স্ট্রেচারে শুয়ে ছেড়েছিলেন দেশ, ১৭ বছর পর ফিরে এলেন রাজবেশে; সঙ্গে স্ত্রী, একমাত্র কন্যাসহ ব্যক্তিগত পরিজন। বৃহস্পতিবার (২৫ ডিসেম্বর) বেলা ১১টা ৪০ মিনিটে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করেন। বিমানবন্দরেই তিনি সাধারণ যাত্রীদের উদ্দেশে সালাম বিনিময় করেন। ভিআইপি লাউঞ্জের সামনে অপেক্ষমাণ সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে করেন কুশল বিনিময়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, চলন্ত সিঁড়িতে নেমে একটু হেঁটে এসেই দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের হাত ধরে জড়িয়ে ধরেন বুকে। এ সময় দুজনই আবেগঘন হয়ে পড়েন। মির্জা ফখরুল জুবাইদা রহমান ও জাইমা রহমানকেও শুভেচ্ছা জানান।
এ প্রসঙ্গে বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘দুজনই আবেগতাড়িত হয়েছিলেন। মহাসচিবের কাছে থেকে এতটুকুই পেয়েছি।’
এরপর তারেক রহমান একে একে মির্জা আব্বাস, সালাহ উদ্দিন আহমদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন। এরপর সেলিনা রহমান, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ড. আব্দুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন, রুহুল কবির রিজভী আহমেদসহ অনেকের সঙ্গে হ্যান্ডশেক ও কোলাকুলি করেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার পর বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘আজকের উপস্থিতি অবিশ্বাস্য। দেশে, দেশের বাইরে এত বড় জনসমাগম, এত স্বতঃস্ফূর্ততা, এত ভালোবাসা, এত প্রত্যাশা অন্তত আমি আমার রাজনৈতিক জীবনে দেখিনি।’
তিনি উল্লেখ করেন, ‘সংখ্যা তো আমরা বলতে পারবো না। কারণ যত মানুষের উপস্থিতি ছিল তারও বেশি মানুষের ছিল প্রতীক্ষা। প্রতীক্ষাটা কিন্তু সংখ্যায় দেখা যায় না।’
বিমানবন্দরে নেমে কেমন ছিলেন তারেক রহমান? এ প্রসঙ্গে আমির খসরু বলেন, ‘প্রথমে আমাদের সঙ্গে কোলাকুলি করেছেন। তিনি খুবই উষ্ণ। আমাদের সঙ্গে নিয়ে বাসে মুভ করেছেন শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত।’
এত মানুষ দেখে বাসে কী আলাপ করলেন আপনারা, প্রশ্নের জবাবে আমির খসরু বলেন, ‘বাসে উনার সময় কোথায়? উনার জন্য এই যে লক্ষ লক্ষ মানুষ দুইদিকে দাঁড়িয়ে আছে, তাদের প্রতি একটা মিনিটও হাত নাড়া বন্ধ করেননি।’
কুশল বিনিময়ের প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে বিএনপির চেয়ারপারসনের মিডিয়া উইংয়ের শায়রুল কবির খান বলেন, ‘আমি অনেক আনন্দিত হয়েছি। এমনভাবে হাতে স্পর্শ পেলাম এবং কথাগুলো হৃদয়কে নিবিড়ভাবে স্পর্শ করেছিল।’
বিমানবন্দরেই তারেক রহমান ফোন করেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে। তাকে তিনি ধন্যবাদ ও দোয়া করার কথা জানান। প্রচারিত একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, তারেক রহমান প্রধান উপদেষ্টাকে বলছেন, ‘আমি আমার পক্ষ থেকে এবং আমার পরিবারের পক্ষ থেকে আপনাকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। আপনার পক্ষ থেকে বিভিন্ন রকমের আয়োজন করেছেন। বিশেষ করে আমার নিরাপত্তার জন্য। থ্যাংক ইউ সো মাচ। নিশ্চয়ই… নিশ্চয়ই।’
দলীয় সূত্র জানাচ্ছে, দুই নেতার মধ্যে আবারও সরাসরি সাক্ষাৎ হতে পারে।
ভিআইপি লাউঞ্জ থেকে বেরিয়ে সামনের সবুজ লনে জুতা, মোজা খুলে খালি পায়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকেন তারেক রহমান। দীর্ঘ ১৭ বছর পর ছুঁয়ে দেখেন স্বদেশের মাটি।
নেতাকর্মীদের সঙ্গে মঞ্চে তারেক রহমান (ছবি: মেহেদি হাসান)
বৃহস্পতিবার পূর্বাচলে গণসংবর্ধনাস্থলে যাওয়ার জন্য বিমানবন্দর থেকে তারেক রহমানকে নিয়ে গাড়িবহর রওনা দেয় দুপুর ১২টা ৪১ মিনিটে। লাল-সবুজ রঙের ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ লেখা বাস গণসংবর্ধনাস্থলের কাছাকাছি পৌঁছাতে পুরো পথটাই ভিড়ের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। অন্তত তিন ঘণ্টা পর বেলা ৩টা ৪০ মিনিটের দিকে তারেক রহমানের গাড়িবহর সভামঞ্চের কাছাকাছি যায়। এরপর গাড়ি সামনে আর অগ্রসর হতে না পারায় ৩টা ৫০ মিনিটে তিনি হেঁটে সভামঞ্চে ওঠেন।
সাদা শার্ট ও কালো প্যান্টে জামার হাতা সামান্য গুটিয়ে সক্রিয় পায়ে মঞ্চে ওঠেন তারেক রহমান। বিমানবন্দর থেকে গায়ে কোট থাকলেও মঞ্চে উঠেন তা ছাড়াই। মঞ্চে উঠেই তারেক রহমান উপবিষ্ট রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। এ সময় তিনি সাইফুল হক, আন্দালিভ রহমান পার্থ, জোনায়েদ সাকি, নুরুল হক, মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দী, একেএম আশরাফুল হকসহ বিভিন্ন দলের নেতাদের সঙ্গে কুশল ও সালাম বিনিময় করেন।
বক্তব্য শেষেও কয়েকজনের সঙ্গে উষ্ণতা ছড়ান তারেক রহমান। বিকালে সভামঞ্চে বক্তব্য শেষে নামার সময় তারেক রহমান জড়িয়ে ধরেন বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হককে। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, “আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসে এত বড় প্রোগ্রাম তো কম। আমি তাকে বললাম, ‘আপনি তো লন্ডন থেকে ঠান্ডা নিয়ে আসলেন।’ শুনে তিনি হাসলেন। আমাকে হাগ করলেন। তিনি বললেন, ‘আমাদের নিশ্চয়ই কথা হবে।”
সাইফুল হক বলেন, ‘তিনি খুব উষ্ণ ছিলেন। সবার সঙ্গে আন্তরিকতার সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেছেন। আমরা পরস্পরকে জড়িয়ে ধরলাম। আমিও একটু ঠাট্টা করলাম।’
নেজামে ইসলাম পার্টির নির্বাহী সভাপতি একেএম আশরাফুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘তিনি সালাম ও শুভেচ্ছা বিনিময় করেছেন।’
অভ্যর্থনায় অংশ নেওয়া নেতাদের উদ্দেশে তারেক রহমানও বক্তব্যে ভবিষ্যতে দেশ গড়তে এই দলগুলোকে একসঙ্গে নিয়ে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, ‘আমি আমার দলের নেতৃবৃন্দ, দেশবাসী ও সমমনা দলের নেতাদের নিয়ে সুন্দর শান্তিপূর্ণ বাংলাদেশ গড়বো। এই মঞ্চে যারা আছেন, যারা মঞ্চে নেই, সবাই মিলে দেশ গড়ে তুলতে চাই।’
অভ্যর্থনা সভায় শুরুতেই মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তার দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে দেশে স্বাগত জানান। দল ও দেশের মানুষের পক্ষ থেকে তিনি শুভেচ্ছা জানান। এ সময় তিনি বিগত গণতান্ত্রিক আন্দোলনে তারেক রহমানের ভূমিকা, বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান, বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে স্মরণ করেন।
এদিকে, তারেক রহমানকে বিমানবন্দর থেকে অভ্যর্থনা অনুষ্ঠানে নিয়ে যাওয়ার পর মঞ্চে নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন ছিল বলে অনেক অংশগ্রহণকারী নেতা উল্লেখ করেছেন। সমাবেশের পর বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে আলাপকালে শীর্ষ একাধিক নেতা জানান, নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন ছিল। প্রপার ছিল না। যে পথ দিয়ে মঞ্চে যাওয়ার কথা ছিল, তা মিস করেছেন আয়োজকরা।
সভা থেকে ধীরগতিতে এভারকেয়ার হাসপাতালে যান তারেক রহমান। রাত সাড়ে সাতটার দিকে এভারকেয়ার থেকে বের হন তিনি। এ সময় তার স্ত্রী, কন্যাসহ আরাফাত রহমান কোকোর পরিবারের সদস্যরাও ছিলেন।
বিএনপি-প্রধানের দেশে আগমনকে কেন্দ্র করে অভ্যর্থনায় জামায়াত, এনসিপি অংশ না নিলেও ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে স্বাগত জানিয়েছেন ডা. শফিকুর রহমান ও নাহিদ ইসলাম।
রিপোর্টারের নাম 

























