ঢাকা ০৩:০০ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

ত্রিদেশীয় সামরিক অক্ষ: দক্ষিণ এশিয়ার নতুন সমীকরণ ও বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৯:৫৯:৪১ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৪ জানুয়ারী ২০২৬
  • ১ বার পড়া হয়েছে

পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্কের মধ্যে ক্রমবর্ধমান সামরিক সমন্বয় এখন আর কেবল কূটনৈতিক আলোচনার টেবিলে সীমাবদ্ধ নেই। গত কয়েক বছরে এই তিন দেশের পারস্পরিক সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, প্রতিরক্ষা খাতে বিনিয়োগ এবং প্রযুক্তিগত বিনিময় একটি শক্তিশালী কাঠামোর দিকে ধাবিত হচ্ছে। বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতিতে এই নতুন মেরুকরণ দক্ষিণ এশিয়ার শক্তির ভারসাম্যে বড় ধরনের পরিবর্তনের আভাস দিচ্ছে।

পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে এই তিন দেশের সম্মিলিত শক্তির গভীরতা স্পষ্ট হয়। পাকিস্তানের প্রায় সাড়ে ৬ লাখ সক্রিয় সেনাসদস্যের পাশাপাশি শক্তিশালী রিজার্ভ ফোর্স রয়েছে। অন্যদিকে, ২০২৩ সালে সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা ব্যয় ছিল প্রায় ৮০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা দেশটিকে বিশ্বের শীর্ষ পাঁচটি সামরিক ব্যয়কারী দেশের তালিকায় স্থান করে দিয়েছে। ন্যাটোর দ্বিতীয় বৃহত্তম সেনাবাহিনী সমৃদ্ধ দেশ তুরস্ক বর্তমানে তাদের প্রতিরক্ষা চাহিদায় প্রায় ৭০ শতাংশ নিজস্ব প্রযুক্তিতে পূরণ করতে সক্ষম। বিশেষ করে তুরস্কের তৈরি ‘বেয়ারেক্টার টিবি-২’ ড্রোন লিবিয়া ও নাগোর্নো-কারাবাখ যুদ্ধে অভাবনীয় সাফল্য দেখানোর পর তা পাকিস্তানের সামরিক পরিকল্পনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। নিয়মিত যৌথ মহড়া এবং প্রতিরক্ষা শিল্পে সৌদি আরবের বিপুল বিনিয়োগ এই ত্রিদেশীয় সম্পর্ককে আরও মজবুত করেছে।

এই উদীয়মান সামরিক অক্ষকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে নয়াদিল্লি। ভারতের বিশাল সামরিক বাহিনী এবং ৭২ বিলিয়ন ডলারের প্রতিরক্ষা বাজেট থাকলেও পাকিস্তানের ‘ফোর্স মাল্টিপ্লায়ার’ বা সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়টি দিল্লির জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তুরস্কের ড্রোন প্রযুক্তি এবং ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সক্ষমতা পাকিস্তানের হাতে পৌঁছানোকে ভারত তাদের সীমান্ত নিরাপত্তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে। এর ওপর কাশ্মীর ইস্যুতে তুরস্কের প্রকাশ্য অবস্থান এবং পাকিস্তানের সঙ্গে দেশটির সামরিক ঘনিষ্ঠতা দিল্লির নীতিনির্ধারকদের ভাবিয়ে তুলছে।

তবে সৌদি আরবের ক্ষেত্রে ভারতের কৌশল কিছুটা ভিন্ন। ভারতের মোট জ্বালানি তেলের প্রায় ২০ শতাংশ আসে সৌদি আরব থেকে এবং দেশটিতে কর্মরত ২৫ লাখের বেশি ভারতীয় শ্রমিকের পাঠানো রেমিট্যান্স ভারতের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। ফলে রিয়াদের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রেখেও ভারত চেষ্টা করছে যেন এই ত্রিদেশীয় সামরিক ঘনিষ্ঠতা দিল্লির বিরুদ্ধে কোনো কৌশলগত প্ল্যাটফর্মে রূপ না নেয়।

এই জটিল আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল। ভারতের সঙ্গে দীর্ঘ ৪ হাজার ১০০ কিলোমিটারের স্থলসীমান্ত এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের সাতটি রাজ্যের ভৌগোলিক বাস্তবতায় বাংলাদেশ দিল্লির জন্য অপরিহার্য এক প্রতিবেশী। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে যেকোনো সামরিক জোটে যোগদানের সম্ভাবনাকে ভারত সরাসরি তাদের জাতীয় নিরাপত্তার ওপর প্রভাব হিসেবে বিবেচনা করে।

বাংলাদেশের নিজস্ব প্রতিরক্ষা নীতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দেশটির সামরিক ব্যয় মূলত নিজস্ব সক্ষমতা রক্ষা এবং জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের ওপর নির্ভরশীল। বর্তমানে শান্তিরক্ষা মিশনে শীর্ষ অবদানকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি একটি ‘শান্তিকামী রাষ্ট্র’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। এই নিরপেক্ষ অবস্থানই বাংলাদেশের কূটনৈতিক শক্তির মূল ভিত্তি।

প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তান-তুরস্ক-সৌদি সামরিক সমন্বয় দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে একটি স্থায়ী পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ ও দূরদর্শী পথ হলো বিদ্যমান ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি বজায় রাখা। কোনো নির্দিষ্ট সামরিক ব্লকের অংশ হওয়া বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি করতে পারে, যা বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

পরিশেষে, আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক এই ক্ষমতার দ্বন্দ্বে জড়ানোর চেয়ে কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বজায় রাখাই বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের অনুকূল। নির্দিষ্ট কোনো সামরিক বলয়ে আবদ্ধ না থেকে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ অবস্থানই দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

তিন মাসের বেতন না দিয়েই কারখানা বন্ধ, টঙ্গীতে শ্রমিকদের বিক্ষোভ

ত্রিদেশীয় সামরিক অক্ষ: দক্ষিণ এশিয়ার নতুন সমীকরণ ও বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান

আপডেট সময় : ০৯:৫৯:৪১ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৪ জানুয়ারী ২০২৬

পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্কের মধ্যে ক্রমবর্ধমান সামরিক সমন্বয় এখন আর কেবল কূটনৈতিক আলোচনার টেবিলে সীমাবদ্ধ নেই। গত কয়েক বছরে এই তিন দেশের পারস্পরিক সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, প্রতিরক্ষা খাতে বিনিয়োগ এবং প্রযুক্তিগত বিনিময় একটি শক্তিশালী কাঠামোর দিকে ধাবিত হচ্ছে। বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতিতে এই নতুন মেরুকরণ দক্ষিণ এশিয়ার শক্তির ভারসাম্যে বড় ধরনের পরিবর্তনের আভাস দিচ্ছে।

পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে এই তিন দেশের সম্মিলিত শক্তির গভীরতা স্পষ্ট হয়। পাকিস্তানের প্রায় সাড়ে ৬ লাখ সক্রিয় সেনাসদস্যের পাশাপাশি শক্তিশালী রিজার্ভ ফোর্স রয়েছে। অন্যদিকে, ২০২৩ সালে সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা ব্যয় ছিল প্রায় ৮০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা দেশটিকে বিশ্বের শীর্ষ পাঁচটি সামরিক ব্যয়কারী দেশের তালিকায় স্থান করে দিয়েছে। ন্যাটোর দ্বিতীয় বৃহত্তম সেনাবাহিনী সমৃদ্ধ দেশ তুরস্ক বর্তমানে তাদের প্রতিরক্ষা চাহিদায় প্রায় ৭০ শতাংশ নিজস্ব প্রযুক্তিতে পূরণ করতে সক্ষম। বিশেষ করে তুরস্কের তৈরি ‘বেয়ারেক্টার টিবি-২’ ড্রোন লিবিয়া ও নাগোর্নো-কারাবাখ যুদ্ধে অভাবনীয় সাফল্য দেখানোর পর তা পাকিস্তানের সামরিক পরিকল্পনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। নিয়মিত যৌথ মহড়া এবং প্রতিরক্ষা শিল্পে সৌদি আরবের বিপুল বিনিয়োগ এই ত্রিদেশীয় সম্পর্ককে আরও মজবুত করেছে।

এই উদীয়মান সামরিক অক্ষকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে নয়াদিল্লি। ভারতের বিশাল সামরিক বাহিনী এবং ৭২ বিলিয়ন ডলারের প্রতিরক্ষা বাজেট থাকলেও পাকিস্তানের ‘ফোর্স মাল্টিপ্লায়ার’ বা সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়টি দিল্লির জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তুরস্কের ড্রোন প্রযুক্তি এবং ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সক্ষমতা পাকিস্তানের হাতে পৌঁছানোকে ভারত তাদের সীমান্ত নিরাপত্তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে। এর ওপর কাশ্মীর ইস্যুতে তুরস্কের প্রকাশ্য অবস্থান এবং পাকিস্তানের সঙ্গে দেশটির সামরিক ঘনিষ্ঠতা দিল্লির নীতিনির্ধারকদের ভাবিয়ে তুলছে।

তবে সৌদি আরবের ক্ষেত্রে ভারতের কৌশল কিছুটা ভিন্ন। ভারতের মোট জ্বালানি তেলের প্রায় ২০ শতাংশ আসে সৌদি আরব থেকে এবং দেশটিতে কর্মরত ২৫ লাখের বেশি ভারতীয় শ্রমিকের পাঠানো রেমিট্যান্স ভারতের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। ফলে রিয়াদের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রেখেও ভারত চেষ্টা করছে যেন এই ত্রিদেশীয় সামরিক ঘনিষ্ঠতা দিল্লির বিরুদ্ধে কোনো কৌশলগত প্ল্যাটফর্মে রূপ না নেয়।

এই জটিল আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল। ভারতের সঙ্গে দীর্ঘ ৪ হাজার ১০০ কিলোমিটারের স্থলসীমান্ত এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের সাতটি রাজ্যের ভৌগোলিক বাস্তবতায় বাংলাদেশ দিল্লির জন্য অপরিহার্য এক প্রতিবেশী। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে যেকোনো সামরিক জোটে যোগদানের সম্ভাবনাকে ভারত সরাসরি তাদের জাতীয় নিরাপত্তার ওপর প্রভাব হিসেবে বিবেচনা করে।

বাংলাদেশের নিজস্ব প্রতিরক্ষা নীতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দেশটির সামরিক ব্যয় মূলত নিজস্ব সক্ষমতা রক্ষা এবং জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের ওপর নির্ভরশীল। বর্তমানে শান্তিরক্ষা মিশনে শীর্ষ অবদানকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি একটি ‘শান্তিকামী রাষ্ট্র’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। এই নিরপেক্ষ অবস্থানই বাংলাদেশের কূটনৈতিক শক্তির মূল ভিত্তি।

প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তান-তুরস্ক-সৌদি সামরিক সমন্বয় দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে একটি স্থায়ী পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ ও দূরদর্শী পথ হলো বিদ্যমান ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি বজায় রাখা। কোনো নির্দিষ্ট সামরিক ব্লকের অংশ হওয়া বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি করতে পারে, যা বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

পরিশেষে, আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক এই ক্ষমতার দ্বন্দ্বে জড়ানোর চেয়ে কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বজায় রাখাই বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের অনুকূল। নির্দিষ্ট কোনো সামরিক বলয়ে আবদ্ধ না থেকে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ অবস্থানই দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে।