ঢাকা ০৯:৫৯ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

বাংলাদেশের সংসদীয় নির্বাচনে বিদেশি শক্তির স্বার্থ

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ১২:১৮:৪১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ জানুয়ারী ২০২৬
  • ৪ বার পড়া হয়েছে

১২ ফেব্রুয়ারির বাংলাদেশ নির্বাচনের আগে ভারত আওয়ামী লীগের মাধ্যমে মুহাম্মদ ইউনুস সরকারকে লক্ষ্যবস্তু করছে এবং জামায়াতে ইসলামীকে বিচ্ছিন্ন করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) সঙ্গে বন্ধুত্ব করছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র এই প্রত্যাশায় জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলছে যে দলটি একটি প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হবে। কিন্তু ভারত জামায়াতের ঘোর বিরোধী, তারা দলটিকে একটি সভ্যতাগত ও নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে।

ফলস্বরূপ, বাংলাদেশ ইস্যুতে ভারত-মার্কিন মুখোমুখি অবস্থান তৈরি হওয়া এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।

বাংলাদেশে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র—উভয় দেশেরই বিশাল স্বার্থ রয়েছে। ১২ ফেব্রুয়ারির সংসদীয় নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে উভয় দেশই উদ্বিগ্ন। কিন্তু তাদের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ ভিন্ন হওয়ায় তারা দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়তে পারে, যা বর্তমানে তলানিতে থাকা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও তিক্ত করে তুলতে পারে।

এই খেলায় দুই বিদেশি শক্তির মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী ভারত তার স্বার্থ হাসিলে বহুমুখী কৌশল অবলম্বন করেছে।

প্রথম কৌশলটি হলো—উৎখাত হওয়া ভারতপন্থী সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ব্যবহার করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ভারতবিরোধী প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনুসকে সরাসরি আক্রমণ করা। দ্বিতীয়টি হলো—নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগকে পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টায় শেখ হাসিনাকে উৎসাহিত করা। আর তৃতীয়টি হলো—তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন মধ্যপন্থী বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) সঙ্গে সেতুবন্ধন তৈরি করা, যাতে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি নিজেরা বাংলাদেশের রাজনৈতিক মঞ্চ ভাগ করে নিতে পারে এবং মুহাম্মদ ইউনুস, জামায়াতে ইসলামী ও জেন-জি নেতৃত্বাধীন জাতীয় নাগরিক কমিটির সমন্বয়ে গঠিত ভারতবিরোধী জোটকে কোণঠাসা করা যায়।

নয়াদিল্লিতে হাসিনার সংবাদ সম্মেলন ২৩ জানুয়ারি শেখ হাসিনা নয়াদিল্লিতে দক্ষিণ এশীয় একটি সাংবাদিক সংগঠন আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ভাষণ দেন। তিনি এই সুযোগে ইউনুস সরকার এবং ব্যক্তিগতভাবে ইউনুসের তীব্র সমালোচনা করেন।

“খুনি ফ্যাসিস্ট ইউনুস আমাদের প্রিয় মাতৃভূমিকে বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে,” উল্লেখ করে তিনি তার বিরুদ্ধে একটি “অবৈধ ও সহিংস” প্রশাসন চালানোর অভিযোগ আনেন। তিনি ইউনুসকে একজন “দখলদার”, “অর্থ পাচারকারী” এবং “ক্ষমতালোভী বিশ্বাসঘাতক” বলে আখ্যায়িত করেন।

হাসিনা বলেন, “বাংলাদেশ আজ এক অতল গহ্বরের কিনারে দাঁড়িয়ে আছে। দেশটিকে একটি বিশাল কারাগারে, ফাঁসির মঞ্চে এবং মৃত্যুর উপত্যকায় পরিণত করা হয়েছে, যেখানে মানবাধিকার পদদলিত, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা বিলুপ্ত এবং নারী ও সংখ্যালঘুদের ওপর সহিংসতা ব্যাপক আকার ধারণ করেছে।”

আওয়ামী লীগ প্রধান বলেন, ৫ আগস্ট, ২০২৪-এ তাঁর ক্ষমতাচ্যুতি ছিল একটি “সুক্ষ্মভাবে পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের” ফল, যা জাতিকে এক আতঙ্কের যুগে নিমজ্জিত করেছে। তিনি রাষ্ট্রীয় কাঠামোর পরিকল্পিত ধ্বংসের জন্য চরমপন্থী গোষ্ঠী এবং “বিদেশি স্বার্থকে” দায়ী করেন।

ঢাকার প্রতিক্রিয়া ঢাকার অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বলেছে, একটি সার্বভৌম দেশে ‘অস্থিরতা উসকে দেওয়ার’ জন্য হাসিনাকে নয়াদিল্লিতে প্ল্যাটফর্ম দেওয়ায় তারা ‘বিস্মিত ও স্তম্ভিত’। সরকারের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, হাসিনার “উসকানি” বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণ এবং নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলেছে।

“তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক দণ্ডিত একজন পলাতক। ভারতকে এই সংবাদ সম্মেলনের অনুমতি দেওয়া মানে দ্বিপাক্ষিক নিয়মাবলীকে অবজ্ঞা করা, সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করা এবং ভবিষ্যতে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের জন্য একটি বিপজ্জনক নজির স্থাপন করা।”

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, হাসিনা “প্রকাশ্যে বাংলাদেশ সরকারকে অপসারণের ডাক দিয়েছেন এবং আসন্ন সাধারণ নির্বাচনকে নস্যাৎ করার জন্য সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালাতে তাঁর দলের অনুগত ও সাধারণ জনগণকে স্পষ্ট উসকানি দিয়েছেন।”

“বাংলাদেশ গভীরভাবে ব্যথিত যে, দ্বিপাক্ষিক প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশের হাতে তুলে দেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকা সত্ত্বেও এবং বাংলাদেশ সরকারের বারবার অনুরোধ সত্ত্বেও ভারত এখনও কোনো পদক্ষেপ নেয়নি, উল্টো তাঁকে নিজেদের মাটি থেকে এমন উসকানিমূলক বক্তব্য দেওয়ার অনুমতি দিয়েছে। এটি নিশ্চিতভাবেই বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তর এবং শান্তি ও নিরাপত্তাকে বিপন্ন করে,” বিবৃতিতে যোগ করা হয়।

বিএনপির দিকে হাত বাড়ানো পরোক্ষভাবে হাসিনাকে দিয়ে ইউনুসকে আক্রমণ করার পাশাপাশি ভারত এখন আওয়ামী লীগের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ার চেষ্টা করছে।

বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করে এক্সে (X) দেওয়া এক পোস্টে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেন— “ঢাকায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার ইন্তেকালের খবরে গভীরভাবে শোকাহত। তাঁর পরিবার এবং বাংলাদেশের সকল জনগণের প্রতি আমাদের আন্তরিক সমবেদনা। মহান আল্লাহ যেন এই অপূরণীয় ক্ষতি সইবার শক্তি তাঁর পরিবারকে দান করেন। ২০১৫ সালে ঢাকায় তাঁর সঙ্গে আমার উষ্ণ সাক্ষাতের কথা মনে পড়ছে। আমরা আশা করি তাঁর স্বপ্ন ও আদর্শ আমাদের অংশীদারিত্বকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। তাঁর বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করি।”

মোদি ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করার ক্ষেত্রে খালেদা জিয়ার ভূমিকার স্বীকৃতি দিয়ে বলেন যে, তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অবদান সর্বদা স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী দ্রুত ঢাকা সফর করেন এবং তারেক রহমানের হাতে মোদির একটি চিঠি পৌঁছে দেন।

ভারতের লক্ষ্য হলো বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকে মূল ধারায় ফিরিয়ে আনা এবং জামায়াতে ইসলামী ও হেফাজতে ইসলামের প্রতিনিধিত্বে বাড়তে থাকা ইসলামি জোয়ারের বিরুদ্ধে একটি দেওয়াল হিসেবে কাজ করা।

হাসিনার আওয়ামী লীগ দেশ থেকে বিতাড়িত হওয়ার পর ইউনুস সরকার জামায়াতের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়। তারপর থেকে জামায়াত সফলভাবে কিছু নতুন প্রচারণা চালাচ্ছে—যেমন দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান এবং আকর্ষণীয় সমাজকল্যাণমূলক প্রকল্প। জামায়াত প্রধান শফিকুর রহমান তাঁদের মেডিকেল ক্যাম্প উদ্যোগ, বন্যা ত্রাণ এবং ২০২৪ সালের জুলাই মাসে হাসিনার বিরুদ্ধে অভ্যুত্থানে নিহতদের পরিবারকে সহায়তার উদাহরণ টেনে তাঁদের নতুন ও আধুনিক মানসিকতার প্রমাণ দিচ্ছেন।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউট (IRI)-এর ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের এক জনমত জরিপে জামায়াতকে “সবচেয়ে পছন্দনীয়” দল হিসেবে দেখানো হয়েছে এবং ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে শীর্ষ স্থানের জন্য বিএনপির সঙ্গে তাদের হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।

জামায়াত ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল এবং হাসিনার শাসনামলে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে দলটির অনেক নেতার ফাঁসি বা কারাদণ্ড হয়েছিল, যা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর সমালোচনার মুখে পড়েছিল। ২০১৩ সালে একটি আদালত রায় দেয় যে জামায়াতের গঠনতন্ত্র বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক, ফলে তাদের নির্বাচনে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের জামায়াত তোষণ যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘকাল ধরেই ২০২৪ সালের জুলাই মাসে হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে মদত দেওয়ার সন্দেহের তালিকায় রয়েছে। কারণ হাসিনা ভারত ও চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের খাতিরে যুক্তরাষ্ট্রের নির্দিষ্ট কিছু ভূ-রাজনৈতিক দাবি মানতে অস্বীকার করেছিলেন।

২২ জানুয়ারি, “দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট” বাংলাদেশে চলমান মার্কিন কৌশলের একটি দিক ফাঁস করেছে। এতে বলা হয়েছে যে, মার্কিন কূটনীতিকরা জামায়াতের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ আরও বাড়াতে চাইছেন।

১ ডিসেম্বর, ২০২৫-এ বাংলাদেশি নারী সাংবাদিকদের সঙ্গে এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকে ঢাকায় নিযুক্ত এক মার্কিন কূটনীতিক বলেন যে, বাংলাদেশ “ইসলামিক ধারায় বদলে গেছে” এবং ভবিষ্যদ্বাণী করেন যে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী “আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে ভালো ফলাফল করবে।”

“আমরা তাদের বন্ধু হতে চাই,” উল্লেখ করে সেই কূটনীতিক প্রশ্ন করেন যে কক্ষে উপস্থিত সাংবাদিকরা দলটির প্রভাবশালী ছাত্র সংগঠনের সদস্যদের তাঁদের অনুষ্ঠানে আনতে রাজি হবেন কি না। তিনি জিজ্ঞেস করেন, “আপনারা কি তাদের সঙ্গে কথা বলতে পারেন?”

ওই মার্কিন কর্মকর্তা ইঙ্গিত দেন যে জামায়াতে ইসলামীর পাশাপাশি মার্কিন দূতাবাস হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মতো অন্যান্য রক্ষণশীল ইসলামি রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গেও যোগাযোগ করতে পারে।

নিরাপদত্তার খাতিরে ‘দ্য পোস্ট’ যাঁর নাম প্রকাশ করেনি, সেই কূটনীতিক জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশে ইসলামি আইন চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করবে কি না—এমন উদ্বেগ উড়িয়ে দিয়ে বলেন যে, জামায়াত শরিয়া আইন আরোপ করলে ওয়াশিংটনের হাতে চাপ দেওয়ার মতো যথেষ্ট অস্ত্র রয়েছে।

“আমি মোটেও বিশ্বাস করি না যে জামায়াত শরিয়া চাপিয়ে দিতে পারবে,” উল্লেখ করে তিনি বলেন যে দলের নেতারা যদি এমন কোনো পদক্ষেপ নেন, তবে পরের দিনই যুক্তরাষ্ট্র তাদের ওপর “১০০ শতাংশ ট্যারিফ বা শুল্ক আরোপ করবে।”

কূটনীতিক ব্যাখ্যা করে বলেন, “আমরা তাদের বন্ধু হতে চাই কারণ আমরা চাই যেন ফোন তুলে বলতে পারি: ‘আপনি এইমাত্র যা বললেন, তার ফল এমন হতে যাচ্ছে’।”

তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, জামায়াতে ইসলামী যদি ক্ষমতায় এসে ওয়াশিংটনের অপছন্দনীয় কোনো নীতি বাস্তবায়ন করে, তবে যুক্তরাষ্ট্র দেশটির বিশাল তৈরি পোশাক শিল্পের ওপর পাল্টা ব্যবস্থা নেবে।

“বাংলাদেশের পুরো অর্থনীতি, যা যুক্তরাষ্ট্রের কাছে রপ্তানির ২০ শতাংশ, তা সামাজিক ও মানসিকভাবে উদার কিছু পোশাক ব্র্যান্ড ও চেইন শপের ওপর নির্ভরশীল। যদি বাংলাদেশ নারীদের বলে তারা কেবল পাঁচ ঘণ্টা কাজ করতে পারবে, বা তাদের বের করে দেয়… এবং শরিয়া আইন জারি করে, তবে আর কোনো অর্ডার থাকবে না। আর যদি অর্ডার না থাকে, তবে বাংলাদেশের কোনো অর্থনীতি থাকবে না।”

“দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট”-কে দেওয়া এক বিবৃতিতে ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাসের মুখপাত্র মনিকা শাই বলেন— “যুক্তরাষ্ট্র কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের পক্ষ নেয় না এবং বাংলাদেশের জনগণের দ্বারা নির্বাচিত যে কোনো সরকারের সঙ্গেই কাজ করার পরিকল্পনা রাখে।”

দিল্লির উদ্বেগ বিশ্লেষকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের এমন আশ্বাসে নয়াদিল্লির উদ্বেগ কমার সম্ভাবনা কম। ভারত ২০১৯ সালে কাশ্মীরের জামায়াতে ইসলামীকে একটি “বেআইনি গোষ্ঠী” হিসেবে চিহ্নিত করেছিল এবং ২০২৪ সালে সেই তকমা নবায়ন করেছে।

আটলান্টিক কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সিনিয়র ফেলো মাইকেল কুগেলম্যান বলেন, জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে মার্কিন ঘনিষ্ঠতা “সম্ভাব্যভাবে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের মধ্যে নতুন করে ফাটল তৈরি করতে পারে।”

কুগেলম্যান বলেন, “বাংলাদেশে ভারতের সবচেয়ে বড় ভয়ের নাম বহু বছর ধরেই জামায়াত।” তিনি আরও বলেন, ভারত এই দলটিকে তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানের মিত্র হিসেবে দেখে।

কুগেলম্যান মনে করেন, যদি ভারত-মার্কিন সম্পর্ক “ভালো অবস্থায়” থাকত, তবে মার্কিনিরা নির্বাচনের আগে জামায়াতে ইসলামীকে নিয়ে ভারতের উদ্বেগের প্রতি হয়তো বেশি গুরুত্ব দিত। কিন্তু “বর্তমানে এই অংশীদারিত্ব একদম হযবরল অবস্থায় থাকায়… আমি মনে করি না যে মার্কিন কর্মকর্তারা ভারতের উদ্বেগের প্রতি অতটা মনোযোগী বা সংবেদনশীল হওয়ার প্রয়োজন বোধ করবেন।”

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র একে অপরের থেকে দূরে সরে গেছে। ২০২৫ সালের মে মাসে ভারত-পাকিস্তান চার দিনের যুদ্ধ শেষ করার বিষয়ে ট্রাম্পের দাবিকে ভারত সমর্থন করেনি। তাঁর নোবেল শান্তি পুরস্কারের দাবিকেও ভারত সমর্থন দেয়নি। ট্রাম্পের শুল্ক সংক্রান্ত দাবি এবং ভারতের কৃষি খাতে মার্কিন পণ্যের প্রবেশের দাবিতেও ভারত রাজি হয়নি। ইউক্রেন, গাজা এবং ট্রাম্পের ‘গাজা শান্তি বোর্ড’ ইস্যুতেও ভারত তাঁর সঙ্গে একমত হতে পারেনি। বাংলাদেশের ওপর আধিপত্য বিস্তারের এই প্রতিযোগিতা এখন এই সম্পর্কের টানাপোড়েনকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

আফগান তালেবানের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের ‘আত্মরক্ষার অধিকার’ সমর্থন করল যুক্তরাষ্ট্র

বাংলাদেশের সংসদীয় নির্বাচনে বিদেশি শক্তির স্বার্থ

আপডেট সময় : ১২:১৮:৪১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ জানুয়ারী ২০২৬

১২ ফেব্রুয়ারির বাংলাদেশ নির্বাচনের আগে ভারত আওয়ামী লীগের মাধ্যমে মুহাম্মদ ইউনুস সরকারকে লক্ষ্যবস্তু করছে এবং জামায়াতে ইসলামীকে বিচ্ছিন্ন করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) সঙ্গে বন্ধুত্ব করছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র এই প্রত্যাশায় জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলছে যে দলটি একটি প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হবে। কিন্তু ভারত জামায়াতের ঘোর বিরোধী, তারা দলটিকে একটি সভ্যতাগত ও নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে।

ফলস্বরূপ, বাংলাদেশ ইস্যুতে ভারত-মার্কিন মুখোমুখি অবস্থান তৈরি হওয়া এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।

বাংলাদেশে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র—উভয় দেশেরই বিশাল স্বার্থ রয়েছে। ১২ ফেব্রুয়ারির সংসদীয় নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে উভয় দেশই উদ্বিগ্ন। কিন্তু তাদের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ ভিন্ন হওয়ায় তারা দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়তে পারে, যা বর্তমানে তলানিতে থাকা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও তিক্ত করে তুলতে পারে।

এই খেলায় দুই বিদেশি শক্তির মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী ভারত তার স্বার্থ হাসিলে বহুমুখী কৌশল অবলম্বন করেছে।

প্রথম কৌশলটি হলো—উৎখাত হওয়া ভারতপন্থী সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ব্যবহার করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ভারতবিরোধী প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনুসকে সরাসরি আক্রমণ করা। দ্বিতীয়টি হলো—নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগকে পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টায় শেখ হাসিনাকে উৎসাহিত করা। আর তৃতীয়টি হলো—তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন মধ্যপন্থী বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) সঙ্গে সেতুবন্ধন তৈরি করা, যাতে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি নিজেরা বাংলাদেশের রাজনৈতিক মঞ্চ ভাগ করে নিতে পারে এবং মুহাম্মদ ইউনুস, জামায়াতে ইসলামী ও জেন-জি নেতৃত্বাধীন জাতীয় নাগরিক কমিটির সমন্বয়ে গঠিত ভারতবিরোধী জোটকে কোণঠাসা করা যায়।

নয়াদিল্লিতে হাসিনার সংবাদ সম্মেলন ২৩ জানুয়ারি শেখ হাসিনা নয়াদিল্লিতে দক্ষিণ এশীয় একটি সাংবাদিক সংগঠন আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ভাষণ দেন। তিনি এই সুযোগে ইউনুস সরকার এবং ব্যক্তিগতভাবে ইউনুসের তীব্র সমালোচনা করেন।

“খুনি ফ্যাসিস্ট ইউনুস আমাদের প্রিয় মাতৃভূমিকে বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে,” উল্লেখ করে তিনি তার বিরুদ্ধে একটি “অবৈধ ও সহিংস” প্রশাসন চালানোর অভিযোগ আনেন। তিনি ইউনুসকে একজন “দখলদার”, “অর্থ পাচারকারী” এবং “ক্ষমতালোভী বিশ্বাসঘাতক” বলে আখ্যায়িত করেন।

হাসিনা বলেন, “বাংলাদেশ আজ এক অতল গহ্বরের কিনারে দাঁড়িয়ে আছে। দেশটিকে একটি বিশাল কারাগারে, ফাঁসির মঞ্চে এবং মৃত্যুর উপত্যকায় পরিণত করা হয়েছে, যেখানে মানবাধিকার পদদলিত, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা বিলুপ্ত এবং নারী ও সংখ্যালঘুদের ওপর সহিংসতা ব্যাপক আকার ধারণ করেছে।”

আওয়ামী লীগ প্রধান বলেন, ৫ আগস্ট, ২০২৪-এ তাঁর ক্ষমতাচ্যুতি ছিল একটি “সুক্ষ্মভাবে পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের” ফল, যা জাতিকে এক আতঙ্কের যুগে নিমজ্জিত করেছে। তিনি রাষ্ট্রীয় কাঠামোর পরিকল্পিত ধ্বংসের জন্য চরমপন্থী গোষ্ঠী এবং “বিদেশি স্বার্থকে” দায়ী করেন।

ঢাকার প্রতিক্রিয়া ঢাকার অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বলেছে, একটি সার্বভৌম দেশে ‘অস্থিরতা উসকে দেওয়ার’ জন্য হাসিনাকে নয়াদিল্লিতে প্ল্যাটফর্ম দেওয়ায় তারা ‘বিস্মিত ও স্তম্ভিত’। সরকারের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, হাসিনার “উসকানি” বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণ এবং নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলেছে।

“তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক দণ্ডিত একজন পলাতক। ভারতকে এই সংবাদ সম্মেলনের অনুমতি দেওয়া মানে দ্বিপাক্ষিক নিয়মাবলীকে অবজ্ঞা করা, সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করা এবং ভবিষ্যতে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের জন্য একটি বিপজ্জনক নজির স্থাপন করা।”

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, হাসিনা “প্রকাশ্যে বাংলাদেশ সরকারকে অপসারণের ডাক দিয়েছেন এবং আসন্ন সাধারণ নির্বাচনকে নস্যাৎ করার জন্য সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালাতে তাঁর দলের অনুগত ও সাধারণ জনগণকে স্পষ্ট উসকানি দিয়েছেন।”

“বাংলাদেশ গভীরভাবে ব্যথিত যে, দ্বিপাক্ষিক প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশের হাতে তুলে দেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকা সত্ত্বেও এবং বাংলাদেশ সরকারের বারবার অনুরোধ সত্ত্বেও ভারত এখনও কোনো পদক্ষেপ নেয়নি, উল্টো তাঁকে নিজেদের মাটি থেকে এমন উসকানিমূলক বক্তব্য দেওয়ার অনুমতি দিয়েছে। এটি নিশ্চিতভাবেই বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তর এবং শান্তি ও নিরাপত্তাকে বিপন্ন করে,” বিবৃতিতে যোগ করা হয়।

বিএনপির দিকে হাত বাড়ানো পরোক্ষভাবে হাসিনাকে দিয়ে ইউনুসকে আক্রমণ করার পাশাপাশি ভারত এখন আওয়ামী লীগের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ার চেষ্টা করছে।

বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করে এক্সে (X) দেওয়া এক পোস্টে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেন— “ঢাকায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার ইন্তেকালের খবরে গভীরভাবে শোকাহত। তাঁর পরিবার এবং বাংলাদেশের সকল জনগণের প্রতি আমাদের আন্তরিক সমবেদনা। মহান আল্লাহ যেন এই অপূরণীয় ক্ষতি সইবার শক্তি তাঁর পরিবারকে দান করেন। ২০১৫ সালে ঢাকায় তাঁর সঙ্গে আমার উষ্ণ সাক্ষাতের কথা মনে পড়ছে। আমরা আশা করি তাঁর স্বপ্ন ও আদর্শ আমাদের অংশীদারিত্বকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। তাঁর বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করি।”

মোদি ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করার ক্ষেত্রে খালেদা জিয়ার ভূমিকার স্বীকৃতি দিয়ে বলেন যে, তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অবদান সর্বদা স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী দ্রুত ঢাকা সফর করেন এবং তারেক রহমানের হাতে মোদির একটি চিঠি পৌঁছে দেন।

ভারতের লক্ষ্য হলো বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকে মূল ধারায় ফিরিয়ে আনা এবং জামায়াতে ইসলামী ও হেফাজতে ইসলামের প্রতিনিধিত্বে বাড়তে থাকা ইসলামি জোয়ারের বিরুদ্ধে একটি দেওয়াল হিসেবে কাজ করা।

হাসিনার আওয়ামী লীগ দেশ থেকে বিতাড়িত হওয়ার পর ইউনুস সরকার জামায়াতের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়। তারপর থেকে জামায়াত সফলভাবে কিছু নতুন প্রচারণা চালাচ্ছে—যেমন দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান এবং আকর্ষণীয় সমাজকল্যাণমূলক প্রকল্প। জামায়াত প্রধান শফিকুর রহমান তাঁদের মেডিকেল ক্যাম্প উদ্যোগ, বন্যা ত্রাণ এবং ২০২৪ সালের জুলাই মাসে হাসিনার বিরুদ্ধে অভ্যুত্থানে নিহতদের পরিবারকে সহায়তার উদাহরণ টেনে তাঁদের নতুন ও আধুনিক মানসিকতার প্রমাণ দিচ্ছেন।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউট (IRI)-এর ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের এক জনমত জরিপে জামায়াতকে “সবচেয়ে পছন্দনীয়” দল হিসেবে দেখানো হয়েছে এবং ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে শীর্ষ স্থানের জন্য বিএনপির সঙ্গে তাদের হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।

জামায়াত ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল এবং হাসিনার শাসনামলে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে দলটির অনেক নেতার ফাঁসি বা কারাদণ্ড হয়েছিল, যা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর সমালোচনার মুখে পড়েছিল। ২০১৩ সালে একটি আদালত রায় দেয় যে জামায়াতের গঠনতন্ত্র বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক, ফলে তাদের নির্বাচনে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের জামায়াত তোষণ যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘকাল ধরেই ২০২৪ সালের জুলাই মাসে হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে মদত দেওয়ার সন্দেহের তালিকায় রয়েছে। কারণ হাসিনা ভারত ও চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের খাতিরে যুক্তরাষ্ট্রের নির্দিষ্ট কিছু ভূ-রাজনৈতিক দাবি মানতে অস্বীকার করেছিলেন।

২২ জানুয়ারি, “দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট” বাংলাদেশে চলমান মার্কিন কৌশলের একটি দিক ফাঁস করেছে। এতে বলা হয়েছে যে, মার্কিন কূটনীতিকরা জামায়াতের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ আরও বাড়াতে চাইছেন।

১ ডিসেম্বর, ২০২৫-এ বাংলাদেশি নারী সাংবাদিকদের সঙ্গে এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকে ঢাকায় নিযুক্ত এক মার্কিন কূটনীতিক বলেন যে, বাংলাদেশ “ইসলামিক ধারায় বদলে গেছে” এবং ভবিষ্যদ্বাণী করেন যে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী “আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে ভালো ফলাফল করবে।”

“আমরা তাদের বন্ধু হতে চাই,” উল্লেখ করে সেই কূটনীতিক প্রশ্ন করেন যে কক্ষে উপস্থিত সাংবাদিকরা দলটির প্রভাবশালী ছাত্র সংগঠনের সদস্যদের তাঁদের অনুষ্ঠানে আনতে রাজি হবেন কি না। তিনি জিজ্ঞেস করেন, “আপনারা কি তাদের সঙ্গে কথা বলতে পারেন?”

ওই মার্কিন কর্মকর্তা ইঙ্গিত দেন যে জামায়াতে ইসলামীর পাশাপাশি মার্কিন দূতাবাস হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মতো অন্যান্য রক্ষণশীল ইসলামি রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গেও যোগাযোগ করতে পারে।

নিরাপদত্তার খাতিরে ‘দ্য পোস্ট’ যাঁর নাম প্রকাশ করেনি, সেই কূটনীতিক জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশে ইসলামি আইন চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করবে কি না—এমন উদ্বেগ উড়িয়ে দিয়ে বলেন যে, জামায়াত শরিয়া আইন আরোপ করলে ওয়াশিংটনের হাতে চাপ দেওয়ার মতো যথেষ্ট অস্ত্র রয়েছে।

“আমি মোটেও বিশ্বাস করি না যে জামায়াত শরিয়া চাপিয়ে দিতে পারবে,” উল্লেখ করে তিনি বলেন যে দলের নেতারা যদি এমন কোনো পদক্ষেপ নেন, তবে পরের দিনই যুক্তরাষ্ট্র তাদের ওপর “১০০ শতাংশ ট্যারিফ বা শুল্ক আরোপ করবে।”

কূটনীতিক ব্যাখ্যা করে বলেন, “আমরা তাদের বন্ধু হতে চাই কারণ আমরা চাই যেন ফোন তুলে বলতে পারি: ‘আপনি এইমাত্র যা বললেন, তার ফল এমন হতে যাচ্ছে’।”

তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, জামায়াতে ইসলামী যদি ক্ষমতায় এসে ওয়াশিংটনের অপছন্দনীয় কোনো নীতি বাস্তবায়ন করে, তবে যুক্তরাষ্ট্র দেশটির বিশাল তৈরি পোশাক শিল্পের ওপর পাল্টা ব্যবস্থা নেবে।

“বাংলাদেশের পুরো অর্থনীতি, যা যুক্তরাষ্ট্রের কাছে রপ্তানির ২০ শতাংশ, তা সামাজিক ও মানসিকভাবে উদার কিছু পোশাক ব্র্যান্ড ও চেইন শপের ওপর নির্ভরশীল। যদি বাংলাদেশ নারীদের বলে তারা কেবল পাঁচ ঘণ্টা কাজ করতে পারবে, বা তাদের বের করে দেয়… এবং শরিয়া আইন জারি করে, তবে আর কোনো অর্ডার থাকবে না। আর যদি অর্ডার না থাকে, তবে বাংলাদেশের কোনো অর্থনীতি থাকবে না।”

“দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট”-কে দেওয়া এক বিবৃতিতে ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাসের মুখপাত্র মনিকা শাই বলেন— “যুক্তরাষ্ট্র কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের পক্ষ নেয় না এবং বাংলাদেশের জনগণের দ্বারা নির্বাচিত যে কোনো সরকারের সঙ্গেই কাজ করার পরিকল্পনা রাখে।”

দিল্লির উদ্বেগ বিশ্লেষকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের এমন আশ্বাসে নয়াদিল্লির উদ্বেগ কমার সম্ভাবনা কম। ভারত ২০১৯ সালে কাশ্মীরের জামায়াতে ইসলামীকে একটি “বেআইনি গোষ্ঠী” হিসেবে চিহ্নিত করেছিল এবং ২০২৪ সালে সেই তকমা নবায়ন করেছে।

আটলান্টিক কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সিনিয়র ফেলো মাইকেল কুগেলম্যান বলেন, জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে মার্কিন ঘনিষ্ঠতা “সম্ভাব্যভাবে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের মধ্যে নতুন করে ফাটল তৈরি করতে পারে।”

কুগেলম্যান বলেন, “বাংলাদেশে ভারতের সবচেয়ে বড় ভয়ের নাম বহু বছর ধরেই জামায়াত।” তিনি আরও বলেন, ভারত এই দলটিকে তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানের মিত্র হিসেবে দেখে।

কুগেলম্যান মনে করেন, যদি ভারত-মার্কিন সম্পর্ক “ভালো অবস্থায়” থাকত, তবে মার্কিনিরা নির্বাচনের আগে জামায়াতে ইসলামীকে নিয়ে ভারতের উদ্বেগের প্রতি হয়তো বেশি গুরুত্ব দিত। কিন্তু “বর্তমানে এই অংশীদারিত্ব একদম হযবরল অবস্থায় থাকায়… আমি মনে করি না যে মার্কিন কর্মকর্তারা ভারতের উদ্বেগের প্রতি অতটা মনোযোগী বা সংবেদনশীল হওয়ার প্রয়োজন বোধ করবেন।”

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র একে অপরের থেকে দূরে সরে গেছে। ২০২৫ সালের মে মাসে ভারত-পাকিস্তান চার দিনের যুদ্ধ শেষ করার বিষয়ে ট্রাম্পের দাবিকে ভারত সমর্থন করেনি। তাঁর নোবেল শান্তি পুরস্কারের দাবিকেও ভারত সমর্থন দেয়নি। ট্রাম্পের শুল্ক সংক্রান্ত দাবি এবং ভারতের কৃষি খাতে মার্কিন পণ্যের প্রবেশের দাবিতেও ভারত রাজি হয়নি। ইউক্রেন, গাজা এবং ট্রাম্পের ‘গাজা শান্তি বোর্ড’ ইস্যুতেও ভারত তাঁর সঙ্গে একমত হতে পারেনি। বাংলাদেশের ওপর আধিপত্য বিস্তারের এই প্রতিযোগিতা এখন এই সম্পর্কের টানাপোড়েনকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।