ঢাকা ০৩:৪৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬

নিয়ন্ত্রণের বাইরে সাইবার অপরাধ, পাঁচ বছরে অভিযোগ প্রায় ২ লাখ

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০১:৩০:৫১ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫
  • ১৩ বার পড়া হয়েছে

দেশে সাইবার অপরাধ ক্রমেই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। প্রতিদিন বাড়ছে অভিযোগ, বাড়ছে ভুক্তভোগীর সংখ্যা। অপরাধীদের নিত্যনতুন কৌশলে বারবার প্রতারিত হচ্ছে সাধারণ মানুষ। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ও ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা শাখা ডিবির তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে সাইবার অপরাধের শিকার হয়ে দেশে প্রায় ২ লাখ মানুষ অভিযোগ করেছে। চলতি বছরেই ডিবির হাতে জমা পড়েছে প্রায় ৫ হাজার অভিযোগ, যার অধিকাংশই আর্থিক প্রতারণাসংশ্লিষ্ট।

ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) শফিকুল ইসলাম বলেন, পুলিশের সক্ষমতা অনুযায়ী সাইবার অপরাধ দমনে কাজ চলছে এবং অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। তবে তিনি মনে করেন, সাইবার অপরাধ কমাতে জনসচেতনতা বাড়ানো জরুরি।

সিআইডির তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সাল থেকে এ পর্যন্ত মোট ১ লাখ ৭৮ হাজার ৫৯৬ জন সাইবার অপরাধের অভিযোগ করেছেন। শুধু গত ছয় মাসেই সাইবার পুলিশ সেন্টারে (সিপিসি) যোগাযোগ করেছেন ৩ হাজার ৭৬৬ জন ভুক্তভোগী। সিআইডির মুখপাত্র বিশেষ পুলিশ সুপার জসিম উদ্দিন জানান, অনলাইন ও ভেরিফায়েড পেজে পাওয়া প্রতিটি অভিযোগ যাচাই করে তদন্ত করা হচ্ছে।

ডিবিতে জমা পড়া অভিযোগ বিশ্লেষণে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, রাজধানীসহ সারা দেশে সংঘবদ্ধ সাইবার চক্র মোবাইল ফোন ব্যবহার করে স্মার্টফোন ব্যবহারকারীদের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও অর্থ চুরি করছে। তারা ঊর্ধ্বতন পুলিশ ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের নাম ভাঙিয়ে মামলা দেওয়ার ভয় দেখানো বা মামলা থেকে রক্ষা করার আশ্বাস দিয়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। প্রতারণার জন্য পুলিশের ইউনিফর্ম পরা ছবি পর্যন্ত ব্যবহার করা হচ্ছে। চলতি বছরের ১১ মাসে গোয়েন্দা পুলিশের কাছে প্রায় ৫ হাজার সাইবার অপরাধের অভিযোগ এসেছে।

পুলিশের সাইবার বিশেষজ্ঞদের মতে, অপরাধীরা আগের চেয়ে অনেক বেশি সংঘবদ্ধ ও বেপরোয়া। সাধারণত তারা প্রথমে ভুক্তভোগীর স্মার্টফোনের কল ফরওয়ার্ডিং সেটিংস পরিবর্তন করে নেয়। এরপর মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্টের তথ্য বদলে ওটিপি ও পাসওয়ার্ড নিজেদের নম্বরে নিয়ে নিয়ে টাকা তুলে ফেলে।

সম্প্রতি গ্রেপ্তার হওয়া সাইবার চক্রের সদস্য দুর্জয় ডিবির জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছে, সে অপরিচিত ব্যক্তিদের ফোন করে কথোপকথনের মাধ্যমে ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করত এবং পরে আর্থিক প্রতারণা চালাত।

সিআইডি সূত্র জানায়, গত ছয় মাসে সিপিসিতে যোগাযোগ করা ৩ হাজার ৭৬৬ ভুক্তভোগীর মধ্যে ১ হাজার ৮১৩ জন অনলাইনে আর্থিক প্রতারণার শিকার হয়েছেন। ৭৪৩ জন ই-কমার্স প্রতারণার, ৫৪৪ জন ইনভেস্টমেন্ট ট্র্যাপের, ৬৪ জন লোন জালিয়াতির এবং ১১৫ জন বিভিন্ন সেবা নিতে গিয়ে প্রতারণার শিকার হন। এ ছাড়া ফ্রিল্যান্সিংয়ে ১৩ জন, এনআইডি সংক্রান্ত প্রতারণায় ১৭ জন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। পোস্ট, মেসেজ, ছবি ও ভিডিওর মাধ্যমে ৮০২ জন, ফেসবুক অ্যাকাউন্ট হ্যাকিংয়ে ২৮২ জন, ব্ল্যাকমেইলিংয়ে ১৮৭ জন, সিম ক্লোনে ১৬৫ জন এবং অন্যান্য সাইবার অপরাধে ২৬১ জন ভুক্তভোগী হয়েছেন। এর মধ্যে ২ হাজার ৫৫২ জনকে পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করেছে সিআইডি।

অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশ-বিদেশ থেকে পরিচালিত সাইবার অপরাধ এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব অপরাধ দমনে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি ভুক্তভোগীদের দ্রুত সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি।

এদিকে, আমেরিকান সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান ম্যান্ডিয়ান্টের গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২৪ সালে সংঘটিত ৫৫ শতাংশ সাইবার হামলার উদ্দেশ্য ছিল অর্থ হাতিয়ে নেওয়া। বেসরকারি সংস্থা ব্লাস্টের উপপরিচালক তাপসী রাবেয়া জানান, শহরের উচ্চশিক্ষিত অনেক নারী অনলাইনে যৌন হয়রানির শিকার হলেও তাদের ১৫ থেকে ২৫ শতাংশ আইনের আশ্রয় নিতে চান না।

ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে সাইবার ক্রাইম অ্যাওয়ারনেস ফাউন্ডেশন জানায়, গত পাঁচ বছরে সাইবার অপরাধে ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় ২ লাখ মানুষ অভিযোগ করেছে, যা প্রকৃত ভুক্তভোগীর মাত্র ১২ শতাংশ। জরিপে দেখা গেছে, ভুক্তভোগীদের ৮০ শতাংশের বয়স ১৮ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে এবং ৬০ শতাংশ নারী। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিপফেক প্রযুক্তির অপব্যবহারও সাইবার অপরাধ বাড়িয়ে দিচ্ছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে সংঘটিত সাইবার অপরাধের ৫৫ থেকে ৬৫ শতাংশই আর্থিক প্রতারণা। প্রতি বছর অপরাধের সংখ্যা ও ধরন—দুটোই উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

এলপিজি আমদানিতে বিশেষ ঋণসুবিধা: ২৭০ দিন পর্যন্ত বাকিতে আনার সুযোগ

নিয়ন্ত্রণের বাইরে সাইবার অপরাধ, পাঁচ বছরে অভিযোগ প্রায় ২ লাখ

আপডেট সময় : ০১:৩০:৫১ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫

দেশে সাইবার অপরাধ ক্রমেই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। প্রতিদিন বাড়ছে অভিযোগ, বাড়ছে ভুক্তভোগীর সংখ্যা। অপরাধীদের নিত্যনতুন কৌশলে বারবার প্রতারিত হচ্ছে সাধারণ মানুষ। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ও ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা শাখা ডিবির তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে সাইবার অপরাধের শিকার হয়ে দেশে প্রায় ২ লাখ মানুষ অভিযোগ করেছে। চলতি বছরেই ডিবির হাতে জমা পড়েছে প্রায় ৫ হাজার অভিযোগ, যার অধিকাংশই আর্থিক প্রতারণাসংশ্লিষ্ট।

ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) শফিকুল ইসলাম বলেন, পুলিশের সক্ষমতা অনুযায়ী সাইবার অপরাধ দমনে কাজ চলছে এবং অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। তবে তিনি মনে করেন, সাইবার অপরাধ কমাতে জনসচেতনতা বাড়ানো জরুরি।

সিআইডির তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সাল থেকে এ পর্যন্ত মোট ১ লাখ ৭৮ হাজার ৫৯৬ জন সাইবার অপরাধের অভিযোগ করেছেন। শুধু গত ছয় মাসেই সাইবার পুলিশ সেন্টারে (সিপিসি) যোগাযোগ করেছেন ৩ হাজার ৭৬৬ জন ভুক্তভোগী। সিআইডির মুখপাত্র বিশেষ পুলিশ সুপার জসিম উদ্দিন জানান, অনলাইন ও ভেরিফায়েড পেজে পাওয়া প্রতিটি অভিযোগ যাচাই করে তদন্ত করা হচ্ছে।

ডিবিতে জমা পড়া অভিযোগ বিশ্লেষণে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, রাজধানীসহ সারা দেশে সংঘবদ্ধ সাইবার চক্র মোবাইল ফোন ব্যবহার করে স্মার্টফোন ব্যবহারকারীদের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও অর্থ চুরি করছে। তারা ঊর্ধ্বতন পুলিশ ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের নাম ভাঙিয়ে মামলা দেওয়ার ভয় দেখানো বা মামলা থেকে রক্ষা করার আশ্বাস দিয়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। প্রতারণার জন্য পুলিশের ইউনিফর্ম পরা ছবি পর্যন্ত ব্যবহার করা হচ্ছে। চলতি বছরের ১১ মাসে গোয়েন্দা পুলিশের কাছে প্রায় ৫ হাজার সাইবার অপরাধের অভিযোগ এসেছে।

পুলিশের সাইবার বিশেষজ্ঞদের মতে, অপরাধীরা আগের চেয়ে অনেক বেশি সংঘবদ্ধ ও বেপরোয়া। সাধারণত তারা প্রথমে ভুক্তভোগীর স্মার্টফোনের কল ফরওয়ার্ডিং সেটিংস পরিবর্তন করে নেয়। এরপর মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্টের তথ্য বদলে ওটিপি ও পাসওয়ার্ড নিজেদের নম্বরে নিয়ে নিয়ে টাকা তুলে ফেলে।

সম্প্রতি গ্রেপ্তার হওয়া সাইবার চক্রের সদস্য দুর্জয় ডিবির জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছে, সে অপরিচিত ব্যক্তিদের ফোন করে কথোপকথনের মাধ্যমে ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করত এবং পরে আর্থিক প্রতারণা চালাত।

সিআইডি সূত্র জানায়, গত ছয় মাসে সিপিসিতে যোগাযোগ করা ৩ হাজার ৭৬৬ ভুক্তভোগীর মধ্যে ১ হাজার ৮১৩ জন অনলাইনে আর্থিক প্রতারণার শিকার হয়েছেন। ৭৪৩ জন ই-কমার্স প্রতারণার, ৫৪৪ জন ইনভেস্টমেন্ট ট্র্যাপের, ৬৪ জন লোন জালিয়াতির এবং ১১৫ জন বিভিন্ন সেবা নিতে গিয়ে প্রতারণার শিকার হন। এ ছাড়া ফ্রিল্যান্সিংয়ে ১৩ জন, এনআইডি সংক্রান্ত প্রতারণায় ১৭ জন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। পোস্ট, মেসেজ, ছবি ও ভিডিওর মাধ্যমে ৮০২ জন, ফেসবুক অ্যাকাউন্ট হ্যাকিংয়ে ২৮২ জন, ব্ল্যাকমেইলিংয়ে ১৮৭ জন, সিম ক্লোনে ১৬৫ জন এবং অন্যান্য সাইবার অপরাধে ২৬১ জন ভুক্তভোগী হয়েছেন। এর মধ্যে ২ হাজার ৫৫২ জনকে পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করেছে সিআইডি।

অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশ-বিদেশ থেকে পরিচালিত সাইবার অপরাধ এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব অপরাধ দমনে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি ভুক্তভোগীদের দ্রুত সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি।

এদিকে, আমেরিকান সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান ম্যান্ডিয়ান্টের গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২৪ সালে সংঘটিত ৫৫ শতাংশ সাইবার হামলার উদ্দেশ্য ছিল অর্থ হাতিয়ে নেওয়া। বেসরকারি সংস্থা ব্লাস্টের উপপরিচালক তাপসী রাবেয়া জানান, শহরের উচ্চশিক্ষিত অনেক নারী অনলাইনে যৌন হয়রানির শিকার হলেও তাদের ১৫ থেকে ২৫ শতাংশ আইনের আশ্রয় নিতে চান না।

ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে সাইবার ক্রাইম অ্যাওয়ারনেস ফাউন্ডেশন জানায়, গত পাঁচ বছরে সাইবার অপরাধে ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় ২ লাখ মানুষ অভিযোগ করেছে, যা প্রকৃত ভুক্তভোগীর মাত্র ১২ শতাংশ। জরিপে দেখা গেছে, ভুক্তভোগীদের ৮০ শতাংশের বয়স ১৮ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে এবং ৬০ শতাংশ নারী। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিপফেক প্রযুক্তির অপব্যবহারও সাইবার অপরাধ বাড়িয়ে দিচ্ছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে সংঘটিত সাইবার অপরাধের ৫৫ থেকে ৬৫ শতাংশই আর্থিক প্রতারণা। প্রতি বছর অপরাধের সংখ্যা ও ধরন—দুটোই উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে।