ঢাকা ১২:৪৮ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ০৬ মার্চ ২০২৬

গ্যাস ও বিদ্যুৎ খাতের ভঙ্গুর দশা

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৯:৫৯:০৯ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২ জানুয়ারী ২০২৬
  • ১১ বার পড়া হয়েছে

২০২৫ সাল বাংলাদেশের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের জন্য এক রূঢ় বাস্তবতার বছর হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ দেড় দশকের ভ্রান্ত পরিকল্পনা, আমদানিনির্ভরতা এবং রাজনৈতিক বিবেচনায় নেয়া প্রকল্পগুলোর নেতিবাচক প্রভাব এই বছর কোনো রাখঢাক ছাড়াই প্রকাশ পেয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের কাগুজে সক্ষমতা থাকলেও জ্বালানি সংকট, তীব্র আর্থিক চাপ এবং অদক্ষ ব্যবস্থাপনার কারণে পুরো খাতটি এক ধরনের নীতিগত স্থবিরতার মুখে পড়ে, যা সরাসরি জনজীবন ও জাতীয় অর্থনীতিকে প্রভাবিত করেছে।

গ্যাস খাতের চিত্র ছিল অত্যন্ত উদ্বেগজনক। দীর্ঘদিনের অনুসন্ধান ব্যর্থতার ফলে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন স্থবির হয়ে পড়েছে। বর্তমানে দৈনিক চাহিদা যেখানে ৪০০ কোটি ঘনফুটের বেশি, সেখানে অনশোর গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে উৎপাদন হচ্ছে মাত্র ২৩০-২৪০ কোটি ঘনফুট। এই বিশাল ঘাটতি মেটাতে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। উচ্চমূল্যের এলএনজি কিনতে গিয়ে ডলার সংকটের মুখে স্পট মার্কেট থেকে কেনা সীমিত করা হলেও শিল্পকারখানা ও সার উৎপাদন কেন্দ্রে রেশনিং করতে হয়েছে। এর ফলে টেক্সটাইল, সিরামিক ও ইস্পাত শিল্পে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় রপ্তানি বাজার প্রতিযোগিতার মুখে পড়েছে।

বিদ্যুৎ খাতে সক্ষমতা বাড়লেও জ্বালানি সংকটে তা অকেজো হয়ে পড়েছিল। বছর শেষে উৎপাদন ক্ষমতা ২৯ হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছালেও গ্যাস ও কয়লা সংকটের কারণে বহু কেন্দ্র বন্ধ রাখতে হয়েছে। পতিত সরকারের আমলে জ্বালানির সংস্থান না করেই শুধু বিদ্যুৎকেন্দ্রের অনুমোদন দেওয়ার ফলে এই বৈপরীত্য তৈরি হয়েছে। এছাড়া বেসরকারি কেন্দ্রগুলোর সাথে করা অসম চুক্তির কারণে ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ হিসেবে সরকারকে বিশাল অংকের অর্থ গুনতে হচ্ছে, যা বিপিডিবি-র লোকসান ও জাতীয় বাজেটে ভর্তুকির চাপ বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। কয়লাভিত্তিক বড় প্রকল্পগুলো থেকে বিদ্যুৎ পাওয়া গেলেও কয়লা আমদানির বকেয়া বিল পরিশোধে জটিলতা নতুন ঝুঁকি তৈরি করেছে।

২০২৫ সাল স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দিয়েছে যে, কেবল উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করে না। সমুদ্রসীমানায় গ্যাস অনুসন্ধান নিয়ে আলোচনা চললেও বছরজুড়ে কোনো দৃশ্যমান সাফল্য আসেনি। কাঠামোগত দুর্বলতা আর দীর্ঘদিনের ভুল নীতির খেসারত দিয়ে ২০২৫ সাল এই বার্তাই দিচ্ছে যে—টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য দেশীয় খনিজ অনুসন্ধান, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দূরদর্শী পরিকল্পনাই হতে হবে আগামী দিনের মূল লক্ষ্য।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

দুই ইস্যুতে নিশ্চয়তা চায় যুক্তরাষ্ট্র

গ্যাস ও বিদ্যুৎ খাতের ভঙ্গুর দশা

আপডেট সময় : ০৯:৫৯:০৯ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২ জানুয়ারী ২০২৬

২০২৫ সাল বাংলাদেশের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের জন্য এক রূঢ় বাস্তবতার বছর হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ দেড় দশকের ভ্রান্ত পরিকল্পনা, আমদানিনির্ভরতা এবং রাজনৈতিক বিবেচনায় নেয়া প্রকল্পগুলোর নেতিবাচক প্রভাব এই বছর কোনো রাখঢাক ছাড়াই প্রকাশ পেয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের কাগুজে সক্ষমতা থাকলেও জ্বালানি সংকট, তীব্র আর্থিক চাপ এবং অদক্ষ ব্যবস্থাপনার কারণে পুরো খাতটি এক ধরনের নীতিগত স্থবিরতার মুখে পড়ে, যা সরাসরি জনজীবন ও জাতীয় অর্থনীতিকে প্রভাবিত করেছে।

গ্যাস খাতের চিত্র ছিল অত্যন্ত উদ্বেগজনক। দীর্ঘদিনের অনুসন্ধান ব্যর্থতার ফলে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন স্থবির হয়ে পড়েছে। বর্তমানে দৈনিক চাহিদা যেখানে ৪০০ কোটি ঘনফুটের বেশি, সেখানে অনশোর গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে উৎপাদন হচ্ছে মাত্র ২৩০-২৪০ কোটি ঘনফুট। এই বিশাল ঘাটতি মেটাতে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। উচ্চমূল্যের এলএনজি কিনতে গিয়ে ডলার সংকটের মুখে স্পট মার্কেট থেকে কেনা সীমিত করা হলেও শিল্পকারখানা ও সার উৎপাদন কেন্দ্রে রেশনিং করতে হয়েছে। এর ফলে টেক্সটাইল, সিরামিক ও ইস্পাত শিল্পে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় রপ্তানি বাজার প্রতিযোগিতার মুখে পড়েছে।

বিদ্যুৎ খাতে সক্ষমতা বাড়লেও জ্বালানি সংকটে তা অকেজো হয়ে পড়েছিল। বছর শেষে উৎপাদন ক্ষমতা ২৯ হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছালেও গ্যাস ও কয়লা সংকটের কারণে বহু কেন্দ্র বন্ধ রাখতে হয়েছে। পতিত সরকারের আমলে জ্বালানির সংস্থান না করেই শুধু বিদ্যুৎকেন্দ্রের অনুমোদন দেওয়ার ফলে এই বৈপরীত্য তৈরি হয়েছে। এছাড়া বেসরকারি কেন্দ্রগুলোর সাথে করা অসম চুক্তির কারণে ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ হিসেবে সরকারকে বিশাল অংকের অর্থ গুনতে হচ্ছে, যা বিপিডিবি-র লোকসান ও জাতীয় বাজেটে ভর্তুকির চাপ বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। কয়লাভিত্তিক বড় প্রকল্পগুলো থেকে বিদ্যুৎ পাওয়া গেলেও কয়লা আমদানির বকেয়া বিল পরিশোধে জটিলতা নতুন ঝুঁকি তৈরি করেছে।

২০২৫ সাল স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দিয়েছে যে, কেবল উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করে না। সমুদ্রসীমানায় গ্যাস অনুসন্ধান নিয়ে আলোচনা চললেও বছরজুড়ে কোনো দৃশ্যমান সাফল্য আসেনি। কাঠামোগত দুর্বলতা আর দীর্ঘদিনের ভুল নীতির খেসারত দিয়ে ২০২৫ সাল এই বার্তাই দিচ্ছে যে—টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য দেশীয় খনিজ অনুসন্ধান, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দূরদর্শী পরিকল্পনাই হতে হবে আগামী দিনের মূল লক্ষ্য।