ঢাকা ০৯:০৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬

উড্ডয়নের ৯ মিনিটের মাথায় আটলান্টিকে বিধ্বস্ত বিমানের ধ্বংসাবশেষ মিলল ৭৪ বছর পর

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৭:২৩:০০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬
  • ২ বার পড়া হয়েছে

উড্ডয়নের মাত্র ৯ মিনিটের মাথায় উত্তাল আটলান্টিক মহাসাগরে সরাসরি আছড়ে পড়েছিল আন্তর্জাতিক আকাশসেবা সংস্থা প্যান আমেরিকান এয়ারওয়েজের একটি যাত্রীবাহী ডিসি-৪ বিমান। ঐতিহাসিক সেই ভয়াবহ দুর্ঘটনার দীর্ঘ ৭৪ বছর পর অবশেষে আটলান্টিক সমুদ্রের প্রায় দুই হাজার ফুট গভীর তলদেশে মিলেছে সেই বিমানের নিখোঁজ ধ্বংসাবশেষ। আধুনিক সোনার প্রযুক্তি এবং পানির নিচে স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলাচলকারী বিশেষ ড্রোন ব্যবহার করে বিশদ অনুসন্ধান চালিয়ে এই ধ্বংসাবশেষ সফলভাবে শনাক্ত করেছে আন্তর্জাতিক অনুসন্ধানকারী একটি প্রতিনিধি দল।

নথিপত্র অনুযায়ী, ১৯৫২ সালের ১১ এপ্রিল স্থানীয় সময় দুপুর ঠিক ১২টা ১১ মিনিটে ক্যারিবীয় দ্বীপ পুয়ের্তো রিকোর সান হুয়ানের ইসলা গ্রান্দে বিমানবন্দর থেকে আমেরিকার নিউইয়র্কের উদ্দেশে উড্ডয়ন করেছিল প্যান আমেরিকান এয়ারওয়েজের ‘ডগলাস ডিসি-৪ ফ্লাইট ৫২৬এ’। তবে আকাশে ওড়ার মাত্র ৯ মিনিট পর বিমানটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সজোড়ে আটলান্টিক মহাসাগরে আছড়ে পড়ে।

অভিশপ্ত সেই বিমানটিতে মোট ৬৪ জন যাত্রী এবং পাইলটসহ পাঁচজন দক্ষ ক্রু সদস্য উপস্থিত ছিলেন। দুর্ঘটনার পর তৎকালীন উদ্ধার অভিযানে অত্যন্ত অলৌকিকভাবে মাত্র ১৭ জনকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছিল। তবে বিমানটিতে থাকা বাকি সকল যাত্রী আটলান্টিক মহাসাগরের গভীরে সলিলসমাধিতে প্রাণ হারান। মূলত দুর্ঘটনার তিন মিনিটের মধ্যেই পুরোদমে ভেঙে পড়া বিমানটি সমুদ্রের গভীরে তলিয়ে গিয়েছিল।

দীর্ঘ ৭৪ বছরের দীর্ঘ অপেক্ষার পর আন্তর্জাতিক ডিসকভারি চ্যানেলের বিখ্যাত ‘এক্সপেডিশন আননোন’ অনুষ্ঠানের গবেষক দলের সদস্যরা অসাধ্য সাধন করে বিমানের এই ধ্বংসাবশেষ খুঁজে পান। ঐতিহাসিক এই অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের নামী সংস্থা ‘এয়ার/সি হেরিটেজ ফাউন্ডেশন’ এবং ‘ডিপ সি ভিশন’ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত ভূমিকা পালন করেছে। অভিযানের সাফল্যের বিষয়ে এয়ার/সি হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের সম্মানিত সভাপতি রাস ম্যাথিউস আবেগপ্রবণ হয়ে বলেন, ‘এই আবিষ্কারে আমরা যেমন বিস্ময় প্রকাশ করছি, তেমনই একইভাবে উচ্ছ্বসিত। এত বছর আগে করুণ এই জায়গায় ঠিক যা ঘটেছিল, তা আমরা অত্যন্ত বিনম্র ভাবে স্মরণ করছি।’

অভিযান পরিচালনাকারী বিশেষজ্ঞ অনুসন্ধানকারীরা জানিয়েছেন, পুয়ের্তো রিকোর কাছে সমুদ্রের প্রায় দুই হাজার ফুট গভীরে বিমানের মূল ধ্বংসাবশেষটি নির্ভুলভাবে শনাক্ত করা হয়েছে। ১৯৫২ সালের সেই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার পর পরবর্তীতে বহুবার বিশ্বমানের একাধিক অনুসন্ধান চালানো হলেও এতদিন কোনো সাফল্য পাওয়া যায়নি। এবার উচ্চ রেজল্যুশনের আধুনিক সোনার প্রযুক্তি এবং পানির নিচে চলতে সক্ষম উচ্চ প্রযুক্তির ড্রোন ব্যবহার করে সমুদ্রের তলদেশে ধ্বংসাবশেষটির আসল অবস্থান নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে। ডিসকভারি চ্যানেল সূত্রে জানা গেছে, পুয়ের্তো রিকোর উত্তর উপকূল থেকে কিছু দূরত্বে অবস্থিত আটলান্টিক মহাসাগরের তলদেশে বিধ্বস্ত বিমানটির মূল ভাঙা অংশ পাওয়া গেছে।

তৎকালীন অফিশিয়াল তদন্ত প্রতিবেদনে জানা যায়, প্যান আমেরিকান বিমানটির অভ্যন্তরীণ রক্ষণাবেক্ষণের চরম ত্রুটির কারণেই মূল দুর্ঘটনাটি ঘটেছিল। ইসলা গ্রান্দে থেকে উড্ডয়নের কিছুক্ষণের মধ্যেই বিমানের গুরুত্বপূর্ণ তিন নম্বর ইঞ্জিনটি আকাশে পুরোপুরি বিকল হয়ে পড়ে। তখন বিমানটির উচ্চতা ছিল ভূমি থেকে মাত্র ৩৫০ ফুট। পরিস্থিতি মারাত্মক বুঝে অভিজ্ঞ পাইলট ক্যাপ্টেন জন সি. বার্ন বিমানটি আবার জরুরি ভিত্তিতে পুয়ের্তো রিকোয় ফিরিয়ে নেওয়ার সাহসী সিদ্ধান্ত নেন। তিনি বিমানের গতি ও দিক পরিবর্তন করে ৫৫০ ফুট পর্যন্ত ওপরে তুলতে সক্ষম হয়েছিলেন। কিন্তু ঠিক তখনই বিমানের চার নম্বর ইঞ্জিনটিও একইভাবে বিকল হয়ে পড়ে। এর পরপরই বিমানটি দ্রুত উচ্চতা হারিয়ে সজোড়ে সমুদ্রে আছড়ে পড়ে।

অভিজ্ঞ পাইলট ক্যাপ্টেন জন সি. বার্ন অতি দ্রুত জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে সমুদ্রে বিমান অবতরণের ঝুকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তিনি তাৎক্ষণিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের কোস্ট গার্ডকে মেসেজ পাঠিয়ে জানান, ইসলা গ্রান্দে বিমানবন্দর থেকে প্রায় সাত মাইল উত্তর-উত্তর-পশ্চিমে তিনি সরাসরি পানিতে বিমান অবতরণ করাচ্ছেন।

ঘটনার দিন দুপুর ১২টা ২০ মিনিটে বিমানটি আটলান্টিকের পানিতে আঘাত হানে। প্রচণ্ড আঘাতে সাগরপৃষ্ঠেই বিমানটি দুই টুকরো হয়ে গেলেও প্রাথমিক মুহূর্তে অনেক যাত্রীই জীবিত ছিলেন। তাঁরা সমুদ্রে ভেসে থাকা বিমানের ভাঙা ডানার অংশ ধরে বেঁচে থাকার আকুল চেষ্টা করেন। তবে পরে উদ্ধারকারী দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছালেও সাগরের উত্তাল ঢেউ এবং অত্যন্ত ঠান্ডা পানির দরুন অনেক যাত্রী লাইফবোটে উঠতে ব্যর্থ হন, যার ফলে তাঁদের আর জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।

ঐতিহাসিক এই বড় দুর্ঘটনার পরই মূলত বিশ্বজুড়ে সমুদ্রপথে চলাচলকারী সকল বিমানের সাধারণ যাত্রীদের জন্য জরুরি বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে কীভাবে বাঁচতে হবে, তার বিশেষ প্রশিক্ষণ ও মহড়া বাধ্যতামূলক করা হয়। একই সঙ্গে বর্তমানে প্রতিটি ফ্লাইটে উড্ডয়নের আগে নিরাপত্তাজনিত নিয়মাবলী সরাসরি প্রদর্শন, লাইফ জ্যাকেটের ব্যবহার এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিধিমালা কঠোরভাবে মেনে চলা বাধ্যতামূলক করা হয়।

তদন্তে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য বের হয় যে, দীর্ঘদিন যাবত ওই বিমানের ইঞ্জিনগুলোর সঠিক ও যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়নি। ইঞ্জিনের কয়েকটি অতি গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশে বড় ধরনের ত্রুটি থাকা সত্ত্বেও উড্ডয়নের আগে তা শনাক্ত করা হয়নি। তদন্তকারীরা শেষ পর্যন্ত মারাত্মক যান্ত্রিক ত্রুটি এবং এনসিটিবির মতোই প্রশাসনিক ও প্রযুক্তিগত রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতিকেই দুর্ঘটনার মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেন। তবে ভয়াবহ দুর্ঘটনা থেকে অলৌকিকভাবে বেঁচে যাওয়া পাইলট প্রধান ক্যাপ্টেন জন সি. বার্নকে আইনি প্রক্রিয়া শেষে সকল দায় থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছিল।

দুর্ঘটনার পর থেকেই ওই প্যান আমেরিকান বিমানের সমুদ্রের তলদেশের ধ্বংসাবশেষ নিয়ে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানীদের তীব্র আগ্রহ ছিল। তবে বহুবার তল্লাশি চালানো হলেও ইতিপূর্বে এর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি, এমনকি সাম্প্রতিক ২০২৪ সালেও পরিচালিত একটি বড় অভিযান ব্যর্থ হয়েছিল। তবে অবশেষে সাম্প্রতিক উচ্চ প্রযুক্তির সহায়তায় ধ্বংসাবশেষ শনাক্ত সম্ভব হয়েছে এবং সমুদ্রের তলদেশ থেকে প্রায় সাড়ে তিন লাখ ছবি তোলা হয়েছে। তবে গবেষকরা জানিয়েছেন, পানিতে প্রাণ হারানো যাত্রীদের দেহাবশেষ উদ্ধারের কোনো রূপরেখা আপাতত নেই।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

ইডিএফ ঋণের মেয়াদ বাড়লো ২৭০ দিন, নতুন নীতিমালা জারি করলো কেন্দ্রীয় ব্যাংক

উড্ডয়নের ৯ মিনিটের মাথায় আটলান্টিকে বিধ্বস্ত বিমানের ধ্বংসাবশেষ মিলল ৭৪ বছর পর

আপডেট সময় : ০৭:২৩:০০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬

উড্ডয়নের মাত্র ৯ মিনিটের মাথায় উত্তাল আটলান্টিক মহাসাগরে সরাসরি আছড়ে পড়েছিল আন্তর্জাতিক আকাশসেবা সংস্থা প্যান আমেরিকান এয়ারওয়েজের একটি যাত্রীবাহী ডিসি-৪ বিমান। ঐতিহাসিক সেই ভয়াবহ দুর্ঘটনার দীর্ঘ ৭৪ বছর পর অবশেষে আটলান্টিক সমুদ্রের প্রায় দুই হাজার ফুট গভীর তলদেশে মিলেছে সেই বিমানের নিখোঁজ ধ্বংসাবশেষ। আধুনিক সোনার প্রযুক্তি এবং পানির নিচে স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলাচলকারী বিশেষ ড্রোন ব্যবহার করে বিশদ অনুসন্ধান চালিয়ে এই ধ্বংসাবশেষ সফলভাবে শনাক্ত করেছে আন্তর্জাতিক অনুসন্ধানকারী একটি প্রতিনিধি দল।

নথিপত্র অনুযায়ী, ১৯৫২ সালের ১১ এপ্রিল স্থানীয় সময় দুপুর ঠিক ১২টা ১১ মিনিটে ক্যারিবীয় দ্বীপ পুয়ের্তো রিকোর সান হুয়ানের ইসলা গ্রান্দে বিমানবন্দর থেকে আমেরিকার নিউইয়র্কের উদ্দেশে উড্ডয়ন করেছিল প্যান আমেরিকান এয়ারওয়েজের ‘ডগলাস ডিসি-৪ ফ্লাইট ৫২৬এ’। তবে আকাশে ওড়ার মাত্র ৯ মিনিট পর বিমানটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সজোড়ে আটলান্টিক মহাসাগরে আছড়ে পড়ে।

অভিশপ্ত সেই বিমানটিতে মোট ৬৪ জন যাত্রী এবং পাইলটসহ পাঁচজন দক্ষ ক্রু সদস্য উপস্থিত ছিলেন। দুর্ঘটনার পর তৎকালীন উদ্ধার অভিযানে অত্যন্ত অলৌকিকভাবে মাত্র ১৭ জনকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছিল। তবে বিমানটিতে থাকা বাকি সকল যাত্রী আটলান্টিক মহাসাগরের গভীরে সলিলসমাধিতে প্রাণ হারান। মূলত দুর্ঘটনার তিন মিনিটের মধ্যেই পুরোদমে ভেঙে পড়া বিমানটি সমুদ্রের গভীরে তলিয়ে গিয়েছিল।

দীর্ঘ ৭৪ বছরের দীর্ঘ অপেক্ষার পর আন্তর্জাতিক ডিসকভারি চ্যানেলের বিখ্যাত ‘এক্সপেডিশন আননোন’ অনুষ্ঠানের গবেষক দলের সদস্যরা অসাধ্য সাধন করে বিমানের এই ধ্বংসাবশেষ খুঁজে পান। ঐতিহাসিক এই অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের নামী সংস্থা ‘এয়ার/সি হেরিটেজ ফাউন্ডেশন’ এবং ‘ডিপ সি ভিশন’ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত ভূমিকা পালন করেছে। অভিযানের সাফল্যের বিষয়ে এয়ার/সি হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের সম্মানিত সভাপতি রাস ম্যাথিউস আবেগপ্রবণ হয়ে বলেন, ‘এই আবিষ্কারে আমরা যেমন বিস্ময় প্রকাশ করছি, তেমনই একইভাবে উচ্ছ্বসিত। এত বছর আগে করুণ এই জায়গায় ঠিক যা ঘটেছিল, তা আমরা অত্যন্ত বিনম্র ভাবে স্মরণ করছি।’

অভিযান পরিচালনাকারী বিশেষজ্ঞ অনুসন্ধানকারীরা জানিয়েছেন, পুয়ের্তো রিকোর কাছে সমুদ্রের প্রায় দুই হাজার ফুট গভীরে বিমানের মূল ধ্বংসাবশেষটি নির্ভুলভাবে শনাক্ত করা হয়েছে। ১৯৫২ সালের সেই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার পর পরবর্তীতে বহুবার বিশ্বমানের একাধিক অনুসন্ধান চালানো হলেও এতদিন কোনো সাফল্য পাওয়া যায়নি। এবার উচ্চ রেজল্যুশনের আধুনিক সোনার প্রযুক্তি এবং পানির নিচে চলতে সক্ষম উচ্চ প্রযুক্তির ড্রোন ব্যবহার করে সমুদ্রের তলদেশে ধ্বংসাবশেষটির আসল অবস্থান নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে। ডিসকভারি চ্যানেল সূত্রে জানা গেছে, পুয়ের্তো রিকোর উত্তর উপকূল থেকে কিছু দূরত্বে অবস্থিত আটলান্টিক মহাসাগরের তলদেশে বিধ্বস্ত বিমানটির মূল ভাঙা অংশ পাওয়া গেছে।

তৎকালীন অফিশিয়াল তদন্ত প্রতিবেদনে জানা যায়, প্যান আমেরিকান বিমানটির অভ্যন্তরীণ রক্ষণাবেক্ষণের চরম ত্রুটির কারণেই মূল দুর্ঘটনাটি ঘটেছিল। ইসলা গ্রান্দে থেকে উড্ডয়নের কিছুক্ষণের মধ্যেই বিমানের গুরুত্বপূর্ণ তিন নম্বর ইঞ্জিনটি আকাশে পুরোপুরি বিকল হয়ে পড়ে। তখন বিমানটির উচ্চতা ছিল ভূমি থেকে মাত্র ৩৫০ ফুট। পরিস্থিতি মারাত্মক বুঝে অভিজ্ঞ পাইলট ক্যাপ্টেন জন সি. বার্ন বিমানটি আবার জরুরি ভিত্তিতে পুয়ের্তো রিকোয় ফিরিয়ে নেওয়ার সাহসী সিদ্ধান্ত নেন। তিনি বিমানের গতি ও দিক পরিবর্তন করে ৫৫০ ফুট পর্যন্ত ওপরে তুলতে সক্ষম হয়েছিলেন। কিন্তু ঠিক তখনই বিমানের চার নম্বর ইঞ্জিনটিও একইভাবে বিকল হয়ে পড়ে। এর পরপরই বিমানটি দ্রুত উচ্চতা হারিয়ে সজোড়ে সমুদ্রে আছড়ে পড়ে।

অভিজ্ঞ পাইলট ক্যাপ্টেন জন সি. বার্ন অতি দ্রুত জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে সমুদ্রে বিমান অবতরণের ঝুকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তিনি তাৎক্ষণিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের কোস্ট গার্ডকে মেসেজ পাঠিয়ে জানান, ইসলা গ্রান্দে বিমানবন্দর থেকে প্রায় সাত মাইল উত্তর-উত্তর-পশ্চিমে তিনি সরাসরি পানিতে বিমান অবতরণ করাচ্ছেন।

ঘটনার দিন দুপুর ১২টা ২০ মিনিটে বিমানটি আটলান্টিকের পানিতে আঘাত হানে। প্রচণ্ড আঘাতে সাগরপৃষ্ঠেই বিমানটি দুই টুকরো হয়ে গেলেও প্রাথমিক মুহূর্তে অনেক যাত্রীই জীবিত ছিলেন। তাঁরা সমুদ্রে ভেসে থাকা বিমানের ভাঙা ডানার অংশ ধরে বেঁচে থাকার আকুল চেষ্টা করেন। তবে পরে উদ্ধারকারী দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছালেও সাগরের উত্তাল ঢেউ এবং অত্যন্ত ঠান্ডা পানির দরুন অনেক যাত্রী লাইফবোটে উঠতে ব্যর্থ হন, যার ফলে তাঁদের আর জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।

ঐতিহাসিক এই বড় দুর্ঘটনার পরই মূলত বিশ্বজুড়ে সমুদ্রপথে চলাচলকারী সকল বিমানের সাধারণ যাত্রীদের জন্য জরুরি বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে কীভাবে বাঁচতে হবে, তার বিশেষ প্রশিক্ষণ ও মহড়া বাধ্যতামূলক করা হয়। একই সঙ্গে বর্তমানে প্রতিটি ফ্লাইটে উড্ডয়নের আগে নিরাপত্তাজনিত নিয়মাবলী সরাসরি প্রদর্শন, লাইফ জ্যাকেটের ব্যবহার এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিধিমালা কঠোরভাবে মেনে চলা বাধ্যতামূলক করা হয়।

তদন্তে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য বের হয় যে, দীর্ঘদিন যাবত ওই বিমানের ইঞ্জিনগুলোর সঠিক ও যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়নি। ইঞ্জিনের কয়েকটি অতি গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশে বড় ধরনের ত্রুটি থাকা সত্ত্বেও উড্ডয়নের আগে তা শনাক্ত করা হয়নি। তদন্তকারীরা শেষ পর্যন্ত মারাত্মক যান্ত্রিক ত্রুটি এবং এনসিটিবির মতোই প্রশাসনিক ও প্রযুক্তিগত রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতিকেই দুর্ঘটনার মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেন। তবে ভয়াবহ দুর্ঘটনা থেকে অলৌকিকভাবে বেঁচে যাওয়া পাইলট প্রধান ক্যাপ্টেন জন সি. বার্নকে আইনি প্রক্রিয়া শেষে সকল দায় থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছিল।

দুর্ঘটনার পর থেকেই ওই প্যান আমেরিকান বিমানের সমুদ্রের তলদেশের ধ্বংসাবশেষ নিয়ে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানীদের তীব্র আগ্রহ ছিল। তবে বহুবার তল্লাশি চালানো হলেও ইতিপূর্বে এর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি, এমনকি সাম্প্রতিক ২০২৪ সালেও পরিচালিত একটি বড় অভিযান ব্যর্থ হয়েছিল। তবে অবশেষে সাম্প্রতিক উচ্চ প্রযুক্তির সহায়তায় ধ্বংসাবশেষ শনাক্ত সম্ভব হয়েছে এবং সমুদ্রের তলদেশ থেকে প্রায় সাড়ে তিন লাখ ছবি তোলা হয়েছে। তবে গবেষকরা জানিয়েছেন, পানিতে প্রাণ হারানো যাত্রীদের দেহাবশেষ উদ্ধারের কোনো রূপরেখা আপাতত নেই।