বাংলাদেশের আসন্ন সাধারণ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক মহলে শুরু হয়েছে নতুন এক ভূ-রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অচলাবস্থা কাটিয়ে একটি গণতান্ত্রিক উত্তরণের লক্ষ্যে আয়োজিত এই নির্বাচনকে ঘিরে বড় শক্তিগুলোর অবস্থান এবং দেশীয় রাজনীতির ডিজিটাল রূপান্তর এক জটিল ও বহুমুখী পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলো বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নতুন মোড় ও নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের রাজনীতিতে বর্তমানে এক বড় ধরনের পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। দীর্ঘ সময় ক্ষমতার বাইরে থাকা এবং নানা চড়াই-উতরাই পার করা রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে প্রভাবশালী দেশগুলোর যোগাযোগ এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। বিশেষ করে একটি প্রভাবশালী পশ্চিমা রাষ্ট্র বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান ইসলামপন্থি দলের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের ইঙ্গিত দিয়েছে। কূটনৈতিক মহলের মতে, এই ‘বন্ধুত্বের’ প্রস্তাব কেবল আদর্শিক নয়, বরং এটি একটি সুদূরপ্রসারী কৌশলগত হিসাব। ওই রাষ্ট্রের কূটনীতিকদের বরাত দিয়ে জানানো হয়েছে যে, তারা বাংলাদেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় সব পক্ষের সঙ্গেই কাজ করতে আগ্রহী। তবে এই আগ্রহের পেছনে রয়েছে কঠোর শর্ত এবং অর্থনৈতিক চাপের প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত। বাংলাদেশের রপ্তানি খাতের বড় অংশ যেহেতু পশ্চিমা বাজারের ওপর নির্ভরশীল, তাই সেই বাজারকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে রাজনৈতিক দলগুলোকে একটি নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে রাখার কৌশল গ্রহণ করা হতে পারে।
এদিকে, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এই নতুন কূটনৈতিক মেরুকরণ প্রতিবেশী দেশ ভারতের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে এক ধরনের শীতলতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বাংলাদেশের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বড় শক্তিগুলোর এই বিপরীতমুখী অবস্থান দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে নতুন ফাটল তৈরি করতে পারে। একদিকে পশ্চিমা বিশ্বের ‘বাস্তববাদী’ কূটনীতি, অন্যদিকে ভারতের আঞ্চলিক নিরাপত্তা চিন্তা—এই দুইয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ এখন এক বড় পরীক্ষার সম্মুখীন।
নির্বাচনের মাঠের এই পরিবর্তনের পাশাপাশি প্রচারণার ধরনেও এসেছে আমূল রূপান্তর। এবারের নির্বাচনে প্রথাগত সভা-সমাবেশের চেয়ে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো অনেক বেশি শক্তিশালী ভূমিকা পালন করছে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের ভোটারদের আকৃষ্ট করতে রাজনৈতিক দলগুলো এখন ফেসবুক, ইউটিউব এবং টিকটকের মতো মাধ্যমগুলোকে প্রধান অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। দেশের মোট ইন্টারনেট ব্যবহারকারী এবং তরুণ ভোটারদের বিশাল সংখ্যাই এই ডিজিটাল যুদ্ধের মূল নিয়ামক। রাজনৈতিক দলগুলো এখন বড় বক্তৃতার বদলে ছোট ছোট ভিডিও ক্লিপ, মিম এবং গানের মাধ্যমে তাদের বার্তা পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছে। তবে ডিজিটাল এই প্রচারণার যেমন ইতিবাচক দিক রয়েছে, তেমনি উসকানিমূলক কনটেন্ট এবং ভুল তথ্য ছড়ানোর ঝুঁকিও তৈরি করেছে।
নির্বাচনের পাশাপাশি একই দিনে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ নিয়ে গণভোটের আয়োজন করা হয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের এই উদ্যোগকে রাষ্ট্র সংস্কারের একটি বড় পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই সনদের মাধ্যমে ক্ষমতার ভারসাম্য এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতার মতো মৌলিক বিষয়গুলোতে জনগণের রায় নেওয়া হবে। সরকার এই সনদের পক্ষে ডিজিটাল মাধ্যমে ব্যাপক প্রচারণা চালাচ্ছে, যা নতুন বাংলাদেশের লক্ষ্য নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, ১২ ফেব্রুয়ারির এই নির্বাচন কেবল সরকার গঠনের লড়াই নয়, বরং এটি বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব এবং নিজস্ব ভবিষ্যৎ নির্মাণের এক বড় চ্যালেঞ্জ। আন্তর্জাতিক মহলের চাপ, ভূ-রাজনৈতিক টানাপোড়েন এবং ডিজিটাল প্রচারণার ডামাডোলের মধ্যে দেশের সাধারণ মানুষ শেষ পর্যন্ত ব্যালটের মাধ্যমে কী সিদ্ধান্ত নেয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়। বাংলাদেশের গণতন্ত্রের এই সন্ধিক্ষণে সিদ্ধান্তটি শেষ পর্যন্ত ঢাকাতেই হবে, নাকি অন্য কোনো নোটের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে—সেই উত্তর মিলবে নির্বাচনের দিন।
রিপোর্টারের নাম 

























