শান্তিতে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বিশ্বজুড়ে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হবে এবং বিদেশ ভ্রমণ সহজ হবে—এমন প্রত্যাশা থাকলেও বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। বর্তমানে কোনো আনুষ্ঠানিক নিষেধাজ্ঞা না থাকা সত্ত্বেও ভারত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, সৌদি আরব ও ভিয়েতনামসহ অনেক দেশই বাংলাদেশিদের ভিসা দিতে অনীহা দেখাচ্ছে। পর্যটন ভিসা থেকে শুরু করে শিক্ষার্থী ও কর্মসংস্থান ভিসা পেতেও পোহাতে হচ্ছে চরম ভোগান্তি। বিশ্লেষক ও পর্যটন খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, অনিয়মিত পথে বিদেশ যাত্রার প্রবণতা বৃদ্ধি এবং বিদেশের মাটিতে রাজনৈতিক বিবাদে জড়ানোর কারণে বাংলাদেশের পাসপোর্টের বিশ্বাসযোগ্যতা সংকটে পড়েছে।
বর্তমানে বিদেশ যেতে চাওয়া শামীম হাসান দম্পতির মতো হাজারো বাংলাদেশি ভিসা জটিলতায় পড়ে পরিকল্পনা বাতিল করতে বাধ্য হচ্ছেন। এক সময় সহজে পাওয়া থাইল্যান্ডের ভিসা পেতে এখন ৪৫ দিনের বেশি সময় লাগছে, আবার সিঙ্গাপুর বা মালয়েশিয়ার ভিসা অনুমোদনের হার (রেশিও) আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে।
ভিসা জটিলতার নেপথ্যে ‘অনিয়মিত’ অভিবাসন
সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবীর মনে করেন, পর্যটন ভিসার অপব্যবহার করে এক দেশ থেকে অন্য দেশে অবৈধভাবে পাড়ি জমানোর প্রবণতা বেড়ে যাওয়ায় অনেক দেশ এখন সতর্ক অবস্থানে। বিশেষ করে ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড বা ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশগুলো, যেখান থেকে সহজেই ভিসা পাওয়া যেত, তারাও এখন কঠোর যাচাই-বাছাই করছে। কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ভ্রমণ ভিসায় লোক পাঠিয়ে সেখানে গিয়ে শ্রমিক ভিসায় রূপান্তর করার চেষ্টা করায় সাধারণ পর্যটকরাও এখন সন্দেহের তালিকায় পড়ছেন।
শিক্ষার্থী ও পর্যটন খাতে বড় ধাক্কা
যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া ও কানাডার মতো দেশগুলো গত বছরের তুলনায় এ বছর অনেক কম ভিসা দিচ্ছে বলে জানিয়েছেন পর্যটন ব্যবসায়ীরা। টোয়াব (TOAB) সভাপতি মো. রাফেউজ্জামান জানান, ভারত পর্যটন ভিসা বন্ধ রাখার পাশাপাশি ইউএই, কাতার ও বাহরাইনের মতো দেশগুলোও ভিসা দিচ্ছে না। এছাড়া মেধার স্বাক্ষর রেখে স্কলারশিপ পাওয়া শিক্ষার্থীরাও শেষ মুহূর্তে ভিসা না পেয়ে শিক্ষাবর্ষ হারাচ্ছেন। তানজুমান আলম ঝুমার মতো অনেক শিক্ষার্থী যুক্তরাষ্ট্র বা হাঙ্গেরিতে পড়ার স্বপ্ন দেখেও ভিসা জটিলতায় পিছিয়ে পড়েছেন।
ভাবমূর্তি সংকট ও রাজনৈতিক অস্থিরতা
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ভারতের ভিসা সীমিত হওয়াকে অনেকে রাজনৈতিক কারণ হিসেবে দেখছেন। তবে বিশ্বের অন্যান্য দেশের কঠোরতার পেছনে বাংলাদেশিদের বিদেশের মাটিতে প্রকাশ্য কোন্দল ও অস্থিতিশীলতাকে দায়ী করছেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা। হেনলি অ্যান্ড পার্টনার্সের সূচকে বাংলাদেশের পাসপোর্টের অবস্থান এখনও বিশ্বের দুর্বলতম দেশগুলোর তালিকায় সপ্তম। দুর্বল পাসপোর্ট ও অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতার সুযোগ নিয়ে অবৈধ অভিবাসনের চেষ্টা বিদেশের কাছে ভুল বার্তা দিচ্ছে।
সমাধানের পথ ও সরকারি উদ্যোগ
যদিও প্রধান উপদেষ্টা ৯টি দেশের ভিসা প্রক্রিয়া ঢাকা থেকেই শুরু করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন, কিন্তু দৃশ্যমান কোনো সুফল এখনও মেলেনি। বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের ক্ষেত্রে নির্বাচিত সরকার না আসা পর্যন্ত পরিস্থিতির পরিবর্তনের সম্ভাবনা ক্ষীণ হলেও অন্যান্য দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ানো জরুরি। বিশেষ করে যারা অসৎ উপায়ে বিদেশে লোক পাঠাচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া এবং আন্তর্জাতিক মহলে আস্থার পরিবেশ ফিরিয়ে আনাই এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ।
ভিসা পেতে বর্তমানে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তি হচ্ছে যে দেশগুলোতে:
- ভারত: পর্যটন ভিসা কার্যত বন্ধ।
- থাইল্যান্ড ও ফিলিপাইন: ভিসা পেতে অতিরিক্ত সময় (৪৫ দিন+) লাগছে।
- ইউএসএ ও অস্ট্রেলিয়া: ভিসা অনুমোদনের হার অনেক কমেছে।
- আরব দেশসমূহ: ইউএই, কাতার, ওমান ও বাহরাইনের ভিসা পাওয়া অত্যন্ত কঠিন।
- শ্রীলঙ্কা ও ইন্দোনেশিয়া: ই-ভিসা ও ফি সংক্রান্ত জটিলতা বেড়েছে।
রিপোর্টারের নাম 

























