রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও কার্যকর পরিকল্পনার অভাবে রাজধানী ঢাকা আজ চরম সংকটাপন্ন বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুস সালাম। তিনি মনে করেন, সরকারি সম্পত্তি দখল, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতাই এই দুরবস্থার প্রধান কারণ। তাঁর মতে, এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য সিটি গভর্নমেন্ট গঠন ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প নেই।
সোমবার (১৯ জানুয়ারি) রাজধানীর গুলশানে গুলশান সোসাইটি এবং নগর উন্নয়ন সাংবাদিক ফোরাম বাংলাদেশের উদ্যোগে আয়োজিত এক নগর সংলাপে আবদুস সালাম এসব কথা বলেন। আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে ‘ঢাকা বাঁচানোর ইশতেহার’ শীর্ষক এই অনুষ্ঠানে তিনি ঢাকার ক্রমবর্ধমান অব্যবস্থাপনা প্রতিরোধ, নাগরিক সেবা নিশ্চিতকরণ এবং একটি বাসযোগ্য নগর গঠনের রূপরেখা তুলে ধরেন।
আবদুস সালাম বলেন, পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে সরকারি জায়গা এভাবে দখল করা সম্ভব নয়, যতটা বাংলাদেশে। রাজধানীতে ফুটপাতের পাশে কোনো স্থাপনা থাকলে তা সহজেই দখল করে নেওয়া যায়, কারণ রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষায় কার্যকর নজরদারির অভাব রয়েছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, যদি আমরা প্রত্যেকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে সচেতন হই, তবে অন্তত ৫০ শতাংশ সমস্যা এমনিতেই সমাধান হয়ে যাবে।
তিনি অভিযোগ করেন, ঢাকা মহানগরের মূল সমস্যাগুলো চিহ্নিত না করে কেবল উপসর্গ নিয়ে কাজ করা হচ্ছে। মেয়র পদে আসীন ব্যক্তি থাকলেও বাস্তবে তাঁর ক্ষমতা অত্যন্ত সীমিত। উদাহরণস্বরূপ, তিনি বলেন, ঢাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য মেয়রকে দায়ী করা হলেও পুলিশের ওপর তাঁর কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। এই দ্বৈততাই একটি বিশাল মহানগরী পরিচালনায় প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আবদুস সালাম আরও বলেন, কেন্দ্রীয় সরকার স্থানীয় সরকারকে কখনোই শক্তিশালী হতে দেয় না। এর ফলে সিটি করপোরেশন, রাজউক, ওয়াসা, ডেসকোসহ বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে চরম সমন্বয়হীনতা দেখা দেয়। একটি সংস্থা রাস্তা তৈরি করলে অন্য সংস্থা সেটি আবার খনন করে, এই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিই ঢাকাকে বসবাসের অযোগ্য করে তুলেছে।
তিনি স্মরণ করেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাসনামলে ঢাকার অনেক উন্নয়ন সাধিত হয়েছিল। বেগম খালেদা জিয়াও রাজধানী উন্নয়নে আন্তরিকভাবে কাজ করেছিলেন। কিন্তু পরবর্তী সরকার রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ঢাকা সিটিকে দুই ভাগে বিভক্ত করে ফেলে, যা ছিল সম্পূর্ণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত এবং জনগণের স্বার্থ সেখানে বিবেচিত হয়নি।
বিএনপির এই নেতা জানান, দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের একটি সুস্পষ্ট রূপকল্প ও মাস্টার প্ল্যান রয়েছে। এর মূল ভিত্তি হলো পরিচ্ছন্ন ঢাকা গড়া, কার্যকর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা, যুবকদের দক্ষতা ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, রাস্তা ও ফুটপাত পৃথক ও কার্যকর করা, মাদকমুক্ত সমাজ গঠন, সুবিধাবঞ্চিত এলাকার নাগরিক সেবা নিশ্চিত করা, নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন, আধুনিক নগর ব্যবস্থাপনা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা এবং নাগরিক সেবা সহজলভ্য করা। এই ১০টি বিষয় বিএনপির নগরভাবনার কেন্দ্রে রয়েছে।
ঢাকাকে বাঁচাতে হলে শুধু শহর নয়, জাতীয় পর্যায়ের পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি উল্লেখ করে তিনি বলেন, বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, তুরাগ ও বালু নদী রক্ষা করতে না পারলে ঢাকাও বাঁচবে না। নদীভাঙন, গ্রামীণ দারিদ্র্য এবং কর্মসংস্থানের অভাব ঢাকামুখী জনস্রোত বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে।
আবদুস সালাম বলেন, গত ১৭ বছরে দেশের প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংস করা হয়েছে এবং এই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে কয়েক বছর সময় লাগবে। এজন্য প্রয়োজন একটি শক্তিশালী ও গণতান্ত্রিক সরকার। নির্বাচনের পরপরই সরকারকে চাপ দিলে রাষ্ট্র পরিচালনা অসম্ভব হয়ে পড়বে। তাই সরকারকে সময় দিতে হবে।
তিনি আরও বলেন, বিএনপি একটি গণতান্ত্রিক দল। আন্দোলন করলেও তারা কখনো শিল্প, অর্থনীতি বা উন্নয়নের ধারা ব্যাহত করেনি। রাজনীতিকে ইতিবাচক ধারায় ফিরিয়ে আনলেই দেশ এগিয়ে যাবে।
তিনি পুনরায় জোর দিয়ে বলেন, ঢাকাকে বাঁচাতে হলে মেয়রের হাতে পূর্ণ ক্ষমতা দিতে হবে। সিটি গভর্নমেন্ট ছাড়া ঢাকা মহানগরকে বসবাসযোগ্য করে তোলা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। তিনি রাজধানীবাসী, বিশেষ করে গুলশান, বনানী ও ধানমন্ডির প্রভাবশালী নাগরিকদের এই নগর রক্ষায় এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারি সেক্রেটারি জেনারেল এ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা অধ্যাপক ডাক্তার ফরহাদ হালিম ডোনার, এনসিবির জ্যৈষ্ঠ যুগ্ম আহবায়ক আরিফুল ইসলাম আদিব প্রমুখ।
রিপোর্টারের নাম 
























