বিশ্ববাজারে পণ্যমূল্য ও জ্বালানি তেলের দাম কমলেও তার সুফল পাচ্ছে না বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ। দেশের অর্থনীতির প্রধান সূচকগুলো—যেমন বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি এবং ডলার সংকটের উপশম—স্বস্তির ইঙ্গিত দিলেও বাজারে মূল্যস্ফীতি এখন ঊর্ধ্বমুখী। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে কেন্দ্র করে সচল হওয়া ‘নির্বাচনি অর্থনীতি’ এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। নির্বাচন সংশ্লিষ্ট সরকারি ও ব্যক্তিগত ব্যয়, কালোটাকার প্রবাহ এবং রেকর্ড পরিমাণ রেমিট্যান্সের ফলে বাজারে নগদ অর্থের সরবরাহ বাড়লেও তার বড় অংশই যাচ্ছে অনুৎপাদনশীল খাতে, যা সরাসরি পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, গত চার বছর ধরে আইএমএফের পরামর্শে নীতি সুদহার বাড়িয়ে (বর্তমানে ১০ শতাংশ) যে সংকোচনমুখী মুদ্রানীতি চালানো হচ্ছে, তা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কার্যত অকার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। বিবিএসের তথ্যমতে, ২০২৫ সাল শেষে গড় মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৮.৭৭ শতাংশে, যা দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বোচ্চ। অথচ একই সময়ে ভারত ১ শতাংশের নিচে এবং শ্রীলঙ্কা ২ শতাংশের কাছাকাছি মূল্যস্ফীতি নামিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে। বাংলাদেশে এই ব্যর্থতার মূল কারণ হিসেবে বাজার সিন্ডিকেট, দুর্বল তদারকি এবং সরবরাহ চেইনের মধ্যস্থভোগীদের দৌরাত্ম্যকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেল ও চালের দাম কমলেও আমদানিকারক ও খুচরা বিক্রেতাদের যোগসাজশে অভ্যন্তরীণ বাজারে দাম কমছে না।
নির্বাচন কমিশন এবারের নির্বাচনের জন্য প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে, যা গত বছরের তুলনায় দুই হাজার কোটি টাকা বেশি। অন্যদিকে, প্রার্থীদের নির্বাচনি ব্যয় ও কালোটাকার প্রভাব বাজারের তারল্য বাড়িয়ে দিচ্ছে। জানুয়ারির প্রথম ১৯ দিনেই ২.১২ বিলিয়ন ডলারের বেশি রেমিট্যান্স এসেছে, যা গত বছরের তুলনায় ৫৬ শতাংশ বেশি। এই রেমিট্যান্সের বিপরীতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজার থেকে ডলার কিনে রেকর্ড পরিমাণ টাকা (প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা) বাজারে ছেড়েছে, যা প্রকারান্তরে মূল্যস্ফীতির চাপকে উসকে দিচ্ছে। ড. মুস্তফা কে মুজেরীর মতে, বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি চাহিদাজনিত নয়, বরং সরবরাহ ব্যবস্থার ত্রুটির ফল। ফলে কেবল সুদহার বাড়িয়ে ঋণের খরচ বাড়ানোয় বেসরকারি বিনিয়োগ কমছে, কিন্তু পণ্যের দাম কমছে না।
সামনে রমজান ও ঈদ থাকায় ফেব্রুয়ারিতে মূল্যস্ফীতি নতুন উচ্চতায় পৌঁছানোর আশঙ্কা করা হচ্ছে। সানেমের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক সেলিম রায়হান মনে করেন, কেবল মুদ্রানীতি দিয়ে এই সংকট সমাধান সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন গভীর প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও বাজার ব্যবস্থাপনায় কঠোর হস্তক্ষেপ। যদি এখনই সিন্ডিকেট ও কৃত্রিম সংকট নিয়ন্ত্রণ করা না যায়, তবে নির্বাচনি ব্যয়ের এই বাড়তি চাপ সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়কে অসহনীয় পর্যায়ে নিয়ে যাবে।
রিপোর্টারের নাম 

























