ঢাকা ১০:২৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

বিচার বিভাগে নারীর পূর্ণ অংশগ্রহণ নিশ্চিতে এখনও অনেক বাধা: প্রধান বিচারপতি

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০২:৩৫:৩৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৫
  • ৪২ বার পড়া হয়েছে

প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদ সম্প্রতি থাইল্যান্ডে অনুষ্ঠিত এশিয়ার নারী বিচারকদের এক আঞ্চলিক সম্মেলনে স্পষ্ট করে বলেছেন যে, বাংলাদেশে একটি নারীবান্ধব বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠার পথে এখনও কিছু কাঠামোগত ও সামাজিক প্রতিবন্ধকতা বিদ্যমান। তিনি উচ্চ আদালতে বিচারপতি নিয়োগের সাম্প্রতিক উদাহরণ টেনে বলেন, মোট ২৫ জন নিয়োগের মধ্যে মাত্র ৩ জন নারী বিচারক নিযুক্ত হওয়াটাই এর প্রমাণ। তার মতে, এই বাধাগুলো অতিক্রম করতে হলে নারীদের জন্য পেশাগত প্রস্তুতি, কার্যকর দিকনির্দেশনা এবং নীতিগত সহায়তা আরও বাড়ানো জরুরি।

প্রধান বিচারপতি মনে করেন, বিচার বিভাগে নারীর অংশগ্রহণকে কেবল প্রতিনিধিত্বের একটি বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না, বরং এটি ন্যায়বিচারের গুণগত মান বৃদ্ধি ও জনগণের আস্থার এক বিশেষ প্রতীক। তিনি উল্লেখ করেন, নারী বিচারকরা তাদের মানবিক অন্তর্দৃষ্টি ও বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা দিয়ে লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা, কর্মক্ষেত্রে হয়রানি ও পারিবারিক বিরোধের মতো সংবেদনশীল মামলাগুলো আরও সমৃদ্ধভাবে পরিচালনা করেন। তাদের এই সক্ষমতা বিচার ব্যবস্থাকে আরও ন্যায়সংগত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করে তোলে, কারণ তারা ক্ষমতার ভারসাম্য ও মর্যাদার সূক্ষ্ম দিকগুলো বিশেষভাবে অনুধাবন করতে পারেন।

তিনি জোর দিয়ে বলেন, বিচার বিভাগে সত্যিকারের সমতা কেবল কিছু নিয়োগের মাধ্যমে আসে না, বরং এটি একটি ব্যাপক রূপান্তরের প্রক্রিয়া। এই লক্ষ্য পূরণে তিনি স্বচ্ছ নিয়োগপ্রক্রিয়া, নারীবান্ধব পেশাগত পরিবেশ এবং মেন্টরশিপ নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করে এশিয়ার বিচার বিভাগগুলোতে একটি সমৃদ্ধ প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি তৈরি করার আহ্বান জানান।

বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপট তুলে ধরে প্রধান বিচারপতি জানান, জেলা আদালতগুলোতে ৬২৫ জন নারী বিচারক কর্মরত থাকলেও উচ্চ আদালতে তাদের সংখ্যা মাত্র ১০ শতাংশ। সুপ্রিম কোর্টে মোট ১১৭ জন বিচারকের মধ্যে নারী বিচারক মাত্র ১২ জন এবং দেশে এখনও কোনো নারী প্রধান বিচারপতি নিযুক্ত হননি। এর পাশাপাশি, আইন পেশায় নারীর সংখ্যাও ১২ শতাংশের কম, যা পেশাগত অগ্রগতিতে তাদের সীমিত অংশগ্রহণকেই নির্দেশ করে। তিনি পুনরায় তার বক্তব্যের পুনরাবৃত্তি করেন যে, সর্বোচ্চ আদালতের সাম্প্রতিক নিয়োগে ২৫ জনের মধ্যে মাত্র ৩ জন নারী বিচারক নিযুক্ত হওয়া প্রমাণ করে নারীবান্ধব বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠায় কাঠামোগত ও সামাজিক বাধা এখনও প্রকট।

প্রধান বিচারপতি আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, বিচার বিভাগে জেন্ডার সমতা নিশ্চিত হলে আইনি চিন্তাভাবনা আরও গভীর ও মানবিক হবে। নারী নেতৃত্ব আইনের ব্যাখ্যা ও প্রয়োগে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি এনে পারিবারিক, শ্রম, সম্পত্তি ও পরিবেশসংক্রান্ত মামলায় আরও ন্যায়সংগত ফলাফল নিশ্চিত করতে সক্ষম হবে। তিনি নারী বিচারকদের মেন্টরশিপ, প্রশিক্ষণ ও নেতৃত্ব বিকাশে সক্রিয় ভূমিকা রাখার জন্য আইন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বার অ্যাসোসিয়েশন ও বিচারকদের প্রতি আহ্বান জানান। তার মতে, ন্যায়বিচার তখনই পূর্ণতা পায়, যখন বিচার বিভাগে সমাজের সকল স্তর ও লিঙ্গের প্রতিনিধিত্ব সুষমভাবে প্রতিফলিত হয়।

বিচারিক নেতৃত্ব বিকাশে আন্তর্জাতিক সংস্থা, উন্নয়ন সহযোগী ও দাতাগোষ্ঠীর ভূমিকার প্রশংসা করে প্রধান বিচারপতি বলেন, এটি নিছক সহায়তা নয়, বরং এক প্রকারের অংশীদারিত্ব। তিনি ইউএনডিপি, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, সুইডেন, যুক্তরাজ্য ও জার্মানির অবদানের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেন, যারা সুপ্রিম কোর্ট ও সিভিল সোসাইটির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে বিচার বিভাগের সক্ষমতা ও জেন্ডার সমতা নিশ্চিতকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এই সম্মেলনের আগে প্রধান বিচারপতি থাইল্যান্ডের বিচারমন্ত্রী রুত্তাফন নাওয়ারাত, ইউএনডিপির এশিয়ার ডেপুটি রিজিওনাল ডিরেক্টর ক্রিস্টোফ বাহুয়েট এবং নেপালের ডেপুটি প্রধান বিচারপতি স্বপ্না প্রধান মাল্লার সঙ্গে দ্বি-পাক্ষিক বৈঠক করেন।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

ফরিদগঞ্জে প্রবাসীর স্ত্রীকে গলা কেটে হত্যা: এনজিও ঋণের জট নিয়ে চাঞ্চল্য

বিচার বিভাগে নারীর পূর্ণ অংশগ্রহণ নিশ্চিতে এখনও অনেক বাধা: প্রধান বিচারপতি

আপডেট সময় : ০২:৩৫:৩৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৫

প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদ সম্প্রতি থাইল্যান্ডে অনুষ্ঠিত এশিয়ার নারী বিচারকদের এক আঞ্চলিক সম্মেলনে স্পষ্ট করে বলেছেন যে, বাংলাদেশে একটি নারীবান্ধব বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠার পথে এখনও কিছু কাঠামোগত ও সামাজিক প্রতিবন্ধকতা বিদ্যমান। তিনি উচ্চ আদালতে বিচারপতি নিয়োগের সাম্প্রতিক উদাহরণ টেনে বলেন, মোট ২৫ জন নিয়োগের মধ্যে মাত্র ৩ জন নারী বিচারক নিযুক্ত হওয়াটাই এর প্রমাণ। তার মতে, এই বাধাগুলো অতিক্রম করতে হলে নারীদের জন্য পেশাগত প্রস্তুতি, কার্যকর দিকনির্দেশনা এবং নীতিগত সহায়তা আরও বাড়ানো জরুরি।

প্রধান বিচারপতি মনে করেন, বিচার বিভাগে নারীর অংশগ্রহণকে কেবল প্রতিনিধিত্বের একটি বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না, বরং এটি ন্যায়বিচারের গুণগত মান বৃদ্ধি ও জনগণের আস্থার এক বিশেষ প্রতীক। তিনি উল্লেখ করেন, নারী বিচারকরা তাদের মানবিক অন্তর্দৃষ্টি ও বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা দিয়ে লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা, কর্মক্ষেত্রে হয়রানি ও পারিবারিক বিরোধের মতো সংবেদনশীল মামলাগুলো আরও সমৃদ্ধভাবে পরিচালনা করেন। তাদের এই সক্ষমতা বিচার ব্যবস্থাকে আরও ন্যায়সংগত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করে তোলে, কারণ তারা ক্ষমতার ভারসাম্য ও মর্যাদার সূক্ষ্ম দিকগুলো বিশেষভাবে অনুধাবন করতে পারেন।

তিনি জোর দিয়ে বলেন, বিচার বিভাগে সত্যিকারের সমতা কেবল কিছু নিয়োগের মাধ্যমে আসে না, বরং এটি একটি ব্যাপক রূপান্তরের প্রক্রিয়া। এই লক্ষ্য পূরণে তিনি স্বচ্ছ নিয়োগপ্রক্রিয়া, নারীবান্ধব পেশাগত পরিবেশ এবং মেন্টরশিপ নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করে এশিয়ার বিচার বিভাগগুলোতে একটি সমৃদ্ধ প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি তৈরি করার আহ্বান জানান।

বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপট তুলে ধরে প্রধান বিচারপতি জানান, জেলা আদালতগুলোতে ৬২৫ জন নারী বিচারক কর্মরত থাকলেও উচ্চ আদালতে তাদের সংখ্যা মাত্র ১০ শতাংশ। সুপ্রিম কোর্টে মোট ১১৭ জন বিচারকের মধ্যে নারী বিচারক মাত্র ১২ জন এবং দেশে এখনও কোনো নারী প্রধান বিচারপতি নিযুক্ত হননি। এর পাশাপাশি, আইন পেশায় নারীর সংখ্যাও ১২ শতাংশের কম, যা পেশাগত অগ্রগতিতে তাদের সীমিত অংশগ্রহণকেই নির্দেশ করে। তিনি পুনরায় তার বক্তব্যের পুনরাবৃত্তি করেন যে, সর্বোচ্চ আদালতের সাম্প্রতিক নিয়োগে ২৫ জনের মধ্যে মাত্র ৩ জন নারী বিচারক নিযুক্ত হওয়া প্রমাণ করে নারীবান্ধব বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠায় কাঠামোগত ও সামাজিক বাধা এখনও প্রকট।

প্রধান বিচারপতি আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, বিচার বিভাগে জেন্ডার সমতা নিশ্চিত হলে আইনি চিন্তাভাবনা আরও গভীর ও মানবিক হবে। নারী নেতৃত্ব আইনের ব্যাখ্যা ও প্রয়োগে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি এনে পারিবারিক, শ্রম, সম্পত্তি ও পরিবেশসংক্রান্ত মামলায় আরও ন্যায়সংগত ফলাফল নিশ্চিত করতে সক্ষম হবে। তিনি নারী বিচারকদের মেন্টরশিপ, প্রশিক্ষণ ও নেতৃত্ব বিকাশে সক্রিয় ভূমিকা রাখার জন্য আইন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বার অ্যাসোসিয়েশন ও বিচারকদের প্রতি আহ্বান জানান। তার মতে, ন্যায়বিচার তখনই পূর্ণতা পায়, যখন বিচার বিভাগে সমাজের সকল স্তর ও লিঙ্গের প্রতিনিধিত্ব সুষমভাবে প্রতিফলিত হয়।

বিচারিক নেতৃত্ব বিকাশে আন্তর্জাতিক সংস্থা, উন্নয়ন সহযোগী ও দাতাগোষ্ঠীর ভূমিকার প্রশংসা করে প্রধান বিচারপতি বলেন, এটি নিছক সহায়তা নয়, বরং এক প্রকারের অংশীদারিত্ব। তিনি ইউএনডিপি, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, সুইডেন, যুক্তরাজ্য ও জার্মানির অবদানের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেন, যারা সুপ্রিম কোর্ট ও সিভিল সোসাইটির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে বিচার বিভাগের সক্ষমতা ও জেন্ডার সমতা নিশ্চিতকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এই সম্মেলনের আগে প্রধান বিচারপতি থাইল্যান্ডের বিচারমন্ত্রী রুত্তাফন নাওয়ারাত, ইউএনডিপির এশিয়ার ডেপুটি রিজিওনাল ডিরেক্টর ক্রিস্টোফ বাহুয়েট এবং নেপালের ডেপুটি প্রধান বিচারপতি স্বপ্না প্রধান মাল্লার সঙ্গে দ্বি-পাক্ষিক বৈঠক করেন।