ঢাকা ১২:০৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৩ মার্চ ২০২৬

বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফের সমাধিতে বিজিবির শ্রদ্ধা

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৮:২০:৩২ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৬ ডিসেম্বর ২০২৫
  • ৭ বার পড়া হয়েছে

মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে রাঙামাটির কাপ্তাই হ্রদের বুকে শায়িত বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ ল্যান্স নায়েক মুন্সী আব্দুর রউফের সমাধিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) রাঙামাটি সেক্টর।

মঙ্গলবার সকালে নানিয়ারচরের বুড়িঘাটে অবস্থিত বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফের সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) মহাপরিচালকের পক্ষে শ্রদ্ধা জানান রাঙামাটি সেক্টরের কমান্ডার কর্নেল মো. আহসান হাবিব। 

এ ছাড়া শ্রদ্ধা নিবেদন করেন বিজিবির কাপ্তাই জোন কমান্ডার লে. কর্নেল কাওসার মেহেদী, বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফের সমাহিত করা ও শনাক্তকারী দয়াল কৃঞ্চ চাকমা ও বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফ ফাউন্ডেশন। পুষ্পস্তবক অর্পণ শেষে বিজিবির একটি দল তাকে গার্ড অব অনার দেয়। পরে আব্দুর রউফসহ মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের আত্মার মাগফিরাত কামনায় মোনাজাত করা হয়।

বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফ  বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফ

উল্লেখ্য, মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙামাটি-মহালছড়ি জলপথে দায়িত্বপ্রাপ্ত হন মুন্সী আব্দুর রউফ। এই জলপথ দিয়ে পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনীর চলাচল প্রতিরোধের দায়িত্ব পড়ে তার কোম্পানির ওপর। কোম্পানিটি বুড়িঘাট এলাকার চেঙ্গিখালের দুই পাড়ে অবস্থান নিয়ে প্রতিরক্ষা ঘাঁটি গড়ে তোলে।

৮ এপ্রিল হানাদার বাহিনীর দুই কোম্পানি সৈন্য মর্টার, মেশিনগান ও রাইফেল নিয়ে বুড়িঘাটের মুক্তিবাহিনীর নতুন প্রতিরক্ষা ঘাঁটি ধ্বংস করতে সাতটি স্পিডবোট এবং দুটি লঞ্চ নিয়ে এগিয়ে আসতে থাকে। এটি ছিল পাকিস্তানি বাহিনীর দ্বিতীয় কমান্ডো ব্যাটালিয়নের (এসএসজি) কোম্পানি। মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরক্ষা ঘাঁটির কাছাকাছি পৌঁছেই আক্রমণ শুরু করে তারা। স্পিডবোট থেকে মেশিনগানের গুলি এবং আর লঞ্চ দুটি থেকে তিন ইঞ্চি মর্টারের শেল নিক্ষেপ করছিল মুক্তিযোদ্ধাদের দিকে। পাকিস্তানি বাহিনীর উদ্দেশ্য ছিল রাঙামাটি-মহালছড়ির জলপথ থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের পিছু হটিয়ে নিজেদের অবস্থান প্রতিষ্ঠা করা।

বীর মুক্তিযোদ্ধারাও প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পরিখায় অবস্থান নেন। কিন্তু হানাদার বাহিনীর গোলাগুলির তীব্রতায় প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভেঙে যায়। তারা মুক্তিযোদ্ধাদের সঠিক অবস্থান চিহ্নিত করে ফেলে। যুদ্ধের এই পর্যায়ে আব্দুর রউফ বুঝতে পারেন এভাবে চলতে থাকলে ঘাঁটির সবাই প্রাণ হারাবেন। তখন কৌশলগত কারণে পশ্চাৎপসরণের সিদ্ধান্ত নেন। এই সিদ্ধান্ত সৈন্যদের জানানো হলে সৈন্যরা পিছু হটতে শুরু করেন। 

কাপ্তাই হ্রদের বুকে শায়িত বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফ  কাপ্তাই হ্রদের বুকে শায়িত বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফ

এরই মধ্যে হানাদার বাহিনী তখন খুব কাছে চলে আসে। ফলে একযোগে পিছু হটতে থাকলে একসঙ্গে সবাই মৃত্যুবরণ করতে হতে পারে ভেবে আব্দুর রউফ পিছু হটেননি। সহযোদ্ধাদের পিছু হটার সুযোগ করে দিতে নিজে পরিখায় দাঁড়িয়ে পাকিস্তানি স্পিডবোটগুলোকে লক্ষ্য করে গুলি করতে থাকেন। হানাদারদের বিরুদ্ধে একা কৌশলে লড়ছিলেন। তিনি তাদের সাতটি স্পিডবোট একে একে ডুবিয়ে দিলে তারা তাদের দুটি লঞ্চ নিয়ে পিছু হটতে বাধ্য হয়।

লঞ্চ দুটো পিছু হটে রউফের মেশিনগানের গুলির আওতার বাইরে নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান নেয়। হানাদার বাহিনী এরপর লঞ্চ থেকে মর্টারের গোলাবর্ষণ শুরু করে। মর্টারের গোলার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা রউফের একার পক্ষে সম্ভব ছিল না। তবু চেষ্টা চালিয়ে যান। হঠাৎ একটি মর্টারের গোলা তার বাঙ্কারে এসে পড়ে এবং তিনি শহীদ হন। কিন্তু তার মৃত্যুর আগে সহযোগী যোদ্ধারা সবাই নিরাপদ দূরত্বে পৌঁছে যেতে পেরেছিলেন। সেদিন আব্দুর রউফের আত্মত্যাগে তার কোম্পানির প্রায় ১৫০ জন বীর মুক্তিযোদ্ধা প্রাণে বেঁচে যান। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে অসীম সাহসিকতার সঙ্গে লড়াই করে শহীদ হন তৎকালীন ইপিআরের ল্যান্স নায়েক মুন্সী আব্দুর রউফ। পরে বুড়িঘাটে তাকে সমাহিত করা হয়। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বাংলাদেশ সরকার মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য ও অনবদ্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে বীরশ্রেষ্ঠ উপাধি দেয়।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫: স্থগিতাদেশ চেয়ে করা রিটের আদেশ আজ

বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফের সমাধিতে বিজিবির শ্রদ্ধা

আপডেট সময় : ০৮:২০:৩২ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৬ ডিসেম্বর ২০২৫

মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে রাঙামাটির কাপ্তাই হ্রদের বুকে শায়িত বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ ল্যান্স নায়েক মুন্সী আব্দুর রউফের সমাধিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) রাঙামাটি সেক্টর।

মঙ্গলবার সকালে নানিয়ারচরের বুড়িঘাটে অবস্থিত বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফের সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) মহাপরিচালকের পক্ষে শ্রদ্ধা জানান রাঙামাটি সেক্টরের কমান্ডার কর্নেল মো. আহসান হাবিব। 

এ ছাড়া শ্রদ্ধা নিবেদন করেন বিজিবির কাপ্তাই জোন কমান্ডার লে. কর্নেল কাওসার মেহেদী, বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফের সমাহিত করা ও শনাক্তকারী দয়াল কৃঞ্চ চাকমা ও বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফ ফাউন্ডেশন। পুষ্পস্তবক অর্পণ শেষে বিজিবির একটি দল তাকে গার্ড অব অনার দেয়। পরে আব্দুর রউফসহ মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের আত্মার মাগফিরাত কামনায় মোনাজাত করা হয়।

বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফ  বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফ

উল্লেখ্য, মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙামাটি-মহালছড়ি জলপথে দায়িত্বপ্রাপ্ত হন মুন্সী আব্দুর রউফ। এই জলপথ দিয়ে পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনীর চলাচল প্রতিরোধের দায়িত্ব পড়ে তার কোম্পানির ওপর। কোম্পানিটি বুড়িঘাট এলাকার চেঙ্গিখালের দুই পাড়ে অবস্থান নিয়ে প্রতিরক্ষা ঘাঁটি গড়ে তোলে।

৮ এপ্রিল হানাদার বাহিনীর দুই কোম্পানি সৈন্য মর্টার, মেশিনগান ও রাইফেল নিয়ে বুড়িঘাটের মুক্তিবাহিনীর নতুন প্রতিরক্ষা ঘাঁটি ধ্বংস করতে সাতটি স্পিডবোট এবং দুটি লঞ্চ নিয়ে এগিয়ে আসতে থাকে। এটি ছিল পাকিস্তানি বাহিনীর দ্বিতীয় কমান্ডো ব্যাটালিয়নের (এসএসজি) কোম্পানি। মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরক্ষা ঘাঁটির কাছাকাছি পৌঁছেই আক্রমণ শুরু করে তারা। স্পিডবোট থেকে মেশিনগানের গুলি এবং আর লঞ্চ দুটি থেকে তিন ইঞ্চি মর্টারের শেল নিক্ষেপ করছিল মুক্তিযোদ্ধাদের দিকে। পাকিস্তানি বাহিনীর উদ্দেশ্য ছিল রাঙামাটি-মহালছড়ির জলপথ থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের পিছু হটিয়ে নিজেদের অবস্থান প্রতিষ্ঠা করা।

বীর মুক্তিযোদ্ধারাও প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পরিখায় অবস্থান নেন। কিন্তু হানাদার বাহিনীর গোলাগুলির তীব্রতায় প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভেঙে যায়। তারা মুক্তিযোদ্ধাদের সঠিক অবস্থান চিহ্নিত করে ফেলে। যুদ্ধের এই পর্যায়ে আব্দুর রউফ বুঝতে পারেন এভাবে চলতে থাকলে ঘাঁটির সবাই প্রাণ হারাবেন। তখন কৌশলগত কারণে পশ্চাৎপসরণের সিদ্ধান্ত নেন। এই সিদ্ধান্ত সৈন্যদের জানানো হলে সৈন্যরা পিছু হটতে শুরু করেন। 

কাপ্তাই হ্রদের বুকে শায়িত বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফ  কাপ্তাই হ্রদের বুকে শায়িত বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফ

এরই মধ্যে হানাদার বাহিনী তখন খুব কাছে চলে আসে। ফলে একযোগে পিছু হটতে থাকলে একসঙ্গে সবাই মৃত্যুবরণ করতে হতে পারে ভেবে আব্দুর রউফ পিছু হটেননি। সহযোদ্ধাদের পিছু হটার সুযোগ করে দিতে নিজে পরিখায় দাঁড়িয়ে পাকিস্তানি স্পিডবোটগুলোকে লক্ষ্য করে গুলি করতে থাকেন। হানাদারদের বিরুদ্ধে একা কৌশলে লড়ছিলেন। তিনি তাদের সাতটি স্পিডবোট একে একে ডুবিয়ে দিলে তারা তাদের দুটি লঞ্চ নিয়ে পিছু হটতে বাধ্য হয়।

লঞ্চ দুটো পিছু হটে রউফের মেশিনগানের গুলির আওতার বাইরে নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান নেয়। হানাদার বাহিনী এরপর লঞ্চ থেকে মর্টারের গোলাবর্ষণ শুরু করে। মর্টারের গোলার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা রউফের একার পক্ষে সম্ভব ছিল না। তবু চেষ্টা চালিয়ে যান। হঠাৎ একটি মর্টারের গোলা তার বাঙ্কারে এসে পড়ে এবং তিনি শহীদ হন। কিন্তু তার মৃত্যুর আগে সহযোগী যোদ্ধারা সবাই নিরাপদ দূরত্বে পৌঁছে যেতে পেরেছিলেন। সেদিন আব্দুর রউফের আত্মত্যাগে তার কোম্পানির প্রায় ১৫০ জন বীর মুক্তিযোদ্ধা প্রাণে বেঁচে যান। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে অসীম সাহসিকতার সঙ্গে লড়াই করে শহীদ হন তৎকালীন ইপিআরের ল্যান্স নায়েক মুন্সী আব্দুর রউফ। পরে বুড়িঘাটে তাকে সমাহিত করা হয়। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বাংলাদেশ সরকার মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য ও অনবদ্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে বীরশ্রেষ্ঠ উপাধি দেয়।