আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি একটি বহুল আলোচিত গণভোটের আয়োজন করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বা সংবিধান সংস্কারের চারটি মূল প্রস্তাবের ওপর জনগণের রায় নিতে এই ভোট অনুষ্ঠিত হবে। তবে এই গণভোটে সরকারের পক্ষ থেকে ‘হ্যাঁ’ ভোটের সমর্থনে দেশব্যাপী ব্যাপক প্রচারণা চালানো নিয়ে জনমনে ও রাজনৈতিক মহলে তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। সরকারের উপদেষ্টারা জেলা পর্যায়ে সফর করে জনমত গঠনের চেষ্টা করছেন এবং সরকারি অফিস ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও আইনজ্ঞরা সরকারের এই ভূমিকার আইনি ও নৈতিক বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। বিশিষ্ট আইনজীবী শাহদীন মালিক মনে করেন, একটি নিরপেক্ষ বা অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষে কোনো নির্দিষ্ট পক্ষের হয়ে ভোট চাওয়া নজিরবিহীন এবং এটি সরাসরি নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপের শামিল। জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জেড আই খান পান্না একে ‘বেআইনি ও অনৈতিক’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তাঁর মতে, জনগণের করের টাকায় সরকার কোনো একপক্ষের হয়ে প্রচারণা চালাতে পারে না, কারণ সেই টাকায় ‘না’ সমর্থকদেরও অংশীদারিত্ব রয়েছে। এছাড়াও, যারা ভোটের দিন প্রিসাইডিং বা পোলিং অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন, সেই শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের ‘সচেতনতামূলক’ প্রচারের নামে প্ররোচনামূলক কাজে নিয়োগ করা নির্বাচনী নিরপেক্ষতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে।
সরকারের পক্ষ থেকে এই প্রচারণার পক্ষে জোরালো যুক্তি দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী আলী রীয়াজ এবং আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল। তাঁদের মতে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মূল ম্যান্ডেট বা সংস্কার বাস্তবায়নের জন্যই এই গণভোট অপরিহার্য। প্রধান উপদেষ্টার ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও তুরস্কের মতো দেশের উদাহরণ টেনে বলা হয়েছে যে, রাষ্ট্রপ্রধানরা জাতীয় স্বার্থে গণভোটের পক্ষে প্রচার চালাতেই পারেন এবং এটি অগণতান্ত্রিক নয়। অন্যদিকে, নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ জানিয়েছেন, কমিশন কেবল জনগণকে সচেতন করার কাজ করছে, সরাসরি কোনো পক্ষ নিচ্ছে না।
গণভোটের ব্যালটে জুলাই জাতীয় সনদের আলোকে চারটি প্রশ্ন রাখা হয়েছে, যার মধ্যে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা এবং প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমাবদ্ধ করার মতো বিষয়গুলো রয়েছে। তবে সমালোচকরা বলছেন, চারটি ভিন্নধর্মী প্রশ্নকে একটিমাত্র ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ উত্তরের ফ্রেমে বাঁধার কারণে ভোটারদের মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত হতে পারে। বিশেষ করে কেউ যদি কোনো একটি প্রস্তাবের বিরোধী হন, তবে তিনি কীভাবে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করবেন, তা নিয়ে বিভ্রান্তি রয়েছে। এই আইনি জটিলতা ও রাজনৈতিক বিতর্কের মাঝেই দেশ এক ঐতিহাসিক নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
রিপোর্টারের নাম 
























