আদ্যনাথ ঘোষ শূন্য দশকের কবি। নব্বই দশকে এসে আধুনিক বাংলা কবিতার আঙ্গিক, প্রকরণ ও ভাষায় যে নতুনতর ব্যঞ্জনার সূচনা হয়, তাকে ধারণ করেই কবিতার জমিনে পা রেখেছেন তিনি। তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘আলোর রেখা’ প্রকাশিত হয় ২০১৫ সালে। এবং ১৩তম কবিতার বই ‘দুঃখ নদীর ধারাপাত’-এর প্রকাশকাল ২০২৫। মাত্র দশ বছরে তার তেরোটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। এরমধ্য দিয়ে একটা ব্যাপার স্পষ্ট হয়, কবি হিসেবে তিনি খুবই সজীব এবং সক্রিয়। আসলে যিনি কবি, জীবন যাপনের যাবতীয় অনুষঙ্গে তাকে কবিতার সঙ্গেই থাকতে হয়। কেননা কবিতা বড়ই বিরহ কাতর।
কবি আদ্যনাথ ঘোষ মন মননে কবি। কবিতায় তিনি চারপাশের মানুষ, প্রকৃতি এবং নৈসর্গিক বৈচিত্রের মধ্যে জীবনের অন্তর্নিহিত সত্যের সন্ধান করেন। মানুষের জীবন প্রবাহের মধ্যে অন্তর্লীন যে প্রেম এবং বিষাদের সহাবস্থান, কবি তাকে শৈল্পিক সুষমায় তার কবিতায় তুলে আনেন। তার কবিতায় জীবনের চাওয়া-পাওয়া, হতাশা, ক্লেদ, কদর্যতার মর্মস্পর্শী অনুরণন ধ্বনিত হয়। এছাড়া তার শৈশবের বেড়ে ওঠার অনুপম জীবনচিত্র এবং গ্রামীণ-লোকজ অনুষঙ্গ তার কবিতায় ঘুরে ফিরে আসে। চারদিকের কোলাহল, এবং সমকালীন নানা ডামাডোলের মধ্যেও আদ্যনাথের কবিতার স্বর উচ্চকিত নয়। বরং তার কবিতার শরীর নরম, কোমল ও পেলব।
কবি আদ্যনাথের মধ্যে এক চিরন্তন প্রেমিক পুরুষের বসবাস, যিনি প্রেমের জন্য নিজের সর্বস্ব সমর্পণ করতেও দ্বিধাহীন। কবির এই প্রেমে কোনো কালিমা নেই। তার প্রিয়তমা নারীর বসবাস একান্ত স্বপ্নলোকে। আকাশের সুদূর নীলিমায় অথবা মেঘের গভীর অন্ধকারে তার অধিষ্ঠান। এই আরাধ্য নারীকে দেবীর আসনে বসিয়ে তার পদতলে নিজেকে গাছের ঝরাপাতার মতো বিসর্জন দিতেও কুণ্ঠিত নন তিনি।
“তোমাকে পাবার আশায়/ঝরা পাতার মতো নিজেরে ছেড়ে/বহুবার তোমার বৃক্ষ তলে/লুটিয়ে পড়েছি চৈতী হাওয়ার দাপটে” (আকাশে ডানা মেলে)।
কিন্তু সেই কাঙ্খিত নারী কবির কাছে অধরাই থেকে যায়। পাওয়া না পাওয়ার দোলাচলে কবি ব্যথিত, ক্ষতবিক্ষত। কবি জীবনের শুরু থেকেই বেদনার এক নীরব বিস্তার তার কবিতায় আমরা প্রত্যক্ষ করি, এবং এই দুঃখময়তা বা বিরহ কাতরতা তার কবিতায় নিস্তরঙ্গ নদীর মতো নীরবে বয়ে চলে। যার একটি প্রকাশ দেখি ‘সেই তুমি আমি’ শীর্ষক কবিতায় হয়েছে। এখানে কবিকে আমরা দেখতে পাই স্মৃতি কাতর। তিনি প্রেমের আনন্দময় দিনের কথা স্মরণ করছেন। প্রেমিকাকে কাছে পেতে তিনি বহু পথ হেঁটেছেন, বৃষ্টিতে ভিজেছেন। এমনকি প্রবল বৃষ্টি থেকে রক্ষা পেতে একই ছাতার তলে দুজন আশ্রয় নিয়ে আনন্দে অবগাহন করেছেন। অথচ আজ একই ছাদের নিচে শুধু নয়, একই বিছানায় থেকেও সেই সুখ আর পান না কবি। চিরন্তন এই হাহাকারই মূর্ত হয়েছে নিম্নোক্ত চরণে:
“আহা! সেই দিন যেন জীবনের সবটুকু পাওয়া/আজ দেখো ছাতা নয়/একই ছাততলে একই বিছানায়/পাশাপাশি শুয়ে আছি-/নদী জলে যেন ভেসে যায় এক জোড়া লাশ!”
(সেই তুমি আমি, বিধিলিপি মন)
কবির মধ্যে যে অপূর্ণতা, যে অপ্রাপ্তি আমরা লক্ষ্য করি, এটাই প্রেমের চিরন্তন সৌন্দর্য। না পাওয়ার বেদনার মধ্যেই প্রেমের সার্থকতা। প্রিয় মানুষকে পাওয়ার যে আকুতি, তাকে কামনার যে অন্তরদহন ও অপূর্ণতার এই দ্বন্দ্বই প্রেমকে বাঁচিয়ে রাখে।
প্রেমের জন্য কবির হৃদয় সর্বদা অবারিত। চাতকের মতো প্রেমিকার পথের প্রান্তরেখায় নিবিষ্ট তার চোখের দৃষ্টি। একদা প্রেমের আনন্দ জোয়ারে ভেসেছেন কবি। কিন্তু কবির জীবনে প্রেমের এই সুখময়তা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ক্ষণিকের এই প্রেম অচিরেই ছেয়ে গেছে বিষাদের কালো ছায়ায়। কবি বলেন:
“ওগো প্রেয়সী বেদনার কোন খেয়ালে/তোমার হারানো স্মৃতির দুয়ারে দাঁড়িয়ে/কোন খেলা খেলে যাও ফেলে রেখে শূন্য খাঁচা/আমার বুকের মাঝে অনলের ঢেউ তুলে
(মানসী, স্বপ্ন বালিকা)
অথবা একই কাব্যগ্রন্থের ‘ঝরাপাতার প্রেম’ কবিতায় কবি যখন বলেন:
“উত্তরমেঘ উড়ে যাবে বিকালের/বেদনা মেখে করুণ বিষাদে/ঝরা কোনো পাতায় দুপুরের রোদ্দুরে”- তখনও প্রেমের জন্য কবি-হৃদয়ের না পাওয়ার চিরন্তন বেদনাই মূর্ত হয়ে ওঠে।
এই বিষাদময়তা কবিকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। এমনকি প্রকৃতির রূপ, রঙেও বিষাদের আবাহন। কবি কল্পনয় দেখতে পান শরতের বুকের পাঁজর যেন ভেঙে চৌচির প্রায়। বাংলার ঘরে ঘরে যে নবান্ন উৎসব, অথবা শরতের শিশির সিক্ত শেফালির যে শুভ্র লালিমা- সবই ম্লান আজ। সেই সাথে কবির মন প্রায় ভস্মীভূত। অবশিষ্ট এই ভস্ম থেকেই হয়ত কবি নতুন জন্ম লাভ করতে চান। কবি বলছেন:
“মন তো কবেই মরে গেছে ভস্মের পোড়া ছাই হয়ে। কতটুকু পড়ে আছে থাক না এভাবেই
জ্বলন্ত উনুনের চোখ আর ঘিয়েভাজা আগুন শিখায়।”
(শরৎযজ্ঞ)
প্রেমের জন্য কবির যে আকাঙ্ক্ষা তার মধ্যে কোনো পঙ্কিলতা নেই। কবির প্রেম বিশুদ্ধ সৌন্দর্যের আধার। এবং তার স্বপ্নে যে নারীর বসবাস, সে নারী কামনা বাসনার উপলক্ষ্য নয়। বরং নারীকে পাওয়ার বাসনার মাধ্যমে কবি মূলত সৌন্দর্যের সন্ধান করতে চেয়েছেন।
কবির জীবনে কখনো কখনো নগ্নদেহের দ্যুতি নিয়ে নারী ধরা দিয়েছে। কিন্তু কবিকে বিচ্যুত করতে পারেনি।
সমাজের সর্বত্র আজ পচন। পচনের এই থাবা ফসলের মাঠেও বিস্তৃত। কবি বলছেন:
“পচন ধরেছে আজ শস্যের নাভিতে/তাই সবুজ ফসল কাঁদে/নীল পোড়া আকাশের গায়/নির্জলা তৃষ্ণায়।
(পচন, তৃষ্ণার পৃথিবী ছুঁয়ে)
প্রচ্ছদ কবি আদ্যনাথ ঘোষের গ্রন্থগুলো হলো: আলোর রেখা (২০১৫), লাল নীল শাড়ির আঁচল (২০১৬), হৃদয়ে উতল হাওয়া (২০১৭), জন্মভূমি তুমি মাগো (২০১৭), আমি তোমাদেরই একজন (২০১৭), ভোরের পাখি (২০১৮), উত্তরের জানালা (২০১৮), স্বপ্ন বালিকা (২০১৯), বিধিলিপি মন (২০১৯), এক মুঠো স্বপ্নের রোদ্দুর (২০২০), তৃষ্ণার পৃথিবী ছুঁয়ে (২০২১), দূর জংলার গান (২০২৩), দুঃখ নদীর ধারাপাত (২০২৫)।
আদ্যনাথ ঘোষ চারপাশের অভিজ্ঞতা থেকে কবিতার বিষয়বস্তু নির্বাচন করেন। এছাড়া ধর্মীয় অনুষঙ্গ, দেশপ্রেম, স্মৃতি কাতরতা তার কবিতার প্রধান অন্বিষ্ট। সবকিছুকে ছাপিয়ে বেদনার একটা সুর আর কবিতায় অনুরণিত হয়। লক্ষণীয় ব্যাপার হলো, এই বেদনাবোধের মধ্যেও তিনি জীবনকে নতুন করে উদযাপনের স্বপ্ন দেখেন:
“কেউ নেই আজ ব্যর্থ জীবনের সাথে/কেউ নেই এখন শূন্যতার আতুড়ঘরে/তথাপি পরাজিত পালক বাসা বাদে জয়ের উৎসবে।
(কেউ নেই আজ, সুতরাং দীর্ঘশ্বাস)
রিপোর্টারের নাম 

























