দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে আজ সারা দেশে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের মধ্যে নির্বাচনি প্রতীক বরাদ্দ করা হবে। প্রতীক হাতে পেয়েই আগামীকাল থেকে পুরোদমে ভোটের লড়াইয়ে নামবেন প্রার্থীরা। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ও গণভোট একই দিনে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিনে ৩০৫ জন সরে দাঁড়ানোয় চূড়ান্ত লড়াইয়ে এখন পর্যন্ত প্রায় এক হাজার ৯৬৭ জন প্রার্থী রয়েছেন। তবে পাবনার দুটি আসনে পুনঃতফসিল এবং উচ্চ আদালতে আপিল নিষ্পত্তির পর এ সংখ্যা কিছুটা বাড়তে পারে।
নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা যায়, গতকাল প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিনে তিন শতাধিক প্রার্থী তাঁদের মনোনয়ন প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। আজ রিটার্নিং কর্মকর্তারা নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের প্রার্থীদের দলীয় প্রতীক বরাদ্দ দেবেন। স্বতন্ত্র প্রার্থীরা নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত প্রতীকগুলো থেকে নিজেদের পছন্দমতো প্রতীক বেছে নিতে পারবেন। একাধিক প্রার্থীর একই প্রতীক পছন্দের ক্ষেত্রে লটারির মাধ্যমে তা নিষ্পত্তি করা হবে।
আগামীকাল বৃহস্পতিবার থেকে আনুষ্ঠানিক প্রচার কার্যক্রম শুরু করবে বিএনপি, জামায়াতসহ সব রাজনৈতিক দল। এই প্রচার চলবে ১০ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৭টা পর্যন্ত। তফসিল অনুযায়ী, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকাল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে ব্যালট পেপারের মাধ্যমে ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হবে।
দলীয় প্রার্থীর সংখ্যায় এগিয়ে রয়েছে বিএনপি। ২৯০টি আসনে তাদের প্রার্থী রয়েছে। জামায়াতে ইসলামীর ২১৬ জন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ২৫৯ জন, জাতীয় পার্টির (জাপা) ১৯৬ জন, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ৩০ জন এবং গণঅধিকার পরিষদের ৯২ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এবারের নির্বাচনে তিন শতাধিক স্বতন্ত্র প্রার্থী রয়েছেন, যাদের মধ্যে অর্ধশতাধিক প্রার্থীকে বিএনপির বিদ্রোহী বলে জানা গেছে। কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের বহিষ্কৃত নেতা সাবেক মন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকীও স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ভোটযুদ্ধে অংশ নিচ্ছেন।
এবার সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি একটি গণভোটও অনুষ্ঠিত হচ্ছে। গণভোটের পক্ষে সরকার ব্যাপক প্রচার চালাচ্ছে। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস সম্প্রতি এক ভিডিও বার্তায় দেশবাসীকে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। সরকারের অন্য উপদেষ্টারাও দেশের বিভিন্ন অঞ্চল সফর করে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে জনমত তৈরি করছেন। সরকারি বিভিন্ন দপ্তর থেকেও গণভোটের পক্ষে প্রচার চালানো হচ্ছে।
বিশেষ ব্যবস্থায় প্রথমবারের মতো প্রবাসী ও দেশের অভ্যন্তরে তিন ধরনের বিশেষ ব্যক্তির জন্য অনলাইনে নিবন্ধনের মাধ্যমে পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। এরই মধ্যে ১৫ লাখ ৩৩ হাজারের বেশি নাগরিক এই প্রক্রিয়ায় নিবন্ধন করেছেন।
নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত ৬০টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ৫১টি দল মনোনয়নপত্র দাখিল করলেও শেষ পর্যন্ত ৪৯টি দল নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। নির্বাহী আদেশে কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ায় আওয়ামী লীগের নিবন্ধন স্থগিত রয়েছে এবং দলটি নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না। এছাড়া আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের কয়েকটি দলও এই নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে না। নির্বাচন থেকে বিরত থাকা ১১টি নিবন্ধিত দলের মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশের সাম্যবাদী দল (এমএল), কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ, বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি, বিকল্প ধারা বাংলাদেশ, বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশন, তৃণমূল বিএনপি, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আন্দোলন (বিএনএম), জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি-জাগপা এবং জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, গত ৪ জানুয়ারি রিটার্নিং কর্মকর্তারা ৩০০ নির্বাচনি এলাকায় দুই হাজার ৫৮৫টি মনোনয়নপত্রের মধ্যে এক হাজার ৮৫৮টি বৈধ ঘোষণা করেন এবং ৭২২টি বাতিল করেন। তবে আদালতের আদেশে পাবনা-১ ও পাবনা-২ আসনের নির্বাচন সাময়িকভাবে স্থগিত হয়েছিল। পরবর্তীতে নিষেধাজ্ঞা উঠে গেলে ভোটের তারিখ অপরিবর্তিত রেখে ওই দুটি আসনের জন্য পুনঃতফসিল ঘোষণা করা হয়। আগামী ২৬ জানুয়ারি এ দুটি আসনের চূড়ান্ত প্রার্থীর সংখ্যা জানা যাবে। রিটার্নিং কর্মকর্তার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ইসিতে ৬৪৫টি আপিল আবেদন জমা পড়েছিল, যার মধ্যে আপিলে ৪৩১ জন প্রার্থিতা ফেরত পাওয়ায় প্রার্থীর সংখ্যা দাঁড়ায় দুই হাজার ২৮৯ জনে। গতকাল ৩০৫ জন প্রত্যাহার করার পর চূড়ান্ত প্রার্থীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৯৬৭ জনে।
দলভিত্তিক আসন বিন্যাস ও জোটের চিত্র:
বিএনপি সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯০টি আসনে প্রার্থী দিয়েছে। দলটি শরিকদের জন্য আটটি আসন ছেড়ে দিয়েছে। এছাড়া যুগপৎ আন্দোলনের শরিক আটজন নেতা বিএনপিতে যোগ দিয়ে ধানের শীষ প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তে প্রার্থিতা বাতিল হওয়ায় কুমিল্লা-৪ ও চট্টগ্রাম-২ আসনে বর্তমানে বিএনপির কোনো প্রার্থী নেই। এই দুই আসনের প্রার্থীরা উচ্চ আদালতে আপিল করেছেন বলে জানা গেছে। বিএনপির জোটভুক্ত পাঁচটি দলের আটজন প্রার্থী নিজস্ব প্রতীকে ভোট করছেন। এর মধ্যে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম চারটি আসনে, গণঅধিকার পরিষদ, বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, গণসংহতি আন্দোলন ও বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির-বিজেপি একটি করে আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। শরিকদের মধ্যে এনপিপির চেয়ারম্যান ফরিদুজ্জামান ফরহাদ, ইসলামী ঐক্যজোটের রশীদ আহমদ, এনডিএমের চেয়ারম্যান ববি হাজ্জাজ, বাংলাদেশ জাতীয় দলের চেয়ারম্যান সৈয়দ এহসানুল হুদা, বিএলডিপির (একাংশ) চেয়ারম্যান শাহাদাত হোসেন সেলিম, রেজা কিবরিয়া, রাশেদ খান এবং এলডিপির মহাসচিব ড. রেদোয়ান আহমেদ বিএনপিতে যোগ দিয়ে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করছেন।
এদিকে, মাহমুদুর রহমান মান্নার নেতৃত্বাধীন নাগরিক ঐক্য বিএনপি জোটের সঙ্গে থাকলেও বনিবনা না হওয়ায় শেষ মুহূর্তে দলটি জোট থেকে বেরিয়ে গেছে। নাগরিক ঐক্য বর্তমানে ১২টি আসনে নিজস্ব প্রতীকে নির্বাচন করছে। মাহমুদুর রহমান মান্না বগুড়া-২ ও ঢাকা-১৮ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১০ দলীয় জোট ২৯৯টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। এই জোট থেকে বেরিয়ে যাওয়া ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সিনিয়র নায়েবে আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ ফয়জুল করীমের প্রতি সম্মান জানিয়ে বরিশাল-৫ আসনে প্রার্থী দেয়নি জোটটি। এই জোটের দলগুলোর মধ্যে জামায়াতে ইসলামী এককভাবে ২১৬টি আসনে প্রার্থী দিয়ে ৮৩টি আসন শরিকদের জন্য ছেড়ে দিয়েছে। জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ২৮টি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ২৩টি, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) ৭টি, খেলাফত মজলিস ১১টি, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি ২টি, আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টি ৩টি এবং বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি (বিডিপি) ২টি আসনে একক প্রার্থী হিসেবে ভোট করছে। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ জোটের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকলেও আসন ভাগাভাগি ইস্যুতে তারা জোট থেকে বেরিয়ে এককভাবে ২৫৯টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে।
প্রচারণায় নামছেন শীর্ষ নেতারা:
বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান সিলেট থেকে নির্বাচনি প্রচার শুরু করবেন। আগামীকাল সকাল ৯টায় তিনি হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজার জিয়ারত করে সকাল ১১টায় সিলেট আলিয়া মাদরাসা মাঠে প্রথম নির্বাচনি জনসভায় বক্তব্য দেবেন। এরপর তিনি মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কিশোরগঞ্জের ভৈরব, নরসিংদী ও নারায়ণগঞ্জে জনসভায় অংশ নিয়ে ২৩ জানুয়ারি সড়কপথে ঢাকায় ফিরবেন।
সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন এলাকায় সফর করবেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। আগামীকাল ঢাকা মহানগরীর মধ্য দিয়ে এই সফর শুরু হবে। এরপর তিনি দুদিনের সফরে উত্তরবঙ্গে যাবেন। ডা. শফিকুর আগামীকাল তাঁর নির্বাচনি এলাকা ঢাকা-১৫ আসনভুক্ত মিরপুর ১০ নম্বর গোলচক্কর এলাকায় গণসংযোগ ও নির্বাচনি জনসভায় অংশ নেবেন। পরদিন ২৩ জানুয়ারি তিনি দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও ও রংপুরে নির্বাচনি জনসভায় বক্তব্য দেবেন।
ভোটকেন্দ্র ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা:
এবারের সংসদ নির্বাচনে প্রায় পৌনে ১৩ কোটি ভোটারের জন্য ৪২ হাজার ৭৬১টি ভোটকেন্দ্র এবং দুই লাখ ৪৫ হাজারের বেশি ভোটকক্ষ থাকছে। ৩০০ আসনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েনের ক্ষেত্রে ভোটকেন্দ্রের গুরুত্ব বিবেচনা করে প্রতিটি কেন্দ্রে ১৬ থেকে ১৮ জন নিরাপত্তা সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন। সংসদ নির্বাচন ও গণভোট একসঙ্গে হওয়ায় প্রতিটি ভোটকক্ষে সিল দেওয়ার গোপন কক্ষ (মার্কিং প্লেস) বাড়ানো হয়েছে।
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী জানিয়েছেন, নিরাপত্তার নিরিখে ৫৯ শতাংশ ভোটকেন্দ্রই ঝুঁকিপূর্ণ। তিনি উল্লেখ করেন, মোট ৪২ হাজার ৭৬১টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে আট হাজার ৭৮০টি অধিক গুরুত্বপূর্ণ, ১৬ হাজার ৫৪৮টি গুরুত্বপূর্ণ এবং ১৭ হাজার ৪৩৩টি সাধারণ ভোটকেন্দ্র। নির্বাচনে সব মিলিয়ে প্রায় ৯ লাখ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হবে। এর মধ্যে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর এক লাখ, নৌবাহিনীর পাঁচ হাজার, বিমানবাহিনীর তিন হাজার ৭৩০, পুলিশের এক লাখ ৪৯ হাজার ৪৪৩, আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর পাঁচ লাখ ৭৬ হাজার ৩১৪, বিজিবির ৩৭ হাজার ৪৫৩, কোস্টগার্ডের তিন হাজার ৫৮৫, র্যাবের সাত হাজার ৭০০ জন এবং সাপোর্ট সার্ভিস হিসেবে ফায়ার সার্ভিসের ১৩ হাজার ৩৯০ জন সদস্য থাকবেন।
রিপোর্টারের নাম 
























