বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে ‘ভোট ডাকাতি’ একটি কলঙ্কিত অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত। সম্প্রতি জাতীয় নির্বাচন (২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪) সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদন গ্রহণকালে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস স্পষ্ট করে বলেছেন, ভবিষ্যতে দেশে যেন আর কখনোই নির্বাচন ডাকাতির পুনরাবৃত্তি না ঘটে, তা নিশ্চিত করতে হবে। তবে প্রধান উপদেষ্টার এই সদিচ্ছা সত্ত্বেও বর্তমান প্রশাসনিক কাঠামো, সংবাদমাধ্যমের একপাক্ষিক ভূমিকা এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতির গতিপ্রকৃতি নিয়ে জনমনে নানা সংশয় ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, সরাসরি ভোট ডাকাতি হয়তো বন্ধ হবে, কিন্তু সূক্ষ্ম কারচুপির মাধ্যমে নির্বাচনের ফলাফল প্রভাবিত করার পুরনো সংস্কৃতি বা ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’ থেকে দেশ এখনো পুরোপুরি মুক্ত হতে পারেনি।
দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে যে অস্থিরতা দৃশ্যমান, তা মূলত দীর্ঘদিনের নিয়ন্ত্রিত গণতান্ত্রিক মডেলের ফল। বিগত দেড় দশকে প্রশাসনের ভেতরে যে ফ্যাসিবাদী কাঠামো গড়ে উঠেছিল, তার অবশেষ এখনো বিদ্যমান। অভিযোগ উঠেছে, মাঠ পর্যায়ের কিছু রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক রাজনৈতিক দলগুলোর ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন মানদণ্ড অবলম্বন করছেন, যা নির্বাচনের নিরপেক্ষতাকে শুরুতেই প্রশ্নের মুখে ফেলছে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও একপাক্ষিক আচরণের বিষয়ে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান থেকে উঠে আসা নেতৃত্ব এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বারবার সতর্ক করছেন। তাঁদের মতে, রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো যদি আমলাতন্ত্রের একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর হাতে বন্দি থাকে, তবে নির্বাচনের প্রকৃত উদ্দেশ্য ব্যাহত হতে পারে।
নির্বাচন ও গণতন্ত্রের এই যাত্রায় সংবাদমাধ্যমের ভূমিকাও এখন বড় আলোচনার বিষয়। অভিযোগ রয়েছে, দেশের মূলধারার মিডিয়ার একটি বড় অংশ নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষকের ভূমিকা পালনের পরিবর্তে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক শক্তির প্রতি অতিমাত্রায় ঝুঁকে পড়ছে। নীতিগত ও রাষ্ট্র সংস্কারের আলোচনার চেয়ে ব্যক্তিকেন্দ্রিক স্তুতি এবং আগাম ক্ষমতার সমীকরণ মেলানোতেই তারা বেশি ব্যস্ত। ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর মিডিয়ার এই ডিগবাজি জনমনে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। বিশেষ করে, রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে সাংবাদিকদের আলাপচারিতায় পেশাদারিত্বের চেয়ে তোষামোদির আধিক্য বেশি দেখা যাচ্ছে, যা স্বাধীন সাংবাদিকতা ও সুস্থ গণতন্ত্রের জন্য অন্তরায়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও চলছে এক ধরনের ‘নিয়ন্ত্রিত বিশৃঙ্খলা’। রাজনৈতিক সহাবস্থানের পরিবর্তে একে অপরকে বিভিন্ন নেতিবাচক তকমা দিয়ে আক্রমণ করার প্রবণতা বাড়ছে। বিভিন্ন উদ্দেশ্যপ্রণোদিত জরিপ ও জনমত যাচাইয়ের নামে ভোটারদের মনস্তাত্ত্বিকভাবে প্রভাবিত করার চেষ্টা চলছে, যা ২০০৮ সালের নির্বাচনের আগের পরিস্থিতির কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। এই ধরনের মেরুকরণ কেবল রাজনৈতিক সংঘাতকেই উসকে দেয় না, বরং ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়াকেও অনিশ্চিত করে তোলে।
এবারের নির্বাচন কেবল ক্ষমতার পালাবদল নয়, বরং এটি ‘নতুন বাংলাদেশ’ বা রাষ্ট্র পুনর্গঠনের একটি সন্ধিক্ষণ। গত দেড় দশকের অভিজ্ঞতা শিক্ষা দেয় যে, একটি ত্রুটিপূর্ণ নির্বাচন রাষ্ট্রকে ব্যর্থতার দিকে ঠেলে দেয়। তাই বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা ও অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা রক্ষায় একটি সর্বজনগ্রাহ্য নির্বাচনের কোনো বিকল্প নেই। এই লক্ষ্য অর্জনে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ন্যূনতম জাতীয় ঐক্য ও সমঝোতা জরুরি।
টেকসই গণতন্ত্রের স্বার্থে রাজনৈতিক নেতাদের কিছু মৌলিক বিষয়ে অঙ্গীকারবদ্ধ হওয়া প্রয়োজন। প্রথমত, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা ও কাঠামোগত সংস্কারের প্রশ্নে ঐক্যমত পোষণ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করতে প্রশাসনকে সব ধরনের প্রভাবমুক্ত রাখার অঙ্গীকার করতে হবে। এছাড়া রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন এবং নির্বাচনের ফলাফল যাই হোক না কেন, তা মেনে নিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।
পরিশেষে, গণতন্ত্র কেবল ভোট প্রদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি একটি নিরবচ্ছিন্ন প্রক্রিয়া যেখানে জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটে। যদি রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও রাষ্ট্রযন্ত্র এই বাস্তবতা উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয়, তবে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও গণতন্ত্র সুসংহত হবে না। দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার স্বার্থে এখন সময় এসেছে ব্যক্তিগত ও দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়ার। জনগণের ম্যান্ডেটকে সম্মান জানানোই হোক আগামীর রাজনীতির মূল ভিত্তি।
রিপোর্টারের নাম 

























