অর্থনৈতিক সংকট, মুদ্রার ধারাবাহিক অবমূল্যায়ন এবং দ্রব্যমূল্য অস্বাভাবিক বৃদ্ধির প্রতিবাদে ইরানে ব্যবসায়ীদের ডাকা শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি দিয়ে বিক্ষোভের সূত্রপাত হয়। ক্রমশ এই বিক্ষোভ সহিংস রূপ ধারণ করে, যেখানে আন্দোলনকারীরা সরকারি প্রতিষ্ঠান, নিরাপত্তা বাহিনীর কার্যালয় এবং মসজিদসহ বিভিন্ন স্থানে নজিরবিহীন তাণ্ডব চালায়।
নরওয়েভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা ইরান হিউম্যান রাইটস (আইএইচআরএনজিও) গতকাল জানিয়েছে, বিক্ষোভ দমনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বলপ্রয়োগে অন্তত ৬৫০ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ৯ জন ১৮ বছরের কম বয়সী। সংস্থাটি আরও জানায়, আন্দোলন শুরু হওয়ার পর থেকে কয়েক হাজার বিক্ষোভকারী আহত হয়েছেন। অন্যদিকে, বিক্ষোভকারীদের হামলায় শতাধিক নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য নিহত হয়েছেন।
বিক্ষোভে যুক্তরাষ্ট্র সমর্থন দেওয়ার পাশাপাশি ইরানে সামরিক হামলার হুমকি দিয়ে তেহরানের ওপর চাপ বাড়ালেও, এর পাল্টা জবাবে ইরানও কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে। এমন উত্তেজনার মধ্যেই তেহরান দাবি করেছে, তারা বিক্ষোভ সম্পূর্ণরূপে নিয়ন্ত্রণে এনেছে। এই পরিস্থিতিতে গতকাল সোমবার রাজধানী তেহরানসহ ইরানের বেশিরভাগ প্রদেশে সরকারের সমর্থনে লাখ লাখ জনতা রাস্তায় নেমে আসেন। কর্মকর্তারা দেশব্যাপী এই জনসমর্থনকে ‘শত্রুর ষড়যন্ত্রের মুখে ঐক্য ও সংহতির অকাট্য প্রমাণ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে বাগ্যুদ্ধ এখনো থামেনি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হুমকির মুখে ইরান সাফ জানিয়ে দিয়েছে, তারা যুদ্ধের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত। গতকাল তেহরানে বিদেশি কূটনীতিকদের সঙ্গে আলাপকালে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেন, সপ্তাহান্তে সহিংসতা বাড়লেও এখন পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অভিযোগ করেন যে, দেশব্যাপী বিক্ষোভ সহিংস ও রক্তাক্ত হয়ে উঠেছে যাতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দেশে সামরিক হস্তক্ষেপের একটি অজুহাত তৈরি করতে পারেন। এমন কঠিন পরিস্থিতিতে ইরান যুদ্ধের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত জানিয়ে তিনি বলেন, “আমরা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত, সংলাপের জন্যও প্রস্তুত।”
বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে কয়েকদিন ধরে ইরানজুড়ে ইন্টারনেট সেবা বিচ্ছিন্ন রাখা হয়েছিল। আরাগচি ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইন্টারনেট পরিষেবা শিগগিরই পুনরায় চালু করা হবে এবং সরকার নিরাপত্তা সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে এ বিষয়ে অগ্রগতি করছে।
বিক্ষোভের তৃতীয় সপ্তাহে এসে ট্রাম্প ইরানের ওপর চাপ বাড়িয়েছেন। সম্প্রতি তিনি তেহরানকে হুমকি দিয়ে বলেছেন, তার হাতে ‘খুব শক্তিশালী বিকল্প’ রয়েছে। মার্কিন সামরিক বাহিনী বর্তমানে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের বিরোধী নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে। ট্রাম্পের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, সুইজারল্যান্ডের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের যোগাযোগের পথ এখনো খোলা আছে।
বিক্ষোভকারীদের ওপর যেন বলপ্রয়োগ করা না হয় সেজন্য জার্মানি, ফিনল্যান্ড, কানাডাসহ বিভিন্ন দেশ ইরানের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছে। অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) জানিয়েছে, প্রয়োজন হলে ইরানের ওপর আরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হবে। ইইউর মুখপাত্র আনোয়ার এল আনুনি বলেন, “বিক্ষোভকারীদের ওপর সহিংস দমন-পীড়নের পর আমরা নতুন, আরও কঠোর নিষেধাজ্ঞার প্রস্তাব দিতে প্রস্তুত।” বর্তমানে যদিও পশ্চিমা বিভিন্ন দেশ তেহরানের ওপর নানা অজুহাতে শত শত নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে রেখেছে।
তীব্র বিক্ষোভে বিপর্যস্ত ইরানের সরকার আন্তর্জাতিক অঙ্গনে খুব একটা সমর্থন না পেলেও, তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে চীন। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিবৃতি দিয়ে বলেছে যে, তারা অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বিদেশি হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাও নিং বলেন, “আমরা সর্বদা অন্যান্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করেছি এবং ধারাবাহিকভাবে সমর্থন করেছি যে, সমস্ত জাতির সার্বভৌমত্ব এবং নিরাপত্তা আন্তর্জাতিক আইন দ্বারা সম্পূর্ণরূপে সুরক্ষিত হওয়া উচিত। আমরা সকল পক্ষকে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য আরও বেশি কিছু করার আহ্বান জানাই।”
মার্কিন মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্ট নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, বিক্ষোভে এ পর্যন্ত প্রায় ৫০০ মানুষ নিহত হয়েছেন। তাদের তথ্য অনুসারে, গত ২৮ ডিসেম্বর রাজধানী তেহরানে শুরু হওয়া বিক্ষোভ ১৮৬টি শহর এবং ৩১টি প্রদেশে ছড়িয়ে পড়ে। বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে সরকার কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করে, যার ফলে ৪৯৬ জন বিক্ষোভকারী নিহত হন এবং কমপক্ষে ১০ হাজার ৬০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
রিপোর্টারের নাম 
























