ঢাকা ০৮:০৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬

চট্টগ্রামের আন্ডারওয়ার্ল্ডে অস্ত্রের ঝনঝনানি: ভোটের আগে বাড়ছে খুনাখুনি

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বন্দরনগরী চট্টগ্রামসহ পুরো জেলায় অবৈধ অস্ত্রের মহড়া ও রাজনৈতিক সহিংসতা চরম উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থানা থেকে লুট হওয়া বিপুল পরিমাণ আগ্নেয়াস্ত্র এখনো উদ্ধার না হওয়ায় নির্বাচনি পরিবেশ মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে। আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি ও আন্ডারওয়ার্ল্ডের নিয়ন্ত্রণ নিতে গিয়ে গত কয়েক মাসে চট্টগ্রামে শতাধিক খুনের ঘটনা ঘটেছে, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে গভীর আতঙ্ক তৈরি করেছে।

চট্টগ্রামে নির্বাচনি প্রচার শুরুর আগেই ফটিকছড়ি, হাটহাজারী ও রাউজানে একের পর এক নৃশংস হত্যাকাণ্ড আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির চিত্র তুলে ধরছে। গত এক বছরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ১,৬২০টির মতো অস্ত্র উদ্ধার করলেও লুট হওয়া অস্ত্রের একটি বড় অংশ এখনো সন্ত্রাসীদের হাতে রয়ে গেছে। অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের আগে বড় ধরনের অভিযান চালিয়ে এই ‘অস্ত্রের পাহাড়’ উদ্ধার করা না গেলে ভোটের মাঠে পেশিশক্তির দাপট ঠেকানো অসম্ভব হবে।

সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক সহিংসতার শিকার হয়েছেন বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী নেতা ও কর্মী। গত ১০ জানুয়ারি রাতে ফটিকছড়িতে মোটরসাইকেলে আসা দুর্বৃত্তদের গুলিতে জামাল উদ্দিন নামে এক জামায়াত কর্মী নিহত হন। ৫ জানুয়ারি রাউজানে যুবদল নেতা জানে আলম সিকদারকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়। এর আগে চট্টগ্রাম-৮ আসনের প্রার্থী এরশাদ উল্লাহর নির্বাচনী গণসংযোগে হামলার ঘটনা ঘটে। পুলিশের তথ্যমতে, জুলাই অভ্যুত্থানে চট্টগ্রাম মহানগর ও জেলার থানাগুলো থেকে ১,১৮০টি অস্ত্র লুট হয়েছিল। যার মধ্যে প্রায় ১৮৪টি আগ্নেয়াস্ত্র এবং বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। এই নিখোঁজ অস্ত্রগুলোই এখন বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে গোয়েন্দা তথ্যে জানা গেছে।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রামের সাধারণ সম্পাদক আকতার কবীর চৌধুরী উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, রাজনৈতিক কারণে তো বটেই, এমনকি বালুমহাল বা মাটিকাটার নিয়ন্ত্রণ নিয়েও অস্ত্রের মহড়া চলছে। বিশেষ করে বাঁশখালীর উপকূলীয় এলাকা এবং রাঙ্গুনিয়ার পাহাড়ে স্থানীয়ভাবে তৈরি অবৈধ অস্ত্রের কারখানাগুলো সন্ত্রাসীদের বড় উৎসে পরিণত হয়েছে। বিদেশ থেকে চোরাপথে আসা একে-৪৭ বা অত্যাধুনিক পিস্তলের পাশাপাশি এসব স্থানীয় এলজি ও পাইপগান ভোটের মাঠে রক্তপাতের আশঙ্কা বাড়িয়ে দিচ্ছে।

চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, নির্বাচন সামনে রেখে ইতোমধ্যে তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসীদের ধরতে ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’ এর দ্বিতীয় ধাপ চলমান রয়েছে। জেলা পুলিশের মুখপাত্র রাসেল জানান, অবৈধ অস্ত্রধারীদের তালিকা করা হয়েছে এবং তাদের গ্রেপ্তারে নিয়মিত অভিযান চলছে। তবে সাধারণ ভোটাররা মনে করছেন, শুধুমাত্র তালিকা নয়, বরং লুট হওয়া এবং অবৈধ সব অস্ত্র উদ্ধার না হওয়া পর্যন্ত একটি উৎসবমুখর ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের পরিবেশ নিশ্চিত করা কঠিন হবে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

হারের বৃত্তে রংপুর, সিলেট টাইটান্সের সহজ জয়

চট্টগ্রামের আন্ডারওয়ার্ল্ডে অস্ত্রের ঝনঝনানি: ভোটের আগে বাড়ছে খুনাখুনি

আপডেট সময় : ০২:২৬:৪৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বন্দরনগরী চট্টগ্রামসহ পুরো জেলায় অবৈধ অস্ত্রের মহড়া ও রাজনৈতিক সহিংসতা চরম উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থানা থেকে লুট হওয়া বিপুল পরিমাণ আগ্নেয়াস্ত্র এখনো উদ্ধার না হওয়ায় নির্বাচনি পরিবেশ মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে। আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি ও আন্ডারওয়ার্ল্ডের নিয়ন্ত্রণ নিতে গিয়ে গত কয়েক মাসে চট্টগ্রামে শতাধিক খুনের ঘটনা ঘটেছে, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে গভীর আতঙ্ক তৈরি করেছে।

চট্টগ্রামে নির্বাচনি প্রচার শুরুর আগেই ফটিকছড়ি, হাটহাজারী ও রাউজানে একের পর এক নৃশংস হত্যাকাণ্ড আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির চিত্র তুলে ধরছে। গত এক বছরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ১,৬২০টির মতো অস্ত্র উদ্ধার করলেও লুট হওয়া অস্ত্রের একটি বড় অংশ এখনো সন্ত্রাসীদের হাতে রয়ে গেছে। অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের আগে বড় ধরনের অভিযান চালিয়ে এই ‘অস্ত্রের পাহাড়’ উদ্ধার করা না গেলে ভোটের মাঠে পেশিশক্তির দাপট ঠেকানো অসম্ভব হবে।

সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক সহিংসতার শিকার হয়েছেন বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী নেতা ও কর্মী। গত ১০ জানুয়ারি রাতে ফটিকছড়িতে মোটরসাইকেলে আসা দুর্বৃত্তদের গুলিতে জামাল উদ্দিন নামে এক জামায়াত কর্মী নিহত হন। ৫ জানুয়ারি রাউজানে যুবদল নেতা জানে আলম সিকদারকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়। এর আগে চট্টগ্রাম-৮ আসনের প্রার্থী এরশাদ উল্লাহর নির্বাচনী গণসংযোগে হামলার ঘটনা ঘটে। পুলিশের তথ্যমতে, জুলাই অভ্যুত্থানে চট্টগ্রাম মহানগর ও জেলার থানাগুলো থেকে ১,১৮০টি অস্ত্র লুট হয়েছিল। যার মধ্যে প্রায় ১৮৪টি আগ্নেয়াস্ত্র এবং বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। এই নিখোঁজ অস্ত্রগুলোই এখন বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে গোয়েন্দা তথ্যে জানা গেছে।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রামের সাধারণ সম্পাদক আকতার কবীর চৌধুরী উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, রাজনৈতিক কারণে তো বটেই, এমনকি বালুমহাল বা মাটিকাটার নিয়ন্ত্রণ নিয়েও অস্ত্রের মহড়া চলছে। বিশেষ করে বাঁশখালীর উপকূলীয় এলাকা এবং রাঙ্গুনিয়ার পাহাড়ে স্থানীয়ভাবে তৈরি অবৈধ অস্ত্রের কারখানাগুলো সন্ত্রাসীদের বড় উৎসে পরিণত হয়েছে। বিদেশ থেকে চোরাপথে আসা একে-৪৭ বা অত্যাধুনিক পিস্তলের পাশাপাশি এসব স্থানীয় এলজি ও পাইপগান ভোটের মাঠে রক্তপাতের আশঙ্কা বাড়িয়ে দিচ্ছে।

চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, নির্বাচন সামনে রেখে ইতোমধ্যে তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসীদের ধরতে ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’ এর দ্বিতীয় ধাপ চলমান রয়েছে। জেলা পুলিশের মুখপাত্র রাসেল জানান, অবৈধ অস্ত্রধারীদের তালিকা করা হয়েছে এবং তাদের গ্রেপ্তারে নিয়মিত অভিযান চলছে। তবে সাধারণ ভোটাররা মনে করছেন, শুধুমাত্র তালিকা নয়, বরং লুট হওয়া এবং অবৈধ সব অস্ত্র উদ্ধার না হওয়া পর্যন্ত একটি উৎসবমুখর ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের পরিবেশ নিশ্চিত করা কঠিন হবে।