আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের আগে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে দুটি বিষয় আলোচনার জন্ম দিয়েছে। একদিকে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের প্রস্তাবিত গণভোটের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন, অন্যদিকে সাবেক তথ্যমন্ত্রী ড. আবু সাইয়িদের বিএনপিতে যোগদান দলটির ভেতরে ও বাইরে ব্যাপক বিতর্কের সৃষ্টি করেছে।
জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের সম্প্রতি আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে আয়োজিতব্য গণভোটে ‘না’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তার মতে, এই গণভোট সংবিধানবিরোধী, অবাস্তব এবং এর বাস্তবায়ন দেশের স্থিতিশীলতা নষ্ট করতে পারে। তিনি প্রস্তাবিত সংস্কারের বিরোধিতা করে বলেছেন, এতে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা সীমিত করা হয়েছে, যা দেশ পরিচালনায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে। জিএম কাদের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারপ্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে হিটলারের সঙ্গে তুলনা করে সমালোচনার মুখে পড়েছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, জিএম কাদেরের এই ধরনের মন্তব্য তার পূর্ববর্তী সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কারণে সৃষ্ট উদ্বেগের বহিঃপ্রকাশ। বিশেষত, গত ১৫ বছরে তার দলের ভূমিকা এবং সাবেক সরকারের সঙ্গে তাদের সখ্যতা নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন রয়েছে। গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত সরকারের অংশীদার হিসেবে জিএম কাদেরের এই আক্রমণাত্মক বক্তব্য নতুন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তার দলের অবস্থানকে আরও জটিল করে তুলছে বলে মনে করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, সম্প্রতি সাবেক তথ্যমন্ত্রী ড. আবু সাইয়িদের বিএনপিতে যোগদানের খবর রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের তথ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে আবু সাইয়িদ শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানকে নিয়ে কঠোর সমালোচনামূলক মন্তব্য ও লেখালেখির জন্য পরিচিত ছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, তার মন্ত্রিত্বকালে রাষ্ট্রীয় প্রচারমাধ্যম বিটিভির আর্কাইভ থেকে শহীদ জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়ার কিছু ভিডিও ফুটেজ ধ্বংস করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
ড. আবু সাইয়িদের লেখা ‘জেনারেল জিয়ার রাজত্ব’ বইয়ে জিয়াউর রহমান সম্পর্কে বিভিন্ন বিতর্কিত তথ্য ও মন্তব্য রয়েছে, যা বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও আলোচিত হচ্ছে। বইটিতে জিয়াউর রহমানকে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে ‘মেজর রিট্রিট’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং তাকে পাকিস্তানি চর, চক্রান্তকারী ও খুনি হিসেবেও আখ্যায়িত করা হয়েছে।
আবু সাইয়িদের রাজনৈতিক জীবনও বেশ বর্ণিল। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং স্বাধীনতার পর সংবিধান প্রণয়ন কমিটির সদস্য ছিলেন। একদলীয় শাসন বাকশাল চালু হলে তিনি এর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং পাবনার গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৬ সালে তিনি আওয়ামী লীগের টিকিটে নির্বাচন করে তথ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। ওয়ান-ইলেভেনের সময় আওয়ামী লীগ ভাঙার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে দল থেকে বিচ্যুত হন। ২০১৪ সালের একতরফা নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে অংশ নেন। ২০১৮ সালের নির্বাচনের এক মাস আগে গণফোরামে যোগ দেন এবং পরবর্তীতে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ব্যানারে বিএনপির প্রার্থী হন। ২০২৪ সালের ডামি নির্বাচনেও তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে অংশ নিয়েছিলেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, শহীদ জিয়াউর রহমানের আদর্শে বিশ্বাসী একটি দলে তার দীর্ঘদিনের সমালোচক আবু সাইয়িদের অন্তর্ভুক্তি বিএনপির আদর্শিক অবস্থানের ওপর প্রশ্ন তুলছে। বিশেষ করে, যখন আসন্ন নির্বাচনে তার প্রতিদ্বন্দ্বীরা তার অতীতের লেখা ও মন্তব্যগুলো সামনে আনবে, তখন বিএনপি নেতৃত্ব কীভাবে এর জবাব দেবেন, তা নিয়ে আলোচনা চলছে। দলের ভেতরেও এই যোগদানকে ঘিরে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে।
রিপোর্টারের নাম 

























