মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নয়নে অন্তর্বর্তী সরকারের কিছু উদ্যোগ চোখে পড়লেও দেশের সার্বিক মানবাধিকার পরিস্থিতি এখনও আশাব্যঞ্জক নয় বলে মনে করছেন মানবাধিকার কর্মী ও সংগঠনগুলো। বিশেষ করে মব সন্ত্রাস ও গণপিটুনিতে মানুষ হত্যার ঘটনা নিয়ন্ত্রণে অন্তর্বর্তী সরকার পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে বলে তাদের অভিমত। সদ্য বিদায়ী বছরে মব সন্ত্রাস, নির্বাচনকেন্দ্রিক রাজনৈতিক সহিংসতা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়েও নানা প্রশ্ন ওঠায় মানবাধিকার পরিস্থিতি দেশ-বিদেশে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে গত এক বছরে রাজনৈতিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ, হামলা, অগ্নিসংযোগ ও প্রাণহানির ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এসব সহিংসতা গণতান্ত্রিক পরিবেশ ও মানবাধিকারের জন্য মারাত্মক হুমকি তৈরি করছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) ২০২৫ সালের সার্বিক মানবাধিকার পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে জানিয়েছে, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার পরিবর্তন হলেও মানবাধিকারের বাস্তব পরিস্থিতিতে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসেনি। বরং পুরোনো নিপীড়নমূলক পদ্ধতির ধারাবাহিকতা নতুন রূপে বহমান রয়েছে। দমনমূলক শাসনব্যবস্থা, জবাবদিহির অভাব ও বৈষম্যমূলক আচরণ মানবাধিকার পরিস্থিতিকে সামগ্রিকভাবে অস্থির ও উদ্বেগজনক করে তুলেছে।
আসকের তথ্যানুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত মব সন্ত্রাসে কমপক্ষে ১৯৭ জন নিহত হয়েছেন। আগের বছর ২০২৪ সালে এ সংখ্যা ছিল অন্তত ১২৮ জন। অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে মব সন্ত্রাসে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েছে ৬৯ জন। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কালে কমপক্ষে ২৯৩ জন নাগরিক মব সন্ত্রাসের শিকার হয়ে নিহত হয়েছেন। এসব ঘটনায় নারী, পুরুষ, ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষ নির্মম সহিংসতার শিকার হয়েছেন। পাশাপাশি গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটেছে।
মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ) জানিয়েছে, ২০২৫ সালে রাজনৈতিক সহিংসতা, গণপিটুনি, হেফাজতে মৃত্যু, অজ্ঞাত পরিচয়ের লাশ উদ্ধার এবং সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনা বেড়েছে। সংগঠনটির তথ্য অনুযায়ী, গত বছর রাজনৈতিক সহিংসতার ৫৯৯টি ঘটনায় মোট ৫ হাজার ৬০৪ জন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এর মধ্যে ৮৬ জন নিহত এবং ৫ হাজার ৫১৮ জন আহত হন। আহতদের মধ্যে ৯৭ জন গুলিবিদ্ধ। নিহতদের মধ্যে বিএনপির ৬৫ জন, আওয়ামী লীগের ৮ জন, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ৩ জন সদস্য এবং ১০ জন সাধারণ নাগরিক ছিলেন, যাদের রাজনৈতিক পরিচয় নিশ্চিত করা যায়নি।
এ প্রসঙ্গে সরকার গঠিত গুম কমিশনের সদস্য ও মানবাধিকার কর্মী নূর খান লিটন বলেন, “৫ আগস্টের পর মানবাধিকার পরিস্থিতির যে গুণগত উন্নতি প্রত্যাশা করা হয়েছিল, বাস্তবে তা অর্জিত হয়নি। যদিও ক্রসফায়ার বা গুমের মতো ঘটনা আর ঘটেনি, যা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। তবে মানুষের ওপর নতুন ধরনের সহিংসতা ও সংঘবদ্ধ সন্ত্রাস উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “গত এক বছরে ধারাবাহিকভাবে মব সন্ত্রাসের ঘটনা ঘটেছে, যার শিকার হয়েছে সাধারণ মানুষ, গণমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক সংগঠন। প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার কার্যালয়ে হামলা, বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনে আক্রমণ, ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে বারবার হামলা, গোপালগঞ্জে সেনা টহলের সময় চার জনের নিহত হওয়া কিংবা চট্টগ্রামে একাধিক হত্যাকাণ্ড—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি গভীর উদ্বেগজনক।”
নূর খান লিটনের মতে, অদৃশ্য কিছু সন্ত্রাসী শক্তি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করছে এবং সরকার এসব শক্তির বিরুদ্ধে কার্যকর ও ধারাবাহিক পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছে। পাশাপাশি, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জনগণের মুখোমুখি দাঁড় করানোর ফলে জনআস্থা ও বাহিনীর মনোবল—দুটোই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নয়নের জন্য রাজনৈতিক সদিচ্ছা, জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থা ও নিরাপত্তা বাহিনীর প্রকৃত সংস্কার জরুরি বলে তিনি মন্তব্য করেন।
মানবাধিকার সংগঠন অধিকার-এর পরিচালক এ এস এম নাসিরউদ্দিন এলান বলেন, “মানবাধিকার পরিস্থিতি আশানুরূপ না হলেও অন্তর্বর্তী সরকার কিছু গুরুত্বপূর্ণ ও প্রশংসনীয় উদ্যোগ নিয়েছে। দীর্ঘদিন ঝুলে থাকা কয়েকটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদে স্বাক্ষরের মাধ্যমে আটক ব্যক্তিদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার একটি কাঠামো তৈরির সুযোগ তৈরি হয়েছে।” গুমসংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সনদে স্বাক্ষরের ধারাবাহিকতায় গুম বিষয়ক অধ্যাদেশ জারি হওয়াকে তিনি বড় অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন।
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, “এসব ইতিবাচক দিকের পাশাপাশি রাজনৈতিক সহিংসতা ও গণপিটুনিতে মানুষের মৃত্যুর ঘটনা ভয়াবহভাবে বেড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কাছাকাছি থেকেও কার্যকর হস্তক্ষেপ করেনি, যা তাদের ব্যর্থতা।”
সেনাবাহিনীকে দেওয়া ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতার যথাযথ ব্যবহার না হওয়া এবং পুলিশ ও যৌথ বাহিনীর মধ্যে সমন্বয়হীনতা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণকে আরও জটিল করে তুলেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
রিপোর্টারের নাম 

























