ফ্যাসিস্ট হাসিনা রেজিমের পতনের পর গত দেড় বছরে আবার এটা দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয়ে গেছে যে ভারত আমাদের বন্ধু বলে গণ্য করে না। কূটনৈতিক ভাষা পরিহার করলে বলতে হয়, ভারত আমাদের বন্ধু নয়। তার কার্যকলাপই বারবার তা বলে দিচ্ছে। আগে এ ব্যাপারে যাদের মধ্যে দ্বিধা ছিল, নিশ্চয়ই তারা মোহমুক্ত হয়েছেন। ভারত এখনো বাংলাদেশে একটি অনুগত সরকারকেই ক্ষমতায় দেখতে চায়। নয়াদিল্লি কোনোমতেই তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে কোনো সরকারকে ঢাকায় স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিতে ইচ্ছুক নয়। তারা দাদাগিরিরও ওপরে উঠে একেবারে প্রভুত্ব কায়েম রাখতে চায়। তারা বাংলাদেশকে একটা স্যাটেলাইট রাষ্ট্র হিসেবেই গণ্য করে এবং এখানে হাসিনা আমলের মতো ঔপনিবেশিক শোষণ অব্যাহত রাখতে চায়। হাসিনার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল নিজেকে বিকিয়ে দিয়ে হলেও ভারতের সহায়তায় নিজের, পরিবারের এবং দলের ক্ষমতা চিরস্থায়ীভাবে ধরে রাখা। আর ভারতের লক্ষ্য ছিল হাসিনা এবং আওয়ামী লীগকে যেকোনোভাবে ক্ষমতায় রেখে বাংলাদেশকে শোষণ করা ও পদতলে রাখা। বাংলাদেশের মানুষ এবং তার ন্যায্য স্বার্থ ছিল হিসাবের বাইরে।
সুবিধাভোগী দালাল এবং নয়াদিল্লির অন্ধ অনুসারীরাই শুধু এই সত্যটিকে অস্বীকার করতে পারেন। এদের নাগপাশ থেকে বের হতে না পারলে বাংলাদেশের মুক্তি নেই। এসব বিষয়ে অনেক লেখা হয়েছে। এখন আমাদের ঠিক করতে হবে কীভাবে আমরা ভারতকে হিসাবের বাইরে রেখে দেশটাকে ভালোভাবে চালাতে পারি। না, ভৌগোলিক অবস্থানটাই আমাদের এ রকম যে তিনদিক থেকে ভারতবেষ্টিত হয়ে আমরা তার ফিজিক্যাল উপস্থিতিটা অস্বীকার করতে পারি না। থাকুক সে তিনদিকে। কিন্তু তার সঙ্গে আমরা কি বড় ধরনের লেনদেন বা খুঁটিনাটি ব্যবসা-বাণিজ্য না করে চলতেই পারি না, যেখানে আমাদের স্বার্থ বিসর্জন দিতে হবে? ওখানে মার্কেটিং না করে কি আমরা বিয়ে-শাদি বা ঈদের অনুষ্ঠান করতে পারি না? চিকিৎসার জন্য কি কলকাতা, ভেলোরে না গেলেই নয়? যদি বাইরে যেতেই হয়, তাহলে বিকল্প দেশ কি নেই? গার্মেন্টসের তুলা আমদানির জন্য দেশের তো অভাব নেই। পেঁয়াজের মতো পণ্যের জন্য ভারতের ওপর নির্ভর না করলেও যে দেশের অসুবিধা হয় না, সেটি তো এবার প্রমাণিত হয়েছে। হ্যাঁ, দাম সামান্য কিছু বেশি পড়তে পারে। কিন্তু আধিপত্যবাদী প্রতিবেশীটি আমাদের বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিকভাবে যতটা শোষণ করছে, অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলাচ্ছে, ক্রীড়নক সরকার বসিয়ে অনেক বিষয়ে তারাই সিদ্ধান্ত দিয়ে যেতে চাইছে এবং আমাদের সার্বভৌমত্বের ওপর হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে, সে তুলনায় এই দাম কিছুই না।
প্রশ্ন উঠবে, তাহলে যে ওরা আমাদের পানিতে মারবে, জলে-স্থলে-আকাশে অবরোধ করবে। জি না—এটি এতটা সহজ না। ভারত পাকিস্তানে সিন্ধু নদের পানি সরবরাহ বন্ধ করে দিতে চাইছে। ইসলামাবাদ ইস্যুটিকে এ সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক আদালতে নিয়ে গেছে এবং আদালত ইতোমধ্যে পাকিস্তানের পক্ষে অস্থায়ী রায়ও দিয়েছে। নীল নদের পানির প্রবাহ নিয়েও উজানের দেশগুলো একতরফা সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান গঙ্গার পানি হিস্যার বিষয়টি জাতিসংঘে নিয়ে যাওয়ার পর ভারত কিন্তু এ ব্যাপারে বাংলাদেশের সঙ্গে পানিবণ্টন চুক্তি করতে বাধ্য হয়। তাতে শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশের নিম্নতম পানিপ্রাপ্তির নিশ্চয়তার বিধান (গ্যারান্টি ক্লজ) ছিল। পাকিস্তান আমলে আইয়ুব খানের সময় গঙ্গা ব্যারাজ নির্মাণের যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, তা বাস্তবায়িত হলে ভারত শীতকালে আমাদের পানি না দিয়ে শুকিয়ে কিংবা বর্ষাকালে অতিরিক্ত পানি ছেড়ে ডুবিয়ে মারার অবস্থা সৃষ্টি করতে পারত না। তিস্তায় তারা আমাদের ন্যায্য পানি দেবে না। চীনাদের তিস্তা প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে দিলে আমরা এ সমস্যারও সমাধান করতে পারব । এ জন্য দরকার দৃঢ় রাজনৈতিক ইচ্ছা। ভারতের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করার মতো সাহস। ভারত যদি বাধ্যতামূলক আন্তর্জাতিক চুক্তির মাধ্যমে তিস্তা চুক্তি করতে রাজি হয়, যা আমাদের ন্যায্য স্বার্থ রক্ষা করবে, তাহলে আমাদের বিকল্প চিন্তা করতে হতো না।
আইটি সেক্টর এবং গার্মেন্টস ম্যানেজমেন্টে ভারতীয়দের নিয়োগ আমাদের বরং ক্ষতি করেছে। এই সেক্টরে আমাদের নিজস্ব জনবলের এখন কোনো ঘাটতি নেই। বাংলাদেশে কর্মরত ভারতীয়রা প্রতিবছর আমাদের দেশ থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা নিয়ে যাচ্ছে, যা আমরা রোধ করতে পারি। যারা মনে করেন, ভারতীয় বিশেষজ্ঞ, পণ্য, মালামাল ছাড়া বাংলাদেশ অচল হয়ে যাবে, তাদের ধারণা ঠিক নয়। ভারত বাংলাদেশে গরু আসা বন্ধ করে দিয়েছিল। এখন আমরা এ খাতে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছি। তারা যদি ন্যায্যতার ভিত্তিতে আমাদের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য করতে চায়, তাহলে তা হবে দুদেশের জন্যই মঙ্গলজনক। নইলে আমাদের অবশ্যই বিকল্প ব্যবস্থা নিতে হবে।
বাংলাদেশকে উত্তর কোরিয়া হতে হবে না। বাইরে আমাদের বন্ধুর অভাব নেই। আমরা তিনদিকে ভারতবেষ্টিত হলেও আশপাশে অনেক দেশই আছে। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে আমাদের বেশ কিছু কৌশলগত অ্যাডভান্টেজও আছে। বঙ্গোপসাগর আমাদের বাইরের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ অবারিত করে দিয়েছে। ভারতীয় নৌশক্তিকে এত ভয় পাওয়ার কিছু নেই। চীন থেকে আনা সাবমেরিনকে নয়াদিল্লির ভয়ে কিংবা আনুকূল্য বহাল রাখার আশায় বসিয়ে রাখা নতজানু পররাষ্ট্রনীতির দৃষ্টান্ত মাত্র। আমরা নৌশক্তি কয়েকগুণ বাড়াতে পারি। আমাদের সাহায্য করার জন্য প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের অনেক শক্তিশালী মিত্রই রাজি। তবে উদ্যোগটা নিতে হবে আমাদের।
জিয়াউর রহমান বিশেষভাবে চাকমা এবং সার্বিকভাবে পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার সমাধান প্রায় করেই ফেলেছিলেন। দেশের রাজনীতির এক চরম ক্রান্তিকালে ভারতের চাপে তৎকালীন হাসিনা সরকার তথাকথিত পার্বত্য শান্তি চুক্তি করে জিয়াউর রহমান সমাধানটাকে উল্টোদিকে ঘুরিয়ে দেয়। এই চুক্তিতে সেখানকার বাঙালিদের রাজনৈতিক অধিকারের দৃষ্টিকোণ থেকে স্থায়ীভাবে সংখ্যালঘু বানিয়ে ফেলা হয়। অথচ বাস্তবে সংখ্যার অনুপাতে তারা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলোর প্রায় সমান। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলো পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমিপুত্র নয়, বিধায় আদিবাসীও নয়। এরা অনেকেই এখানে এসে আশ্রয় নিয়েছে মিয়ানমারের নির্যাতন থেকে মুক্তি পেতে। এক-দেড়শ বছর আগে অন্য দেশ থেকে বিতাড়িত হয়ে এখানে আশ্রয় পাওয়া চাকমা এবং অন্য ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলো হয়ে পড়েছে আদিবাসী আর একই দেশের সমতল ভূমি থেকে আসা বাঙালিরা হয়ে পড়েছে বহিরাগত—এ এক অবিশ্বাস্য দাবি। এমনকি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলোর আগমনের আগেও সেখানে সমতলভূমি থেকে যাওয়া মানুষের বসতি ছিল। এ সমস্যাটাও মূলত ভারতই তাদের স্বার্থে তৈরি করেছে। আমাদের দেশের কিছু অতি প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবী এই অন্যায্য দাবিকে সমর্থন করছে। এদের স্বকীয়তা রক্ষা করাসহ অর্থনৈতিক উন্নয়নে রাষ্ট্রকে অবশ্যই সবকিছু করতে হবে। সেটা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু ভিন্ন প্রসঙ্গ। ভারতের স্ট্র্যাটিজি হচ্ছে এই ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলোকে দিয়ে বাংলাদেশকে চাপের মধ্যে রাখা।
ভারত পঞ্চম বাহিনী তৈরি বা ব্যবহার করে বাংলাদেশকে চাপের মধ্যে রাখতে চায়। আমাদের উচিত হবে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করে তাদের মধ্যে এমন দৃঢ় ও দ্ব্যর্থহীন আস্থা স্থাপন করা, যাতে তারা নিশ্চিতভাবেই মনে করে বাংলাদেশের স্বার্থের সঙ্গেই তাদের স্থায়ী স্বার্থ নিহিত। আর এটা তো সবাই জানেন আমাদের দেশের সংখ্যালঘুরা ভারতের সংখ্যালঘুদের চেয়ে ঢের ভালো আছেন। আর তথাকথিত সুশীল সমাজের সদস্য হিসেবে লুকিয়ে থাকা তাদের চরদের মুখোশ অব্যাহতভাবে উন্মোচন করে যেতে হবে।
রিপোর্টারের নাম 

























