদের দীর্ঘমেয়াদি যত্নের পেছনে বিনিয়োগ করাটা শুধু একটা নৈতিক দায়িত্বই নয়, এটা একটা অর্থনৈতিক সুযোগও তৈরি করে।’

গবেষণার প্রধান দিকগুলো তুলে ধরেন এডিবি বাংলাদেশের প্রধান সামাজিক উন্নয়ন কর্মকর্তা (জেন্ডার) নাশিবা সেলিম এবং আয়াত ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও জাতীয় প্রবীণ যত্ন পরামর্শক ইমরান চৌধুরী। তারা জোর দিয়ে বলেছেন যে, একটা ‘জাতীয় দীর্ঘমেয়াদি যত্ন নীতি ও কৌশল’ ঠিক করা, যত্ন নেওয়ার জন্য প্রশিক্ষিত লোক তৈরি করা, স্বাস্থ্য আর সামাজিক সেবাগুলোকে একসাথে মেলানো এবং টাকা-পয়সার জন্য নতুন নতুন উপায় (উদ্ভাবনী অর্থায়ন) বের করা খুবই জরুরি।

এই সেমিনারে সমাজকল্যাণ, স্বাস্থ্য, অর্থ, মহিলা ও শিশুবিষয়ক এবং পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় ছাড়াও বিভিন্ন দূতাবাস, জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা, সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (একাডেমিক) এবং বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অংশ নিয়েছিলেন।

এই অনুষ্ঠানের একটা বড় আকর্ষণ ছিল একটা প্যানেল আলোচনা, যার বিষয় ছিল ‘বাংলাদেশে টেকসই দীর্ঘমেয়াদি যত্ন ব্যবস্থার জন্য নতুন ধরনের অর্থায়ন কৌশল’। এটা পরিচালনা করেন আয়াত এডুকেশন ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নুসরাত আমান। তিনি বলেন, “বয়স্কদের এই দীর্ঘমেয়াদি যত্ন ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জটাই হলো টাকা-পয়সার জোগান (অর্থায়ন)। এখনই সময় নতুন কিছু ভাবার আর বাস্তবসম্মত একটা তহবিল পরিকল্পনা করার।”

প্যানেল আলোচনায় যারা ছিলেন, তারা বলেছেন, এজন্য চাঁদাভিত্তিক (অবদানভিত্তিক) সামাজিক বিমা চালু করা যায়, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বে কাজ করা যায় এবং বর্তমানে যে সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা (যেমন ভাতা) আছে, তার সাথেই এই দীর্ঘমেয়াদি যত্নকে জুড়ে দেওয়া যায়।

বাংলাদেশে জাতিসংঘ নারী সংস্থার প্রতিনিধি গীতাঞ্জলি সিংহ বলেন, এই যত্নের ব্যবস্থাটা এমনভাবে করতে হবে, যেন একদিকে নারীদের ওপর বিনা বেতনে সেবা দেওয়ার বোঝাটা কমে, আবার অন্যদিকে তাদের জন্য নতুন কাজের সুযোগও (কর্মসংস্থান) তৈরি হয়।

কেয়ার বাংলাদেশের উপ-দেশ পরিচালক এমেবেট মেনা বলেন, টাকা-পয়সার এই ব্যবস্থাটা যেন টেকসই হয় সেটা তো দেখতেই হবে, পাশাপাশি যারা প্রান্তিক জনগোষ্ঠী বা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার মানুষ, তারাও যেন এই সেবার আওতায় আসে, সেটা নিশ্চিত করতে হবে।

জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) উপ-প্রতিনিধি মাসাকি ওয়াতাবে বলেন, এই দীর্ঘমেয়াদি যত্ন শুধু বুড়ো বয়সের ব্যাপার নয়, এটা আসলে সারা জীবনের জন্য একটা যত্ন ব্যবস্থা গড়ে তোলার বিষয়। লক্ষ্য হলো, জীবনের প্রত্যেকটা ধাপে যেন মানুষ সহজে, কম খরচে আর সম্মানের সাথে সেবা পায়।

এডিবির সহায়তায় করা এই গবেষণাটি দেশের ‘জাতীয় প্রবীণ নীতি’ আর ‘জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি’—এই দুটোর সাথে মিল রেখে একটা ‘জাতীয় দীর্ঘমেয়াদি যত্ন নীতি ও কৌশল’ গ্রহণ করার জন্য সুপারিশ করেছে। বাংলাদেশের জনসংখ্যা যেভাবে দ্রুত বদলে যাচ্ছে (অর্থাৎ বয়স্ক মানুষ বাড়ছে), এই সময়ে যদি ঠিকমতো বিনিয়োগ করা যায়, সব কাজের মধ্যে সমন্বয় রাখা যায় আর দূরের কথা ভাবা যায় (দূরদৃষ্টি), তাহলে বাংলাদেশ এমন একটা যত্ন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারবে, যা বয়স্কদের সুরক্ষা দেবে, নারীদের ক্ষমতা বাড়াবে আর ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সমাজকে তৈরি করবে।