ঢাকা ০৮:৪৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬

ডব্লিউএইচওতে সায়মা ওয়াজেদের পদে ফেরা নিয়ে বিতর্ক, বাংলাদেশের কঠোর আপত্তি

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৮:৪৩:১১ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৪ জানুয়ারী ২০২৬
  • ৪ বার পড়া হয়েছে

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক দপ্তরে (এসইএআরও) সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কন্যা সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের পদে ফেরার চেষ্টার তীব্র বিরোধিতা করছে বাংলাদেশ সরকার। ব্যাপক বিতর্ক ও দুর্নীতির অভিযোগে দীর্ঘমেয়াদি ছুটিতে থাকা পুতুলকে স্বপদে ফেরাতে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একাধিক লবিস্ট ফার্মের মাধ্যমে জোর লবিং চালানো হচ্ছে। এ বিষয়ে ডব্লিউএইচও বাংলাদেশের মতামত জানতে চাইলে সরকার দুর্নীতির মামলায় পুতুলের সাজার রায়ের কপিসহ বিভিন্ন অভিযোগের বিশ্বাসযোগ্য তথ্যপ্রমাণ পেশ করেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, লবিস্ট ফার্মগুলো ইতোমধ্যে পুতুলের পক্ষে ডব্লিউএইচওতে একাধিক আবেদন জমা দিয়েছে। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে সংস্থাটি বাংলাদেশ সরকারের মতামত জানতে চেয়ে একটি চিঠি পাঠায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে আইন, পররাষ্ট্র ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, পুতুলের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের আদালতে হওয়া রায়ের কপিসহ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা ও দপ্তরের প্রতিবেদন যুক্ত করে ডব্লিউএইচওকে একটি বিস্তারিত জবাব পাঠানো হয়েছে।

সরকারের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিতর্কিত ও দুর্নীতিবাজ একজন পলাতক ব্যক্তি যদি ওই পদে পুনরায় যোগদানের সুযোগ পান, তবে তা বাংলাদেশ ও ডব্লিউএইচও’র জন্য চরম অবমাননাকর হবে। আইন পরামর্শক ড. আসিফ নজরুল এ বিষয়ে মন্তব্য করে বলেন, সায়মা ওয়াজেদ পুতুল বাংলাদেশের আদালতে দণ্ডপ্রাপ্ত। একজন দণ্ডিত আসামিকে নিয়োগ দেওয়া হলে তা একটি নেতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুনাম ও বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ণ হবে। অন্তর্বর্তী সরকারের একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মর্যাদা রক্ষায় সর্বোচ্চ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ১ ফেব্রুয়ারি সায়মা ওয়াজেদ পুতুল ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে অবস্থিত ডব্লিউএইচও’র দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক অফিসের আঞ্চলিক পরিচালকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তার নিয়োগের ক্ষেত্রে শুরু থেকেই তার মা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ঘনিষ্ঠ মিত্র ভারতের অবাঞ্ছিত হস্তক্ষেপ ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ ওঠে। গত জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতন হলে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নেন। এরপর অন্তর্বর্তী সরকারের আপত্তি এবং তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ ও নানা অনিয়মের বিশ্বাসযোগ্য তথ্যপ্রমাণ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সদর দপ্তরে পাঠানো হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত বছর ১১ জুলাই থেকে সংস্থাটি তাকে অনির্দিষ্টকালের জন্য ছুটিতে পাঠায়।

সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের বিরুদ্ধে পূর্ববর্তী আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) ঢাকার অদূরে ‘পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে’ দুর্নীতি, তথ্য গোপন ও মিথ্যা হলফনামা দিয়ে ১০ কাঠা আয়তনের একটি প্লট বরাদ্দ নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। এই অভিযোগের ভিত্তিতে দুদকের দায়ের করা মামলায় গত ২৭ নভেম্বর তাকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়। ওই মামলায় ২৮ জন সাক্ষী আদালতে তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেন।

দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সূত্রে জানা গেছে, সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া-বিষয়ক আঞ্চলিক পরিচালকের পদ পাওয়ার প্রমাণ পেয়েছে দুদক। দুদকের একটি বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে, শেখ হাসিনা তার মেয়েকে পদায়নের জন্য রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপব্যবহার এবং নিয়মবহির্ভূত কার্যকলাপের আশ্রয় নিয়েছিলেন। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, শেখ হাসিনা যুক্তিযুক্ত কারণ ছাড়াই পুতুলকে নিয়ম বহির্ভূতভাবে বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় সফরে সফরসঙ্গী করেছেন। এছাড়াও, পুতুলকে ওই পদে মনোনয়ন দেওয়ার আগে ২০২৩ সালের ৩০ অক্টোবর থেকে ২ নভেম্বর পর্যন্ত ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ডব্লিউএইচও’র ৭৬তম সম্মেলনে রাষ্ট্রীয় অর্থ অপচয় করে বাংলাদেশ থেকে শতাধিক ব্যক্তি অংশ নেন। পুতুল পারিবারিক প্রভাব ও তার নিকটাত্মীয়দের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করে বাংলাদেশ সরকারের বিপুল অর্থ অপচয় করেন।

সূচনা ফাউন্ডেশন নামে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেও পুতুলের বিরুদ্ধে অর্থ লোপাটের অভিযোগ রয়েছে। দুদকের ওই চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘তিনি সূচনা ফাউন্ডেশন নামে একটি প্রতিষ্ঠান খুলে বিভিন্ন সামাজিক ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান থেকে জোরপূর্বক উপঢৌকনের নামে অর্থ আদায় করে তা আত্মসাৎ করেছেন। এছাড়াও তিনি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন অটিস্টিক সেলকে ব্যবহার করে ভুয়া প্রকল্প দেখিয়ে বিপুল পরিমাণ রাষ্ট্রীয় অর্থ লোপাট করেছেন। পাশাপাশি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ওপর মায়ের পদের অবৈধ প্রভাব খাটিয়ে তিনি সূচনা ফাউন্ডেশনের নামে পাওয়া অর্থ আয়করমুক্ত করিয়ে নেন।’

আইন মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আরও জানান, সায়মা ওয়াজেদ পুতুলকে ওই পদে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে মনোনয়ন দেওয়ার আগে তার কানাডার নাগরিকত্ব থাকার বিষয়টি গোপন রাখা হয়েছিল। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কাছে এসব তথ্য আগেই জানানো হয়েছিল এবং দুদক এ বিষয়ে নিশ্চিত প্রমাণ পেয়েছে। সর্বশেষ চিঠিতেও এই বিষয়টি পুনরুল্লেখ করা হয়েছে।

পুতুলকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক অফিসের আঞ্চলিক পরিচালক পদে মনোনয়নের পরপরই তার প্রতারণা নিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে কিছু সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল। চিকিৎসা-বিষয়ক বিশ্বখ্যাত মেডিকেল জার্নাল দ্য ল্যানসেটের ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসের এক সম্পাদকীয়তে পুতুলের ওই পদে মনোনয়ন নিয়ে তীব্র আপত্তি তোলা হয়। এতে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘কয়েকটি অঞ্চলে প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতার ঘাটতি রয়েছে। এছাড়া প্রার্থীরা এই পদের জন্য উপযুক্ত কি না সেই প্রশ্নও রয়েছে।’ ব্রিটেনের ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস পত্রিকার একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, পুতুল স্কুল সাইকোলজিস্ট হিসেবে প্রশিক্ষণ নিয়ে একটি দাতব্য সংস্থা দেখাশোনা করেছেন, কিন্তু এ অভিজ্ঞতা নিয়ে একটি আন্তর্জাতিক সংস্থায় বড় বাজেট নিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা তার নেই।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দিল্লিভিত্তিক আঞ্চলিক কার্যালয়ে যোগ দেওয়ার আগে এ অঞ্চলের ১১টি দেশের মধ্যে ভোটাভুটি হয়। এতে বাংলাদেশের তৎকালীন সরকার হাসিনাকন্যা পুতুলকে প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেয়। নেপাল দেশটির নাগরিক শম্ভু আচার্যকে মনোনয়ন দেয়, যিনি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং সংস্থাটিতে ৩০ বছর যাবৎ কাজ করেছেন। এছাড়া জনস্বাস্থ্যের ওপর তার উচ্চতর (পিএইচডি) ডিগ্রি রয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশের প্রার্থীর চেয়ে সবদিক থেকে নেপালের প্রার্থী অনেক এগিয়ে ছিলেন। ওই কর্মকর্তা জানান, ভোটাভুটির আগে ভারতের নয়াদিল্লিতে ‘জি-২০ সম্মেলন’ অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশ এ সম্মেলনের সদস্য না হলেও অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ পায়। ২০২৩ সালের ৯ সেপ্টেম্বর সম্মেলনের বিরতির ফাঁকে শেখ হাসিনা ও পুতুল তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সঙ্গে সেলফি তোলেন। পুতুল তার নির্বাচনী প্রচারেও এ সেলফি ব্যবহার করেছেন, অথচ ওই সফরে তার অংশগ্রহণের বৈধতা ছিল না। এছাড়াও শেখ হাসিনা ওই নির্বাচনের আগে তার কন্যা পুতুলকে সফরসঙ্গী করে নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে যোগ দেন এবং অধিবেশনের ফাঁকে পুতুলকে সঙ্গে নিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালকের সঙ্গে দেখা করেন। অধিকাংশ দেশে ভারতের প্রভাব থাকায় ১১টি দেশের ভোটাভুটিতে নেপালের প্রার্থীকে হারিয়ে পুতুল সংস্থাটির আঞ্চলিক পরিচালকের পদে আসীন হন।

দুদকের পরিচালক পর্যায়ের এক কর্মকর্তা আরও জানান, আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ডব্লিউএইচওকে দেওয়া চিঠিতে পুতুলের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া আরেকটি মামলার নথিও দেওয়া হয়েছে। মামলাটির অভিযোগে বলা হয়েছে, তিনি সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক পরিচালক পদে নিয়োগের আবেদন করার সময় বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (সাবেক বিএসএমএমইউ) শিক্ষকতার মিথ্যা তথ্য দিয়েছেন। তিনি ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা তো দূরের কথা, লেখাপড়াও করেননি। এছাড়াও তিনি ক্ষমতার অপব্যবহার করে সূচনা ফাউন্ডেশনের নামে ২০টি ব্যাংকের সিএসআর (করপোরেট সোশ্যাল রেসপন্সিবিলিটি) ফান্ড থেকে ৩৩ কোটি টাকা হাতিয়ে নেন। এ ঘটনায় তার নামে পৃথক আরেকটি মামলা দায়ের করেছে দুদক।

আইন পরামর্শক ড. আসিফ নজরুল পুনরায় দৃঢ়ভাবে বলেন, সায়মা ওয়াজেদ পুতুল আদালতের রায়ে দণ্ডিত হয়েছেন। ক্ষমতার অপব্যবহার করে সরকারি প্লট বরাদ্দ গ্রহণের অভিযোগ প্রমাণ হওয়ায় আদালত তাকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছে। একজন দণ্ডিত আসামি কোনোভাবেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কোনো পদে নিয়োগ পাওয়ার যোগ্য নন। তাকে নিয়োগ দেওয়া হলে তা একটি নেতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুনাম ও বিশ্বাসযোগ্যতাকে ক্ষুণ্ণ করবে। তিনি আরও যোগ করেন, সরকার এ বিষয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে ইতোমধ্যে অবহিত করেছে। বাংলাদেশ চায় না যে নৈতিক স্খলনের দায়ে দণ্ডিত কোনো ব্যক্তি এমন একটি স্বনামধন্য আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের কোনো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে অধিষ্ঠিত হোক। এসব তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা পুতুলকে চূড়ান্তভাবে অব্যাহতি দিয়ে সংস্থাটির মর্যাদা রক্ষা করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি মোকাবিলায় সুদের হার অপরিবর্তিত রাখল ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক

ডব্লিউএইচওতে সায়মা ওয়াজেদের পদে ফেরা নিয়ে বিতর্ক, বাংলাদেশের কঠোর আপত্তি

আপডেট সময় : ০৮:৪৩:১১ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৪ জানুয়ারী ২০২৬

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক দপ্তরে (এসইএআরও) সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কন্যা সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের পদে ফেরার চেষ্টার তীব্র বিরোধিতা করছে বাংলাদেশ সরকার। ব্যাপক বিতর্ক ও দুর্নীতির অভিযোগে দীর্ঘমেয়াদি ছুটিতে থাকা পুতুলকে স্বপদে ফেরাতে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একাধিক লবিস্ট ফার্মের মাধ্যমে জোর লবিং চালানো হচ্ছে। এ বিষয়ে ডব্লিউএইচও বাংলাদেশের মতামত জানতে চাইলে সরকার দুর্নীতির মামলায় পুতুলের সাজার রায়ের কপিসহ বিভিন্ন অভিযোগের বিশ্বাসযোগ্য তথ্যপ্রমাণ পেশ করেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, লবিস্ট ফার্মগুলো ইতোমধ্যে পুতুলের পক্ষে ডব্লিউএইচওতে একাধিক আবেদন জমা দিয়েছে। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে সংস্থাটি বাংলাদেশ সরকারের মতামত জানতে চেয়ে একটি চিঠি পাঠায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে আইন, পররাষ্ট্র ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, পুতুলের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের আদালতে হওয়া রায়ের কপিসহ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা ও দপ্তরের প্রতিবেদন যুক্ত করে ডব্লিউএইচওকে একটি বিস্তারিত জবাব পাঠানো হয়েছে।

সরকারের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিতর্কিত ও দুর্নীতিবাজ একজন পলাতক ব্যক্তি যদি ওই পদে পুনরায় যোগদানের সুযোগ পান, তবে তা বাংলাদেশ ও ডব্লিউএইচও’র জন্য চরম অবমাননাকর হবে। আইন পরামর্শক ড. আসিফ নজরুল এ বিষয়ে মন্তব্য করে বলেন, সায়মা ওয়াজেদ পুতুল বাংলাদেশের আদালতে দণ্ডপ্রাপ্ত। একজন দণ্ডিত আসামিকে নিয়োগ দেওয়া হলে তা একটি নেতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুনাম ও বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ণ হবে। অন্তর্বর্তী সরকারের একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মর্যাদা রক্ষায় সর্বোচ্চ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ১ ফেব্রুয়ারি সায়মা ওয়াজেদ পুতুল ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে অবস্থিত ডব্লিউএইচও’র দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক অফিসের আঞ্চলিক পরিচালকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তার নিয়োগের ক্ষেত্রে শুরু থেকেই তার মা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ঘনিষ্ঠ মিত্র ভারতের অবাঞ্ছিত হস্তক্ষেপ ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ ওঠে। গত জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতন হলে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নেন। এরপর অন্তর্বর্তী সরকারের আপত্তি এবং তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ ও নানা অনিয়মের বিশ্বাসযোগ্য তথ্যপ্রমাণ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সদর দপ্তরে পাঠানো হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত বছর ১১ জুলাই থেকে সংস্থাটি তাকে অনির্দিষ্টকালের জন্য ছুটিতে পাঠায়।

সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের বিরুদ্ধে পূর্ববর্তী আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) ঢাকার অদূরে ‘পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে’ দুর্নীতি, তথ্য গোপন ও মিথ্যা হলফনামা দিয়ে ১০ কাঠা আয়তনের একটি প্লট বরাদ্দ নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। এই অভিযোগের ভিত্তিতে দুদকের দায়ের করা মামলায় গত ২৭ নভেম্বর তাকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়। ওই মামলায় ২৮ জন সাক্ষী আদালতে তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেন।

দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সূত্রে জানা গেছে, সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া-বিষয়ক আঞ্চলিক পরিচালকের পদ পাওয়ার প্রমাণ পেয়েছে দুদক। দুদকের একটি বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে, শেখ হাসিনা তার মেয়েকে পদায়নের জন্য রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপব্যবহার এবং নিয়মবহির্ভূত কার্যকলাপের আশ্রয় নিয়েছিলেন। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, শেখ হাসিনা যুক্তিযুক্ত কারণ ছাড়াই পুতুলকে নিয়ম বহির্ভূতভাবে বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় সফরে সফরসঙ্গী করেছেন। এছাড়াও, পুতুলকে ওই পদে মনোনয়ন দেওয়ার আগে ২০২৩ সালের ৩০ অক্টোবর থেকে ২ নভেম্বর পর্যন্ত ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ডব্লিউএইচও’র ৭৬তম সম্মেলনে রাষ্ট্রীয় অর্থ অপচয় করে বাংলাদেশ থেকে শতাধিক ব্যক্তি অংশ নেন। পুতুল পারিবারিক প্রভাব ও তার নিকটাত্মীয়দের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করে বাংলাদেশ সরকারের বিপুল অর্থ অপচয় করেন।

সূচনা ফাউন্ডেশন নামে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেও পুতুলের বিরুদ্ধে অর্থ লোপাটের অভিযোগ রয়েছে। দুদকের ওই চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘তিনি সূচনা ফাউন্ডেশন নামে একটি প্রতিষ্ঠান খুলে বিভিন্ন সামাজিক ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান থেকে জোরপূর্বক উপঢৌকনের নামে অর্থ আদায় করে তা আত্মসাৎ করেছেন। এছাড়াও তিনি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন অটিস্টিক সেলকে ব্যবহার করে ভুয়া প্রকল্প দেখিয়ে বিপুল পরিমাণ রাষ্ট্রীয় অর্থ লোপাট করেছেন। পাশাপাশি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ওপর মায়ের পদের অবৈধ প্রভাব খাটিয়ে তিনি সূচনা ফাউন্ডেশনের নামে পাওয়া অর্থ আয়করমুক্ত করিয়ে নেন।’

আইন মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আরও জানান, সায়মা ওয়াজেদ পুতুলকে ওই পদে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে মনোনয়ন দেওয়ার আগে তার কানাডার নাগরিকত্ব থাকার বিষয়টি গোপন রাখা হয়েছিল। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কাছে এসব তথ্য আগেই জানানো হয়েছিল এবং দুদক এ বিষয়ে নিশ্চিত প্রমাণ পেয়েছে। সর্বশেষ চিঠিতেও এই বিষয়টি পুনরুল্লেখ করা হয়েছে।

পুতুলকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক অফিসের আঞ্চলিক পরিচালক পদে মনোনয়নের পরপরই তার প্রতারণা নিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে কিছু সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল। চিকিৎসা-বিষয়ক বিশ্বখ্যাত মেডিকেল জার্নাল দ্য ল্যানসেটের ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসের এক সম্পাদকীয়তে পুতুলের ওই পদে মনোনয়ন নিয়ে তীব্র আপত্তি তোলা হয়। এতে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘কয়েকটি অঞ্চলে প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতার ঘাটতি রয়েছে। এছাড়া প্রার্থীরা এই পদের জন্য উপযুক্ত কি না সেই প্রশ্নও রয়েছে।’ ব্রিটেনের ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস পত্রিকার একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, পুতুল স্কুল সাইকোলজিস্ট হিসেবে প্রশিক্ষণ নিয়ে একটি দাতব্য সংস্থা দেখাশোনা করেছেন, কিন্তু এ অভিজ্ঞতা নিয়ে একটি আন্তর্জাতিক সংস্থায় বড় বাজেট নিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা তার নেই।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দিল্লিভিত্তিক আঞ্চলিক কার্যালয়ে যোগ দেওয়ার আগে এ অঞ্চলের ১১টি দেশের মধ্যে ভোটাভুটি হয়। এতে বাংলাদেশের তৎকালীন সরকার হাসিনাকন্যা পুতুলকে প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেয়। নেপাল দেশটির নাগরিক শম্ভু আচার্যকে মনোনয়ন দেয়, যিনি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং সংস্থাটিতে ৩০ বছর যাবৎ কাজ করেছেন। এছাড়া জনস্বাস্থ্যের ওপর তার উচ্চতর (পিএইচডি) ডিগ্রি রয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশের প্রার্থীর চেয়ে সবদিক থেকে নেপালের প্রার্থী অনেক এগিয়ে ছিলেন। ওই কর্মকর্তা জানান, ভোটাভুটির আগে ভারতের নয়াদিল্লিতে ‘জি-২০ সম্মেলন’ অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশ এ সম্মেলনের সদস্য না হলেও অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ পায়। ২০২৩ সালের ৯ সেপ্টেম্বর সম্মেলনের বিরতির ফাঁকে শেখ হাসিনা ও পুতুল তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সঙ্গে সেলফি তোলেন। পুতুল তার নির্বাচনী প্রচারেও এ সেলফি ব্যবহার করেছেন, অথচ ওই সফরে তার অংশগ্রহণের বৈধতা ছিল না। এছাড়াও শেখ হাসিনা ওই নির্বাচনের আগে তার কন্যা পুতুলকে সফরসঙ্গী করে নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে যোগ দেন এবং অধিবেশনের ফাঁকে পুতুলকে সঙ্গে নিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালকের সঙ্গে দেখা করেন। অধিকাংশ দেশে ভারতের প্রভাব থাকায় ১১টি দেশের ভোটাভুটিতে নেপালের প্রার্থীকে হারিয়ে পুতুল সংস্থাটির আঞ্চলিক পরিচালকের পদে আসীন হন।

দুদকের পরিচালক পর্যায়ের এক কর্মকর্তা আরও জানান, আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ডব্লিউএইচওকে দেওয়া চিঠিতে পুতুলের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া আরেকটি মামলার নথিও দেওয়া হয়েছে। মামলাটির অভিযোগে বলা হয়েছে, তিনি সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক পরিচালক পদে নিয়োগের আবেদন করার সময় বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (সাবেক বিএসএমএমইউ) শিক্ষকতার মিথ্যা তথ্য দিয়েছেন। তিনি ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা তো দূরের কথা, লেখাপড়াও করেননি। এছাড়াও তিনি ক্ষমতার অপব্যবহার করে সূচনা ফাউন্ডেশনের নামে ২০টি ব্যাংকের সিএসআর (করপোরেট সোশ্যাল রেসপন্সিবিলিটি) ফান্ড থেকে ৩৩ কোটি টাকা হাতিয়ে নেন। এ ঘটনায় তার নামে পৃথক আরেকটি মামলা দায়ের করেছে দুদক।

আইন পরামর্শক ড. আসিফ নজরুল পুনরায় দৃঢ়ভাবে বলেন, সায়মা ওয়াজেদ পুতুল আদালতের রায়ে দণ্ডিত হয়েছেন। ক্ষমতার অপব্যবহার করে সরকারি প্লট বরাদ্দ গ্রহণের অভিযোগ প্রমাণ হওয়ায় আদালত তাকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছে। একজন দণ্ডিত আসামি কোনোভাবেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কোনো পদে নিয়োগ পাওয়ার যোগ্য নন। তাকে নিয়োগ দেওয়া হলে তা একটি নেতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুনাম ও বিশ্বাসযোগ্যতাকে ক্ষুণ্ণ করবে। তিনি আরও যোগ করেন, সরকার এ বিষয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে ইতোমধ্যে অবহিত করেছে। বাংলাদেশ চায় না যে নৈতিক স্খলনের দায়ে দণ্ডিত কোনো ব্যক্তি এমন একটি স্বনামধন্য আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের কোনো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে অধিষ্ঠিত হোক। এসব তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা পুতুলকে চূড়ান্তভাবে অব্যাহতি দিয়ে সংস্থাটির মর্যাদা রক্ষা করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।