ঢাকা ১২:২৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ০৭ মার্চ ২০২৬

নোয়াখালী আদালতের হাজতখানায় চাঞ্চল্যকর ‘বেয়াইখানা’য় তোলপাড়

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ১২:৪০:৪৯ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২১ জানুয়ারী ২০২৬
  • ২ বার পড়া হয়েছে

নোয়াখালী চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের মতো একটি সংবেদনশীল স্থানে, যেখানে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কড়া পাহারায় আসামিদের রাখা হয়, সেখানে এক অভাবনীয় ঘটনার সূত্রপাত হয়েছে। সম্প্রতি, আদালতের হাজতখানার ভেতরে পরিবার নিয়ে দুই আওয়ামী লীগ নেতার ‘বেয়াইখানা’ আয়োজনের খবর ছড়িয়ে পড়লে সর্বত্র তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। এই চাঞ্চল্যকর ঘটনাটি ঘটেছে সোমবার (১৯ জানুয়ারি) দুপুরে, নারী হাজতখানার ভেতরে, দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের সহযোগিতায়।

জানা গেছে, কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা যুবলীগের সভাপতি এবং সাবেক উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান আজম পাশা চৌধুরী রুমেল এবং হাতিয়া পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও বঙ্গবন্ধু আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট ছাইফ উদ্দিন আহমদ, উভয়েই হত্যা ও বিস্ফোরণের মতো বিভিন্ন মামলার আসামি হিসেবে নোয়াখালী জেলা কারাগারে বন্দি রয়েছেন। সম্প্রতি, কারাগারের অভ্যন্তরে এই দুই নেতার মধ্যে কথা প্রসঙ্গে একটি পারিবারিক বন্ধনের সূচনা হয়। সেই সূত্র ধরে, কোম্পানীগঞ্জের যুবলীগ নেতা আজম পাশা চৌধুরী রুমেলের মেয়ে ফালিহা আজম চৌধুরী অর্থির সাথে হাতিয়া আওয়ামী লীগ নেতা অ্যাডভোকেট ছাইফ উদ্দিন আহমদের ছেলে ছাইম উদ্দিন সাকিবের বিয়ে সম্পন্ন হয় গত ৩০ ডিসেম্বর।

মামলার শুনানির জন্য সোমবার (১৯ জানুয়ারি) দুই নেতাকে আদালতে হাজির করা হলে, পুলিশের উপস্থিতিতে তাদের পরিবারের সদস্যরা হাজতখানার ভেতরে এই ‘বেয়াইখানা’র আয়োজন করেন। এই ঘটনাটি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক কারণ, নারী হাজতখানাটি যেখানে নারী আসামিদের রাখা হয়, সেখানে আজম পাশা রুমেলের স্ত্রী খোদেজা আক্তার সুমি, মেয়ে ফালিহা আজম চৌধুরী অর্থি, অ্যাডভোকেট ছাইফ উদ্দিন আহমদের ছেলে ছাইম উদ্দিন সাকিব এবং আরও একজন যুবককে উপস্থিত থাকতে দেখা গেছে।

এই ঘটনার বিষয়ে আজম পাশা চৌধুরীর স্ত্রী খোদেজা আক্তার সুমি এবং অ্যাডভোকেট ছাইফ উদ্দিন আহমদের ছেলে ছাইম উদ্দিন সাকিবের সাথে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

আদালতের সূত্রে জানা গেছে, আজম পাশা চৌধুরী রুমেলের বিরুদ্ধে নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জে জামায়াতে ইসলামীর সাত কর্মীকে গুলি করে হত্যার মতো গুরুতর অভিযোগসহ বিভিন্ন থানায় আরও একাধিক মামলা রয়েছে। অন্যদিকে, অ্যাডভোকেট ছাইফ উদ্দিন আহমদের বিরুদ্ধে হাতিয়া, চরজব্বর ও কবিরহাট থানায় বিস্ফোরকসহ মোট পাঁচটি মামলা বিচারাধীন।

হাজতখানার ভেতরে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের তথ্য অনুযায়ী, ওই কক্ষটি মূলত নারী আসামিদের পোশাক পরিবর্তন, খাওয়া, নামাজ আদায় এবং শিশুদের দুধ খাওয়ানোর জন্য ব্যবহৃত হয়।

ঘটনার দিন সোমবার (১৯ জানুয়ারি) হাজতখানার দায়িত্বে ছিলেন পুলিশের সহকারী শহর উপ-পরিদর্শক (এটিএসআই) কবির আহম্মদ ভুইয়া, কনস্টেবল বিল্লাল হোসেন (নম্বর ৬৩৬), মো. হাসান (৩৪০) ও সাইফুল ইসলাম (২২০)। সহকারী শহর উপ-পরিদর্শক (এটিএসআই) জাহেদুল ইসলাম এই হাজতখানার প্রধান দায়িত্বে ছিলেন।

এ ধরনের ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলে এটিএসআই জাহেদুল ইসলাম জানান, চিফ জুডিশিয়াল ও জজ আদালতের দুটি হাজতখানায় দায়িত্বরতদের ডিউটি বণ্টনের পর তিনি আদালতের কাজে উপরে ছিলেন। তিনি বলেন, ‘এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটে থাকলে আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত।’

আদালতের পরিদর্শক (কোর্ট ইন্সপেক্টর) মো. সারওয়ার আলম জানিয়েছেন, ঘটনাটি জানার পর তিনি সংশ্লিষ্ট সকলকে ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন এবং ভবিষ্যতে যাতে আদালত চত্বরে এমন কোনো অনিয়ম না হয়, সেজন্য কঠোরভাবে সতর্ক করা হয়েছে।

এই বিষয়ে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) আবু তৈয়ব মো. আরিফ হোসেন মঙ্গলবার রাতে জানিয়েছেন, ঘটনাটি পুলিশ অবগত হয়েছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘আদালতের সুরক্ষিত স্থানে আসামি ছাড়া কারো প্রবেশাধিকার নেই।’ তিনি আরও জানান, এই ঘটনায় মঙ্গলবার পুলিশ সুপারের নির্দেশে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) আবু তৈয়ব মো. আরিফ হোসেনকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত কমিটি আগামী সাত কর্মদিবসের মধ্যে তাদের প্রতিবেদন জমা দেবে। তদন্ত শেষে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

নোয়াখালী আদালতের হাজতখানায় চাঞ্চল্যকর ‘বেয়াইখানা’য় তোলপাড়

আপডেট সময় : ১২:৪০:৪৯ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২১ জানুয়ারী ২০২৬

নোয়াখালী চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের মতো একটি সংবেদনশীল স্থানে, যেখানে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কড়া পাহারায় আসামিদের রাখা হয়, সেখানে এক অভাবনীয় ঘটনার সূত্রপাত হয়েছে। সম্প্রতি, আদালতের হাজতখানার ভেতরে পরিবার নিয়ে দুই আওয়ামী লীগ নেতার ‘বেয়াইখানা’ আয়োজনের খবর ছড়িয়ে পড়লে সর্বত্র তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। এই চাঞ্চল্যকর ঘটনাটি ঘটেছে সোমবার (১৯ জানুয়ারি) দুপুরে, নারী হাজতখানার ভেতরে, দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের সহযোগিতায়।

জানা গেছে, কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা যুবলীগের সভাপতি এবং সাবেক উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান আজম পাশা চৌধুরী রুমেল এবং হাতিয়া পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও বঙ্গবন্ধু আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট ছাইফ উদ্দিন আহমদ, উভয়েই হত্যা ও বিস্ফোরণের মতো বিভিন্ন মামলার আসামি হিসেবে নোয়াখালী জেলা কারাগারে বন্দি রয়েছেন। সম্প্রতি, কারাগারের অভ্যন্তরে এই দুই নেতার মধ্যে কথা প্রসঙ্গে একটি পারিবারিক বন্ধনের সূচনা হয়। সেই সূত্র ধরে, কোম্পানীগঞ্জের যুবলীগ নেতা আজম পাশা চৌধুরী রুমেলের মেয়ে ফালিহা আজম চৌধুরী অর্থির সাথে হাতিয়া আওয়ামী লীগ নেতা অ্যাডভোকেট ছাইফ উদ্দিন আহমদের ছেলে ছাইম উদ্দিন সাকিবের বিয়ে সম্পন্ন হয় গত ৩০ ডিসেম্বর।

মামলার শুনানির জন্য সোমবার (১৯ জানুয়ারি) দুই নেতাকে আদালতে হাজির করা হলে, পুলিশের উপস্থিতিতে তাদের পরিবারের সদস্যরা হাজতখানার ভেতরে এই ‘বেয়াইখানা’র আয়োজন করেন। এই ঘটনাটি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক কারণ, নারী হাজতখানাটি যেখানে নারী আসামিদের রাখা হয়, সেখানে আজম পাশা রুমেলের স্ত্রী খোদেজা আক্তার সুমি, মেয়ে ফালিহা আজম চৌধুরী অর্থি, অ্যাডভোকেট ছাইফ উদ্দিন আহমদের ছেলে ছাইম উদ্দিন সাকিব এবং আরও একজন যুবককে উপস্থিত থাকতে দেখা গেছে।

এই ঘটনার বিষয়ে আজম পাশা চৌধুরীর স্ত্রী খোদেজা আক্তার সুমি এবং অ্যাডভোকেট ছাইফ উদ্দিন আহমদের ছেলে ছাইম উদ্দিন সাকিবের সাথে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

আদালতের সূত্রে জানা গেছে, আজম পাশা চৌধুরী রুমেলের বিরুদ্ধে নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জে জামায়াতে ইসলামীর সাত কর্মীকে গুলি করে হত্যার মতো গুরুতর অভিযোগসহ বিভিন্ন থানায় আরও একাধিক মামলা রয়েছে। অন্যদিকে, অ্যাডভোকেট ছাইফ উদ্দিন আহমদের বিরুদ্ধে হাতিয়া, চরজব্বর ও কবিরহাট থানায় বিস্ফোরকসহ মোট পাঁচটি মামলা বিচারাধীন।

হাজতখানার ভেতরে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের তথ্য অনুযায়ী, ওই কক্ষটি মূলত নারী আসামিদের পোশাক পরিবর্তন, খাওয়া, নামাজ আদায় এবং শিশুদের দুধ খাওয়ানোর জন্য ব্যবহৃত হয়।

ঘটনার দিন সোমবার (১৯ জানুয়ারি) হাজতখানার দায়িত্বে ছিলেন পুলিশের সহকারী শহর উপ-পরিদর্শক (এটিএসআই) কবির আহম্মদ ভুইয়া, কনস্টেবল বিল্লাল হোসেন (নম্বর ৬৩৬), মো. হাসান (৩৪০) ও সাইফুল ইসলাম (২২০)। সহকারী শহর উপ-পরিদর্শক (এটিএসআই) জাহেদুল ইসলাম এই হাজতখানার প্রধান দায়িত্বে ছিলেন।

এ ধরনের ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলে এটিএসআই জাহেদুল ইসলাম জানান, চিফ জুডিশিয়াল ও জজ আদালতের দুটি হাজতখানায় দায়িত্বরতদের ডিউটি বণ্টনের পর তিনি আদালতের কাজে উপরে ছিলেন। তিনি বলেন, ‘এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটে থাকলে আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত।’

আদালতের পরিদর্শক (কোর্ট ইন্সপেক্টর) মো. সারওয়ার আলম জানিয়েছেন, ঘটনাটি জানার পর তিনি সংশ্লিষ্ট সকলকে ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন এবং ভবিষ্যতে যাতে আদালত চত্বরে এমন কোনো অনিয়ম না হয়, সেজন্য কঠোরভাবে সতর্ক করা হয়েছে।

এই বিষয়ে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) আবু তৈয়ব মো. আরিফ হোসেন মঙ্গলবার রাতে জানিয়েছেন, ঘটনাটি পুলিশ অবগত হয়েছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘আদালতের সুরক্ষিত স্থানে আসামি ছাড়া কারো প্রবেশাধিকার নেই।’ তিনি আরও জানান, এই ঘটনায় মঙ্গলবার পুলিশ সুপারের নির্দেশে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) আবু তৈয়ব মো. আরিফ হোসেনকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত কমিটি আগামী সাত কর্মদিবসের মধ্যে তাদের প্রতিবেদন জমা দেবে। তদন্ত শেষে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।