ঢাকা ০৬:৫৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৩ এপ্রিল ২০২৬

পাঁচ কৃষিপণ্যের বাজারে মধ্যস্বত্বভোগীদের দাপট: উৎপাদক ও ভোক্তার লোকসানে পকেট ভারী হচ্ছে ফড়িয়াদের

দেশের বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পাঁচটি কৃষিপণ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির নেপথ্যে মধ্যস্বত্বভোগীদের অতি মুনাফা ও বাজার ব্যবস্থাপনার অদক্ষতাকে দায়ী করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। চাল, আলু, পেঁয়াজ, ব্রয়লার মুরগি ও ডিম—এই পণ্যগুলো হাতবদল হওয়ার প্রতিটি পর্যায়েই লাফিয়ে লাফিয়ে দাম বাড়ছে। ফলে কৃষক বা খামারিরা তাদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হলেও ভোক্তাদের গুনতে হচ্ছে অতিরিক্ত অর্থ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক সাম্প্রতিক গবেষণা প্রতিবেদনে এই উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে।

বুধবার ‘বাংলাদেশের কৃষিপণ্যের মূল্য শৃঙ্খল দক্ষতা’ শীর্ষক এই গবেষণা প্রতিবেদনটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের গবেষণা বিভাগের পরিচালক সেলিম আল মামুন এক সংবাদ সম্মেলনে প্রতিবেদনের বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন। গবেষণায় দেখা গেছে, বাজার ব্যবস্থায় বড় ব্যবসায়ী ও মিলমালিকদের একচ্ছত্র আধিপত্যের কারণে ক্ষুদ্র উৎপাদকরা ক্রমাগত লোকসানের মুখে পড়ছেন।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যমতে, দুই ধাপে এই গবেষণাটি পরিচালিত হয়েছে। প্রথম ধাপটি ছিল ২০২৫ সালের ৫ থেকে ১৬ জানুয়ারি এবং দ্বিতীয় ধাপটি সম্পন্ন হয় ১৫ জুন থেকে ২৭ জুলাই পর্যন্ত। দেশের ১৮টি জেলার ৬১টি উপজেলার ৪২৬ জন অংশীজনের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করে গত আগস্টে প্রতিবেদনটি চূড়ান্ত করা হয়।

গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, চালের বাজার এখন পুরোপুরি মিলারদের নিয়ন্ত্রণে। বোরো মৌসুমে প্রতি কেজি চাল উৎপাদনে কৃষকের খরচ ৫০ টাকা হলেও খুচরা বাজারে তা ৫৮ টাকা ৫০ পয়সায় বিক্রি হচ্ছে। তবে মিলাররা শুধু চাল বিক্রি করেই ক্ষান্ত নন, উপজাত হিসেবে তুষ ও কুঁড়া বিক্রি করে প্রতি মণে অতিরিক্ত ১০৬ টাকা আয় করছেন। মিলারদের এই বাড়তি মুনাফার চাপ শেষ পর্যন্ত সাধারণ ভোক্তার ওপর গিয়ে পড়ছে।

আলুর বাজারে মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব আরও ভয়াবহ। কৃষক পর্যায়ে প্রতি কেজি আলুর উৎপাদন খরচ ১০ টাকা ৬৩ পয়সা এবং তারা তা ১৮ টাকা ৪৪ পয়সায় বিক্রি করেন। কিন্তু হিমাগার থেকে বের হওয়ার পর সেই আলুর দাম ২৮ টাকা ৮০ পয়সায় পৌঁছায় এবং খুচরা বাজারে গিয়ে ঠেকে ৪৫ টাকা ৮০ পয়সায়। গবেষণায় বলা হয়েছে, হিমাগার গেট থেকে খুচরা বাজার পর্যন্ত পৌঁছাতেই মধ্যস্বত্বভোগীরা বড় অঙ্কের মুনাফা লুটে নিচ্ছে। অথচ হিমাগারের ভাড়া কমিয়ে আলুর দাম নিয়ন্ত্রণের সুযোগ রয়েছে।

পেঁয়াজের ক্ষেত্রে বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে অনুন্নত সংরক্ষণ ব্যবস্থা। দীর্ঘ সময় সংরক্ষণের ফলে পেঁয়াজের ওজন উল্লেখযোগ্য হারে কমে যায়, যা অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর সময়ে বাজারে সরবরাহ সংকট তৈরি করে। তবে পেঁয়াজের বাজারে কোনো সিন্ডিকেট বা কৃত্রিম সংকটের অকাট্য প্রমাণ পায়নি কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বরং পচনশীল এই পণ্যের সঠিক বাজারজাতকরণ ও আধুনিক সংরক্ষণের অভাবকেই দাম বাড়ার প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

পোল্ট্রি খাতের চিত্র আরও হতাশাজনক। গবেষণায় দেখা গেছে, ব্রয়লার মুরগি ও ডিম উৎপাদনের ব্যয়ের সিংহভাগই (প্রায় ৭৫ থেকে ৮৫ শতাংশ) চলে যায় খাবারের পেছনে। ফিড মিল মালিকরা উচ্চমূল্যে খাবার বিক্রি করে লাভবান হলেও ক্ষুদ্র খামারিরা অনেক সময় উৎপাদন খরচের চেয়েও কম দামে পণ্য বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। ব্রয়লার মুরগির ক্ষেত্রে খামারিদের কেজিপ্রতি খরচ ১৬৩ টাকা ৫৩ পয়সা হলেও খুচরা বাজারে তা ১৯৫ টাকার উপরে বিক্রি হচ্ছে। একইভাবে ডিমের ক্ষেত্রেও উৎপাদন খরচের তুলনায় খুচরা বাজারের ব্যবধান অনেক বেশি।

বাজারের এই অস্থিরতা দূর করতে বাংলাদেশ ব্যাংক বেশ কিছু সুপারিশ পেশ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে—আলু ও পেঁয়াজের জন্য আধুনিক ও বিকল্প সংরক্ষণাগার নির্মাণ, কৃষকদের জন্য সরাসরি নগদ সহায়তা প্রদান, পোল্ট্রি ফিডের দাম নিয়মিত তদারকি এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমাতে ক্ষুদ্র খামারিদের জন্য ‘কন্ট্রাক্ট ফার্মিং’ বা চুক্তিভিত্তিক চাষাবাদ মডেল চালু করা। বাজার ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা না গেলে ভোক্তা ও উৎপাদক উভয়েরই স্বার্থ ক্ষুণ্ণ হতে থাকবে বলে প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

‘ইরানকে দমানোর সক্ষমতা নিয়ে ভুল ধারণা পোষণ করছে যুক্তরাষ্ট্র’

পাঁচ কৃষিপণ্যের বাজারে মধ্যস্বত্বভোগীদের দাপট: উৎপাদক ও ভোক্তার লোকসানে পকেট ভারী হচ্ছে ফড়িয়াদের

আপডেট সময় : ০৯:২৯:৫৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ২১ জানুয়ারী ২০২৬

দেশের বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পাঁচটি কৃষিপণ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির নেপথ্যে মধ্যস্বত্বভোগীদের অতি মুনাফা ও বাজার ব্যবস্থাপনার অদক্ষতাকে দায়ী করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। চাল, আলু, পেঁয়াজ, ব্রয়লার মুরগি ও ডিম—এই পণ্যগুলো হাতবদল হওয়ার প্রতিটি পর্যায়েই লাফিয়ে লাফিয়ে দাম বাড়ছে। ফলে কৃষক বা খামারিরা তাদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হলেও ভোক্তাদের গুনতে হচ্ছে অতিরিক্ত অর্থ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক সাম্প্রতিক গবেষণা প্রতিবেদনে এই উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে।

বুধবার ‘বাংলাদেশের কৃষিপণ্যের মূল্য শৃঙ্খল দক্ষতা’ শীর্ষক এই গবেষণা প্রতিবেদনটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের গবেষণা বিভাগের পরিচালক সেলিম আল মামুন এক সংবাদ সম্মেলনে প্রতিবেদনের বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন। গবেষণায় দেখা গেছে, বাজার ব্যবস্থায় বড় ব্যবসায়ী ও মিলমালিকদের একচ্ছত্র আধিপত্যের কারণে ক্ষুদ্র উৎপাদকরা ক্রমাগত লোকসানের মুখে পড়ছেন।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যমতে, দুই ধাপে এই গবেষণাটি পরিচালিত হয়েছে। প্রথম ধাপটি ছিল ২০২৫ সালের ৫ থেকে ১৬ জানুয়ারি এবং দ্বিতীয় ধাপটি সম্পন্ন হয় ১৫ জুন থেকে ২৭ জুলাই পর্যন্ত। দেশের ১৮টি জেলার ৬১টি উপজেলার ৪২৬ জন অংশীজনের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করে গত আগস্টে প্রতিবেদনটি চূড়ান্ত করা হয়।

গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, চালের বাজার এখন পুরোপুরি মিলারদের নিয়ন্ত্রণে। বোরো মৌসুমে প্রতি কেজি চাল উৎপাদনে কৃষকের খরচ ৫০ টাকা হলেও খুচরা বাজারে তা ৫৮ টাকা ৫০ পয়সায় বিক্রি হচ্ছে। তবে মিলাররা শুধু চাল বিক্রি করেই ক্ষান্ত নন, উপজাত হিসেবে তুষ ও কুঁড়া বিক্রি করে প্রতি মণে অতিরিক্ত ১০৬ টাকা আয় করছেন। মিলারদের এই বাড়তি মুনাফার চাপ শেষ পর্যন্ত সাধারণ ভোক্তার ওপর গিয়ে পড়ছে।

আলুর বাজারে মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব আরও ভয়াবহ। কৃষক পর্যায়ে প্রতি কেজি আলুর উৎপাদন খরচ ১০ টাকা ৬৩ পয়সা এবং তারা তা ১৮ টাকা ৪৪ পয়সায় বিক্রি করেন। কিন্তু হিমাগার থেকে বের হওয়ার পর সেই আলুর দাম ২৮ টাকা ৮০ পয়সায় পৌঁছায় এবং খুচরা বাজারে গিয়ে ঠেকে ৪৫ টাকা ৮০ পয়সায়। গবেষণায় বলা হয়েছে, হিমাগার গেট থেকে খুচরা বাজার পর্যন্ত পৌঁছাতেই মধ্যস্বত্বভোগীরা বড় অঙ্কের মুনাফা লুটে নিচ্ছে। অথচ হিমাগারের ভাড়া কমিয়ে আলুর দাম নিয়ন্ত্রণের সুযোগ রয়েছে।

পেঁয়াজের ক্ষেত্রে বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে অনুন্নত সংরক্ষণ ব্যবস্থা। দীর্ঘ সময় সংরক্ষণের ফলে পেঁয়াজের ওজন উল্লেখযোগ্য হারে কমে যায়, যা অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর সময়ে বাজারে সরবরাহ সংকট তৈরি করে। তবে পেঁয়াজের বাজারে কোনো সিন্ডিকেট বা কৃত্রিম সংকটের অকাট্য প্রমাণ পায়নি কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বরং পচনশীল এই পণ্যের সঠিক বাজারজাতকরণ ও আধুনিক সংরক্ষণের অভাবকেই দাম বাড়ার প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

পোল্ট্রি খাতের চিত্র আরও হতাশাজনক। গবেষণায় দেখা গেছে, ব্রয়লার মুরগি ও ডিম উৎপাদনের ব্যয়ের সিংহভাগই (প্রায় ৭৫ থেকে ৮৫ শতাংশ) চলে যায় খাবারের পেছনে। ফিড মিল মালিকরা উচ্চমূল্যে খাবার বিক্রি করে লাভবান হলেও ক্ষুদ্র খামারিরা অনেক সময় উৎপাদন খরচের চেয়েও কম দামে পণ্য বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। ব্রয়লার মুরগির ক্ষেত্রে খামারিদের কেজিপ্রতি খরচ ১৬৩ টাকা ৫৩ পয়সা হলেও খুচরা বাজারে তা ১৯৫ টাকার উপরে বিক্রি হচ্ছে। একইভাবে ডিমের ক্ষেত্রেও উৎপাদন খরচের তুলনায় খুচরা বাজারের ব্যবধান অনেক বেশি।

বাজারের এই অস্থিরতা দূর করতে বাংলাদেশ ব্যাংক বেশ কিছু সুপারিশ পেশ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে—আলু ও পেঁয়াজের জন্য আধুনিক ও বিকল্প সংরক্ষণাগার নির্মাণ, কৃষকদের জন্য সরাসরি নগদ সহায়তা প্রদান, পোল্ট্রি ফিডের দাম নিয়মিত তদারকি এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমাতে ক্ষুদ্র খামারিদের জন্য ‘কন্ট্রাক্ট ফার্মিং’ বা চুক্তিভিত্তিক চাষাবাদ মডেল চালু করা। বাজার ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা না গেলে ভোক্তা ও উৎপাদক উভয়েরই স্বার্থ ক্ষুণ্ণ হতে থাকবে বলে প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে।