ভারতীয় সেনাবাহিনী সম্প্রতি হায়দ্রাবাদ-ভিত্তিক ডিফেন্স-টেক স্টার্টআপ ‘অ্যাপোলিয়ন ডায়নামিক্স’-এর কাছ থেকে একটি অত্যন্ত উন্নত এবং যুগান্তকারী ‘মোবাইল ড্রোন ল্যাব’ বুঝে নিয়েছে। এই ল্যাবটি মূলত একটি ভ্রাম্যমাণ কারখানা, যা যুদ্ধক্ষেত্রের একদম কাছাকাছি থেকে ড্রোন তৈরি ও মেরামতের মাধ্যমে সেনাবাহিনীকে এক অপরাজেয় ‘সুপার আর্মি’তে রূপান্তর করতে সক্ষম।
এই ল্যাবটি ভারত সরকারের ‘আত্মনির্ভর ভারত’ উদ্যোগের অধীনে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এটি মূলত সেনাবাহিনীর ট্রাক প্ল্যাটফর্মের ওপর তৈরি একটি চলমান উৎপাদন ও অ্যাসেম্বলি ইউনিট। এটি ব্যবহারের ফলে সেনাদলকে এখন ড্রোন বা খুচরা যন্ত্রাংশের জন্য দূরবর্তী কোনো কারখানার ওপর নির্ভর করতে হবে না। বিশেষ করে জম্মু-কাশ্মীরের মতো সংবেদনশীল সীমান্ত এলাকায় এই প্রযুক্তি ভারতের কৌশলগত সক্ষমতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
২০২৫ সালের এপ্রিলে বিটস পিলানি (BITS Pilani) হায়দ্রাবাদ ক্যাম্পাসের মাত্র ২০ বছর বয়সী দুই মেধাবী শিক্ষার্থী—জয়ন্ত খত্রী এবং শৌর্য চৌধুরী এই স্টার্টআপটি প্রতিষ্ঠা করেন। শুরুতে তাদের হোস্টেল রুম থেকে শুরু হওয়া এই উদ্ভাবন আজ ভারতীয় সেনাবাহিনীর একটি শক্তিশালী অংশে পরিণত হয়েছে।
মোবাইল ড্রোন ল্যাবের প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ:
প্রথাগত ড্রোন লজিস্টিকসের চিত্র বদলে দিতে এই ল্যাবে রয়েছে অত্যন্ত আধুনিক কিছু প্রযুক্তি ও সুবিধা। এটি প্রতি মাসে ১০০টিরও বেশি ফার্স্ট পারসন ভিউ (FPV) ড্রোন সরাসরি রণক্ষেত্রে বসেই তৈরি করতে সক্ষম। ড্রোনের কাঠামো বা ফ্রেম তৈরির জন্য এতে রয়েছে বিশেষায়িত থ্রিডি (3D) প্রিন্টার এবং ডিজিটাল মডেলিং ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে মুহূর্তের মধ্যেই নতুন ড্রোন ডিজাইন ও প্রিন্ট করা যায়। এছাড়া ল্যাবের ভেতরেই রয়েছে অত্যাধুনিক অ্যাসেম্বলি এবং রিপেয়ার স্টেশন। যুদ্ধ চলাকালীন ক্ষতিগ্রস্ত ড্রোনগুলো কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সারিয়ে তুলে আবার আকাশে ওড়ানো সম্ভব, যা আগে সরবরাহ চেইনের কারণে দিন বা সপ্তাহ সময় নিত। ল্যাবে থাকা গ্রাউন্ড কন্ট্রোল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মাধ্যমে সৈন্যরা মিশনের প্রয়োজনীয়তা অনুযায়ী ড্রোনগুলোকে কনফিগার করে দ্রুত মোতায়েন করতে পারে।
সৈন্যদের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও প্রশিক্ষণ:
অ্যাপোলিয়ন ডায়নামিক্স কেবল হার্ডওয়্যার সরবরাহ করছে না, বরং ভারতীয় সেনাবাহিনীর জওয়ানদের এই ল্যাব স্বাধীনভাবে পরিচালনা করার জন্য নিবিড় প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। এই প্রশিক্ষণের ফলে সাধারণ সৈনিকরাও ড্রোনের অ্যাসেম্বলিং, সফটওয়্যার প্রোগ্রামিং এবং হার্ডওয়্যার সোল্ডারিংয়ের মতো কারিগরি কাজে দক্ষ হয়ে উঠছে। এটি বাহিনীর বাহ্যিক নির্ভরশীলতা কমিয়ে ‘ট্যাকটিক্যাল টেকনিক্যাল কম্পিটেন্স’ বা কৌশলগত কারিগরি দক্ষতা তৈরি করছে। এর ফলে রণক্ষেত্রে থাকা সৈনিকরাই এখন তাদের ড্রোনের ক্ষমতা বা কনফিগারেশন রিয়েল-টাইম পরিস্থিতিতে বদলে নিতে পারছে।
সেনাবাহিনীকে কীভাবে ‘সুপার আর্মি’তে রূপান্তর করবে?
আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে এফপিভি ড্রোন এখন অন্যতম প্রধান ‘ফোর্স মাল্টিপ্লায়ার’ বা শক্তি বৃদ্ধিকারক অস্ত্র। মোবাইল ড্রোন ল্যাব থাকার ফলে ভারতীয় সেনাবাহিনী এখন যেকোনো প্রতিকূল পরিস্থিতিতে লজিস্টিক সুবিধা ছাড়াই ড্রোন অপারেশন সচল রাখতে পারবে। এটি যুদ্ধের গতি বা ‘অপারেশনাল টেম্পো’ বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। বর্তমানে এই ভ্রাম্যমাণ ল্যাবটি জম্মুর একটি রেজিমেন্টে স্থায়ী ড্রোন ল্যাবরেটরির পরিপূরক হিসেবে কাজ করছে, যা পুরো অঞ্চলের ড্রোন নেটওয়ার্ককে শক্তিশালী করেছে। বিটস পিলানির শিক্ষার্থীদের তৈরি এই ‘কামিকাজে’ ড্রোনগুলো ঘণ্টায় ৩০০ কিলোমিটারেরও বেশি গতিতে উড়ে ১ কেজি পর্যন্ত বিস্ফোরক নিয়ে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে এবং শত্রুর রাডার ফাঁকি দিতে সক্ষম।
ভবিষ্যতে এই স্টার্টআপটি ভিটিওএল (VTOL) ড্রোন এবং এআই-চালিত স্বায়ত্তশাসিত ফ্লাইট সিস্টেম তৈরির পরিকল্পনা করছে। এই ধরনের নিজস্ব প্রযুক্তি এবং ফ্রন্টলাইনে ড্রোন তৈরির ক্ষমতা ভারতীয় বাহিনীকে বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত একটি ‘সুপার আর্মি’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করছে।
রিপোর্টারের নাম 
























