ঢাকা ০৯:১৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

জামায়াতের সঙ্গে জোট নিয়ে এনসিপিতে টানাপড়েন

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ১১:৫৯:৩০ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৮ ডিসেম্বর ২০২৫
  • ১৭ বার পড়া হয়েছে

জাতীয় নির্বাচনে জামায়াতের সঙ্গে জোট গঠন নিয়ে দ্বিধা বিভক্ত হয়ে পড়েছে তরুণদের রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। এ সিদ্ধান্তে আপত্তি জানিয়ে দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ও সদস্য সচিব আখতার হোসেনকে চিঠি দিয়েছেন কেন্দ্রীয় ৩০ সদস্য। আবার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে নাহিদকে চিঠি দিয়েছেন ১৭০ জন নেতা।

শীর্ষ নারী নেত্রীরাও বিষয়টিকে মেনে নিতে পারছেন না। এরই মধ্যে পদত্যাগ করেছেন যুগ্ম আহ্বায়ক ডা. তাজনূভা জাবিন ও সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব ডা. তাসনিম জারা। আর জামায়াতের সঙ্গে জোট করার পরিণতি নিয়ে ফেসবুক পোস্টে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন। তবে তিনি পদত্যাগ করবেন না বলে জানান।

এ নিয়ে বেশ কয়েকজন নারী নেত্রী ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। অনেকেই পদত্যাগ করেছেন। দলটির নীতি ও আদর্শ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। জুলাই স্পিরিট থেকে গড়ে ওঠা এ দল এতদিন নিজেদের উদারপন্থি ও প্রগতিশীল হিসেবে প্রচার করেছে। যেখানে দাবি করা হতো— ধর্ম, বর্ণ, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবার জন্য একটি উন্মুক্ত রাজনৈতিক চর্চার পরিবেশ গড়তে চান তারা। এমন দৃষ্টিভঙ্গি লালন করা অসংখ্য তরুণ-তরুণী তাদের সঙ্গে যুক্ত হন।

তবে জামায়াতের মতো একটি ধর্মভিত্তিক দলের জোটে যুক্ত হওয়ার প্রক্রিয়াকে মেনে নিতে না পেরে অনেক নারী নেত্রীর দল থেকে সিটকে পড়ার আশঙ্কা করছেন কেউ কেউ। অনেকে মনে করছিলেন এনসিপিতে তরুণ নারী নেত্রীদের সরব উপস্থিতি অনেক বড় দলের চেয়েও ঈর্ষণীয় দৃষ্টান্ত ছিল। আর এভাবে নেত্রীদের দল ছেড়ে যাওয়ার ঘোষণায় নয়া বন্দোবস্ত কতটুকু বাস্তবায়ন হলো— তা নিয়ে নানা কথা হচ্ছে। শুধু তাই নয়, এতদিন এনসিপি যে স্বতন্ত্র ধারার কথা বলে আসছিল— তা নিয়ে অনেকে দলটির দ্বিচারিতার কথা বলছেন। এতে কয়েকটি আসনের জন্য দলটির সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ নষ্ট হওয়ার পথে। বিশেষ করে তাদেরকে জামায়াতের আদর্শিক সহযোগী হিসেবে যে অভিযোগ ছিল, তা আরও উচ্চকিত হয়েছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।

এ বিষয়ে সিনিয়র সাংবাদিক মাসুদ কামাল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এনসিপি এতদিন নিজেদের মধ্যমপন্থি দল হিসেবে দাবি করলেও জামায়াতের সঙ্গে যোগ দিয়ে নিজেদের চরিত্র প্রকাশ করলো। আসলে তারা তাদের আদর্শেই ফিরে গেছে। এতদিন যা বলেছে, তা ছিল একান্তই ধোঁকাবাজি। অথচ মানুষ তাদের কাছে এমনটি আশা করেনি। দলটি চেয়েছিল রাজনীতিতে নতুন ধারা চালু করবে। কিন্তু তারা মানুষকে আশাহত করলো।’

নারী নেত্রীদের পদত্যাগ ত্যাগের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘তারা তো অনেক আশা নিয়ে দলটিতে যুক্ত হয়েছিল। কিন্তু তারা যখন তাদের আদর্শিক বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছে, তখন সরে যাচ্ছে। আমার ধারণা এ সংখ্যা আরও বাড়বে। যদিও এনসিপির নেতাদের দাবি দলীয় স্বার্থেই নির্বাচনি কৌশল হিসেবে এমন সিদ্ধান্ত এবং এতে সংখ্যাগরিষ্ঠ কেন্দ্রীয় নেতাদের মত রয়েছে।’

আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েই জামায়াতের জোটে নাহিদরা

জাতীয় নাগরিক পার্টি এনসিপি এতদিন বলে আসছিল তারা বিএনপি ও জামায়াতের সঙ্গে জোটে যাবে না। তারা বিকল্প শক্তি হিসেবে রাজনৈতিক ময়দানে প্রভাব বিস্তার করবে। সে আলোকে চলতি বছরের ৭ ডিসেম্বর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি মিলনায়তনে এনসিপি, আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি) ও রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন মিলে তিন দলীয় গণতান্ত্রিক সংস্কার জোট গঠন করে। তখন তারা ঘোষণা দিয়েছিলেন তারা নিজেরাই নির্বাচন করবেন। সংসদে এমপি হওয়া তাদের লক্ষ্য নয়। তারা জাতি ক্রান্তিকালে রাজপথে ভূমিকা রাখতে চান।

তবে এরই মধ্যে কিছু আসনে জামায়াতের সঙ্গে এনসিপির শীর্ষ নেতাদের ভোটের সমীকরণ নিয়ে নানা বিশ্লেষণ শুরু হয়। তখন আলোচনা শুরু হয় এনসিপি জামায়াতের সঙ্গে জোট বা আসন সমঝোতায় যাচ্ছে। কয়েকটি গণমাধ্যমে এ নিয়ে সংবাদও প্রকাশ হয়। এতদিন এনসিপি নেতারা এ নিয়ে পরিষ্কার কিছু বলেননি। তবে শনিবার (২৭ ডিসেম্বর) এ নিয়ে এনসিপির কতিপয় নেতা বিষয়টি স্বীকার করেন।

সর্বশেষ, রবিবার (২৮ ডিসেম্বর) বিকালে জাতীয় প্রেসক্লাবে ৮ দলের সংবাদ সম্মেলনে প্রথমে এনসিপি জোটে যোগ দেওয়ার বিষয়টি জানান জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, ‘সময় স্বল্পতার কারণে এনসিপির কেউ আসতে না পারলেও নাহিদ জানিয়েছেন তারা আমাদের সঙ্গে থাকবেন। রাতেই হয়তো দল থেকে তারা আনুষ্ঠানিক জানাবেন।’ 

সে অনুযায়ী রাত ৮টায় বাংলা মোটরে দলের অস্থায়ী কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে নিজেদের অবস্থান জানান নাহিদ। তিনি ঘোষণা দেন তারা জামায়াতের সঙ্গে নির্বাচনি সমঝোতায় যাচ্ছেন।

যে ব্যাখ্যা দিলেন নাহিদ

জামায়াতের সঙ্গে জোটে যাওয়ার বিষয়ে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ বলেন, ‘আসন্ন নির্বাচনে এককভাবেই অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত ছিল। পরবর্তী সময়ে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের ফলে দেশের রাজনীতিতে পরিবর্তন এসেছে। আমরা মনে করি, আধিপত্যবাদী শক্তি এখনও দেশে আছে। তারা চায় নির্বাচন বানচাল করে জুলাই যোদ্ধাদের শেষ করে ফেলতে। তাই এমন পরিস্থিতিতে এনসিপি বৃহত্তর ঐক্যের জন্য জামায়াতের সঙ্গে নির্বাচনি সমঝোতায় এসেছে।’

তিনি বলেন, ‘আধিপত্যবাদী শক্তি থেকে নিজেদের রক্ষা করতে এবং বৃহত্তর ঐক্যের জন্য ১০ দলীয় জোটে অংশ নিচ্ছে এনসিপি।’

এনসপির এই নেতা বলেন, ‘ঐকমত্য কমিশনে দৃঢ় অবস্থানে ছিল এনসিপি। এটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। আমরা চাই গণভোটের পক্ষে সবাইকে নিয়ে ঐক্যবদ্ধ রাজনীতি করতে। আমরা বিএনপিকেও আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম। আমরা চাই দেশ গঠনের জন্য জুলাই সনদ অনুযায়ী পরিকল্পনা করতে।’

এসময় জোটে থাকলেও এনসিপি ও জামায়াত আলাদাভাবে নিজ আদর্শ অনুযায়ী কাজ করবে বলে জানান তিনি। তিনি বলেন, ‘জামায়াতের সঙ্গে আদর্শিক ঐক্য নয়, শুধুমাত্র নির্বাচনি সমঝোতা হয়েছে।’

দ্বিধা বিভক্ত নেতারা

এনসিপির যুগ্ম সদস্য সচিব জয়নাল আবেদীন শিশির বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘গত ২৩ ডিসেম্বর তাদের সঙ্গে জামায়াতের বৈঠক হয়। এতে দুদলের প্রাথমিক আলোচনায় জোট গঠনের সিদ্ধান্ত হয়। পরবর্তী সময়ে এনসিপি নিজেদের সঙ্গে বৈঠক করে। এতে ২১৪ জন কেন্দ্রীয় সদস্যের মধ্যে ১৮৪ জন জামায়াতের সঙ্গে জোটে একমত হয়। আর বাকি ৩০ জন আপত্তি জানান। তারা নাহিদ ইসলামকে এ বিষয়ে আপত্তির কথা জানিয়ে চিঠি দেন। যেহেতু গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে এ সিদ্ধান্ত হয়েছে, সেখানে কেউ কেউ দ্বিমত করতেই পারে। তাদের মতামতকে অবশ্যই এনসিপি সম্মান করে। তারপরও সামগ্রিক বাস্তবতায় দল এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’

অবশ্য রবিবার (২৮ ডিসেম্বর) জামায়াতের সঙ্গে জোটে সমর্থন জানিয়ে নাহিদকে চিঠি দেন ১৭০ নেতা।

দুই শীর্ষ নেত্রীর পদত্যাগ, অনেকের ক্ষোভ

জামায়াতের সঙ্গে জোটের সিদ্ধান্ত এনসিপির কয়েকজন নারী নেত্রী মেনে নিতে পারছেন না। এ নিয়ে ফেসবুকে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অনেকে। এরই মধ্যে দল ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছেন দুই শীর্ষ নেত্রী। প্রথমে শনিবার (২৭ ডিসেম্বর) ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে পদত্যাগের কথা জানিয়েছেন দলের সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব ডা. তাসনিম জারা। তিনি দলটি থেকে ঢাকা-৯ আসনের প্রার্থী ছিলেন। তবে পদত্যাগ করলেও স্বতন্ত্র হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকার ঘোষণা দেন।

ফেসবুক পোস্টে তাসনিম জারা লেখেন, ‘প্রিয় খিলগাঁও, সবুজবাগ ও মুগদাবাসী, আমি আপনাদের ঘরের মেয়ে। খিলগাঁওয়েই আমার জন্ম ও বেড়ে ওঠা। আমার স্বপ্ন ছিল একটি রাজনৈতিক দলের প্ল্যাটফর্‌ম থেকে সংসদে গিয়ে আমার এলাকার মানুষের ও দেশের সেবা করা। তবে বাস্তবিক প্রেক্ষাপটের কারণে আমি কোনও নির্দিষ্ট দল বা জোটের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’

তাসনিম জারা আরও লেখেন, ‘আমি আপনাদের এবং দেশের মানুষকে ওয়াদা করেছিলাম যে আপনাদের জন্য নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ার লক্ষে আমি লড়বো। পরিস্থিতি যাই হোক না কেন, আমি আমার সেই ওয়াদা রক্ষা করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তাই এই নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে ঢাকা-৯ থেকে অংশগ্রহণ করবো।’

তিনি লেখেন, ‘একটা দলের প্রার্থী হলে সেই দলের স্থানীয় অফিস থাকে, সুসংগঠিত কর্মী-বাহিনী থাকে। সরকার ও প্রশাসনের সঙ্গে নিরাপত্তা বা অন্যান্য বিষয়ে আপত্তি ও শঙ্কা নিয়ে কথা বলার সুযোগ থাকে। তবে আমি যেহেতু কোনও দলের সঙ্গে থাকছি না, তাই আমার সে সব কিছুই থাকবে না। আমার একমাত্র ভরসা আপনারা। আপনাদের মেয়ে হিসেবে আমার সততা, নিষ্ঠা এবং নতুন রাজনীতি করার অদম্য ইচ্ছাশক্তির প্রেক্ষিতে আপনারা যদি স্নেহ ও সমর্থন দেন, তবেই আমি আপনাদের সেবা করার সুযোগ পাবো।’

এর একদিন পর রবিবার (২৮ ডিসেম্বর) ফেসবুকে এনসিপি থেকে পদত্যাগের কথা জানান যুগ্ম আহ্বায়ক ডা. তাজনূভা জাবীন। লম্বা স্ট্যাটাসের এক অংশে তাজনূভা লেখেন, ‘এনসিপি শুরু থেকে যে গণপরিষদ, সেকেন্ড রিপাবলিক মধ্যপন্থার, নারী, বিভিন্ন জাতিসত্তাকে নিয়ে রাজনীতি করার কথা বলছে। সেটা ধারণ করে যে কয়জন পার্টিতে ছিল তাদের মধ্যে আমি একজন। এই পার্টির একজন ফাউন্ডার মেম্বার আমি। স্বাভাবিকভাবেই ভীষণ মন খারাপ। কিন্তু এই দল ছেড়ে দেওয়া ছাড়া আমার সামনে আর কোনও সম্মানজনক অপশন নাই। দলের খারাপ সময়ে দল ছেড়ে দিয়ে অরাজনৈতিক, অপরিপক্বতার পরিচয় ইত্যাদি বয়ান দিবে অনেকে।’ 

তিনি লেখেন, ‘জাস্ট বুলশিট। শুধু এটুকু বলি, আমি বহিরাগত ওখানে, আমাকে প্রতারিত করলে মেইক সেন্স। কিন্তু এক শীর্ষ নেতা আরেক শীর্ষ নেতার সঙ্গে যে মাইনাসের রাজনীতি করে ওখানে সেটা ভয়ংকর। এরা নিজেদের মধ্যে রাজনীতি করতে এত ব্যস্ত এরা কখনও দেশের জন্য নতুন একটা মধ‍্যপন্থার বাংলাদেশপন্থি রাজনীতি করতে পারবে না।’

আরেক অংশে তিনি লেখেন, ‘আজকে পদত্যাগ করেছি এনসিপি থেকে। অত্যন্ত ভাঙা মন নিয়ে জানাচ্ছি আমি আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারছি না। সবচেয়ে কষ্ট লাগছে আজকেই আম্মু চট্টগ্রাম থেকে আসছে আমার নির্বাচন করা উপলক্ষ‍ে। আর আজকেই আমি এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হলাম। আমি জানি অনেকে ভীষণ কষ্ট পেয়েছেন আমার এই সিদ্ধান্তে। কিন্তু এটাই আমার জন‍্য সঠিক। এখানে ন্যূনতম আশা থাকলে, আমি আমার আত্মসম্মানবোধকেও বোধ হয় ডাউট অফ বেনিফিট দিতাম।’

একইদিন ফেসবুক পোস্টে জামায়াতকে ‘অনির্ভরযোগ্য মিত্র’ আখ্যা দিয়ে এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন লেখেন, ‘দলটির সঙ্গে কোনও ধরনের সমঝোতায় গেলে এনসিপিকে ভবিষ্যতে কঠিন মূল্য চুকাতে হবে।’

সামান্তা লেখেন, ‘জামায়াতের দায়িত্বশীল নেতারা মন্তব্য করেছিলেন, জামায়াত জুলাইয়ের স্পিরিট, বাংলাদেশের পরিকল্পনা নিয়ে একমত হলে দলটির সঙ্গে জোট করতে আসতে পারে যে-কোনও দল। এনসিপি এতদিনের অবস্থান অনুযায়ী তার মূলনীতি, রাষ্ট্রকল্প জামায়াত থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। বিচার, সংস্কার ও গণপরিষদ নির্বাচন তথা সেকেন্ড রিপাবলিককে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা দল এনসিপি। ফলে এই তিনটি বিষয়ে অভিন্ন অবস্থান যে-কোনও রাজনৈতিক মিত্রতার পূর্বশর্ত।’

তিনি লেখেন, ‘‘আমার বর্তমান অবস্থান এনসিপির গত দেড় বছরের অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। নিম্নকক্ষে পিআর আওয়াজ তুলে সংস্কারকে ব্যাহত করায় লিপ্ত হয়েছিল জামায়াত। ফলত এনসিপির আহ্বায়ক বলেছিলেন, ‘যারা সংস্কারের পক্ষে নয় তাদের সঙ্গে জোটও সম্ভব নয়।’ তাই জুলাই পদযাত্রার পর থেকে ‘৩০০’ আসনে একক প্রার্থী দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়, আহ্বায়কসহ একাধিক বরাতে এবং স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচন করবে এনসিপি— এই মর্মে সারা দেশ থেকে প্রার্থীদের আহ্বান করা হয়।”

তিনি আরও উল্লেখ করেন, “জামায়াতের সঙ্গে জোট করার সমস্যাগুলো তুলে ধরা মানেই বিএনপির পক্ষে অবস্থান বোঝায় না। বরং বিভিন্ন বিষয়ে এতদিন ধরে প্রকাশিত ও নানান মহলে প্রশংসিত এনসিপির অবস্থান আমি সঠিক মনে করি ও নিজেকে এই আদর্শের সৈনিক মনে করি। বিএনপি-জামায়াতের যে কোনোটির সঙ্গে জোট এনসিপির সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক পলিসি থেকে সরে গিয়ে তৈরি হচ্ছে।’’

আরেক নেত্রী ডা. মাহমুদা মিতু লেখেন, ‘এক পয়সা দিয়েও দেশি ভান ধরা পশ্চিমা গং বিশ্বাস করি না। এর চেয়ে যারা ওপেন বলে-কয়ে পশ্চিমা অ্যাজেন্ডার পক্ষ নেয় তাদের স্যালুট।’ তবে কিছুসময় পর তিনি পোস্টটি ডিলিট করে দেন।

নুসরাত তাবাসসুম ফেসবুকে লেখেন, ‘নীতির চাইতে রাজনীতি বড় নয়। কমিটমেন্ট ইজ কমিটমেন্ট‌।’

এ বিষয়ে এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এনসিপিতে সব মতাদর্শের মানুষের জায়গা আছে।’ 

নেত্রীদের পদত্যাগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ব্যক্তি তার সিদ্ধান্ত নিতে পারে। এটা আমরা শ্রদ্ধার সঙ্গে দেখি। অতীতেও দু-একজন পদত্যাগ করেছিল। তখনও বিভিন্ন আশঙ্কার কথা বলা হয়েছিল। এখনও বলা হচ্ছে। আমরা আশা করি, সঠিক রাজনীতির মাধ্যমে আমরা সামনে এগিয়ে যাবো।’ 

আগামীতে যে কোনও সংকটে দেশকে নেতৃত্ব দিতে সক্ষম হবে এনসিপি। তিনি এমন আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

সেমিফাইনালের স্বপ্ন জিইয়ে রাখার লড়াই: শ্রীলঙ্কার মুখোমুখি পাকিস্তান, সামনে পাহাড়সম সমীকরণ

জামায়াতের সঙ্গে জোট নিয়ে এনসিপিতে টানাপড়েন

আপডেট সময় : ১১:৫৯:৩০ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৮ ডিসেম্বর ২০২৫

জাতীয় নির্বাচনে জামায়াতের সঙ্গে জোট গঠন নিয়ে দ্বিধা বিভক্ত হয়ে পড়েছে তরুণদের রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। এ সিদ্ধান্তে আপত্তি জানিয়ে দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ও সদস্য সচিব আখতার হোসেনকে চিঠি দিয়েছেন কেন্দ্রীয় ৩০ সদস্য। আবার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে নাহিদকে চিঠি দিয়েছেন ১৭০ জন নেতা।

শীর্ষ নারী নেত্রীরাও বিষয়টিকে মেনে নিতে পারছেন না। এরই মধ্যে পদত্যাগ করেছেন যুগ্ম আহ্বায়ক ডা. তাজনূভা জাবিন ও সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব ডা. তাসনিম জারা। আর জামায়াতের সঙ্গে জোট করার পরিণতি নিয়ে ফেসবুক পোস্টে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন। তবে তিনি পদত্যাগ করবেন না বলে জানান।

এ নিয়ে বেশ কয়েকজন নারী নেত্রী ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। অনেকেই পদত্যাগ করেছেন। দলটির নীতি ও আদর্শ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। জুলাই স্পিরিট থেকে গড়ে ওঠা এ দল এতদিন নিজেদের উদারপন্থি ও প্রগতিশীল হিসেবে প্রচার করেছে। যেখানে দাবি করা হতো— ধর্ম, বর্ণ, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবার জন্য একটি উন্মুক্ত রাজনৈতিক চর্চার পরিবেশ গড়তে চান তারা। এমন দৃষ্টিভঙ্গি লালন করা অসংখ্য তরুণ-তরুণী তাদের সঙ্গে যুক্ত হন।

তবে জামায়াতের মতো একটি ধর্মভিত্তিক দলের জোটে যুক্ত হওয়ার প্রক্রিয়াকে মেনে নিতে না পেরে অনেক নারী নেত্রীর দল থেকে সিটকে পড়ার আশঙ্কা করছেন কেউ কেউ। অনেকে মনে করছিলেন এনসিপিতে তরুণ নারী নেত্রীদের সরব উপস্থিতি অনেক বড় দলের চেয়েও ঈর্ষণীয় দৃষ্টান্ত ছিল। আর এভাবে নেত্রীদের দল ছেড়ে যাওয়ার ঘোষণায় নয়া বন্দোবস্ত কতটুকু বাস্তবায়ন হলো— তা নিয়ে নানা কথা হচ্ছে। শুধু তাই নয়, এতদিন এনসিপি যে স্বতন্ত্র ধারার কথা বলে আসছিল— তা নিয়ে অনেকে দলটির দ্বিচারিতার কথা বলছেন। এতে কয়েকটি আসনের জন্য দলটির সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ নষ্ট হওয়ার পথে। বিশেষ করে তাদেরকে জামায়াতের আদর্শিক সহযোগী হিসেবে যে অভিযোগ ছিল, তা আরও উচ্চকিত হয়েছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।

এ বিষয়ে সিনিয়র সাংবাদিক মাসুদ কামাল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এনসিপি এতদিন নিজেদের মধ্যমপন্থি দল হিসেবে দাবি করলেও জামায়াতের সঙ্গে যোগ দিয়ে নিজেদের চরিত্র প্রকাশ করলো। আসলে তারা তাদের আদর্শেই ফিরে গেছে। এতদিন যা বলেছে, তা ছিল একান্তই ধোঁকাবাজি। অথচ মানুষ তাদের কাছে এমনটি আশা করেনি। দলটি চেয়েছিল রাজনীতিতে নতুন ধারা চালু করবে। কিন্তু তারা মানুষকে আশাহত করলো।’

নারী নেত্রীদের পদত্যাগ ত্যাগের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘তারা তো অনেক আশা নিয়ে দলটিতে যুক্ত হয়েছিল। কিন্তু তারা যখন তাদের আদর্শিক বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছে, তখন সরে যাচ্ছে। আমার ধারণা এ সংখ্যা আরও বাড়বে। যদিও এনসিপির নেতাদের দাবি দলীয় স্বার্থেই নির্বাচনি কৌশল হিসেবে এমন সিদ্ধান্ত এবং এতে সংখ্যাগরিষ্ঠ কেন্দ্রীয় নেতাদের মত রয়েছে।’

আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েই জামায়াতের জোটে নাহিদরা

জাতীয় নাগরিক পার্টি এনসিপি এতদিন বলে আসছিল তারা বিএনপি ও জামায়াতের সঙ্গে জোটে যাবে না। তারা বিকল্প শক্তি হিসেবে রাজনৈতিক ময়দানে প্রভাব বিস্তার করবে। সে আলোকে চলতি বছরের ৭ ডিসেম্বর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি মিলনায়তনে এনসিপি, আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি) ও রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন মিলে তিন দলীয় গণতান্ত্রিক সংস্কার জোট গঠন করে। তখন তারা ঘোষণা দিয়েছিলেন তারা নিজেরাই নির্বাচন করবেন। সংসদে এমপি হওয়া তাদের লক্ষ্য নয়। তারা জাতি ক্রান্তিকালে রাজপথে ভূমিকা রাখতে চান।

তবে এরই মধ্যে কিছু আসনে জামায়াতের সঙ্গে এনসিপির শীর্ষ নেতাদের ভোটের সমীকরণ নিয়ে নানা বিশ্লেষণ শুরু হয়। তখন আলোচনা শুরু হয় এনসিপি জামায়াতের সঙ্গে জোট বা আসন সমঝোতায় যাচ্ছে। কয়েকটি গণমাধ্যমে এ নিয়ে সংবাদও প্রকাশ হয়। এতদিন এনসিপি নেতারা এ নিয়ে পরিষ্কার কিছু বলেননি। তবে শনিবার (২৭ ডিসেম্বর) এ নিয়ে এনসিপির কতিপয় নেতা বিষয়টি স্বীকার করেন।

সর্বশেষ, রবিবার (২৮ ডিসেম্বর) বিকালে জাতীয় প্রেসক্লাবে ৮ দলের সংবাদ সম্মেলনে প্রথমে এনসিপি জোটে যোগ দেওয়ার বিষয়টি জানান জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, ‘সময় স্বল্পতার কারণে এনসিপির কেউ আসতে না পারলেও নাহিদ জানিয়েছেন তারা আমাদের সঙ্গে থাকবেন। রাতেই হয়তো দল থেকে তারা আনুষ্ঠানিক জানাবেন।’ 

সে অনুযায়ী রাত ৮টায় বাংলা মোটরে দলের অস্থায়ী কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে নিজেদের অবস্থান জানান নাহিদ। তিনি ঘোষণা দেন তারা জামায়াতের সঙ্গে নির্বাচনি সমঝোতায় যাচ্ছেন।

যে ব্যাখ্যা দিলেন নাহিদ

জামায়াতের সঙ্গে জোটে যাওয়ার বিষয়ে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ বলেন, ‘আসন্ন নির্বাচনে এককভাবেই অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত ছিল। পরবর্তী সময়ে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের ফলে দেশের রাজনীতিতে পরিবর্তন এসেছে। আমরা মনে করি, আধিপত্যবাদী শক্তি এখনও দেশে আছে। তারা চায় নির্বাচন বানচাল করে জুলাই যোদ্ধাদের শেষ করে ফেলতে। তাই এমন পরিস্থিতিতে এনসিপি বৃহত্তর ঐক্যের জন্য জামায়াতের সঙ্গে নির্বাচনি সমঝোতায় এসেছে।’

তিনি বলেন, ‘আধিপত্যবাদী শক্তি থেকে নিজেদের রক্ষা করতে এবং বৃহত্তর ঐক্যের জন্য ১০ দলীয় জোটে অংশ নিচ্ছে এনসিপি।’

এনসপির এই নেতা বলেন, ‘ঐকমত্য কমিশনে দৃঢ় অবস্থানে ছিল এনসিপি। এটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। আমরা চাই গণভোটের পক্ষে সবাইকে নিয়ে ঐক্যবদ্ধ রাজনীতি করতে। আমরা বিএনপিকেও আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম। আমরা চাই দেশ গঠনের জন্য জুলাই সনদ অনুযায়ী পরিকল্পনা করতে।’

এসময় জোটে থাকলেও এনসিপি ও জামায়াত আলাদাভাবে নিজ আদর্শ অনুযায়ী কাজ করবে বলে জানান তিনি। তিনি বলেন, ‘জামায়াতের সঙ্গে আদর্শিক ঐক্য নয়, শুধুমাত্র নির্বাচনি সমঝোতা হয়েছে।’

দ্বিধা বিভক্ত নেতারা

এনসিপির যুগ্ম সদস্য সচিব জয়নাল আবেদীন শিশির বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘গত ২৩ ডিসেম্বর তাদের সঙ্গে জামায়াতের বৈঠক হয়। এতে দুদলের প্রাথমিক আলোচনায় জোট গঠনের সিদ্ধান্ত হয়। পরবর্তী সময়ে এনসিপি নিজেদের সঙ্গে বৈঠক করে। এতে ২১৪ জন কেন্দ্রীয় সদস্যের মধ্যে ১৮৪ জন জামায়াতের সঙ্গে জোটে একমত হয়। আর বাকি ৩০ জন আপত্তি জানান। তারা নাহিদ ইসলামকে এ বিষয়ে আপত্তির কথা জানিয়ে চিঠি দেন। যেহেতু গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে এ সিদ্ধান্ত হয়েছে, সেখানে কেউ কেউ দ্বিমত করতেই পারে। তাদের মতামতকে অবশ্যই এনসিপি সম্মান করে। তারপরও সামগ্রিক বাস্তবতায় দল এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’

অবশ্য রবিবার (২৮ ডিসেম্বর) জামায়াতের সঙ্গে জোটে সমর্থন জানিয়ে নাহিদকে চিঠি দেন ১৭০ নেতা।

দুই শীর্ষ নেত্রীর পদত্যাগ, অনেকের ক্ষোভ

জামায়াতের সঙ্গে জোটের সিদ্ধান্ত এনসিপির কয়েকজন নারী নেত্রী মেনে নিতে পারছেন না। এ নিয়ে ফেসবুকে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অনেকে। এরই মধ্যে দল ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছেন দুই শীর্ষ নেত্রী। প্রথমে শনিবার (২৭ ডিসেম্বর) ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে পদত্যাগের কথা জানিয়েছেন দলের সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব ডা. তাসনিম জারা। তিনি দলটি থেকে ঢাকা-৯ আসনের প্রার্থী ছিলেন। তবে পদত্যাগ করলেও স্বতন্ত্র হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকার ঘোষণা দেন।

ফেসবুক পোস্টে তাসনিম জারা লেখেন, ‘প্রিয় খিলগাঁও, সবুজবাগ ও মুগদাবাসী, আমি আপনাদের ঘরের মেয়ে। খিলগাঁওয়েই আমার জন্ম ও বেড়ে ওঠা। আমার স্বপ্ন ছিল একটি রাজনৈতিক দলের প্ল্যাটফর্‌ম থেকে সংসদে গিয়ে আমার এলাকার মানুষের ও দেশের সেবা করা। তবে বাস্তবিক প্রেক্ষাপটের কারণে আমি কোনও নির্দিষ্ট দল বা জোটের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’

তাসনিম জারা আরও লেখেন, ‘আমি আপনাদের এবং দেশের মানুষকে ওয়াদা করেছিলাম যে আপনাদের জন্য নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ার লক্ষে আমি লড়বো। পরিস্থিতি যাই হোক না কেন, আমি আমার সেই ওয়াদা রক্ষা করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তাই এই নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে ঢাকা-৯ থেকে অংশগ্রহণ করবো।’

তিনি লেখেন, ‘একটা দলের প্রার্থী হলে সেই দলের স্থানীয় অফিস থাকে, সুসংগঠিত কর্মী-বাহিনী থাকে। সরকার ও প্রশাসনের সঙ্গে নিরাপত্তা বা অন্যান্য বিষয়ে আপত্তি ও শঙ্কা নিয়ে কথা বলার সুযোগ থাকে। তবে আমি যেহেতু কোনও দলের সঙ্গে থাকছি না, তাই আমার সে সব কিছুই থাকবে না। আমার একমাত্র ভরসা আপনারা। আপনাদের মেয়ে হিসেবে আমার সততা, নিষ্ঠা এবং নতুন রাজনীতি করার অদম্য ইচ্ছাশক্তির প্রেক্ষিতে আপনারা যদি স্নেহ ও সমর্থন দেন, তবেই আমি আপনাদের সেবা করার সুযোগ পাবো।’

এর একদিন পর রবিবার (২৮ ডিসেম্বর) ফেসবুকে এনসিপি থেকে পদত্যাগের কথা জানান যুগ্ম আহ্বায়ক ডা. তাজনূভা জাবীন। লম্বা স্ট্যাটাসের এক অংশে তাজনূভা লেখেন, ‘এনসিপি শুরু থেকে যে গণপরিষদ, সেকেন্ড রিপাবলিক মধ্যপন্থার, নারী, বিভিন্ন জাতিসত্তাকে নিয়ে রাজনীতি করার কথা বলছে। সেটা ধারণ করে যে কয়জন পার্টিতে ছিল তাদের মধ্যে আমি একজন। এই পার্টির একজন ফাউন্ডার মেম্বার আমি। স্বাভাবিকভাবেই ভীষণ মন খারাপ। কিন্তু এই দল ছেড়ে দেওয়া ছাড়া আমার সামনে আর কোনও সম্মানজনক অপশন নাই। দলের খারাপ সময়ে দল ছেড়ে দিয়ে অরাজনৈতিক, অপরিপক্বতার পরিচয় ইত্যাদি বয়ান দিবে অনেকে।’ 

তিনি লেখেন, ‘জাস্ট বুলশিট। শুধু এটুকু বলি, আমি বহিরাগত ওখানে, আমাকে প্রতারিত করলে মেইক সেন্স। কিন্তু এক শীর্ষ নেতা আরেক শীর্ষ নেতার সঙ্গে যে মাইনাসের রাজনীতি করে ওখানে সেটা ভয়ংকর। এরা নিজেদের মধ্যে রাজনীতি করতে এত ব্যস্ত এরা কখনও দেশের জন্য নতুন একটা মধ‍্যপন্থার বাংলাদেশপন্থি রাজনীতি করতে পারবে না।’

আরেক অংশে তিনি লেখেন, ‘আজকে পদত্যাগ করেছি এনসিপি থেকে। অত্যন্ত ভাঙা মন নিয়ে জানাচ্ছি আমি আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারছি না। সবচেয়ে কষ্ট লাগছে আজকেই আম্মু চট্টগ্রাম থেকে আসছে আমার নির্বাচন করা উপলক্ষ‍ে। আর আজকেই আমি এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হলাম। আমি জানি অনেকে ভীষণ কষ্ট পেয়েছেন আমার এই সিদ্ধান্তে। কিন্তু এটাই আমার জন‍্য সঠিক। এখানে ন্যূনতম আশা থাকলে, আমি আমার আত্মসম্মানবোধকেও বোধ হয় ডাউট অফ বেনিফিট দিতাম।’

একইদিন ফেসবুক পোস্টে জামায়াতকে ‘অনির্ভরযোগ্য মিত্র’ আখ্যা দিয়ে এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন লেখেন, ‘দলটির সঙ্গে কোনও ধরনের সমঝোতায় গেলে এনসিপিকে ভবিষ্যতে কঠিন মূল্য চুকাতে হবে।’

সামান্তা লেখেন, ‘জামায়াতের দায়িত্বশীল নেতারা মন্তব্য করেছিলেন, জামায়াত জুলাইয়ের স্পিরিট, বাংলাদেশের পরিকল্পনা নিয়ে একমত হলে দলটির সঙ্গে জোট করতে আসতে পারে যে-কোনও দল। এনসিপি এতদিনের অবস্থান অনুযায়ী তার মূলনীতি, রাষ্ট্রকল্প জামায়াত থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। বিচার, সংস্কার ও গণপরিষদ নির্বাচন তথা সেকেন্ড রিপাবলিককে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা দল এনসিপি। ফলে এই তিনটি বিষয়ে অভিন্ন অবস্থান যে-কোনও রাজনৈতিক মিত্রতার পূর্বশর্ত।’

তিনি লেখেন, ‘‘আমার বর্তমান অবস্থান এনসিপির গত দেড় বছরের অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। নিম্নকক্ষে পিআর আওয়াজ তুলে সংস্কারকে ব্যাহত করায় লিপ্ত হয়েছিল জামায়াত। ফলত এনসিপির আহ্বায়ক বলেছিলেন, ‘যারা সংস্কারের পক্ষে নয় তাদের সঙ্গে জোটও সম্ভব নয়।’ তাই জুলাই পদযাত্রার পর থেকে ‘৩০০’ আসনে একক প্রার্থী দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়, আহ্বায়কসহ একাধিক বরাতে এবং স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচন করবে এনসিপি— এই মর্মে সারা দেশ থেকে প্রার্থীদের আহ্বান করা হয়।”

তিনি আরও উল্লেখ করেন, “জামায়াতের সঙ্গে জোট করার সমস্যাগুলো তুলে ধরা মানেই বিএনপির পক্ষে অবস্থান বোঝায় না। বরং বিভিন্ন বিষয়ে এতদিন ধরে প্রকাশিত ও নানান মহলে প্রশংসিত এনসিপির অবস্থান আমি সঠিক মনে করি ও নিজেকে এই আদর্শের সৈনিক মনে করি। বিএনপি-জামায়াতের যে কোনোটির সঙ্গে জোট এনসিপির সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক পলিসি থেকে সরে গিয়ে তৈরি হচ্ছে।’’

আরেক নেত্রী ডা. মাহমুদা মিতু লেখেন, ‘এক পয়সা দিয়েও দেশি ভান ধরা পশ্চিমা গং বিশ্বাস করি না। এর চেয়ে যারা ওপেন বলে-কয়ে পশ্চিমা অ্যাজেন্ডার পক্ষ নেয় তাদের স্যালুট।’ তবে কিছুসময় পর তিনি পোস্টটি ডিলিট করে দেন।

নুসরাত তাবাসসুম ফেসবুকে লেখেন, ‘নীতির চাইতে রাজনীতি বড় নয়। কমিটমেন্ট ইজ কমিটমেন্ট‌।’

এ বিষয়ে এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এনসিপিতে সব মতাদর্শের মানুষের জায়গা আছে।’ 

নেত্রীদের পদত্যাগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ব্যক্তি তার সিদ্ধান্ত নিতে পারে। এটা আমরা শ্রদ্ধার সঙ্গে দেখি। অতীতেও দু-একজন পদত্যাগ করেছিল। তখনও বিভিন্ন আশঙ্কার কথা বলা হয়েছিল। এখনও বলা হচ্ছে। আমরা আশা করি, সঠিক রাজনীতির মাধ্যমে আমরা সামনে এগিয়ে যাবো।’ 

আগামীতে যে কোনও সংকটে দেশকে নেতৃত্ব দিতে সক্ষম হবে এনসিপি। তিনি এমন আশাবাদ ব্যক্ত করেন।