ঢাকা ০৫:৪৯ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

রপ্তানি আয়ে বড় ধাক্কা: অর্থবছরের প্রথমার্ধে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি

২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি রেকর্ড করা হয়েছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) প্রকাশিত সবশেষ তথ্যানুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধে মোট রপ্তানি আয় আগের বছরের তুলনায় ২.১৯ শতাংশ কমে ২৩.৯৯ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে ডিসেম্বর মাসে রপ্তানি আয় গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৪.২৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর শুল্কনীতি, বৈশ্বিক বাজারে চীনের আগ্রাসী অবস্থান এবং অভ্যন্তরীণ নীতি সহায়তার অভাবকে এই ধসের প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি রপ্তানি খাত এখন এক গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ইপিবির তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গত বছরের ডিসেম্বরের ৪.৬২ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় এই বছরের ডিসেম্বরে আয় কমে ৩.৮৯ বিলিয়ন ডলারে ঠেকেছে।

দেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক (RMG) প্রথমার্ধে ২.৬৩ শতাংশ আয় হারিয়েছে। গত বছরের ১৯.৮৮ বিলিয়ন ডলারের বিপরীতে এবার আয় হয়েছে ১৯.৩৬ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে নিটওয়্যার খাতে ৩.২২ শতাংশ এবং ওভেন পোশাকে ১.৯১ শতাংশ নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়েছে। বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম জানিয়েছেন, ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কনীতির কারণে বিশেষ করে মার্কিন বাজারে কাজের অর্ডারে বড় ধরনের পতন ঘটেছে। অন্যদিকে চীন ও ভারত ইউরোপীয় ইউনিয়নে কম দামে পণ্য সরবরাহ করে বাংলাদেশের বাজার দখল করছে।

রপ্তানি আয়ের পরিসংখ্যানে কিছু খাতে প্রবৃদ্ধি দেখা গেলেও অধিকাংশ বড় খাতই সংকটে রয়েছে:

  • কৃষিপণ্য: ১০.৩০ শতাংশ কমে ৫৩৪ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।
  • প্লাস্টিক পণ্য: ৮.৮৩ শতাংশ কমে ১৪৪ মিলিয়ন ডলারে নেমেছে।
  • চামড়াজাত পণ্য: এই খাতে ৫.৬১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে (মোট ৬১০ মিলিয়ন ডলার), যার মধ্যে চামড়াজাত পণ্যে ১৯.৫০ শতাংশ উল্লম্ফন দেখা গেছে।
  • ওষুধ: ৩.৮৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধির মুখ দেখেছে।
  • মাছ ও হিমায়িত খাদ্য: ৩.৭২ শতাংশ সামান্য প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈশ্বিক চাহিদা কমে যাওয়া এবং ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা দেশের রপ্তানি খাতকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। সিপিডি-র ডিস্টিংগুইশড ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, মার্কিন বাজারে রপ্তানির অবস্থা ভালো নয়। এর কারণ হিসেবে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্ক আরোপ ও প্রতিযোগিতামূলক বাজারে বাংলাদেশের সক্ষমতা হ্রাসকে দায়ী করেন। একই সময়ে ভারত ও চীন তাদের রপ্তানিকারকদের প্রণোদনা দিয়ে আরও শক্তিশালী করছে, যেখানে বাংলাদেশ আইএমএফ-এর শর্ত মেনে প্রণোদনা কমিয়ে দিয়েছে।

উদ্যোক্তারা বলছেন, ৯ শতাংশ মজুরি বৃদ্ধি এবং শ্রম আইনের কঠোর প্রয়োগ উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে অর্থবছরের বাকি সময়টুকুতে ইতিবাচক ধারায় ফেরার সম্ভাবনা ক্ষীণ। যদি সরকার দ্রুত কার্যকর নীতি গ্রহণ না করে, তবে এই অর্থবছর নেতিবাচক প্রবৃদ্ধিতেই শেষ হতে পারে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

শিক্ষকদের অন্য পেশায় যুক্ত হতে কর্তৃপক্ষের অনুমতি আবশ্যক: শিক্ষামন্ত্রী

রপ্তানি আয়ে বড় ধাক্কা: অর্থবছরের প্রথমার্ধে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি

আপডেট সময় : ১২:৫৬:০৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ৫ জানুয়ারী ২০২৬
২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি রেকর্ড করা হয়েছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) প্রকাশিত সবশেষ তথ্যানুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধে মোট রপ্তানি আয় আগের বছরের তুলনায় ২.১৯ শতাংশ কমে ২৩.৯৯ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে ডিসেম্বর মাসে রপ্তানি আয় গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৪.২৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর শুল্কনীতি, বৈশ্বিক বাজারে চীনের আগ্রাসী অবস্থান এবং অভ্যন্তরীণ নীতি সহায়তার অভাবকে এই ধসের প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি রপ্তানি খাত এখন এক গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ইপিবির তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গত বছরের ডিসেম্বরের ৪.৬২ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় এই বছরের ডিসেম্বরে আয় কমে ৩.৮৯ বিলিয়ন ডলারে ঠেকেছে।

দেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক (RMG) প্রথমার্ধে ২.৬৩ শতাংশ আয় হারিয়েছে। গত বছরের ১৯.৮৮ বিলিয়ন ডলারের বিপরীতে এবার আয় হয়েছে ১৯.৩৬ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে নিটওয়্যার খাতে ৩.২২ শতাংশ এবং ওভেন পোশাকে ১.৯১ শতাংশ নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়েছে। বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম জানিয়েছেন, ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কনীতির কারণে বিশেষ করে মার্কিন বাজারে কাজের অর্ডারে বড় ধরনের পতন ঘটেছে। অন্যদিকে চীন ও ভারত ইউরোপীয় ইউনিয়নে কম দামে পণ্য সরবরাহ করে বাংলাদেশের বাজার দখল করছে।

রপ্তানি আয়ের পরিসংখ্যানে কিছু খাতে প্রবৃদ্ধি দেখা গেলেও অধিকাংশ বড় খাতই সংকটে রয়েছে:

  • কৃষিপণ্য: ১০.৩০ শতাংশ কমে ৫৩৪ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।
  • প্লাস্টিক পণ্য: ৮.৮৩ শতাংশ কমে ১৪৪ মিলিয়ন ডলারে নেমেছে।
  • চামড়াজাত পণ্য: এই খাতে ৫.৬১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে (মোট ৬১০ মিলিয়ন ডলার), যার মধ্যে চামড়াজাত পণ্যে ১৯.৫০ শতাংশ উল্লম্ফন দেখা গেছে।
  • ওষুধ: ৩.৮৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধির মুখ দেখেছে।
  • মাছ ও হিমায়িত খাদ্য: ৩.৭২ শতাংশ সামান্য প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈশ্বিক চাহিদা কমে যাওয়া এবং ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা দেশের রপ্তানি খাতকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। সিপিডি-র ডিস্টিংগুইশড ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, মার্কিন বাজারে রপ্তানির অবস্থা ভালো নয়। এর কারণ হিসেবে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্ক আরোপ ও প্রতিযোগিতামূলক বাজারে বাংলাদেশের সক্ষমতা হ্রাসকে দায়ী করেন। একই সময়ে ভারত ও চীন তাদের রপ্তানিকারকদের প্রণোদনা দিয়ে আরও শক্তিশালী করছে, যেখানে বাংলাদেশ আইএমএফ-এর শর্ত মেনে প্রণোদনা কমিয়ে দিয়েছে।

উদ্যোক্তারা বলছেন, ৯ শতাংশ মজুরি বৃদ্ধি এবং শ্রম আইনের কঠোর প্রয়োগ উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে অর্থবছরের বাকি সময়টুকুতে ইতিবাচক ধারায় ফেরার সম্ভাবনা ক্ষীণ। যদি সরকার দ্রুত কার্যকর নীতি গ্রহণ না করে, তবে এই অর্থবছর নেতিবাচক প্রবৃদ্ধিতেই শেষ হতে পারে।