বগুড়ার আলোচিত যুবদল নেতা রাশেদ হত্যাকাণ্ডের ১০ মাস পেরিয়ে গেলেও হত্যাকারী ও নির্দেশদাতারা এলাকায় ঘুরে বেড়ালেও পুলিশ গ্রেফতার করছে না বলে জানালেন স্বজনরা।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে রাশেদ হত্যা মামলার প্রধান আসামি হান্নান বাটালু ও জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সভাপতি মাজেদুর রহমান জুয়েলের একটি ফোনালাপ ফাঁস হয়েছে। ফাঁস হওয়া সেই ফোনালাপে প্রধান আসামি বাটালু দাবি করেন সোনাতলা উপজেলা বিএনপির সভাপতি জাকির হোসেনের নির্দেশে হত্যাকাণ্ড ঘটান। এরপরই জাকিরের বিষয়ে তদন্ত করার দাবি জানিয়ে আসছেন রাশেদের স্বজনরা।
ফোনালাপে প্রধান আসামি হান্নান বাটালু সাবেক জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি জুয়েলকে বলেন, ‘আমি জাকির ভাইকে (সোনাতলা উপজেলা বিএনপির সভাপতি) অনেক বোঝানোর চেষ্টা করেছি। তিনি আমাকে রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতন করেছেন। শুধু স্ট্রোক করা বাকি ছিল। তারপর বাধ্য হয়ে আমি রাশেদের দুর্ঘটনা (রাশেদ হত্যা) ঘটাইছি।’
সেই ফোনালাপ ভাইরাল হওয়ার পর বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হলে হান্নান বাটালু সেই অডিও রেকর্ড মিথ্যা দাবি করে একটি সংবাদ সম্মেলন করেন। তবে ফোনালাপের অপরপ্রান্তে যুক্ত থাকা বগুড়া জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক আহ্বায়ক মাজেদুর রহমান জুয়েল বাটালুর সেই দাবিকে মিথ্যা বলে জানান। তিনি বলেন, ‘রাশেদ হত্যাকাণ্ড নিয়ে জাকির ভাইয়ের সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে হান্নান বাটালুর সঙ্গে ফোনে যে কথা হয়েছে তা সত্য। বাটালু আমার সঙ্গেও এসব কথা বলেছেন। এই হত্যাকাণ্ড সরাসরি জাকিরের নির্দেশেই তিনি সংঘটিত করেছেন বলে আমার কাছেও স্বীকার করেছেন।’
এরই মধ্যে মামলার চূড়ান্ত চার্জশিট দিয়েছে সোনাতলা থানা পুলিশ। তবে সেখান থেকে সরাসরি হত্যায় অংশ নেওয়া আট জনকে বাদ দেওয়ার অভিযোগ তুলেছে রাশেদের পরিবার। তার চাচা জাকিরুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা সেই চার্জশিটের ওপর নারাজি দিয়েছি। ফলে মামলাটি পিবিআইয়ে পাঠানো হয়েছে পুনরায় তদন্তের জন্য।’ আসামিদের বাদ দেওয়া ও হত্যার নেপথ্যের ব্যক্তিদের আড়ালের ঘটনায় মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তাকে দোষারোপ করেন তিনি।
তবে তদন্তকারী কর্মকর্তা সোনাতলা থানার এসআই শামীশ হোসেন বিষয়টি অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, ‘মামলায় কারও প্রভাবে তদন্ত করা হয়নি।’ তবে জাকিরের বিষয়ে তদন্ত বা ভাইরাল হওয়া কল রেকর্ডের বিষয়ে তিনি জানেন না বলে উল্লেখ করেন।
নিহতের পরিবারের অভিযোগ, গত ৭ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় উপজেলার পাকুল্লা বাজারে রাশেদুলের ওপর হামলা করেন ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আবদুল হান্নান বাটালু, স্থানীয় ছাত্রলীগ, যুবলীগের নেতাকর্মীরা। হান্নান বাটালু সোনাতলা উপজেলা বিএনপির সভাপতি জাকির হোসেনের অনুসারী। এ ঘটনায় গত ১৭ ফেব্রুয়ারি সোনাতলা থানায় হত্যা মামলা করেন রাশেদুলের মা ওজেনা বেগম। আসামিদের মধ্যে আছেন পাকুল্যা বহুমুখী উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নিয়ামুল কবির, তার চাচাতো ভাই জাহাঙ্গীর আলম এবং পাকুল্যা ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আবদুল হান্নান। রাশেদুল পাকুল্যা ইউনিয়ন যুবদলের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ছিলেন। গত ৫ ফেব্রুয়ারি বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের নিবিড় পর্যবেক্ষণ ইউনিটে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, পাকুল্লা বহুমুখী উচ্চবিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি গঠন নিয়ে এলাকাবাসী তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েন। এক পক্ষের নেতৃত্বে ছিলেন ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি হান্নান বাটালু। অপর দুই পক্ষ পরিচালনা করেন পাকুল্যা বহুমুখী উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নিয়ামুল কবির ও স্থানীয় আওয়ামী লীগের একাংশ এবং জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক আহ্বায়ক মাজেদুর রহমান জুয়েল।
নিয়ামুল মাস্টার পাকুল্লা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতির ছোট ভাই। তারই চাচাতো ভাই স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা জাহাঙ্গীর আলম গোপনে পাকুল্লা হাইস্কুলের সভাপতি করতে একটি প্রস্তাবনা জেলা প্রশাসকের দফতরে পাঠিয়ে দেন। সেই প্রস্তাবনা বাস্তবায়নের নেপথ্যে উপজেলা বিএনপির নাম ছড়িয়ে পড়ে। এরই জেরে উপজেলা বিএনপির সঙ্গে স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে বিরোধ দেখা দেয়। ৭ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা জুয়েল মোটরসাইকেলের একটি বহর নিয়ে পাকুল্লা বাজারে মহড়া দেন বলে অভিযোগ করে সেদিনই রাশেদের ওপর হামলা চালানো হয়। সে ঘটনায় গুরুতর আহত হন রাশেদ। তিনি সোনাতলা উপজেলা সাইবার ফোর্সের সভাপতি জেলা কমিটির সহসভাপতি, যুবদল পাকুল্লা ইউনিয়ন আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ছিলেন।
রাশেদের মায়ের দাবি, মামলার আইও ও উপজেলা বিএনপির সভাপতি জাকিরের সঙ্গে মিলে মূল আসামিগুলোকে বাদ দেওয়া হয়েছে।’ একইসঙ্গে এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জাকিরের সম্পৃক্ততারও অভিযোগ তোলেন তার মা। তার দাবি, মোবাইল ফোনালাপে জাকিরের কথা বলছে জাকিরের লোকজনই। তার লোকজনই এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে।
তবে মামলার আইও এসআই শামীম তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি বলেন, মামলায় সম্পৃক্ততা না পাওয়ায় কিছু আসামিকে চার্জশিট থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।
রিপোর্টারের নাম 
























