ঢাকা ০২:০১ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৬

ভারতে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে ধর্মীয় বিদ্বেষ: এক বছরেই ১৩ শ’র বেশি ‘হেট স্পিচ’ রেকর্ড

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ১১:১২:৫৩ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৪ জানুয়ারী ২০২৬
  • ৫ বার পড়া হয়েছে

প্রতিবেশী দেশ ভারতে ধর্মীয় সংখ্যালঘু, বিশেষ করে মুসলিম ও খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক বক্তব্য বা ‘হেট স্পিচ’-এর ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। গত এক বছরে দেশটিতে এ ধরনের ১ হাজার ৩০০-এর বেশি ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছে, যার বড় অংশই ঘটেছে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) শাসিত রাজ্যগুলোতে। ওয়াশিংটন ভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘ইন্ডিয়া হেট ল্যাব’ (আইএইচএল)-এর সাম্প্রতিক বার্ষিক প্রতিবেদনে এই উদ্বেগময় চিত্র উঠে এসেছে।

প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ভারতের ২১টি রাজ্যে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের লক্ষ্য করে মোট ১ হাজার ৩১৮টি বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের ঘটনা ঘটেছে। এই পরিসংখ্যান ২০২৪ সালের তুলনায় ১৩ শতাংশ এবং ২০২৩ সালের তুলনায় প্রায় ৯৭ শতাংশ বেশি। ২০২৩ সালে দেশটিতে ৬৬৮টি এ ধরনের ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছিল। অর্থাৎ মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে ভারতে ধর্মীয় বিদ্বেষ ছড়ানোর হার প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।

জাতিসংঘের নির্ধারিত মানদণ্ড অনুযায়ী এই বিদ্বেষমূলক বক্তব্যগুলোকে শ্রেণীবদ্ধ করেছে আইএইচএল। এর মধ্যে রয়েছে ভিত্তিহীন ষড়যন্ত্র তত্ত্বের প্রচার, সহিংসতা ও অস্ত্র ব্যবহারের উসকানি, সামাজিক ও অর্থনৈতিক বয়কটের ডাক এবং ধর্মীয় উপাসনালয় দখল বা ধ্বংসের দাবি। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, মোট বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের প্রায় ৯৮ শতাংশ বা ১ হাজার ২৮৯টি ঘটনা ছিল মুসলিম বিদ্বেষী। অন্যদিকে, খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে ঘটেছে ১৩৩টি ঘটনা, যা আগের বছরের তুলনায় ১২ শতাংশ বেশি।

বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের ভৌগোলিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এর সিংহভাগই ঘটেছে বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলোতে। পরিসংখ্যান বলছে, প্রায় ৮৮ শতাংশ বা ১ হাজার ১৬৪টি ঘটনা ঘটেছে বিজেপি বা তাদের নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোট শাসিত রাজ্য এবং কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলোতে। ২০২৪ সালের তুলনায় এই অঞ্চলে বিদ্বেষের হার ২৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। রাজ্যগুলোর মধ্যে উত্তরপ্রদেশে সর্বোচ্চ ২৬৬টি ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া মহারাষ্ট্রে ১৯৩, মধ্যপ্রদেশে ১৭২, উত্তরাখণ্ডে ১৫৫ এবং দিল্লিতে ৭৬টি ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। এই পাঁচটি অঞ্চলেই দেশের মোট বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের ৬৫ শতাংশ সংঘটিত হয়েছে।

বিপরীত চিত্র দেখা গেছে বিরোধী দল শাসিত রাজ্যগুলোতে। সেখানে ২০২৫ সালে ১৫৪টি বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৩৪ শতাংশ কম। প্রতিবেদনে আরও জানানো হয়েছে, উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠন বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (ভিএইচপি) ও বজরং দল ২৮৯টি এবং অন্তর্রাষ্টীয় হিন্দু পরিষদ (এএইচপি) ১৩৮টি বিদ্বেষমূলক ঘটনার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিল।

তদন্তে দেখা গেছে, গত বছর রেকর্ড করা বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের প্রায় অর্ধেকই (৬৫৬টি) ছিল ‘লাভ জিহাদ’, ‘ভূমি জিহাদ’ ও ‘জনসংখ্যা জিহাদ’-এর মতো ষড়যন্ত্রমূলক তত্ত্ব নির্ভর। এছাড়া ৩০৮টি বক্তব্যে সরাসরি সহিংসতার উসকানি এবং ১৩৬টিতে অস্ত্র ব্যবহারের আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সময়ে সংখ্যালঘু বিশেষ করে মুসলিমদের বয়কটের ডাক দিয়ে ১২০টি এবং মসজিদ, মাজার ও গির্জা ধ্বংসের উসকানি দিয়ে ২৭৬টি বক্তব্য প্রদান করা হয়েছে। ভারতে ধর্মীয় সম্প্রীতির ক্ষেত্রে এই ক্রমবর্ধমান বিদ্বেষ এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে শরিফুলের রাজকীয় প্রত্যাবর্তন: তপ্ত গরমে কিউইদের নাভিশ্বাস

ভারতে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে ধর্মীয় বিদ্বেষ: এক বছরেই ১৩ শ’র বেশি ‘হেট স্পিচ’ রেকর্ড

আপডেট সময় : ১১:১২:৫৩ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৪ জানুয়ারী ২০২৬

প্রতিবেশী দেশ ভারতে ধর্মীয় সংখ্যালঘু, বিশেষ করে মুসলিম ও খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক বক্তব্য বা ‘হেট স্পিচ’-এর ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। গত এক বছরে দেশটিতে এ ধরনের ১ হাজার ৩০০-এর বেশি ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছে, যার বড় অংশই ঘটেছে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) শাসিত রাজ্যগুলোতে। ওয়াশিংটন ভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘ইন্ডিয়া হেট ল্যাব’ (আইএইচএল)-এর সাম্প্রতিক বার্ষিক প্রতিবেদনে এই উদ্বেগময় চিত্র উঠে এসেছে।

প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ভারতের ২১টি রাজ্যে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের লক্ষ্য করে মোট ১ হাজার ৩১৮টি বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের ঘটনা ঘটেছে। এই পরিসংখ্যান ২০২৪ সালের তুলনায় ১৩ শতাংশ এবং ২০২৩ সালের তুলনায় প্রায় ৯৭ শতাংশ বেশি। ২০২৩ সালে দেশটিতে ৬৬৮টি এ ধরনের ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছিল। অর্থাৎ মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে ভারতে ধর্মীয় বিদ্বেষ ছড়ানোর হার প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।

জাতিসংঘের নির্ধারিত মানদণ্ড অনুযায়ী এই বিদ্বেষমূলক বক্তব্যগুলোকে শ্রেণীবদ্ধ করেছে আইএইচএল। এর মধ্যে রয়েছে ভিত্তিহীন ষড়যন্ত্র তত্ত্বের প্রচার, সহিংসতা ও অস্ত্র ব্যবহারের উসকানি, সামাজিক ও অর্থনৈতিক বয়কটের ডাক এবং ধর্মীয় উপাসনালয় দখল বা ধ্বংসের দাবি। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, মোট বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের প্রায় ৯৮ শতাংশ বা ১ হাজার ২৮৯টি ঘটনা ছিল মুসলিম বিদ্বেষী। অন্যদিকে, খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে ঘটেছে ১৩৩টি ঘটনা, যা আগের বছরের তুলনায় ১২ শতাংশ বেশি।

বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের ভৌগোলিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এর সিংহভাগই ঘটেছে বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলোতে। পরিসংখ্যান বলছে, প্রায় ৮৮ শতাংশ বা ১ হাজার ১৬৪টি ঘটনা ঘটেছে বিজেপি বা তাদের নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোট শাসিত রাজ্য এবং কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলোতে। ২০২৪ সালের তুলনায় এই অঞ্চলে বিদ্বেষের হার ২৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। রাজ্যগুলোর মধ্যে উত্তরপ্রদেশে সর্বোচ্চ ২৬৬টি ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া মহারাষ্ট্রে ১৯৩, মধ্যপ্রদেশে ১৭২, উত্তরাখণ্ডে ১৫৫ এবং দিল্লিতে ৭৬টি ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। এই পাঁচটি অঞ্চলেই দেশের মোট বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের ৬৫ শতাংশ সংঘটিত হয়েছে।

বিপরীত চিত্র দেখা গেছে বিরোধী দল শাসিত রাজ্যগুলোতে। সেখানে ২০২৫ সালে ১৫৪টি বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৩৪ শতাংশ কম। প্রতিবেদনে আরও জানানো হয়েছে, উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠন বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (ভিএইচপি) ও বজরং দল ২৮৯টি এবং অন্তর্রাষ্টীয় হিন্দু পরিষদ (এএইচপি) ১৩৮টি বিদ্বেষমূলক ঘটনার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিল।

তদন্তে দেখা গেছে, গত বছর রেকর্ড করা বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের প্রায় অর্ধেকই (৬৫৬টি) ছিল ‘লাভ জিহাদ’, ‘ভূমি জিহাদ’ ও ‘জনসংখ্যা জিহাদ’-এর মতো ষড়যন্ত্রমূলক তত্ত্ব নির্ভর। এছাড়া ৩০৮টি বক্তব্যে সরাসরি সহিংসতার উসকানি এবং ১৩৬টিতে অস্ত্র ব্যবহারের আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সময়ে সংখ্যালঘু বিশেষ করে মুসলিমদের বয়কটের ডাক দিয়ে ১২০টি এবং মসজিদ, মাজার ও গির্জা ধ্বংসের উসকানি দিয়ে ২৭৬টি বক্তব্য প্রদান করা হয়েছে। ভারতে ধর্মীয় সম্প্রীতির ক্ষেত্রে এই ক্রমবর্ধমান বিদ্বেষ এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে।