ঢাকা ১০:০৭ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

আকাশচুম্বী বিলাসিতা ও ফুটপাতের হাহাকার: বৈষম্যের চরম শিখরে রাষ্ট্রীয় নীতি

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ১১:০০:০৮ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ জানুয়ারী ২০২৬
  • ১ বার পড়া হয়েছে

ঢাকার ওসমানী উদ্যানের ফুটপাতে যখন একজন সর্বস্বান্ত বৃদ্ধ এক টুকরো পলিথিন দিয়ে স্ত্রী ও নিজের শরীর ঢাকার আপ্রাণ চেষ্টা করছেন, ঠিক তখনই দেশের নীতিনির্ধারকদের জন্য বেইলি রোড ও মিন্টো রোডে ৯ হাজার ৩০ বর্গফুটের রাজকীয় ফ্ল্যাট তৈরির তোড়জোড় চলছে। নদীভাঙনে নিঃস্ব হওয়া লাখো মানুষের মাথার ওপর যখন ছাদ নেই, তখন ৭৮৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিতব্য এই বহুতল ভবনগুলোর ছাদে থাকবে নীল জলের সুইমিংপুল। দেশের বিপুল সংখ্যক মানুষ যখন দু’বেলা ভাতের চিন্তায় দিশেহারা, তখন মন্ত্রীদের জন্য সাধারণ উচ্চমধ্যবিত্তের তুলনায় ছয় গুণ বড় এবং নিম্নপদস্থ কর্মচারীদের চেয়ে ১৪ গুণ বড় আয়তনের এই আবাসন প্রকল্প রাষ্ট্রের নৈতিকতা ও অগ্রাধিকার নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। বর্তমানে মন্ত্রীদের জন্য ঢাকায় ৭১টি বাংলো ও ফ্ল্যাট থাকা সত্ত্বেও বিপুল অর্থ খরচ করে এই বিলাসিতার আয়োজন কেবল নীতিহীনতারই বহিঃপ্রকাশ।

অর্থনৈতিক সংকটের এই সন্ধিক্ষণে অন্তর্বর্তী সরকারের নবম জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশও জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। সরকারি কর্মচারীদের বেতন গড়ে ১০৫ শতাংশ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির যে প্রস্তাব করা হয়েছে, তা কার্যকর হলে রাষ্ট্রের ওপর বছরে অতিরিক্ত ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকার বিশাল বোঝা চাপবে। অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলেছেন, যেখানে রাজস্ব আদায়ে বড় ঘাটতি রয়েছে এবং ব্যাংকগুলোকে বাঁচাতে হাজার হাজার কোটি টাকা ঢালতে হচ্ছে, সেখানে এই ব্যয় মেটানো অসম্ভব। এই বিপুল অর্থের জোগান দিতে ঋণ নিলে মুদ্রাস্ফীতি চরমে পৌঁছাবে, যার খেসারত দিতে হবে সাধারণ নিম্নবিত্ত মানুষকে। বেতন বাড়িয়ে দুর্নীতি কমানোর পুরনো যুক্তি অতীতেও যেমন কাজ করেনি, এবারও তা কেবল বাজারের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন।

একদিকে রাষ্ট্রের অর্থ বিলাসিতায় ব্যয় হচ্ছে, অন্যদিকে ব্যাংক লুটেরারা আইনের ফাঁকফোকরে নির্বাচন করে ক্ষমতার মসনদে বসার স্বপ্ন দেখছে। ৪৫ জন ঋণখেলাপি প্রার্থী আসন্ন নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যাদের মধ্যে একজনের মাথায়ই ১৭০০ কোটি টাকার ঋণের বোঝা। জনগণের আমানত লুণ্ঠন করে বিদেশে শত শত কোটি টাকার সম্পদ গড়ার মহোৎসব চললেও সাধারণ মানুষের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হচ্ছে না। সরকারি পরিসংখ্যানের বাইরে বাস্তবে কয়েক গুণ বেশি মানুষ আজ গৃহহীন হয়ে কমলাপুর বা সদরঘাটের স্টেশনে রাত কাটাচ্ছে। ক্ষুধার জ্বালা ভুলতে পথশিশুরা যখন নেশার আশ্রয় নিচ্ছে, তখন মন্ত্রীদের ছাদে কোটি টাকার সুইমিংপুল নির্মাণের পরিকল্পনা সুশাসনের জন্য এক বড় উপহাস। রাষ্ট্রের মেরুদণ্ড সাধারণ মানুষ হলেও উন্নয়নের মানদণ্ড এখন কেবল সুবিধাভোগী ও প্রভাবশালীদের তোষণেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

বলিভিয়ায় নোটবাহী সামরিক বিমান বিধ্বস্ত: ১৫ জনের প্রাণহানি, ছড়ানো নোট ঘিরে বিশৃঙ্খলা

আকাশচুম্বী বিলাসিতা ও ফুটপাতের হাহাকার: বৈষম্যের চরম শিখরে রাষ্ট্রীয় নীতি

আপডেট সময় : ১১:০০:০৮ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ জানুয়ারী ২০২৬

ঢাকার ওসমানী উদ্যানের ফুটপাতে যখন একজন সর্বস্বান্ত বৃদ্ধ এক টুকরো পলিথিন দিয়ে স্ত্রী ও নিজের শরীর ঢাকার আপ্রাণ চেষ্টা করছেন, ঠিক তখনই দেশের নীতিনির্ধারকদের জন্য বেইলি রোড ও মিন্টো রোডে ৯ হাজার ৩০ বর্গফুটের রাজকীয় ফ্ল্যাট তৈরির তোড়জোড় চলছে। নদীভাঙনে নিঃস্ব হওয়া লাখো মানুষের মাথার ওপর যখন ছাদ নেই, তখন ৭৮৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিতব্য এই বহুতল ভবনগুলোর ছাদে থাকবে নীল জলের সুইমিংপুল। দেশের বিপুল সংখ্যক মানুষ যখন দু’বেলা ভাতের চিন্তায় দিশেহারা, তখন মন্ত্রীদের জন্য সাধারণ উচ্চমধ্যবিত্তের তুলনায় ছয় গুণ বড় এবং নিম্নপদস্থ কর্মচারীদের চেয়ে ১৪ গুণ বড় আয়তনের এই আবাসন প্রকল্প রাষ্ট্রের নৈতিকতা ও অগ্রাধিকার নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। বর্তমানে মন্ত্রীদের জন্য ঢাকায় ৭১টি বাংলো ও ফ্ল্যাট থাকা সত্ত্বেও বিপুল অর্থ খরচ করে এই বিলাসিতার আয়োজন কেবল নীতিহীনতারই বহিঃপ্রকাশ।

অর্থনৈতিক সংকটের এই সন্ধিক্ষণে অন্তর্বর্তী সরকারের নবম জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশও জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। সরকারি কর্মচারীদের বেতন গড়ে ১০৫ শতাংশ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির যে প্রস্তাব করা হয়েছে, তা কার্যকর হলে রাষ্ট্রের ওপর বছরে অতিরিক্ত ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকার বিশাল বোঝা চাপবে। অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলেছেন, যেখানে রাজস্ব আদায়ে বড় ঘাটতি রয়েছে এবং ব্যাংকগুলোকে বাঁচাতে হাজার হাজার কোটি টাকা ঢালতে হচ্ছে, সেখানে এই ব্যয় মেটানো অসম্ভব। এই বিপুল অর্থের জোগান দিতে ঋণ নিলে মুদ্রাস্ফীতি চরমে পৌঁছাবে, যার খেসারত দিতে হবে সাধারণ নিম্নবিত্ত মানুষকে। বেতন বাড়িয়ে দুর্নীতি কমানোর পুরনো যুক্তি অতীতেও যেমন কাজ করেনি, এবারও তা কেবল বাজারের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন।

একদিকে রাষ্ট্রের অর্থ বিলাসিতায় ব্যয় হচ্ছে, অন্যদিকে ব্যাংক লুটেরারা আইনের ফাঁকফোকরে নির্বাচন করে ক্ষমতার মসনদে বসার স্বপ্ন দেখছে। ৪৫ জন ঋণখেলাপি প্রার্থী আসন্ন নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যাদের মধ্যে একজনের মাথায়ই ১৭০০ কোটি টাকার ঋণের বোঝা। জনগণের আমানত লুণ্ঠন করে বিদেশে শত শত কোটি টাকার সম্পদ গড়ার মহোৎসব চললেও সাধারণ মানুষের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হচ্ছে না। সরকারি পরিসংখ্যানের বাইরে বাস্তবে কয়েক গুণ বেশি মানুষ আজ গৃহহীন হয়ে কমলাপুর বা সদরঘাটের স্টেশনে রাত কাটাচ্ছে। ক্ষুধার জ্বালা ভুলতে পথশিশুরা যখন নেশার আশ্রয় নিচ্ছে, তখন মন্ত্রীদের ছাদে কোটি টাকার সুইমিংপুল নির্মাণের পরিকল্পনা সুশাসনের জন্য এক বড় উপহাস। রাষ্ট্রের মেরুদণ্ড সাধারণ মানুষ হলেও উন্নয়নের মানদণ্ড এখন কেবল সুবিধাভোগী ও প্রভাবশালীদের তোষণেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে।