ঢাকা ১১:১০ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

গাজায় নীরব মৃত্যুদূত: যুদ্ধবিরতির পরও আতঙ্ক ছড়াচ্ছে ইসরায়েলের ‘বিস্ফোরক রোবট’

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ১২:০৬:০৭ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৫
  • ৪৩ বার পড়া হয়েছে

ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর গাজা শহরের হাজার হাজার বাসিন্দা নিজেদের বিধ্বস্ত বাড়িতে ফিরেছেন। তারা ক্ষতির পরিমাণ বোঝার চেষ্টা করছেন, যা কিছু অবশিষ্ট আছে তা উদ্ধারের জন্য হাতড়াচ্ছেন এবং নতুন করে জীবন শুরু করার প্রাথমিক কাজ শুরু করেছেন। কিন্তু জাবালিয়া, শেখ রাদওয়ান, আবু ইস্কান্দারসহ বিভিন্ন এলাকা জুড়ে যারা ফিরেছেন, তারা এক নতুন ও মারাত্মক বিপদের মুখোমুখি হচ্ছেন। ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনও পড়ে আছে ইসরায়েলের ব্যবহৃত ‘বিস্ফোরক রোবট’, যার অনেকগুলোই ফাটেনি এবং এখন নীরব, কিন্তু অত্যন্ত বিপজ্জনক অবস্থায় রয়ে গেছে।

২০২৪ সালের মে মাসে ইসরায়েল প্রথমবারের মতো জাবালিয়া শরণার্থী ক্যাম্পে এই ধরনের রোবট ব্যবহার শুরু করে। এরপর থেকে উত্তর গাজাজুড়ে এগুলো এক ভয়ঙ্কর আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ইউরো-মেড হিউম্যান রাইটস মনিটরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতির আগে পর্যন্ত ইসরায়েল এসব রোবট ব্যবহারে ‘অভূতপূর্ব গতি’ অর্জন করেছিল—গাজা সিটি ও জাবালিয়ায় প্রতিদিন প্রায় ৩০০টি আবাসিক ভবন ধ্বংস করা হচ্ছিল। এই রোবটগুলো মূলত সাঁজোয়া যান, যার ভেতরে বিস্ফোরক বোঝাই করা থাকে। এরপর সেগুলোকে সাঁজোয়া বুলডোজার দিয়ে টেনে নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে নিয়ে যাওয়া হয় এবং দূরনিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে বিস্ফোরণ ঘটানো হয়—যা চারপাশের সবকিছু মুহূর্তেই ধূলিসাৎ করে দেয়।

গাজা সিটি সিভিল ডিফেন্সের মুখপাত্র মাহমুদ বাসাল জানিয়েছেন, এই রোবটগুলোর ‘ধ্বংস পরিধি প্রায় ৫০০ মিটার’ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল এবং অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা ছিল ‘চমকে দেওয়ার মতো’।

জাবালিয়ার ২২ বছর বয়সী শরিফ শাদি ভয়াবহ সেই অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করে বলেন, ‘বিস্ফোরক রোবট যখন প্রবেশ করে, কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে পুরো এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। শুধু ধ্বংসাবশেষ আর ধোঁয়া ছাড়া কিছুই থাকে না।’

শাদি স্মরণ করে বলেন, এক সকালে রাস্তায় দাঁড়িয়ে তিনি দেখতে পান একটি ডি১০ বুলডোজার একটি রোবট টেনে তাদের ব্লকের দিকে নিয়ে আসছে।

তিনি বলেন, ‘আমি দৌড়াতে শুরু করি। ১০০ মিটারও যেতে পারিনি, এমন সময় বিশাল এক বিস্ফোরণে আমি ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ি। যারা আমার কাছাকাছি ছিল, তাদের কোনো চিহ্নও আর খুঁজে পাওয়া যায়নি।’

ইউরো-মেড মনিটর তাদের প্রতিবেদনে বলেছে যে, এই রোবটগুলোর নির্বিচার ধ্বংসযজ্ঞ ‘নিষিদ্ধ অস্ত্রের আওতায় পড়ে’ এবং জনবসতিপূর্ণ এলাকায় এর ব্যবহারকে “যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধ” হিসেবে গণ্য করা উচিত।

তবে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী এখনও পর্যন্ত প্রকাশ্যে এসব বিধ্বংসী অস্ত্র ব্যবহারের কথা স্বীকার করেনি।

ফিলিস্তিনি মেডিকেল রিলিফ সোসাইটির পরিচালক ডা. মোহাম্মদ আবু আফাশ জানিয়েছেন, বিস্ফোরণের পর এসব রোবট থেকে বিষাক্ত গ্যাস ও ভারী ধাতব কণা মিশ্রিত ধোঁয়া নির্গত হয়, যা তীব্র শ্বাসকষ্ট ও বিষক্রিয়া সৃষ্টি করছে। তিনি বলেন, ‘মানুষের মধ্যে বারবার শ্বাসরোধ হওয়া, বুকে ব্যথা এবং স্নায়বিক দুর্বলতার মতো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে।’

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

আফগানিস্তানের পক্ষ থেকে পাকিস্তানের প্রতি শান্তি আলোচনার প্রস্তাব

গাজায় নীরব মৃত্যুদূত: যুদ্ধবিরতির পরও আতঙ্ক ছড়াচ্ছে ইসরায়েলের ‘বিস্ফোরক রোবট’

আপডেট সময় : ১২:০৬:০৭ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৫

ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর গাজা শহরের হাজার হাজার বাসিন্দা নিজেদের বিধ্বস্ত বাড়িতে ফিরেছেন। তারা ক্ষতির পরিমাণ বোঝার চেষ্টা করছেন, যা কিছু অবশিষ্ট আছে তা উদ্ধারের জন্য হাতড়াচ্ছেন এবং নতুন করে জীবন শুরু করার প্রাথমিক কাজ শুরু করেছেন। কিন্তু জাবালিয়া, শেখ রাদওয়ান, আবু ইস্কান্দারসহ বিভিন্ন এলাকা জুড়ে যারা ফিরেছেন, তারা এক নতুন ও মারাত্মক বিপদের মুখোমুখি হচ্ছেন। ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনও পড়ে আছে ইসরায়েলের ব্যবহৃত ‘বিস্ফোরক রোবট’, যার অনেকগুলোই ফাটেনি এবং এখন নীরব, কিন্তু অত্যন্ত বিপজ্জনক অবস্থায় রয়ে গেছে।

২০২৪ সালের মে মাসে ইসরায়েল প্রথমবারের মতো জাবালিয়া শরণার্থী ক্যাম্পে এই ধরনের রোবট ব্যবহার শুরু করে। এরপর থেকে উত্তর গাজাজুড়ে এগুলো এক ভয়ঙ্কর আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ইউরো-মেড হিউম্যান রাইটস মনিটরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতির আগে পর্যন্ত ইসরায়েল এসব রোবট ব্যবহারে ‘অভূতপূর্ব গতি’ অর্জন করেছিল—গাজা সিটি ও জাবালিয়ায় প্রতিদিন প্রায় ৩০০টি আবাসিক ভবন ধ্বংস করা হচ্ছিল। এই রোবটগুলো মূলত সাঁজোয়া যান, যার ভেতরে বিস্ফোরক বোঝাই করা থাকে। এরপর সেগুলোকে সাঁজোয়া বুলডোজার দিয়ে টেনে নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে নিয়ে যাওয়া হয় এবং দূরনিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে বিস্ফোরণ ঘটানো হয়—যা চারপাশের সবকিছু মুহূর্তেই ধূলিসাৎ করে দেয়।

গাজা সিটি সিভিল ডিফেন্সের মুখপাত্র মাহমুদ বাসাল জানিয়েছেন, এই রোবটগুলোর ‘ধ্বংস পরিধি প্রায় ৫০০ মিটার’ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল এবং অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা ছিল ‘চমকে দেওয়ার মতো’।

জাবালিয়ার ২২ বছর বয়সী শরিফ শাদি ভয়াবহ সেই অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করে বলেন, ‘বিস্ফোরক রোবট যখন প্রবেশ করে, কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে পুরো এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। শুধু ধ্বংসাবশেষ আর ধোঁয়া ছাড়া কিছুই থাকে না।’

শাদি স্মরণ করে বলেন, এক সকালে রাস্তায় দাঁড়িয়ে তিনি দেখতে পান একটি ডি১০ বুলডোজার একটি রোবট টেনে তাদের ব্লকের দিকে নিয়ে আসছে।

তিনি বলেন, ‘আমি দৌড়াতে শুরু করি। ১০০ মিটারও যেতে পারিনি, এমন সময় বিশাল এক বিস্ফোরণে আমি ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ি। যারা আমার কাছাকাছি ছিল, তাদের কোনো চিহ্নও আর খুঁজে পাওয়া যায়নি।’

ইউরো-মেড মনিটর তাদের প্রতিবেদনে বলেছে যে, এই রোবটগুলোর নির্বিচার ধ্বংসযজ্ঞ ‘নিষিদ্ধ অস্ত্রের আওতায় পড়ে’ এবং জনবসতিপূর্ণ এলাকায় এর ব্যবহারকে “যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধ” হিসেবে গণ্য করা উচিত।

তবে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী এখনও পর্যন্ত প্রকাশ্যে এসব বিধ্বংসী অস্ত্র ব্যবহারের কথা স্বীকার করেনি।

ফিলিস্তিনি মেডিকেল রিলিফ সোসাইটির পরিচালক ডা. মোহাম্মদ আবু আফাশ জানিয়েছেন, বিস্ফোরণের পর এসব রোবট থেকে বিষাক্ত গ্যাস ও ভারী ধাতব কণা মিশ্রিত ধোঁয়া নির্গত হয়, যা তীব্র শ্বাসকষ্ট ও বিষক্রিয়া সৃষ্টি করছে। তিনি বলেন, ‘মানুষের মধ্যে বারবার শ্বাসরোধ হওয়া, বুকে ব্যথা এবং স্নায়বিক দুর্বলতার মতো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে।’