ঢাকা ১০:০৭ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

আসন্ন নির্বাচন: উত্তাপ-উত্তেজনা ছাপিয়ে সহিষ্ণুতা ও সহমর্মিতার প্রত্যাশা

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৯:১২:১৭ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ জানুয়ারী ২০২৬
  • ২ বার পড়া হয়েছে

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন থেকেই উত্তাপ ও উত্তেজনা বিরাজ করছে। এক রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানের পর ১৭ বছর ধরে জনগণের মতামত প্রকাশের আকাঙ্ক্ষা এবং দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে এই নির্বাচনকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। রাজনৈতিক দলগুলো যখন তাদের জনসমর্থন প্রদর্শনে প্রতিযোগিতায় নেমেছে, তখন অবাধ ও নিরঙ্কুশ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার এই সুযোগকে সহিষ্ণুতা ও সহমর্মিতার মাধ্যমে সফল করার আহ্বান জানিয়েছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তবে নির্বাচনী প্রচারণার শুরুতেই পরস্পরকে আক্রমণ ও অভিযোগের প্রবণতা গণতন্ত্রের সুস্থ পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানে নির্বাচনী আচরণ, রাজনৈতিক দলের প্রচার কৌশল ও জনমনসমীক্ষা নিয়ে অধ্যয়নকে নির্বাচন সমীক্ষা বলা হয়। উন্নত গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে এর প্রাতিষ্ঠানিক চর্চা থাকলেও, আমাদের মতো উন্নয়নশীল গণতন্ত্রে এ নিয়ে তেমন আলোচনা নেই। তবে রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ হিসেবে নির্বাচনী প্রতিযোগিতা ক্রমশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। আসন্ন নির্বাচনটিকে তিনটি কারণে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রথমত, দীর্ঘ ১৭ বছর পর বাংলাদেশের জনগণ সত্যিকার অর্থে তাদের মতামত প্রকাশের একটি সুযোগ পেতে যাচ্ছে। দ্বিতীয়ত, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর জনগণের আকাঙ্ক্ষা পূরণে এই নির্বাচনটি ভবিষ্যৎ নির্ধারক হয়ে উঠেছে। তৃতীয়ত, রাজনৈতিক দলগুলো তাদের জনসমর্থন প্রদর্শনের জন্য একটি উত্তম প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হয়েছে। এসব কিছুর মূল উদ্দেশ্য দেশে অবাধ ও নিরঙ্কুশ গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা।

অনেক সময় পশ্চিমা বিশ্বে এসব দেশের গণতন্ত্রকে ‘একদিনের গণতন্ত্র’ বলে অভিহিত করা হয়, যেখানে জনগণ কেবল ভোটের দিনই তাদের মতামত জানানোর সুযোগ পায়। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, বাংলাদেশের জনগণ বিগত তিনটি নির্বাচনে এই ‘একদিনের গণতন্ত্র’ও পুরোপুরি উপভোগ করতে পারেনি। যদিও গণতন্ত্রের আনুষ্ঠানিকতা দৃশ্যমান ছিল। সাবেক শাসক দলের একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি একসময় নির্বাচনকে ‘খেলা’ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন, কিন্তু সেই খেলার নিয়মকানুনও বারবার উপেক্ষা করা হয়েছে। অথচ ক্ষমতাচ্যুতির পর তারাই এখন ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক’ নির্বাচনের নামে রাজনৈতিক অংশগ্রহণের ধোঁয়া তুলছেন।

সাধারণত যুদ্ধজয়ের পর শত্রুর অনুপস্থিতিতে একটি অনুকূল পরিবেশ বিরাজ করে। কিন্তু ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানকে যদি জনযুদ্ধ বলা হয়, তবে সেই যুদ্ধের যে শক্তিগুলো একে অপরের হাতে হাত মিলিয়ে রক্ত ঢেলেছিল, বিস্ময়করভাবে তারাই আজ একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে দাঁড়িয়েছে। নির্বাচন বা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় প্রতিযোগিতা অস্বাভাবিক নয়, কিন্তু এটিকে শত্রুতা মনে করা অস্বাভাবিক। শত্রুর বিনাশের জন্য পক্ষ-প্রতিপক্ষ নানা ধরনের ছল-বল ও কলাকৌশল প্রদর্শন করতে পারে, যা গণতন্ত্রের ভাষা নয়। গণতন্ত্র যদি ‘জনগণের দ্বারা, জনগণের জন্য, জনগণের সরকার’—এই চিরায়ত ধারণায় বিশ্বাসী হয়, তাহলে জনগণের অবাধ রায় গ্রহণে কোনো অসুবিধা থাকার কথা নয়। অসুবিধা তখনই হয়, যখন রাজনৈতিক নেতৃত্ব প্রতিপক্ষকে বিশ্বাসঘাতক বা জাতির শত্রু হিসেবে দেখতে শুরু করে, তখন গণতান্ত্রিক মনোভাব ব্যাহত হয় এবং বিভেদ আরও গভীর হয়।

গত ২২ জানুয়ারি থেকে দেশে নির্বাচনী প্রচারণা পুরোদমে শুরু হয়েছে। প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের মতো সাধারণ জনগণও আশা করছেন, নির্বাচনটি উৎসবমুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত হবে। গত কয়েকদিন ধরে দেশের রাজনৈতিক নেতারা দেশজুড়ে ভোটের লড়াইয়ে লিপ্ত রয়েছেন। জনসভা, পথসভা ও ঘরোয়া সভায় ব্যস্ত তারা। কথার ফুলঝুরি ও প্রতিশ্রুতির পর প্রতিশ্রুতি দিয়ে জনতুষ্টিতে ব্যস্ত নেতারা। এসবই স্বাভাবিক, কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হলো, প্রতিদ্বন্দ্বী দল, গোষ্ঠী ও ব্যক্তিকে আক্রমণ করে কথা বলার প্রবণতা। পরস্পরকে ঘায়েল করতে অভিযোগ পাল্টা অভিযোগ তোলা হচ্ছে। তাদের কোনো কোনো বক্তব্যকে আক্রমণাত্মকও বলা যায়। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল মনে করছে, সামনের দিনগুলোতে আক্রমণের প্রবণতা আরও প্রবল হতে পারে। আগে যারা একে অপরের মিত্র ছিল, তারাই এখন শত্রুর মতো কথা বলছে। অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের পাশাপাশি বহিঃস্থ দ্বন্দ্বও পরিলক্ষিত হচ্ছে। যে ফ্যাসিবাদকে তারা পরাজিত করেছেন, এখন তারাই একে অপরকে ‘নব্য ফ্যাসিবাদ’ বলে অভিহিত করছেন। মুক্তিযুদ্ধ এখন আর কোনো বিরোধের বিষয় হতে পারে না, ধর্ম কোনো বিভেদের কারণ হতে পারে না, সুশাসন কোনো প্রশ্নসাপেক্ষ বিষয় নয়। অথচ এসব ঘিরেই দুপক্ষের বাগযুদ্ধ দেখছে এ দেশের মানুষ।

বহুদলীয় গণতন্ত্রের মূলমন্ত্র হলো ‘শতফুল ফুটতে দেওয়া’। প্রতিটি দলই পৃথকভাবে তাদের রাজনৈতিক ও আদর্শগত কর্মসূচি ধারণ করে। সুতরাং তাদের রাজনৈতিক কর্মসূচি, আদর্শগত অবস্থান ও নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ভিন্ন ভিন্ন হবে—এটাই স্বাভাবিক। জনগণকে প্রভাবিত করার জন্য তারা নানা প্রতিশ্রুতি দেবেন, কৌশল অবলম্বন করবেন এবং পরিকল্পনার কথা বলবেন—এসবই সুন্দর, কিন্তু অসুন্দর হলো সংঘাত। ইতোমধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংঘাত-সন্ত্রাস ও সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। সবাই উদ্বিগ্ন এসব যেন সীমালঙ্ঘন না করে। সেখানে সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হচ্ছে রাজনৈতিক নেতৃত্বের। স্থানীয়ভাবে রাজনৈতিক সদ্ভাব ও সুসম্পর্ক বজায় রাখার দায়িত্ব স্থানীয় নেতৃত্বের। আর কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের দায়িত্ব হলো তার কথা ও কাজের মাধ্যমে সংঘাত ও শত্রুতা যেন সারা দেশে ছড়িয়ে না পড়ে। নেতৃত্বের এসব সংঘাতের মধ্যেও আমরা নেতা-নেত্রীদের থেকে ভালো কথাও শুনছি, এটা অস্বীকার করা যায় না। তারা নেতাকর্মীদের সুন্দর শোভন আচরণের পরামর্শ দিচ্ছেন। কিন্তু মানুষের স্বভাব হচ্ছে খারাপটাকে সহজে গ্রহণ করা। তাই নেতাদের ভালো কথায় কাজ না হলেও, মন্দ কথার ইঙ্গিতে তোলপাড় হয়ে যায়।

নির্বাচনব্যবস্থা গণতন্ত্রের একটি বড় নির্ধারক। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা গণতন্ত্রের অনেক দোষ ও সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও এর অনুকূলে মতামত দেন এই জন্য যে, জনগণের মতামতের ভিত্তিতে এটি পরিচালিত হয়। গণতন্ত্র শুধু একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থাই নয়, বরং গণতন্ত্র হচ্ছে একটি জীবন পদ্ধতি। গণতন্ত্র তথা নির্বাচন সফল করতে হলে আমাদের অবশ্যই গণতন্ত্রের ভালো দিকগুলো চর্চা করতে হবে। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও পরিচর্যার বিষয়। তাৎক্ষণিকভাবে নির্বাচন অবাধ, নিরপেক্ষ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য করার জন্য গণতন্ত্রের যে বিষয়াবলি ধারণ করা আমাদের কর্তব্য, তা হচ্ছে:

১. সহিষ্ণুতা: নির্বাচন মুহূর্তে সহিষ্ণুতা হচ্ছে প্রথম ও প্রধান শর্ত। মানুষ স্বভাবতই প্রশংসা শুনতে চায়, সমালোচনাকে কেউ সহজে সহ্য করতে পারে না। অথচ নির্বাচন সফল ও সার্থক করতে হলে অন্যের মতকে অবশ্যই সহ্য করতে হবে। এই গুণটি ব্যক্তি থেকে গোষ্ঠী তথা দল পর্যন্ত প্রসারিত। দল বা দলীয় নেতা যদি কর্মীদের সহিষ্ণু হওয়ার শিক্ষা না দেন, তাহলে কর্মী সাধারণরা যুক্তির বদলে শক্তির অনুশীলন করেন। যখন কোনো রাজনৈতিক দল যুক্তির বদলে শক্তির প্রয়োগকে প্রাধান্য দেয়, তখন তা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পরিপন্থী এবং ফ্যাসিবাদী প্রবণতার জন্ম দেয়। ফ্যাসিবাদ কোনো বায়বীয় বিষয় নয়, এটি হচ্ছে আচার-আচরণ ও কথাবার্তা চালচলনে অসহিষ্ণু অবস্থা।

২. সহমর্মিতা: সহমর্মিতা হলো অন্যের দুঃখ, কষ্ট বা পরিস্থিতি বোঝার এবং সেই অনুযায়ী সহানুভূতি প্রদর্শনের ক্ষমতা। নির্বাচন বা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সহমর্মিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রার্থী, রাজনৈতিক দল এবং নাগরিক—সবার জন্য এটি প্রযোজ্য। একজন প্রার্থী যদি ভোটারদের সমস্যার প্রতি সহমর্মী না হন, তাদের বাস্তব অভিজ্ঞতা বোঝার চেষ্টা না করেন, তাহলে ভোট প্রক্রিয়ায় জনগণের আস্থা সৃষ্টি সম্ভব নয়। সহমর্মিতা মানুষকে ন্যায়পরায়ণ সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে এবং রাজনৈতিক সহমত ও সমঝোতার পরিবেশ গড়ে তোলে। নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বী বা দলের মধ্যে সহমর্মিতা থাকলে সংবেদনশীল বিষয়গুলো নিয়ে অযথা দ্বন্দ্ব বা সংঘাতও কমে।

৩. ন্যায়পরায়ণতা: নির্বাচন গ্রহণযোগ্য ও অবাধ করতে হলে ন্যায়পরায়ণতা অপরিহার্য। ভোটার, প্রার্থী এবং রাজনৈতিক দল—সবাইকে ন্যায়পরায়ণ হতে হবে। ভোট গণনা, প্রার্থী যাচাই, নির্বাচন কমিশনের কার্যক্রম—সবকিছুতে ন্যায়পরায়ণতা নিশ্চিত করতে হবে। ন্যায়পরায়ণতা মানুষকে আস্থা দেয়, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখে এবং দীর্ঘ মেয়াদে গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে।

৪. নৈতিক দায়িত্ববোধ: নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় নৈতিকতা অপরিহার্য। ভোটার হিসেবে দায়িত্ব পালন, সৎ আচরণ এবং প্রতিশ্রুতিবদ্ধ প্রচারণা এই নৈতিক দায়িত্ববোধের অংশ। যখন নাগরিকরা নৈতিকভাবে সচেতন হয়, তখন প্রার্থী ও দলও নৈতিকভাবে পরিচালিত হয়। এটি দীর্ঘ মেয়াদে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিকে সুসংহত করে।

৫. সক্রিয় নাগরিক অংশগ্রহণ: গণতন্ত্র শুধু ভোট দেওয়ার মাধ্যমে নয়, সক্রিয় নাগরিক অংশগ্রহণের মাধ্যমে শক্তিশালী হয়। জনসচেতনতা বৃদ্ধি, রাজনৈতিক আলোচনা, ভোট প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ—এসব কর্মকাণ্ড ভোটারদের রাজনৈতিক শিক্ষার অংশ এবং নীতি প্রণয়নের প্রভাব বিস্তারের মাধ্যম।

অতএব, আসন্ন নির্বাচন কেন্দ্র করে যে উত্তাপ ও উত্তেজনার আবহ দেশে ছড়িয়ে পড়েছে, তাকে যদি আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারি, তাহলে তা গণতান্ত্রিক অভিযাত্রাকে বিপন্ন করে তুলতে পারে। গণতন্ত্র প্রতিযোগিতার নাম বটে, কিন্তু সেই প্রতিযোগিতা যদি শত্রুতায় রূপ নেয়, যদি রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ঘৃণা ও প্রতিশোধপরায়ণতায় পর্যবসিত হয়, তাহলে তার পরিণতি কখনোই শুভ হয় না। ইতিহাস আমাদের শিখিয়েছে যে সমাজ সংযম হারায়, সে সমাজ শেষ পর্যন্ত নিজের অর্জনকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাও আমাদের সেই শিক্ষাই দেয়।

গণতন্ত্র শুধু ব্যালট বাক্সের ভেতরে সীমাবদ্ধ নয়; এটি মানুষের আচরণে, কথাবার্তায়, রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধে প্রতিফলিত হয়। জনগণের রায়কে মেনে নেওয়ার মানসিকতা, বিরুদ্ধ মতকে সহ্য করার ক্ষমতা, প্রতিদ্বন্দ্বীর মানবিক মর্যাদা স্বীকার করা—এসবই গণতন্ত্রের মৌলিক ভিত্তি। নির্বাচন উৎসবমুখর ও অর্থবহ করতে হলে রাজনৈতিক দল, নেতৃত্ব এবং নাগরিক সমাজ—সবাইকে এই মূল্যবোধ ধারণ করতে হবে। উত্তেজনার বদলে সহিষ্ণুতা, আক্রমণের বদলে যুক্তি, বিদ্বেষের বদলে সহমর্মিতা যদি আমাদের রাজনৈতিক চর্চায় স্থান পায়, তবেই গণতন্ত্র সত্যিকার অর্থে শক্ত ভিত পাবে।

একটি রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানের পর জাতি আজ যে সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, সেখানে দায়িত্ব আরও বেশি। বিজয়ের উচ্ছ্বাস যেন আত্মতুষ্টিতে পরিণত না হয়, প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করার আকাঙ্ক্ষা যেন নতুন করে বিভাজনের রাজনীতি জন্ম না দেয়—সে বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। রাজনৈতিক শক্তিগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক যদি বৈরিতার পথে এগিয়ে যায়, তবে ক্ষতবিক্ষত হবে শুধু দল নয়, পুরো রাষ্ট্রকাঠামোই। সেজন্যই এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সংযম, বিচক্ষণতা এবং দূরদর্শী নেতৃত্ব।

এই নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ যে তাদের মতামত প্রকাশের ঐতিহাসিক সুযোগ পেয়েছে, সেটিকে হালকাভাবে নেওয়ার অবকাশ নেই। জনগণের রায়ই শেষ কথা—এই সত্যকে হৃদয়ে ধারণ করাই হচ্ছে গণতন্ত্রের আসল পরীক্ষা। যে দল জিতবে তাকে বিনয়ী হতে হবে আর যে দল হারবে, তাকে সাংবিধানিক ও শান্তিপূর্ণ পথে বিরোধিতার ভূমিকা পালন করতে হবে। ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়—এই উপলব্ধিই একটি পরিপক্ব গণতান্ত্রিক সমাজের পরিচয় বহন করে।

সবশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে আজকের রাজনৈতিক আচরণ ও নাগরিক মনোভাবের ওপর। উত্তাপ-উত্তেজনার রাজনীতি থেকে সরে এসে যদি আমরা সহিষ্ণুতা-সহমর্মিতার রাজনীতির পথে হাঁটতে পারি, তবে এই নির্বাচন শুধু একটি সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনের ঘটনাই হবে না—এটি হয়ে উঠবে জাতীয় পুনর্গঠনের একটি মাইলফলক। গণতন্ত্রকে বাঁচাতে হলে আমাদের সবাইকে—নেতা, কর্মী ও সাধারণ নাগরিককে একযোগে সেই সংস্কৃতি নির্মাণ করতে হবে, যেখানে প্রতিযোগিতা থাকবে, কিন্তু ঘৃণা থাকবে না; মতভেদ থাকবে, কিন্তু সহিংসতা থাকবে না; লড়াই থাকবে, কিন্তু তা হবে যুক্তি ও আদর্শের—শত্রুতার নয়।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

বলিভিয়ায় নোটবাহী সামরিক বিমান বিধ্বস্ত: ১৫ জনের প্রাণহানি, ছড়ানো নোট ঘিরে বিশৃঙ্খলা

আসন্ন নির্বাচন: উত্তাপ-উত্তেজনা ছাপিয়ে সহিষ্ণুতা ও সহমর্মিতার প্রত্যাশা

আপডেট সময় : ০৯:১২:১৭ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ জানুয়ারী ২০২৬

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন থেকেই উত্তাপ ও উত্তেজনা বিরাজ করছে। এক রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানের পর ১৭ বছর ধরে জনগণের মতামত প্রকাশের আকাঙ্ক্ষা এবং দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে এই নির্বাচনকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। রাজনৈতিক দলগুলো যখন তাদের জনসমর্থন প্রদর্শনে প্রতিযোগিতায় নেমেছে, তখন অবাধ ও নিরঙ্কুশ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার এই সুযোগকে সহিষ্ণুতা ও সহমর্মিতার মাধ্যমে সফল করার আহ্বান জানিয়েছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তবে নির্বাচনী প্রচারণার শুরুতেই পরস্পরকে আক্রমণ ও অভিযোগের প্রবণতা গণতন্ত্রের সুস্থ পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানে নির্বাচনী আচরণ, রাজনৈতিক দলের প্রচার কৌশল ও জনমনসমীক্ষা নিয়ে অধ্যয়নকে নির্বাচন সমীক্ষা বলা হয়। উন্নত গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে এর প্রাতিষ্ঠানিক চর্চা থাকলেও, আমাদের মতো উন্নয়নশীল গণতন্ত্রে এ নিয়ে তেমন আলোচনা নেই। তবে রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ হিসেবে নির্বাচনী প্রতিযোগিতা ক্রমশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। আসন্ন নির্বাচনটিকে তিনটি কারণে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রথমত, দীর্ঘ ১৭ বছর পর বাংলাদেশের জনগণ সত্যিকার অর্থে তাদের মতামত প্রকাশের একটি সুযোগ পেতে যাচ্ছে। দ্বিতীয়ত, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর জনগণের আকাঙ্ক্ষা পূরণে এই নির্বাচনটি ভবিষ্যৎ নির্ধারক হয়ে উঠেছে। তৃতীয়ত, রাজনৈতিক দলগুলো তাদের জনসমর্থন প্রদর্শনের জন্য একটি উত্তম প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হয়েছে। এসব কিছুর মূল উদ্দেশ্য দেশে অবাধ ও নিরঙ্কুশ গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা।

অনেক সময় পশ্চিমা বিশ্বে এসব দেশের গণতন্ত্রকে ‘একদিনের গণতন্ত্র’ বলে অভিহিত করা হয়, যেখানে জনগণ কেবল ভোটের দিনই তাদের মতামত জানানোর সুযোগ পায়। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, বাংলাদেশের জনগণ বিগত তিনটি নির্বাচনে এই ‘একদিনের গণতন্ত্র’ও পুরোপুরি উপভোগ করতে পারেনি। যদিও গণতন্ত্রের আনুষ্ঠানিকতা দৃশ্যমান ছিল। সাবেক শাসক দলের একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি একসময় নির্বাচনকে ‘খেলা’ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন, কিন্তু সেই খেলার নিয়মকানুনও বারবার উপেক্ষা করা হয়েছে। অথচ ক্ষমতাচ্যুতির পর তারাই এখন ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক’ নির্বাচনের নামে রাজনৈতিক অংশগ্রহণের ধোঁয়া তুলছেন।

সাধারণত যুদ্ধজয়ের পর শত্রুর অনুপস্থিতিতে একটি অনুকূল পরিবেশ বিরাজ করে। কিন্তু ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানকে যদি জনযুদ্ধ বলা হয়, তবে সেই যুদ্ধের যে শক্তিগুলো একে অপরের হাতে হাত মিলিয়ে রক্ত ঢেলেছিল, বিস্ময়করভাবে তারাই আজ একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে দাঁড়িয়েছে। নির্বাচন বা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় প্রতিযোগিতা অস্বাভাবিক নয়, কিন্তু এটিকে শত্রুতা মনে করা অস্বাভাবিক। শত্রুর বিনাশের জন্য পক্ষ-প্রতিপক্ষ নানা ধরনের ছল-বল ও কলাকৌশল প্রদর্শন করতে পারে, যা গণতন্ত্রের ভাষা নয়। গণতন্ত্র যদি ‘জনগণের দ্বারা, জনগণের জন্য, জনগণের সরকার’—এই চিরায়ত ধারণায় বিশ্বাসী হয়, তাহলে জনগণের অবাধ রায় গ্রহণে কোনো অসুবিধা থাকার কথা নয়। অসুবিধা তখনই হয়, যখন রাজনৈতিক নেতৃত্ব প্রতিপক্ষকে বিশ্বাসঘাতক বা জাতির শত্রু হিসেবে দেখতে শুরু করে, তখন গণতান্ত্রিক মনোভাব ব্যাহত হয় এবং বিভেদ আরও গভীর হয়।

গত ২২ জানুয়ারি থেকে দেশে নির্বাচনী প্রচারণা পুরোদমে শুরু হয়েছে। প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের মতো সাধারণ জনগণও আশা করছেন, নির্বাচনটি উৎসবমুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত হবে। গত কয়েকদিন ধরে দেশের রাজনৈতিক নেতারা দেশজুড়ে ভোটের লড়াইয়ে লিপ্ত রয়েছেন। জনসভা, পথসভা ও ঘরোয়া সভায় ব্যস্ত তারা। কথার ফুলঝুরি ও প্রতিশ্রুতির পর প্রতিশ্রুতি দিয়ে জনতুষ্টিতে ব্যস্ত নেতারা। এসবই স্বাভাবিক, কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হলো, প্রতিদ্বন্দ্বী দল, গোষ্ঠী ও ব্যক্তিকে আক্রমণ করে কথা বলার প্রবণতা। পরস্পরকে ঘায়েল করতে অভিযোগ পাল্টা অভিযোগ তোলা হচ্ছে। তাদের কোনো কোনো বক্তব্যকে আক্রমণাত্মকও বলা যায়। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল মনে করছে, সামনের দিনগুলোতে আক্রমণের প্রবণতা আরও প্রবল হতে পারে। আগে যারা একে অপরের মিত্র ছিল, তারাই এখন শত্রুর মতো কথা বলছে। অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের পাশাপাশি বহিঃস্থ দ্বন্দ্বও পরিলক্ষিত হচ্ছে। যে ফ্যাসিবাদকে তারা পরাজিত করেছেন, এখন তারাই একে অপরকে ‘নব্য ফ্যাসিবাদ’ বলে অভিহিত করছেন। মুক্তিযুদ্ধ এখন আর কোনো বিরোধের বিষয় হতে পারে না, ধর্ম কোনো বিভেদের কারণ হতে পারে না, সুশাসন কোনো প্রশ্নসাপেক্ষ বিষয় নয়। অথচ এসব ঘিরেই দুপক্ষের বাগযুদ্ধ দেখছে এ দেশের মানুষ।

বহুদলীয় গণতন্ত্রের মূলমন্ত্র হলো ‘শতফুল ফুটতে দেওয়া’। প্রতিটি দলই পৃথকভাবে তাদের রাজনৈতিক ও আদর্শগত কর্মসূচি ধারণ করে। সুতরাং তাদের রাজনৈতিক কর্মসূচি, আদর্শগত অবস্থান ও নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ভিন্ন ভিন্ন হবে—এটাই স্বাভাবিক। জনগণকে প্রভাবিত করার জন্য তারা নানা প্রতিশ্রুতি দেবেন, কৌশল অবলম্বন করবেন এবং পরিকল্পনার কথা বলবেন—এসবই সুন্দর, কিন্তু অসুন্দর হলো সংঘাত। ইতোমধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংঘাত-সন্ত্রাস ও সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। সবাই উদ্বিগ্ন এসব যেন সীমালঙ্ঘন না করে। সেখানে সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হচ্ছে রাজনৈতিক নেতৃত্বের। স্থানীয়ভাবে রাজনৈতিক সদ্ভাব ও সুসম্পর্ক বজায় রাখার দায়িত্ব স্থানীয় নেতৃত্বের। আর কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের দায়িত্ব হলো তার কথা ও কাজের মাধ্যমে সংঘাত ও শত্রুতা যেন সারা দেশে ছড়িয়ে না পড়ে। নেতৃত্বের এসব সংঘাতের মধ্যেও আমরা নেতা-নেত্রীদের থেকে ভালো কথাও শুনছি, এটা অস্বীকার করা যায় না। তারা নেতাকর্মীদের সুন্দর শোভন আচরণের পরামর্শ দিচ্ছেন। কিন্তু মানুষের স্বভাব হচ্ছে খারাপটাকে সহজে গ্রহণ করা। তাই নেতাদের ভালো কথায় কাজ না হলেও, মন্দ কথার ইঙ্গিতে তোলপাড় হয়ে যায়।

নির্বাচনব্যবস্থা গণতন্ত্রের একটি বড় নির্ধারক। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা গণতন্ত্রের অনেক দোষ ও সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও এর অনুকূলে মতামত দেন এই জন্য যে, জনগণের মতামতের ভিত্তিতে এটি পরিচালিত হয়। গণতন্ত্র শুধু একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থাই নয়, বরং গণতন্ত্র হচ্ছে একটি জীবন পদ্ধতি। গণতন্ত্র তথা নির্বাচন সফল করতে হলে আমাদের অবশ্যই গণতন্ত্রের ভালো দিকগুলো চর্চা করতে হবে। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও পরিচর্যার বিষয়। তাৎক্ষণিকভাবে নির্বাচন অবাধ, নিরপেক্ষ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য করার জন্য গণতন্ত্রের যে বিষয়াবলি ধারণ করা আমাদের কর্তব্য, তা হচ্ছে:

১. সহিষ্ণুতা: নির্বাচন মুহূর্তে সহিষ্ণুতা হচ্ছে প্রথম ও প্রধান শর্ত। মানুষ স্বভাবতই প্রশংসা শুনতে চায়, সমালোচনাকে কেউ সহজে সহ্য করতে পারে না। অথচ নির্বাচন সফল ও সার্থক করতে হলে অন্যের মতকে অবশ্যই সহ্য করতে হবে। এই গুণটি ব্যক্তি থেকে গোষ্ঠী তথা দল পর্যন্ত প্রসারিত। দল বা দলীয় নেতা যদি কর্মীদের সহিষ্ণু হওয়ার শিক্ষা না দেন, তাহলে কর্মী সাধারণরা যুক্তির বদলে শক্তির অনুশীলন করেন। যখন কোনো রাজনৈতিক দল যুক্তির বদলে শক্তির প্রয়োগকে প্রাধান্য দেয়, তখন তা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পরিপন্থী এবং ফ্যাসিবাদী প্রবণতার জন্ম দেয়। ফ্যাসিবাদ কোনো বায়বীয় বিষয় নয়, এটি হচ্ছে আচার-আচরণ ও কথাবার্তা চালচলনে অসহিষ্ণু অবস্থা।

২. সহমর্মিতা: সহমর্মিতা হলো অন্যের দুঃখ, কষ্ট বা পরিস্থিতি বোঝার এবং সেই অনুযায়ী সহানুভূতি প্রদর্শনের ক্ষমতা। নির্বাচন বা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সহমর্মিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রার্থী, রাজনৈতিক দল এবং নাগরিক—সবার জন্য এটি প্রযোজ্য। একজন প্রার্থী যদি ভোটারদের সমস্যার প্রতি সহমর্মী না হন, তাদের বাস্তব অভিজ্ঞতা বোঝার চেষ্টা না করেন, তাহলে ভোট প্রক্রিয়ায় জনগণের আস্থা সৃষ্টি সম্ভব নয়। সহমর্মিতা মানুষকে ন্যায়পরায়ণ সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে এবং রাজনৈতিক সহমত ও সমঝোতার পরিবেশ গড়ে তোলে। নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বী বা দলের মধ্যে সহমর্মিতা থাকলে সংবেদনশীল বিষয়গুলো নিয়ে অযথা দ্বন্দ্ব বা সংঘাতও কমে।

৩. ন্যায়পরায়ণতা: নির্বাচন গ্রহণযোগ্য ও অবাধ করতে হলে ন্যায়পরায়ণতা অপরিহার্য। ভোটার, প্রার্থী এবং রাজনৈতিক দল—সবাইকে ন্যায়পরায়ণ হতে হবে। ভোট গণনা, প্রার্থী যাচাই, নির্বাচন কমিশনের কার্যক্রম—সবকিছুতে ন্যায়পরায়ণতা নিশ্চিত করতে হবে। ন্যায়পরায়ণতা মানুষকে আস্থা দেয়, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখে এবং দীর্ঘ মেয়াদে গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে।

৪. নৈতিক দায়িত্ববোধ: নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় নৈতিকতা অপরিহার্য। ভোটার হিসেবে দায়িত্ব পালন, সৎ আচরণ এবং প্রতিশ্রুতিবদ্ধ প্রচারণা এই নৈতিক দায়িত্ববোধের অংশ। যখন নাগরিকরা নৈতিকভাবে সচেতন হয়, তখন প্রার্থী ও দলও নৈতিকভাবে পরিচালিত হয়। এটি দীর্ঘ মেয়াদে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিকে সুসংহত করে।

৫. সক্রিয় নাগরিক অংশগ্রহণ: গণতন্ত্র শুধু ভোট দেওয়ার মাধ্যমে নয়, সক্রিয় নাগরিক অংশগ্রহণের মাধ্যমে শক্তিশালী হয়। জনসচেতনতা বৃদ্ধি, রাজনৈতিক আলোচনা, ভোট প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ—এসব কর্মকাণ্ড ভোটারদের রাজনৈতিক শিক্ষার অংশ এবং নীতি প্রণয়নের প্রভাব বিস্তারের মাধ্যম।

অতএব, আসন্ন নির্বাচন কেন্দ্র করে যে উত্তাপ ও উত্তেজনার আবহ দেশে ছড়িয়ে পড়েছে, তাকে যদি আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারি, তাহলে তা গণতান্ত্রিক অভিযাত্রাকে বিপন্ন করে তুলতে পারে। গণতন্ত্র প্রতিযোগিতার নাম বটে, কিন্তু সেই প্রতিযোগিতা যদি শত্রুতায় রূপ নেয়, যদি রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ঘৃণা ও প্রতিশোধপরায়ণতায় পর্যবসিত হয়, তাহলে তার পরিণতি কখনোই শুভ হয় না। ইতিহাস আমাদের শিখিয়েছে যে সমাজ সংযম হারায়, সে সমাজ শেষ পর্যন্ত নিজের অর্জনকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাও আমাদের সেই শিক্ষাই দেয়।

গণতন্ত্র শুধু ব্যালট বাক্সের ভেতরে সীমাবদ্ধ নয়; এটি মানুষের আচরণে, কথাবার্তায়, রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধে প্রতিফলিত হয়। জনগণের রায়কে মেনে নেওয়ার মানসিকতা, বিরুদ্ধ মতকে সহ্য করার ক্ষমতা, প্রতিদ্বন্দ্বীর মানবিক মর্যাদা স্বীকার করা—এসবই গণতন্ত্রের মৌলিক ভিত্তি। নির্বাচন উৎসবমুখর ও অর্থবহ করতে হলে রাজনৈতিক দল, নেতৃত্ব এবং নাগরিক সমাজ—সবাইকে এই মূল্যবোধ ধারণ করতে হবে। উত্তেজনার বদলে সহিষ্ণুতা, আক্রমণের বদলে যুক্তি, বিদ্বেষের বদলে সহমর্মিতা যদি আমাদের রাজনৈতিক চর্চায় স্থান পায়, তবেই গণতন্ত্র সত্যিকার অর্থে শক্ত ভিত পাবে।

একটি রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানের পর জাতি আজ যে সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, সেখানে দায়িত্ব আরও বেশি। বিজয়ের উচ্ছ্বাস যেন আত্মতুষ্টিতে পরিণত না হয়, প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করার আকাঙ্ক্ষা যেন নতুন করে বিভাজনের রাজনীতি জন্ম না দেয়—সে বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। রাজনৈতিক শক্তিগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক যদি বৈরিতার পথে এগিয়ে যায়, তবে ক্ষতবিক্ষত হবে শুধু দল নয়, পুরো রাষ্ট্রকাঠামোই। সেজন্যই এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সংযম, বিচক্ষণতা এবং দূরদর্শী নেতৃত্ব।

এই নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ যে তাদের মতামত প্রকাশের ঐতিহাসিক সুযোগ পেয়েছে, সেটিকে হালকাভাবে নেওয়ার অবকাশ নেই। জনগণের রায়ই শেষ কথা—এই সত্যকে হৃদয়ে ধারণ করাই হচ্ছে গণতন্ত্রের আসল পরীক্ষা। যে দল জিতবে তাকে বিনয়ী হতে হবে আর যে দল হারবে, তাকে সাংবিধানিক ও শান্তিপূর্ণ পথে বিরোধিতার ভূমিকা পালন করতে হবে। ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়—এই উপলব্ধিই একটি পরিপক্ব গণতান্ত্রিক সমাজের পরিচয় বহন করে।

সবশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে আজকের রাজনৈতিক আচরণ ও নাগরিক মনোভাবের ওপর। উত্তাপ-উত্তেজনার রাজনীতি থেকে সরে এসে যদি আমরা সহিষ্ণুতা-সহমর্মিতার রাজনীতির পথে হাঁটতে পারি, তবে এই নির্বাচন শুধু একটি সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনের ঘটনাই হবে না—এটি হয়ে উঠবে জাতীয় পুনর্গঠনের একটি মাইলফলক। গণতন্ত্রকে বাঁচাতে হলে আমাদের সবাইকে—নেতা, কর্মী ও সাধারণ নাগরিককে একযোগে সেই সংস্কৃতি নির্মাণ করতে হবে, যেখানে প্রতিযোগিতা থাকবে, কিন্তু ঘৃণা থাকবে না; মতভেদ থাকবে, কিন্তু সহিংসতা থাকবে না; লড়াই থাকবে, কিন্তু তা হবে যুক্তি ও আদর্শের—শত্রুতার নয়।