ঢাকা ০৪:৫৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

নেকাব বিতর্ক: নারীর পর্দাকে ঘিরে নতুন আলোচনা

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৯:১৬:৩৩ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৩ জানুয়ারী ২০২৬
  • ১ বার পড়া হয়েছে

সম্প্রতি বাংলাদেশের রাজনীতিতে নেকাব বা বোরকা পরিধানকে কেন্দ্র করে একটি বিতর্ক নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। একটি টেলিভিশন টক শোতে বিএনপি নেতা মোশাররফ হোসেনের একটি মন্তব্য এই বিতর্কের সূত্রপাত করে, যেখানে তিনি নেকাবকে মুসলিম নারীর অপরিহার্য পোশাক হিসেবে প্রত্যাখ্যান করে এর সঙ্গে নেতিবাচক অনুষঙ্গ যুক্ত করেন। তার এই মন্তব্যটি ধর্মপ্রাণ মুসলিম সমাজের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে, কারণ এটি কেবল মুসলিম নারীর পর্দার সঙ্গে সম্পর্কিত নয়, বরং ইসলামে ইবাদতের একটি অংশ হিসেবে বিবেচিত। এছাড়াও, কোনো ধর্ম বা গোষ্ঠীর নারীদের সম্পর্কে ঢালাওভাবে নেতিবাচক মন্তব্য করা ইসলামি মূল্যবোধের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।

ব্যক্তিগতভাবে, মোশাররফ হোসেনের দীর্ঘদিনের পরিচিতি এবং তার রাজনৈতিক অবস্থান বিবেচনায় এমন মন্তব্য বিস্ময়কর। তার এই বক্তব্যের পেছনের কারণ বা উদ্দেশ্য এখনো স্পষ্ট নয়। তবে, এটি ইসলামে পর্দার গুরুত্ব সম্পর্কে তার ধারণাগত বিভ্রান্তি অথবা অন্য কোনো উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্ররোচনা থেকেও উদ্ভূত হতে পারে। কোনো ধর্ম বা সম্প্রদায়ের নারীদের প্রতি আপত্তিকর মন্তব্য কোনোভাবেই কাম্য নয়, কারণ আল্লাহ তায়ালার হেদায়েতের মালিক তিনি এবং যেকোনো ব্যক্তিকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে পারেন।

অনেক সময় কিছু মানুষ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য বোরকা বা নেকাবের মতো পোশাক ব্যবহার করে। সম্প্রতি মোহাম্মদপুরের একটি নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর হত্যাকারী স্কুলছাত্রীর পোশাকে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনাটিও এই প্রসঙ্গে আলোচিত হয়েছে। কিন্তু কিছু অপরাধীর আচরণের জন্য সামগ্রিকভাবে এই পোশাকটিকে দায়ী করা বা এর মহৎ উদ্দেশ্যকে ক্ষুণ্ন করা যুক্তিযুক্ত নয়। একইভাবে, চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় নায়িকাদের জনসম্মুখে বোরকা পরিধানের উদাহরণ টেনে বোরকাকে তাদের পোশাক হিসেবে চিহ্নিত করাও ভুল। কোনো সাংবিধানিক বা ধর্মীয় বিষয়ে মন্তব্য করার ক্ষেত্রে সর্বদা সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত।

এই আলোচনার মূল উদ্দেশ্য মোশাররফ হোসেনের সমালোচনার পরিবর্তে সত্য উন্মোচন এবং আত্মশুদ্ধি। নেকাব, হিজাব, বোরকা – এগুলো সবই মুসলিম নারীদের পর্দার বিভিন্ন রূপ। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মুসলিম নারীরা আল্লাহ তায়ালার বিধান অনুযায়ী এই সকল পদ্ধতিতে পর্দা পালন করে আসছেন। হিজাবে সাধারণত মাথা ও ঘাড় আবৃত থাকে, মুখমণ্ডল খোলা থাকে। নেকাবে চোখ ছাড়া মুখমণ্ডল ও শরীর ঢাকা থাকে। আর বোরকায় মাথা, চোখ, মুখসহ পুরো শরীর আবৃত থাকে, তবে মুখমণ্ডলের উপর একটি জালের মতো অংশ থাকে যা দিয়ে পরিধানকারী দেখতে পায়। আফগানিস্তানে এই ধরনের বোরকা বেশি দেখা যায় এবং বাংলাদেশেও এর প্রচলন রয়েছে। বর্তমানে পর্দার ক্ষেত্রে আরও আধুনিক পদ্ধতিও প্রচলিত হয়েছে।

আরবি শব্দ ‘নেকাব’ অর্থ পর্দা বা আবরণ। ইসলামের শুরু থেকেই নারীরা এটি ব্যবহার করে আসছেন। প্রাক-ইসলামিক যুগেও অভিজাত নারীদের মধ্যে এর প্রচলন ছিল। ‘হিজাব’ শব্দের অর্থও পর্দা বা ঢেকে রাখা, যা ইসলামে বর্ণিত শালীনতা ও সম্ভ্রম নিশ্চিত করে। ‘বোরকা’ শব্দটি আরবি ‘বুরকু’ থেকে এসেছে, যার অর্থও পর্দা বা ঢেকে রাখা। বিভিন্ন দেশে এটি ভিন্ন ভিন্ন নামে পরিচিত, যেমন আফগানিস্তানে ‘চাদরি’ বা পশতু ভাষায় ‘চাদর’। সুতরাং, নেকাব নিয়ে কোনো ভিন্ন মন্তব্য এর মহৎ উদ্দেশ্যকে খাটো করার সুযোগ দেয় না।

ইসলামে আখলাক বা নৈতিকতার ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে সম্ভ্রম, বিনয় ও শালীনতা অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ তায়ালার বিধান অনুযায়ী পর্দা পালন প্রত্যেক মুসলমানের জন্য ফরজ। কোরআন ও হাদিসে এ বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। কোরআনুল কারিমের সাতটি আয়াত এবং প্রায় ৭০টি হাদিসে পর্দা সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। এটি গুরুত্বপূর্ণ যে, ইসলামে পর্দা কেবল নারীর জন্য নয়, পুরুষের জন্যও সমভাবে বাধ্যতামূলক। সমাজে এই ধারণা প্রচলিত যে, পর্দা কেবল নারীর জন্য নির্দিষ্ট, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে পুরুষের জন্য পর্দার আদেশ নারীর আগে এসেছে।

আল্লাহ তায়ালা পুরুষদের দৃষ্টি সংযত রাখা এবং লজ্জাস্থানের হেফাজতের নির্দেশ দিয়েছেন। অন্যদিকে, নারীদের ক্ষেত্রে দৃষ্টি সংযত রাখা ও লজ্জাস্থানের হেফাজতের পাশাপাশি শারীরিক সৌন্দর্য ঢেকে রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সূরা নূরের ৩০ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা মুমিন পুরুষদের দৃষ্টি সংযত রাখতে এবং লজ্জাস্থানের হেফাজত করতে বলেছেন। এটি তাদের জন্য অধিক পবিত্র। এরপর, সূরা নূরের ৩১ নম্বর আয়াতে মুমিন নারীদের দৃষ্টি সংযত রাখতে, লজ্জাস্থানের হেফাজত করতে এবং যা সাধারণত প্রকাশ পায় তা ছাড়া তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশ ঢেকে রাখে এবং নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তি ছাড়া কারো কাছে তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে।

এখানে দেখা যায়, আল্লাহ তায়ালা নারী ও পুরুষ উভয়েরই দৃষ্টি সংযত রাখা এবং লজ্জাস্থানের হেফাজতের কথা বলেছেন। পার্থক্য কেবল নারীর সৌন্দর্য প্রদর্শনের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা। রাসুলুল্লাহ (সা.) হজরত আলি (রা.)-কে একবারের বেশি কোনো নারীর দিকে তাকাতে নিষেধ করেছিলেন। সাহাবিরা এই বিধান অত্যন্ত কঠোরভাবে মেনে চলতেন। হজরত সালাবা বিন আবদুর রহমান (রা.)-এর ঘটনা এর একটি উদাহরণ। তিনি গোসলরত এক নারীর প্রতি অনিচ্ছাকৃতভাবে দৃষ্টি পড়ার কারণে ৪০ দিন আত্মগোপন করে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেছিলেন। এই ঘটনা আমাদের পর্দার ব্যাপারে উদাসীনতার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। তবে বর্তমানে বাংলাদেশসহ বিশ্বজুড়ে মুসলমানরা পর্দার ব্যাপারে পূর্বের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন।

একসময় অনেক মুসলিম দেশে, যেমন ইরান, আফগানিস্তান, মিশর ও তুরস্কে হিজাব বা বোরকা পরা নিষিদ্ধ ছিল। মোস্তফা কামাল পাশার শাসনামলে তুরস্কে পর্দা প্রথা সহ ইসলামের অনেক অবশ্য পালনীয় ইবাদত নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। সেখানে হিজাব পরিহিত নারীদের ভোট দেওয়ার অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। একইভাবে, ইরানের শাহেনশা রেজা শাহ পাহলভী ১৯৩৬ সালে ‘নারী মুক্তি দিবস’ ঘোষণা করে পর্দা বর্জন বাধ্যতামূলক করেছিলেন। পর্দা ব্যবহারকারী নারীদের সরকারি সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা হতো। আফগানিস্তানে বাদশাহ আমানুল্লাহ তার স্ত্রী রানী সুরাইয়াকে পর্দাহীন করে তথাকথিত আধুনিকতার প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেছিলেন। মিশরের নারী আন্দোলনের নেত্রী মাদাম শারাভি পাশা পর্দা বর্জনের মাধ্যমে এই প্রথার বিরুদ্ধে আন্দোলনকে গতিশীল করার চেষ্টা করেছিলেন। এসব ঘটনা ঔপনিবেশিক শাসনামলে ঘটেছিল, যখন ঔপনিবেশিক শক্তিগুলো পর্দা প্রথাকে আধুনিকতার বাধা হিসেবে দেখত।

কিন্তু সময়ের সাথে সাথে পরিস্থিতি বদলেছে। ২০০৩ সালে সৌদি আরবের একটি ঘটনা ছিল ব্যতিক্রমী। ব্রিটিশ ও ডাচ দূতাবাস পরিচালিত একটি স্কুলে মেয়েদের হিজাব নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। কিন্তু একজন মিসরীয় মেয়ের সাহসিকতার কারণে এবং জনরোষের মুখে সৌদি শিক্ষা মন্ত্রণালয় হস্তক্ষেপ করে স্কুল কর্তৃপক্ষকে সেই নিয়ম বাতিল করতে বাধ্য করে।

বর্তমানে মুসলিম নারীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে পর্দা পালন করছেন, শুধু মুসলিম দেশেই নয়, পশ্চিমা দেশগুলোতেও এর হার বাড়ছে। বাংলাদেশেও শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত নারীদের স্বতঃস্ফূর্ত পর্দা পালন এক নতুন দৃশ্যপট তৈরি করেছে। এই প্রেক্ষাপটে নেকাব ইস্যু নিয়ে বিতর্ক উসকে দেওয়া দুঃখজনক।

সূরা আল-ইমরানের ১১০ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন, “তোমরাই সর্বোত্তম উম্মা, সমগ্র মানবজাতির (কল্যাণের) জন্যই তোমাদের সৃষ্টি করা হয়েছে। তোমরা সৎকাজের আদেশ দেবে এবং অসৎকাজ থেকে বিরত রাখবে এবং তোমরা নিজেরা আল্লাহর ওপর (পুরোপুরি) ঈমান আনবে।” এই আয়াতের আলোকে, সকল মুসলমানের কর্তব্য হলো সমগ্র মানবতার জন্য সত্যের সাক্ষ্য প্রদান করা এবং যা সঠিক তারই পক্ষে অবিচল থাকা।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

ইরানে ইসরাইলি বাহিনীর বিমান হামলা: স্কুলছাত্রীসহ ৫ জনের মৃত্যু

নেকাব বিতর্ক: নারীর পর্দাকে ঘিরে নতুন আলোচনা

আপডেট সময় : ০৯:১৬:৩৩ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৩ জানুয়ারী ২০২৬

সম্প্রতি বাংলাদেশের রাজনীতিতে নেকাব বা বোরকা পরিধানকে কেন্দ্র করে একটি বিতর্ক নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। একটি টেলিভিশন টক শোতে বিএনপি নেতা মোশাররফ হোসেনের একটি মন্তব্য এই বিতর্কের সূত্রপাত করে, যেখানে তিনি নেকাবকে মুসলিম নারীর অপরিহার্য পোশাক হিসেবে প্রত্যাখ্যান করে এর সঙ্গে নেতিবাচক অনুষঙ্গ যুক্ত করেন। তার এই মন্তব্যটি ধর্মপ্রাণ মুসলিম সমাজের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে, কারণ এটি কেবল মুসলিম নারীর পর্দার সঙ্গে সম্পর্কিত নয়, বরং ইসলামে ইবাদতের একটি অংশ হিসেবে বিবেচিত। এছাড়াও, কোনো ধর্ম বা গোষ্ঠীর নারীদের সম্পর্কে ঢালাওভাবে নেতিবাচক মন্তব্য করা ইসলামি মূল্যবোধের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।

ব্যক্তিগতভাবে, মোশাররফ হোসেনের দীর্ঘদিনের পরিচিতি এবং তার রাজনৈতিক অবস্থান বিবেচনায় এমন মন্তব্য বিস্ময়কর। তার এই বক্তব্যের পেছনের কারণ বা উদ্দেশ্য এখনো স্পষ্ট নয়। তবে, এটি ইসলামে পর্দার গুরুত্ব সম্পর্কে তার ধারণাগত বিভ্রান্তি অথবা অন্য কোনো উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্ররোচনা থেকেও উদ্ভূত হতে পারে। কোনো ধর্ম বা সম্প্রদায়ের নারীদের প্রতি আপত্তিকর মন্তব্য কোনোভাবেই কাম্য নয়, কারণ আল্লাহ তায়ালার হেদায়েতের মালিক তিনি এবং যেকোনো ব্যক্তিকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে পারেন।

অনেক সময় কিছু মানুষ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য বোরকা বা নেকাবের মতো পোশাক ব্যবহার করে। সম্প্রতি মোহাম্মদপুরের একটি নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর হত্যাকারী স্কুলছাত্রীর পোশাকে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনাটিও এই প্রসঙ্গে আলোচিত হয়েছে। কিন্তু কিছু অপরাধীর আচরণের জন্য সামগ্রিকভাবে এই পোশাকটিকে দায়ী করা বা এর মহৎ উদ্দেশ্যকে ক্ষুণ্ন করা যুক্তিযুক্ত নয়। একইভাবে, চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় নায়িকাদের জনসম্মুখে বোরকা পরিধানের উদাহরণ টেনে বোরকাকে তাদের পোশাক হিসেবে চিহ্নিত করাও ভুল। কোনো সাংবিধানিক বা ধর্মীয় বিষয়ে মন্তব্য করার ক্ষেত্রে সর্বদা সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত।

এই আলোচনার মূল উদ্দেশ্য মোশাররফ হোসেনের সমালোচনার পরিবর্তে সত্য উন্মোচন এবং আত্মশুদ্ধি। নেকাব, হিজাব, বোরকা – এগুলো সবই মুসলিম নারীদের পর্দার বিভিন্ন রূপ। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মুসলিম নারীরা আল্লাহ তায়ালার বিধান অনুযায়ী এই সকল পদ্ধতিতে পর্দা পালন করে আসছেন। হিজাবে সাধারণত মাথা ও ঘাড় আবৃত থাকে, মুখমণ্ডল খোলা থাকে। নেকাবে চোখ ছাড়া মুখমণ্ডল ও শরীর ঢাকা থাকে। আর বোরকায় মাথা, চোখ, মুখসহ পুরো শরীর আবৃত থাকে, তবে মুখমণ্ডলের উপর একটি জালের মতো অংশ থাকে যা দিয়ে পরিধানকারী দেখতে পায়। আফগানিস্তানে এই ধরনের বোরকা বেশি দেখা যায় এবং বাংলাদেশেও এর প্রচলন রয়েছে। বর্তমানে পর্দার ক্ষেত্রে আরও আধুনিক পদ্ধতিও প্রচলিত হয়েছে।

আরবি শব্দ ‘নেকাব’ অর্থ পর্দা বা আবরণ। ইসলামের শুরু থেকেই নারীরা এটি ব্যবহার করে আসছেন। প্রাক-ইসলামিক যুগেও অভিজাত নারীদের মধ্যে এর প্রচলন ছিল। ‘হিজাব’ শব্দের অর্থও পর্দা বা ঢেকে রাখা, যা ইসলামে বর্ণিত শালীনতা ও সম্ভ্রম নিশ্চিত করে। ‘বোরকা’ শব্দটি আরবি ‘বুরকু’ থেকে এসেছে, যার অর্থও পর্দা বা ঢেকে রাখা। বিভিন্ন দেশে এটি ভিন্ন ভিন্ন নামে পরিচিত, যেমন আফগানিস্তানে ‘চাদরি’ বা পশতু ভাষায় ‘চাদর’। সুতরাং, নেকাব নিয়ে কোনো ভিন্ন মন্তব্য এর মহৎ উদ্দেশ্যকে খাটো করার সুযোগ দেয় না।

ইসলামে আখলাক বা নৈতিকতার ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে সম্ভ্রম, বিনয় ও শালীনতা অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ তায়ালার বিধান অনুযায়ী পর্দা পালন প্রত্যেক মুসলমানের জন্য ফরজ। কোরআন ও হাদিসে এ বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। কোরআনুল কারিমের সাতটি আয়াত এবং প্রায় ৭০টি হাদিসে পর্দা সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। এটি গুরুত্বপূর্ণ যে, ইসলামে পর্দা কেবল নারীর জন্য নয়, পুরুষের জন্যও সমভাবে বাধ্যতামূলক। সমাজে এই ধারণা প্রচলিত যে, পর্দা কেবল নারীর জন্য নির্দিষ্ট, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে পুরুষের জন্য পর্দার আদেশ নারীর আগে এসেছে।

আল্লাহ তায়ালা পুরুষদের দৃষ্টি সংযত রাখা এবং লজ্জাস্থানের হেফাজতের নির্দেশ দিয়েছেন। অন্যদিকে, নারীদের ক্ষেত্রে দৃষ্টি সংযত রাখা ও লজ্জাস্থানের হেফাজতের পাশাপাশি শারীরিক সৌন্দর্য ঢেকে রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সূরা নূরের ৩০ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা মুমিন পুরুষদের দৃষ্টি সংযত রাখতে এবং লজ্জাস্থানের হেফাজত করতে বলেছেন। এটি তাদের জন্য অধিক পবিত্র। এরপর, সূরা নূরের ৩১ নম্বর আয়াতে মুমিন নারীদের দৃষ্টি সংযত রাখতে, লজ্জাস্থানের হেফাজত করতে এবং যা সাধারণত প্রকাশ পায় তা ছাড়া তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশ ঢেকে রাখে এবং নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তি ছাড়া কারো কাছে তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে।

এখানে দেখা যায়, আল্লাহ তায়ালা নারী ও পুরুষ উভয়েরই দৃষ্টি সংযত রাখা এবং লজ্জাস্থানের হেফাজতের কথা বলেছেন। পার্থক্য কেবল নারীর সৌন্দর্য প্রদর্শনের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা। রাসুলুল্লাহ (সা.) হজরত আলি (রা.)-কে একবারের বেশি কোনো নারীর দিকে তাকাতে নিষেধ করেছিলেন। সাহাবিরা এই বিধান অত্যন্ত কঠোরভাবে মেনে চলতেন। হজরত সালাবা বিন আবদুর রহমান (রা.)-এর ঘটনা এর একটি উদাহরণ। তিনি গোসলরত এক নারীর প্রতি অনিচ্ছাকৃতভাবে দৃষ্টি পড়ার কারণে ৪০ দিন আত্মগোপন করে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেছিলেন। এই ঘটনা আমাদের পর্দার ব্যাপারে উদাসীনতার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। তবে বর্তমানে বাংলাদেশসহ বিশ্বজুড়ে মুসলমানরা পর্দার ব্যাপারে পূর্বের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন।

একসময় অনেক মুসলিম দেশে, যেমন ইরান, আফগানিস্তান, মিশর ও তুরস্কে হিজাব বা বোরকা পরা নিষিদ্ধ ছিল। মোস্তফা কামাল পাশার শাসনামলে তুরস্কে পর্দা প্রথা সহ ইসলামের অনেক অবশ্য পালনীয় ইবাদত নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। সেখানে হিজাব পরিহিত নারীদের ভোট দেওয়ার অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। একইভাবে, ইরানের শাহেনশা রেজা শাহ পাহলভী ১৯৩৬ সালে ‘নারী মুক্তি দিবস’ ঘোষণা করে পর্দা বর্জন বাধ্যতামূলক করেছিলেন। পর্দা ব্যবহারকারী নারীদের সরকারি সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা হতো। আফগানিস্তানে বাদশাহ আমানুল্লাহ তার স্ত্রী রানী সুরাইয়াকে পর্দাহীন করে তথাকথিত আধুনিকতার প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেছিলেন। মিশরের নারী আন্দোলনের নেত্রী মাদাম শারাভি পাশা পর্দা বর্জনের মাধ্যমে এই প্রথার বিরুদ্ধে আন্দোলনকে গতিশীল করার চেষ্টা করেছিলেন। এসব ঘটনা ঔপনিবেশিক শাসনামলে ঘটেছিল, যখন ঔপনিবেশিক শক্তিগুলো পর্দা প্রথাকে আধুনিকতার বাধা হিসেবে দেখত।

কিন্তু সময়ের সাথে সাথে পরিস্থিতি বদলেছে। ২০০৩ সালে সৌদি আরবের একটি ঘটনা ছিল ব্যতিক্রমী। ব্রিটিশ ও ডাচ দূতাবাস পরিচালিত একটি স্কুলে মেয়েদের হিজাব নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। কিন্তু একজন মিসরীয় মেয়ের সাহসিকতার কারণে এবং জনরোষের মুখে সৌদি শিক্ষা মন্ত্রণালয় হস্তক্ষেপ করে স্কুল কর্তৃপক্ষকে সেই নিয়ম বাতিল করতে বাধ্য করে।

বর্তমানে মুসলিম নারীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে পর্দা পালন করছেন, শুধু মুসলিম দেশেই নয়, পশ্চিমা দেশগুলোতেও এর হার বাড়ছে। বাংলাদেশেও শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত নারীদের স্বতঃস্ফূর্ত পর্দা পালন এক নতুন দৃশ্যপট তৈরি করেছে। এই প্রেক্ষাপটে নেকাব ইস্যু নিয়ে বিতর্ক উসকে দেওয়া দুঃখজনক।

সূরা আল-ইমরানের ১১০ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন, “তোমরাই সর্বোত্তম উম্মা, সমগ্র মানবজাতির (কল্যাণের) জন্যই তোমাদের সৃষ্টি করা হয়েছে। তোমরা সৎকাজের আদেশ দেবে এবং অসৎকাজ থেকে বিরত রাখবে এবং তোমরা নিজেরা আল্লাহর ওপর (পুরোপুরি) ঈমান আনবে।” এই আয়াতের আলোকে, সকল মুসলমানের কর্তব্য হলো সমগ্র মানবতার জন্য সত্যের সাক্ষ্য প্রদান করা এবং যা সঠিক তারই পক্ষে অবিচল থাকা।