ঢাকা ০৫:০৩ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

ভারতীয় গণমাধ্যমে বাংলাদেশবিরোধী অপতথ্যের মহোৎসব

বাংলাদেশ সম্পর্কে ভারতীয় গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপতথ্য বা ডিস-ইনফরমেশন ছড়ানোর হার উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ফ্যাক্টচেকিং প্রতিষ্ঠান ‘রিউমর স্ক্যানার’-এর বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ভারতীয় উৎস থেকে অন্তত ১৫৫টি অপতথ্য ছড়ানো হয়েছে, যা ২০২৪ সালের তুলনায় ৫ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে সবচেয়ে ভীতিজাগানিয়া তথ্য হলো, ভারতের মূলধারার ৭৩টি সংবাদমাধ্যম অন্তত ৩৮টি ভিন্ন ভিন্ন ঘটনায় মোট ১৪০টি ভুল ও বিভ্রান্তিকর সংবাদ প্রচার করেছে। এসব খবরের সিংহভাগই ছিল বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘু তথা হিন্দুদের ওপর কথিত নির্যাতনের অতিরঞ্জিত ও ভিত্তিহীন বয়ান।

পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, বছরের শুরুতেই অর্থাৎ জানুয়ারি মাসে সর্বোচ্চ ৩৪টি অপতথ্য ছড়ানো হয়। এই অপপ্রচারের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল মাইক্রোব্লগিং সাইট ‘এক্স’ (সাবেক টুইটার), যেখানে মোট অপতথ্যের ৮১ শতাংশ বা ১২৬টি ঘটনা প্রচার করা হয়েছে। ফেসবুক, ইউটিউব এবং ইনস্টাগ্রামেও এই ধারা অব্যাহত ছিল। রিউমর স্ক্যানার জানিয়েছে, শনাক্ত হওয়া ১৫৫টি অপতথ্যের মধ্যে ৯১টিই ছিল সরাসরি সাম্প্রদায়িক উসকানি ছড়ানোর লক্ষ্যে তৈরি। বিশেষ করে এনডিটিভি, টাইমস অফ ইন্ডিয়া, জি নিউজ এবং আজতক বাংলার মতো প্রভাবশালী গণমাধ্যমগুলোকেও এই অপতথ্য প্রচারের মিছিলে দেখা গেছে। এর মধ্যে ‘আজতক বাংলা’ একাই ১০টি বড় ধরনের ভুল তথ্য প্রচার করে তালিকার শীর্ষে রয়েছে।

অপপ্রচারের অন্যতম কৌশলী ধরণ ছিল বাংলাদেশে সংঘটিত কোনো সাধারণ অপরাধ বা মুসলিম ব্যক্তির ওপর হামলাকে হিন্দু নির্যাতন হিসেবে রঙ চড়ানো। গত ৯ জুলাই ঢাকার মিটফোর্ডে সোহাগ নামে এক মুসলিম ভাঙারি ব্যবসায়ী হত্যাকাণ্ডের শিকার হলে অন্তত ২৭টি ভারতীয় গণমাধ্যম তাকে হিন্দু দাবি করে খবর প্রচার করে। এছাড়া পুরনো ভিডিওকে সাম্প্রতিক সময়ের দাবি করা, কৃত্রিম বা স্ক্রিপ্টেড ভিডিওকে বাস্তব বলে প্রচার করা এবং এমনকি ভারতের অভ্যন্তরে ঘটা অপরাধকেও বাংলাদেশের ঘটনা বলে চালিয়ে দেওয়ার অন্তত ৩৩টি উদাহরণ পাওয়া গেছে। গবেষকরা বলছেন, এটি কেবল সাংবাদিকতার ভুল নয়, বরং পরিকল্পিতভাবে একটি নির্দিষ্ট ন্যারেটিভ তৈরির চেষ্টা।

কলকাতাভিত্তিক সাংবাদিক অর্ক ভাদুড়ী এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক রাজীব নন্দীর মতে, এই অপপ্রচার দুই দেশের জনগণের পারস্পরিক সম্পর্কে বিষবাষ্প ছড়াচ্ছে। রাজীব নন্দী মনে করেন, বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ‘মব ভায়োলেন্স’ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় দুর্বলতা ভারতীয় মিডিয়াকে অতিরঞ্জিত সংবাদ তৈরির ‘কাঁচামাল’ সরবরাহ করছে। অন্যদিকে অর্ক ভাদুড়ী মনে করেন, উপমহাদেশের সাম্প্রদায়িক রাজনীতিকে পুঁজি করে মূলধারার মিডিয়া যখন মিথ্যাচার করে, তখন প্রকৃত সমস্যাগুলো আড়ালে চলে যায় যা অত্যন্ত বিপজ্জনক। এই তথ্যযুদ্ধ মোকাবিলায় দুই দেশের সিভিল সোসাইটির মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধি এবং আরও শক্তিশালী ফ্যাক্টচেকিং ব্যবস্থার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

জগন্নাথের বেদখল হল উদ্ধারে সব ধরনের আইনি সহায়তার আশ্বাস এমপি হামিদের

ভারতীয় গণমাধ্যমে বাংলাদেশবিরোধী অপতথ্যের মহোৎসব

আপডেট সময় : ১২:১০:৫৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৫ জানুয়ারী ২০২৬

বাংলাদেশ সম্পর্কে ভারতীয় গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপতথ্য বা ডিস-ইনফরমেশন ছড়ানোর হার উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ফ্যাক্টচেকিং প্রতিষ্ঠান ‘রিউমর স্ক্যানার’-এর বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ভারতীয় উৎস থেকে অন্তত ১৫৫টি অপতথ্য ছড়ানো হয়েছে, যা ২০২৪ সালের তুলনায় ৫ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে সবচেয়ে ভীতিজাগানিয়া তথ্য হলো, ভারতের মূলধারার ৭৩টি সংবাদমাধ্যম অন্তত ৩৮টি ভিন্ন ভিন্ন ঘটনায় মোট ১৪০টি ভুল ও বিভ্রান্তিকর সংবাদ প্রচার করেছে। এসব খবরের সিংহভাগই ছিল বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘু তথা হিন্দুদের ওপর কথিত নির্যাতনের অতিরঞ্জিত ও ভিত্তিহীন বয়ান।

পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, বছরের শুরুতেই অর্থাৎ জানুয়ারি মাসে সর্বোচ্চ ৩৪টি অপতথ্য ছড়ানো হয়। এই অপপ্রচারের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল মাইক্রোব্লগিং সাইট ‘এক্স’ (সাবেক টুইটার), যেখানে মোট অপতথ্যের ৮১ শতাংশ বা ১২৬টি ঘটনা প্রচার করা হয়েছে। ফেসবুক, ইউটিউব এবং ইনস্টাগ্রামেও এই ধারা অব্যাহত ছিল। রিউমর স্ক্যানার জানিয়েছে, শনাক্ত হওয়া ১৫৫টি অপতথ্যের মধ্যে ৯১টিই ছিল সরাসরি সাম্প্রদায়িক উসকানি ছড়ানোর লক্ষ্যে তৈরি। বিশেষ করে এনডিটিভি, টাইমস অফ ইন্ডিয়া, জি নিউজ এবং আজতক বাংলার মতো প্রভাবশালী গণমাধ্যমগুলোকেও এই অপতথ্য প্রচারের মিছিলে দেখা গেছে। এর মধ্যে ‘আজতক বাংলা’ একাই ১০টি বড় ধরনের ভুল তথ্য প্রচার করে তালিকার শীর্ষে রয়েছে।

অপপ্রচারের অন্যতম কৌশলী ধরণ ছিল বাংলাদেশে সংঘটিত কোনো সাধারণ অপরাধ বা মুসলিম ব্যক্তির ওপর হামলাকে হিন্দু নির্যাতন হিসেবে রঙ চড়ানো। গত ৯ জুলাই ঢাকার মিটফোর্ডে সোহাগ নামে এক মুসলিম ভাঙারি ব্যবসায়ী হত্যাকাণ্ডের শিকার হলে অন্তত ২৭টি ভারতীয় গণমাধ্যম তাকে হিন্দু দাবি করে খবর প্রচার করে। এছাড়া পুরনো ভিডিওকে সাম্প্রতিক সময়ের দাবি করা, কৃত্রিম বা স্ক্রিপ্টেড ভিডিওকে বাস্তব বলে প্রচার করা এবং এমনকি ভারতের অভ্যন্তরে ঘটা অপরাধকেও বাংলাদেশের ঘটনা বলে চালিয়ে দেওয়ার অন্তত ৩৩টি উদাহরণ পাওয়া গেছে। গবেষকরা বলছেন, এটি কেবল সাংবাদিকতার ভুল নয়, বরং পরিকল্পিতভাবে একটি নির্দিষ্ট ন্যারেটিভ তৈরির চেষ্টা।

কলকাতাভিত্তিক সাংবাদিক অর্ক ভাদুড়ী এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক রাজীব নন্দীর মতে, এই অপপ্রচার দুই দেশের জনগণের পারস্পরিক সম্পর্কে বিষবাষ্প ছড়াচ্ছে। রাজীব নন্দী মনে করেন, বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ‘মব ভায়োলেন্স’ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় দুর্বলতা ভারতীয় মিডিয়াকে অতিরঞ্জিত সংবাদ তৈরির ‘কাঁচামাল’ সরবরাহ করছে। অন্যদিকে অর্ক ভাদুড়ী মনে করেন, উপমহাদেশের সাম্প্রদায়িক রাজনীতিকে পুঁজি করে মূলধারার মিডিয়া যখন মিথ্যাচার করে, তখন প্রকৃত সমস্যাগুলো আড়ালে চলে যায় যা অত্যন্ত বিপজ্জনক। এই তথ্যযুদ্ধ মোকাবিলায় দুই দেশের সিভিল সোসাইটির মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধি এবং আরও শক্তিশালী ফ্যাক্টচেকিং ব্যবস্থার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।