বাংলাদেশের ৫৪ বছরের ইতিহাসে ভোট বরাবরই এক অমীমাংসিত সংকটের নাম হলেও বিগত দেড় দশকের শাসনামলে এই ব্যবস্থাটি পুরোপুরি ধূলিসাৎ হয়ে গিয়েছিল। বিশেষ করে ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের বিতর্কিত নির্বাচনগুলো দেশের সাধারণ মানুষের কাছে ভোট শব্দটিকে একটি নিষ্ঠুর প্রহসনে পরিণত করেছিল।
তবে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার মহাবিপ্লব বাংলাদেশের রাজনৈতিক ললাট থেকে স্বৈরাচারের কলঙ্ক মুছে দিয়েছে। সেই বিপ্লবের চূড়ান্ত সার্থকতা এখন নির্ভর করছে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ওপর। এই নির্বাচন কেবল একটি প্রতীকী ভোট নয়, বরং একটি লুণ্ঠনমূলক রাষ্ট্র কাঠামো ভেঙে ‘মানবিক রাষ্ট্র’ গড়ার স্বপ্ন। মানুষ এখন গুম, খুন ও দুর্নীতির অন্ধকার থেকে মুক্তি পেয়ে নাগরিক মর্যাদা ও আইনের শাসনের নিশ্চয়তা চায়। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সফলতার সবচেয়ে বড় মানদণ্ড হবে একটি স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন উপহার দেওয়া।
বাংলাদেশের বর্তমান সাংবিধানিক সংকটের মূলে রয়েছে ২০১১ সালের পঞ্চদশ সংশোধনী। সুপ্রিম কোর্টের একটি সংক্ষিপ্ত রায়কে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে অত্যন্ত তড়িঘড়ি করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করা হয়েছিল, যা কার্যত জনগণের ভোটাধিকার হরণ করে একদলীয় শৃঙ্খলে রাষ্ট্রকে আবদ্ধ করার একটি গভীর নীল নকশা ছিল। এই সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রযন্ত্রের নির্বাহী, আইন ও বিচার বিভাগের মধ্যকার ক্ষমতার ভারসাম্য নষ্ট করা হয়, যার বিষফল হিসেবে জাতি ‘নিশীথ ভোট’ ও ‘ডামি নির্বাচনের’ মতো নজিরবিহীন জালিয়াতি প্রত্যক্ষ করেছে।
অথচ ১৯৯১, ১৯৯৬ এবং ২০০১ সালের সাধারণ নির্বাচনের পর দেশে আর কোনো সুষ্ঠু নির্বাচন না হওয়া এবং ক্ষমতা হস্তান্তরে রাজনৈতিক দলগুলোর অনীহা এ দেশের মানুষকে ভোটের প্রতি বীতশ্রদ্ধ করে তুলেছিল। স্বাধীনতার ৫৪ বছর পর আজও সেই কাঙ্ক্ষিত গণতন্ত্রের জন্য মানুষকে রক্ত দিতে হচ্ছে, যা জাতীয় ইতিহাসের এক চরম পরিতাপের বিষয়।
২০২৫ সালের ১১ ডিসেম্বর ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের প্রস্তুতি এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে। ২৯ ডিসেম্বর মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার কাজ শেষ হয়েছে এবং বর্তমানে যাচাই-বাছাই ও আপিল নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া চলছে। এবারের নির্বাচনে ভোটার সংখ্যা অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে ১২ কোটি ৭৬ লাখের উপরে পৌঁছেছে, যার মধ্যে ২ কোটিরও বেশি তরুণ বা জেনারেশন-জেড ভোটার। এই তরুণ প্রজন্মই চব্বিশের বিপ্লবের মূল চালিকাশক্তি, যারা একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র গঠনের অঙ্গীকার নিয়ে মাঠে নেমেছে।
এবারের নির্বাচনের সবচেয়ে বৈপ্লবিক দিক হলো সংসদীয় ভোটের পাশাপাশি একই দিনে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ‘গণভোট’। এই গণভোটের মাধ্যমে পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিল ও তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার স্থায়ী পুনস্থাপনের মতো মৌলিক সংস্কারগুলোতে জনগণের সরাসরি ম্যান্ডেট নেওয়া হবে।
রাজনৈতিক ময়দানে এবার পরিবর্তনের হাওয়া বইছে। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি তাদের ‘৩১ দফা’ রাষ্ট্র সংস্কারের রূপরেখা নিয়ে শক্ত অবস্থানে রয়েছে। পাশাপাশি জামায়াতে ইসলামীসহ অন্যান্য দলগুলোও জোটবদ্ধ হওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে। তবে শুরুতে চমক দেখালেও ছাত্র নেতাদের গঠিত নতুন দলগুলো সাংগঠনিক দুর্বলতার কারণে কিছুটা পিছিয়ে পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে একটি অবাধ ও জালিয়াতিমুক্ত ভোট নিশ্চিত করা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
প্রশাসনের ভেতরে থাকা ফ্যাসিবাদের অবশিষ্টাংশ দূর করার পাশাপাশি প্রতিটি কেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন এবং স্বচ্ছ ব্যালট বক্সে ভোট গ্রহণ নিশ্চিত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সেনাবাহিনীর সরাসরি তত্ত্বাবধানে নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা এই নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতাকে আরও বাড়িয়ে তুলবে বলে আশা করা হচ্ছে। ১২ ফেব্রুয়ারির এই লড়াই কেবল ক্ষমতা বদলের নয়, বরং এটি নাগরিক মর্যাদা ও হারানো অধিকার পুনরুদ্ধারের এক ঐতিহাসিক যুদ্ধ।
রিপোর্টারের নাম 

























