ঢাকা ১২:২৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ০৭ মার্চ ২০২৬

সীতাকুণ্ডের ছলিমপুরে র‍্যাব সদস্য হত্যা: সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্যে যৌথ অভিযানের প্রস্তুতি

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০১:৪৪:৩৬ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২১ জানুয়ারী ২০২৬
  • ৩ বার পড়া হয়েছে

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের জঙ্গল ছলিমপুরে সন্ত্রাসীদের হাতে র‍্যাবের এক উপসহকারী পরিচালক (ডিএডি) নিহত এবং তিন সদস্য গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনা দেশজুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে। দুর্গম এই পাহাড়ি এলাকা দীর্ঘদিন ধরেই অপরাধীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিচিত। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ওপর এমন নৃশংস হামলা এবং একজন র‍্যাব সদস্যকে অপহরণ করে বিবস্ত্র করে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা এটিই প্রথম। এই ঘটনার পর এলাকাটিতে সন্ত্রাসীদের দৌরাত্ম্য বন্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বড় ধরনের যৌথ অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে।

ঘটনার বিবরণ অনুযায়ী, চট্টগ্রামের শীর্ষ সন্ত্রাসী ইয়াসিন তার সহযোগীদের নিয়ে ছলিমপুরের একটি স্থাপনায় অবস্থান করছে—এমন গোপন সংবাদের ভিত্তিতে সেখানে অভিযান চালায় র‍্যাব। সাদা পোশাকে চার সদস্যের একটি র‍্যাব দল ওই স্থাপনার ভেতরে প্রবেশ করলে ইয়াসিনের সহযোগীরা মাইকে ঘোষণা দিয়ে তাদের চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলে। একপর্যায়ে চার র‍্যাব সদস্যকে ওই স্থাপনার মধ্যে আটকে ফেলা হয়। কিছুক্ষণ পর তাদের সেখান থেকে বের করে পিটাতে পিটাতে সিএনজিতে তুলে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে আলীনগরের ভেতরে নিয়ে যায় সন্ত্রাসীরা। সেখানে একটি ঘরে আটকে দফায় দফায় মারপিট করা হয় চারজনকেই। গুরুতর আহতদের মধ্যে র‍্যাব-৭ এর উপসহকারী পরিচালক আব্দুল মোতালেব পরবর্তীতে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। অন্য তিন র‍্যাব সদস্যের মধ্যে একজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় তাকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) রাখা হয়েছে। তবে এই চাঞ্চল্যকর ঘটনার পরও পুলিশ কাউকে আটক করতে পারেনি।

এদিকে, উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক ডা. কমল কদর দাবি করেছেন, জঙ্গল ছলিমপুরে তাদের কোনো কার্যালয় নেই। তিনি জানান, গত দেড় বছরে তিনি বা বিএনপির কোনো পদধারী নেতা ছলিমপুরে যাননি বা দলীয় কোনো কর্মসূচি সেখানে পালিত হয়নি। এই ন্যক্কারজনক হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে বিএনপির দূরতম কোনো সম্পর্ক নেই বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, যে স্থাপনাটিকে ঘিরে ঘটনা ঘটেছে, সেটি আগে আওয়ামী লীগের কার্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত হতো এবং মশিউর ও গফুর মেম্বার নামে দুই সন্ত্রাসী এটি পরিচালনা করত। একটি বিশেষ ঘটনার পর তারা পালিয়ে গেলে উত্তর জেলা যুবদলের বহিষ্কৃত যুগ্ম সম্পাদক রোকন উদ্দিন মেম্বার কার্যালয়টি দখল করে সেখানে বিএনপির কার্যালয়ের সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দেন। তবে পার্শ্ববর্তী আলীনগরের অধিপতি হিসেবে পরিচিত আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী ইয়াসিন জঙ্গল ছলিমপুরের নিয়ন্ত্রণ নিতে চেষ্টা করলে দুপক্ষের মধ্যে একাধিক ছোট-বড় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

গত বছরের ৩১ আগস্ট ছলিমপুরের দুর্গম পাহাড়ে সেনাবাহিনী অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদসহ রোকন মেম্বারের চার অনুসারীকে গ্রেপ্তার করে। এসব নিয়ে গত ৪ অক্টোবর দুপক্ষের মধ্যে সংঘর্ষে রোকনের সমর্থক দুজন নিহত হন। এর জেরে রোকনকে যুবদল থেকে বহিষ্কার করা হয় এবং পেশিশক্তিতে পেরে না উঠে তিনি এলাকা ছাড়তে বাধ্য হন। তখন থেকেই ওই কার্যালয়টি জঙ্গল ছলিমপুরের শীর্ষ সন্ত্রাসী ইয়াসিন বাহিনীর দখলে চলে আসে। গত সোমবার ইয়াসিন কার্যালয়টি উদ্বোধনের ঘোষণা দিলে রোকনের লোকজন হামলা চালায় এবং দুপক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এর কিছু সময় পরই সেখানে র‍্যাব অভিযান চালায়।

প্রশাসনের ওপর হামলা প্রথম নয়
জঙ্গল ছলিমপুরে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ওপর হামলার ঘটনা এবারই প্রথম নয়। এর আগেও দফায় দফায় জেলা প্রশাসন, পুলিশ, পরিবেশ অধিদপ্তরসহ একাধিক সরকারি কর্মকর্তার ওপর হামলা চালানো হয়েছে। ২০২৩ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর জঙ্গল ছলিমপুর ছিন্নমূল বরইতলা ২ নম্বর সমাজ এলাকায় পাহাড় থেকে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ শেষে ফেরার পথে হামলায় জেলা প্রশাসনের তৎকালীন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এবং সীতাকুণ্ড থানার ওসিসহ অন্তত ২০ জন আহত হন। এর আগের বছর ২০২২ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি র‍্যাবের সঙ্গে জঙ্গল ছলিমপুরে সন্ত্রাসীদের গুলি বিনিময়ের ঘটনা ঘটেছিল। একই বছরের ২ আগস্ট অবৈধ ঘরবাড়ি উচ্ছেদ অভিযান শেষে ফেরার পথে জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের পথরোধ করা হয়। ২০২২ সালের ৮ সেপ্টেম্বর আলীনগরে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে গেলে সন্ত্রাসীরা পুলিশের ওপর হামলা চালায়।

যেভাবে হলো সন্ত্রাসীদের আখড়া
সীতাকুণ্ড ও বায়েজিদের একাংশ নিয়ে গঠিত জঙ্গল ছলিমপুর এলাকা শহরের কাছাকাছি হলেও পাহাড়বেষ্টিত ও দুর্গম হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে সন্ত্রাসীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়েছে। প্রায় তিন হাজার একর সরকারি খাসজমি দখল করে গড়ে ওঠা বিশাল এই বসতিতে নব্বইয়ের দশকে সন্ত্রাসী আলী আক্কাস পাহাড় কেটে বসতি স্থাপন শুরু করে। পরে আক্কাস র‍্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হলে তার সহযোগী কাজী মশিউর রহমান, ইয়াসিন মিয়া, গফুর মেম্বার ও গাজী সাদেক এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেয়। অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের একপর্যায়ে ইয়াসিন আরো ভেতরে গিয়ে আলীনগর ও নবীনগর নামে নতুন আস্তানা গড়ে তোলে। রাজনৈতিক মধ্যস্থতায় ইয়াসিন আলীনগর ও নবীনগরের নিয়ন্ত্রণ পায়, আর জঙ্গল ছলিমপুরে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে মশিউর ও গফুর। দুর্গম অবস্থানের কারণে এলাকাটি স্থানীয় ও নগরীর সন্ত্রাসীদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়ে পরিণত হয়।

স্থানীয় রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর মশিউর ও গফুর পালিয়ে গেলে রোকন মেম্বার জঙ্গল ছলিমপুরের নিয়ন্ত্রণ নেন। তবে আলীনগর ও জঙ্গল ছলিমপুরের দখল নিয়ে ইয়াসিন ও রোকনের পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষে গত ১৬ মাসে অন্তত পাঁচজন নিহত হন। পুলিশের ভাষ্য, সব হত্যাকাণ্ডের পেছনে রয়েছে পাহাড়ি এলাকার নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য বিস্তারের দ্বন্দ্ব।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর চট্টগ্রাম জেলা সম্পাদক অ্যাডভোকেট আখতার কবির বলেন, প্রায় এক লাখ মানুষের বসবাস এবং ভোটের রাজনীতির কারণে এলাকাটিতে রাজনৈতিক প্রভাব রয়েছে। প্রকাশ্যে না হলেও সন্ত্রাসীরা পরোক্ষভাবে রাজনৈতিক ছত্রছায়া পাচ্ছে। রাজনৈতিক দলগুলো ও প্রশাসন একাট্টা হয়ে সন্ত্রাসীদের আস্তানা গুঁড়িয়ে দেওয়া উচিত।

যৌথ অভিযান পরিচালনার পরিকল্পনা
চট্টগ্রামের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ রাসেল জানিয়েছেন, জঙ্গল ছলিমপুর ও আলীনগরে সন্ত্রাসীদের আখড়া ভাঙতে না পারলে নগরীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে না। এ কারণে র‍্যাব, পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সহায়তায় শিগগির বড় ধরনের অভিযানের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

র‍্যাবের মহাপরিচালক একেএম শহিদুর রহমান মঙ্গলবার দুপুরে বলেন, জঙ্গল ছলিমপুরে শিগগির যৌথবাহিনীর অভিযান শুরু হবে। এতে সেনাবাহিনী, বিজিবি, এপিবিএন, পুলিশ, জেলা প্রশাসনসহ বিভিন্ন বাহিনী ও সংস্থাকে যুক্ত করা হবে। বড় পরিসরে এই অভিযানের লক্ষ্য হবে অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার, সরকারি খাসজমি উদ্ধার এবং র‍্যাব সদস্য আব্দুল মোতালেব হত্যার বিচার নিশ্চিত করা।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

সীতাকুণ্ডের ছলিমপুরে র‍্যাব সদস্য হত্যা: সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্যে যৌথ অভিযানের প্রস্তুতি

আপডেট সময় : ০১:৪৪:৩৬ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২১ জানুয়ারী ২০২৬

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের জঙ্গল ছলিমপুরে সন্ত্রাসীদের হাতে র‍্যাবের এক উপসহকারী পরিচালক (ডিএডি) নিহত এবং তিন সদস্য গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনা দেশজুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে। দুর্গম এই পাহাড়ি এলাকা দীর্ঘদিন ধরেই অপরাধীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিচিত। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ওপর এমন নৃশংস হামলা এবং একজন র‍্যাব সদস্যকে অপহরণ করে বিবস্ত্র করে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা এটিই প্রথম। এই ঘটনার পর এলাকাটিতে সন্ত্রাসীদের দৌরাত্ম্য বন্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বড় ধরনের যৌথ অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে।

ঘটনার বিবরণ অনুযায়ী, চট্টগ্রামের শীর্ষ সন্ত্রাসী ইয়াসিন তার সহযোগীদের নিয়ে ছলিমপুরের একটি স্থাপনায় অবস্থান করছে—এমন গোপন সংবাদের ভিত্তিতে সেখানে অভিযান চালায় র‍্যাব। সাদা পোশাকে চার সদস্যের একটি র‍্যাব দল ওই স্থাপনার ভেতরে প্রবেশ করলে ইয়াসিনের সহযোগীরা মাইকে ঘোষণা দিয়ে তাদের চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলে। একপর্যায়ে চার র‍্যাব সদস্যকে ওই স্থাপনার মধ্যে আটকে ফেলা হয়। কিছুক্ষণ পর তাদের সেখান থেকে বের করে পিটাতে পিটাতে সিএনজিতে তুলে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে আলীনগরের ভেতরে নিয়ে যায় সন্ত্রাসীরা। সেখানে একটি ঘরে আটকে দফায় দফায় মারপিট করা হয় চারজনকেই। গুরুতর আহতদের মধ্যে র‍্যাব-৭ এর উপসহকারী পরিচালক আব্দুল মোতালেব পরবর্তীতে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। অন্য তিন র‍্যাব সদস্যের মধ্যে একজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় তাকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) রাখা হয়েছে। তবে এই চাঞ্চল্যকর ঘটনার পরও পুলিশ কাউকে আটক করতে পারেনি।

এদিকে, উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক ডা. কমল কদর দাবি করেছেন, জঙ্গল ছলিমপুরে তাদের কোনো কার্যালয় নেই। তিনি জানান, গত দেড় বছরে তিনি বা বিএনপির কোনো পদধারী নেতা ছলিমপুরে যাননি বা দলীয় কোনো কর্মসূচি সেখানে পালিত হয়নি। এই ন্যক্কারজনক হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে বিএনপির দূরতম কোনো সম্পর্ক নেই বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, যে স্থাপনাটিকে ঘিরে ঘটনা ঘটেছে, সেটি আগে আওয়ামী লীগের কার্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত হতো এবং মশিউর ও গফুর মেম্বার নামে দুই সন্ত্রাসী এটি পরিচালনা করত। একটি বিশেষ ঘটনার পর তারা পালিয়ে গেলে উত্তর জেলা যুবদলের বহিষ্কৃত যুগ্ম সম্পাদক রোকন উদ্দিন মেম্বার কার্যালয়টি দখল করে সেখানে বিএনপির কার্যালয়ের সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দেন। তবে পার্শ্ববর্তী আলীনগরের অধিপতি হিসেবে পরিচিত আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী ইয়াসিন জঙ্গল ছলিমপুরের নিয়ন্ত্রণ নিতে চেষ্টা করলে দুপক্ষের মধ্যে একাধিক ছোট-বড় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

গত বছরের ৩১ আগস্ট ছলিমপুরের দুর্গম পাহাড়ে সেনাবাহিনী অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদসহ রোকন মেম্বারের চার অনুসারীকে গ্রেপ্তার করে। এসব নিয়ে গত ৪ অক্টোবর দুপক্ষের মধ্যে সংঘর্ষে রোকনের সমর্থক দুজন নিহত হন। এর জেরে রোকনকে যুবদল থেকে বহিষ্কার করা হয় এবং পেশিশক্তিতে পেরে না উঠে তিনি এলাকা ছাড়তে বাধ্য হন। তখন থেকেই ওই কার্যালয়টি জঙ্গল ছলিমপুরের শীর্ষ সন্ত্রাসী ইয়াসিন বাহিনীর দখলে চলে আসে। গত সোমবার ইয়াসিন কার্যালয়টি উদ্বোধনের ঘোষণা দিলে রোকনের লোকজন হামলা চালায় এবং দুপক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এর কিছু সময় পরই সেখানে র‍্যাব অভিযান চালায়।

প্রশাসনের ওপর হামলা প্রথম নয়
জঙ্গল ছলিমপুরে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ওপর হামলার ঘটনা এবারই প্রথম নয়। এর আগেও দফায় দফায় জেলা প্রশাসন, পুলিশ, পরিবেশ অধিদপ্তরসহ একাধিক সরকারি কর্মকর্তার ওপর হামলা চালানো হয়েছে। ২০২৩ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর জঙ্গল ছলিমপুর ছিন্নমূল বরইতলা ২ নম্বর সমাজ এলাকায় পাহাড় থেকে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ শেষে ফেরার পথে হামলায় জেলা প্রশাসনের তৎকালীন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এবং সীতাকুণ্ড থানার ওসিসহ অন্তত ২০ জন আহত হন। এর আগের বছর ২০২২ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি র‍্যাবের সঙ্গে জঙ্গল ছলিমপুরে সন্ত্রাসীদের গুলি বিনিময়ের ঘটনা ঘটেছিল। একই বছরের ২ আগস্ট অবৈধ ঘরবাড়ি উচ্ছেদ অভিযান শেষে ফেরার পথে জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের পথরোধ করা হয়। ২০২২ সালের ৮ সেপ্টেম্বর আলীনগরে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে গেলে সন্ত্রাসীরা পুলিশের ওপর হামলা চালায়।

যেভাবে হলো সন্ত্রাসীদের আখড়া
সীতাকুণ্ড ও বায়েজিদের একাংশ নিয়ে গঠিত জঙ্গল ছলিমপুর এলাকা শহরের কাছাকাছি হলেও পাহাড়বেষ্টিত ও দুর্গম হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে সন্ত্রাসীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়েছে। প্রায় তিন হাজার একর সরকারি খাসজমি দখল করে গড়ে ওঠা বিশাল এই বসতিতে নব্বইয়ের দশকে সন্ত্রাসী আলী আক্কাস পাহাড় কেটে বসতি স্থাপন শুরু করে। পরে আক্কাস র‍্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হলে তার সহযোগী কাজী মশিউর রহমান, ইয়াসিন মিয়া, গফুর মেম্বার ও গাজী সাদেক এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেয়। অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের একপর্যায়ে ইয়াসিন আরো ভেতরে গিয়ে আলীনগর ও নবীনগর নামে নতুন আস্তানা গড়ে তোলে। রাজনৈতিক মধ্যস্থতায় ইয়াসিন আলীনগর ও নবীনগরের নিয়ন্ত্রণ পায়, আর জঙ্গল ছলিমপুরে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে মশিউর ও গফুর। দুর্গম অবস্থানের কারণে এলাকাটি স্থানীয় ও নগরীর সন্ত্রাসীদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়ে পরিণত হয়।

স্থানীয় রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর মশিউর ও গফুর পালিয়ে গেলে রোকন মেম্বার জঙ্গল ছলিমপুরের নিয়ন্ত্রণ নেন। তবে আলীনগর ও জঙ্গল ছলিমপুরের দখল নিয়ে ইয়াসিন ও রোকনের পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষে গত ১৬ মাসে অন্তত পাঁচজন নিহত হন। পুলিশের ভাষ্য, সব হত্যাকাণ্ডের পেছনে রয়েছে পাহাড়ি এলাকার নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য বিস্তারের দ্বন্দ্ব।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর চট্টগ্রাম জেলা সম্পাদক অ্যাডভোকেট আখতার কবির বলেন, প্রায় এক লাখ মানুষের বসবাস এবং ভোটের রাজনীতির কারণে এলাকাটিতে রাজনৈতিক প্রভাব রয়েছে। প্রকাশ্যে না হলেও সন্ত্রাসীরা পরোক্ষভাবে রাজনৈতিক ছত্রছায়া পাচ্ছে। রাজনৈতিক দলগুলো ও প্রশাসন একাট্টা হয়ে সন্ত্রাসীদের আস্তানা গুঁড়িয়ে দেওয়া উচিত।

যৌথ অভিযান পরিচালনার পরিকল্পনা
চট্টগ্রামের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ রাসেল জানিয়েছেন, জঙ্গল ছলিমপুর ও আলীনগরে সন্ত্রাসীদের আখড়া ভাঙতে না পারলে নগরীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে না। এ কারণে র‍্যাব, পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সহায়তায় শিগগির বড় ধরনের অভিযানের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

র‍্যাবের মহাপরিচালক একেএম শহিদুর রহমান মঙ্গলবার দুপুরে বলেন, জঙ্গল ছলিমপুরে শিগগির যৌথবাহিনীর অভিযান শুরু হবে। এতে সেনাবাহিনী, বিজিবি, এপিবিএন, পুলিশ, জেলা প্রশাসনসহ বিভিন্ন বাহিনী ও সংস্থাকে যুক্ত করা হবে। বড় পরিসরে এই অভিযানের লক্ষ্য হবে অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার, সরকারি খাসজমি উদ্ধার এবং র‍্যাব সদস্য আব্দুল মোতালেব হত্যার বিচার নিশ্চিত করা।