ইরানে টানা ১৬ দিন ধরে চলমান সরকারবিরোধী আন্দোলন দমনে নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর অভিযানে প্রাণহানির সংখ্যা বেড়ে অন্তত ৬৪৮ জনে দাঁড়িয়েছে। নরওয়েভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা ‘ইরান হিউম্যান রাইটস’ (আইএইচআর) সোমবার সর্বশেষ এই তথ্য প্রকাশ করেছে।
মানবাধিকার সংস্থাটির প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিহতদের মধ্যে অন্তত ৯ জন শিশু ও কিশোর রয়েছে যাদের বয়স ১৮ বছরের নিচে। এই সংঘাতময় পরিস্থিতিতে নিহতের পাশাপাশি কয়েক হাজার মানুষ গুরুতর আহত হয়েছেন বলেও জানানো হয়েছে। এর আগে অন্য একটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা এই আন্দোলনে ৫৪৪ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছিল।
বর্তমানে ইরানে ইন্টারনেট সেবা ব্যাপকভাবে ব্যাহত হওয়ায় হতাহতের প্রকৃত সংখ্যা এবং ঘটনার বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। তবে দেশটির রাজধানী তেহরানের বিভিন্ন হাসপাতাল ও মর্গ থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওগুলোতে বিপুল সংখ্যক মরদেহের দৃশ্য দেখা গেছে, যা পরিস্থিতির ভয়াবহতার সাক্ষ্য দিচ্ছে।
এদিকে, ইরানে বিক্ষোভকারীদের ওপর এই বর্বরোচিত দমনাভিযানের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে পশ্চিমা বিশ্ব। ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইয়েভেত্তে কুপার এক বার্তায় শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের ওপর সহিংসতা বন্ধের জোর দাবি জানিয়েছেন। তিনি ইরান সরকারকে নাগরিকদের মৌলিক অধিকার ও বাকস্বাধীনতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। সংহতি প্রকাশ করে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ বলেছেন, মৌলিক স্বাধীনতা একটি সার্বজনীন অধিকার এবং যারা এই অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে শামিল হয়েছেন, ফ্রান্স তাদের পাশে রয়েছে। এর আগে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও জার্মানির শীর্ষ নেতারা এক যৌথ বিবৃতিতে ইরানে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অবসান ঘটানোর দাবি তুলেছিলেন।
আন্তর্জাতিক মহলের এই সমালোচনার মুখে কঠোর প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে এক ফোনালাপে তিনি অভিযোগ করেন, পশ্চিমা দেশগুলো ইরানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত হস্তক্ষেপ করছে। আরাগচি দাবি করেন, ইসরায়েল-সমর্থিত কিছু গোষ্ঠী ও নির্দিষ্ট কিছু সংবাদমাধ্যম ইরানে সহিংসতা উসকে দেওয়ার পেছনে কাজ করছে। একইসঙ্গে লন্ডনে অবস্থিত ইরানি কূটনৈতিক মিশনের নিরাপত্তা জোরদার করা না হলে সেখান থেকে কূটনীতিকদের ফিরিয়ে নেওয়ার হুমকিও দেন তিনি।
উল্লেখ্য, গত ২৮ ডিসেম্বর ইরানের বাজারে চরম অর্থনৈতিক সংকট, লাগামহীন দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি এবং জাতীয় মুদ্রা রিয়ালের রেকর্ড দরপতনের প্রতিবাদে এই বিক্ষোভের সূত্রপাত হয়। তবে সাধারণ মানুষের এই ক্ষোভ দ্রুতই সরকারবিরোধী রাজনৈতিক আন্দোলনে রূপ নেয়। নির্বাসিত শেষ শাহের পুত্র রেজা পাহলভি এই আন্দোলন আরও জোরদার করার আহ্বান জানানোর পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। বর্তমানে দেশটির তরুণ সমাজ ও সাধারণ জনগণ প্রশাসনিক দুর্নীতি এবং বর্তমান শাসনব্যবস্থার পরিবর্তনের দাবিতে রাজপথে অবস্থান করছে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক মহল সতর্ক করে বলছে, সরকার যদি অবিলম্বে নমনীয় না হয়, তবে এই সহিংসতা ও প্রাণহানি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে।
রিপোর্টারের নাম 























